মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যের একটা সময় আমরা পার করছি। পণ্য ভালো হোক বা মন্দ, প্রচার হতে হবে বিশ্বমানের। আর গ্রাহকদের অবস্থাও ঠিক এমন—‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারি।’ কিন্তু গুণ বিচার করতে যাবার আগেই যা হবার তা হয়ে যায়। বৈচিত্র্যময় প্রচার-কৌশলের এই ধারা স্পর্শ করেছে আমাদের বইয়ের জগৎকেও। ফলে অনিবার্যভাবেই একজন লেখককে ভালো প্রচারণা করতেও জানতে হয়। ওই যে আগে বললাম, ওই কথাটাকেই ঘুরিয়ে যদি বলি—‘লেখা ভালো হোক বা মন্দ, প্রচার হতে হবে বিশ্বমানের।’
বই প্রচারণার ক্ষেত্রে লেখকের যে দায়বদ্ধতা, এটা মূলত প্রথমে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় প্রকাশকের তরফ থেকে। প্রচারেই প্রসার, লেখক যদি প্রচার না করেন, বই বিক্রি হবে কীভাবে? ইত্যাদি কথাবার্তা শুনে গোবেচারা ইন্ট্রোভার্ট লেখককেও প্রচারণায় মাঠে নেমে পড়তে হয়। লেখকরা প্রচারণার ক্ষেত্রে যা করেন, আমি কিছু নমুনা ও তার প্রভাব আগে তুলে ধরি :
১. প্রকাশের আগেই বেশকিছু পাঠককে বই উপহার দেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া।
উদ্দেশ্য হলো, তারা যাতে বই নিয়ে প্রচারণা করেন। এ পদ্ধতিতে বইয়ের কথা ছড়িয়ে দেওয়া যায় বলে লেখকরা বিশ্বাস করেন। আমি মনে করি, নিজের বই হাদিয়া দেবার ক্ষেত্রে লেখককে সর্বোচ্চ সচেতন হতে হবে। বইয়ের মূল্য তখনই তৈরি হবে, যখন লেখক তৈরি করবে। লেখক যদি পাঠকমহলে চাউর করে দেয়, আমার বই বিনামূল্যে পাওয়ার উপায় হলো এটা—তাহলে মূলত নিজের বই মূল্যহীন হবার প্রথম ধাপটি লেখক নিজেই সম্পন্ন করল।
ফলে এ পদ্ধতি ছাড়াও আরও কোনো পদ্ধতিতে নিজের বই নিজে উপহার দেবার মানসিকতা বর্জন করাই শ্রেয়। এতে মার্কেটিং হয় ত্রিশ পার্সেন্ট, বইয়ের ভ্যালু নষ্ট হয় সত্তর পার্সেন্ট।
২. ভাড়াটে পাঠকদের দিয়ে রিভিউ কিংবা প্রিভিউ লেখানো।
এক শ্রেণির পাঠক সব লেখকের পকেটেই থাকে, যারা বই প্রকাশের পূর্বে লেখকের বই নিয়ে প্রিভিউ প্রচার করে, প্রকাশের পরে তড়িঘড়ি করে রিভিউ দিতে থাকে সোস্যাল মিডিয়ায়।
এ পদ্ধতির মাধ্যমে কিছু উপকার তো রয়েছে, তবে এর নেগেটিভ ইফেক্ট তার তুলনায় বেশি। যারা ভাড়াটে পাঠক, তাদের মাধ্যমে অথেনটিক বুক রিভিউ পাওয়া যায় না। অধিকাংশ সময় সেটা হয়ে থাকে দায়সারা গোছের। ফলে পাঠক এতে প্রভাবিত হয় না। উল্টো উপর্যুপরি লেখকের আলগা প্রশংসায় হীতে বিপরীতও ঘটে যায়।
৩. প্রতিদিন নিয়ম করে ফেসবুকে বই নিয়ে পোস্ট করা।
বর্তমান লেখকদের অনেকেই তার ফেসবুক প্রোফাইলকে প্রচারণার সবচে বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রতিদিন অথবা সপ্তাহে চার-পাঁচদিন, অনেকে দৈনিক দু-তিনটা করে পোস্ট দেন নিজের বই নিয়ে। পাঠককে জমিয়ে রাখতে চান বিভিন্ন কৌশলে।
এতেও বহুবিধ উপকার রয়েছে। তবে আমি শুধু ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরব। প্রথম যে ক্ষতিটা হয়, লেখকের প্রতি মানুষের বিরক্তি চলে আসে। মনে রাখতে হবে, ফ্রেন্ডলিস্টের ৫ হাজার মানুষই আপনার পাঠক নন। ফলোয়ার্সের সবাই আপনাকে লেখক হিসেবেই পছন্দ করেন না। একেকজন একেক সূত্রে, একেক উদ্দেশ্যে, একেক উপায়ে আপনার সাথে যুক্ত হয়েছে। সবাই নিশ্চয়ই আপনার মাত্রাতিরিক্ত প্রচারণা পছন্দ করবে না। বাস্তবতা হচ্ছে, ফেসবুকে এই প্রচারণা কৌশলের মাধ্যমে সিরিয়াস মানুষজন বিরক্ত হয়ে আনফলো করে রাখেন। আরও বাস্তব কথা হলো, এই কৌশলের মাধ্যমে বইয়ের বিক্রি খুব বৃদ্ধি পায় না।
আরও অনেকগুলো পদ্ধতিতে লেখকরা বইয়ের প্রচার করেন। আমি উল্লেখযোগ্য তিনটি কৌশল বলে সামনে এগোচ্ছি।
লেখক কি তাহলে নিজ বইয়ের মার্কেটিং করবে না? মার্কেটিং না করলে বই বিক্রি হবে কীভাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানবার আগে আমাদের একটি কথা মনে রাখা দরকার, লেখকের প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে লেখা। এই কাজটা যদি কেউ ভালোমতো করতে পারে, তাকে আর কিচ্ছু করতে হয় না। কলম নামের যে অস্ত্রটি লেখকের হাতে রয়েছে, এটা ভালোমতো চালাতে জানলে এর সামনে সব কুপোকাত হয়ে যায়।
এরপর বলি, লেখকের সবচে বড় মার্কেটিং টুলস হচ্ছে তার বই। একটা বই অন্য বইয়ের প্রচার করে। যখন স্যোসাল মিডিয়া ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, টেলিযোগাযোগও ছিল না, তখনও লেখকরা লিখেছেন এবং হাজার হাজার কপি বই বিক্রি হয়েছে। মার্কেটিং কে করেছে? লেখক নিজেই করেছেন তার বইয়ের মাধ্যমে। আমি যখন হুমায়ূনের ‘হিমুর মধ্যদুপুর’ বইটা পড়ে শেষ করেছি, ঠিক ওইদিনই চল্লিশ টাকা সিএনজি ভাড়া খরচ করে বহুদূরে নিজে গিয়ে হিমু সিরিজের আরেকটি বই সংগ্রহ করে এনেছি। ফলে লেখক বর্তমানে যে বইটি লিখছেন, এটিই তার মার্কেটিং টুলস। এই বই যদি তিনি ভালোভাবে লিখতে পারেন, তাহলে পাঠক বইটি পড়ে তার পরবর্তী বইয়ের জন্য অপেক্ষা করবে। কখন আসবে, কোত্থেকে আসবে, এ চিন্তা পাঠকের মাথায় ঘুরঘুর করবে। লেখককে ব্যস্ত হতে হবে না বই প্রচারের জন্য।
এর সূত্র ধরেই বলি, লেখকের সবচে বড় মার্কেটর হচ্ছে তার পাঠক। যারা অথেনটিক পাঠক, মানে নিয়মিত বই পড়েন যারা, তারা বই নিয়ে আলাপ করতেই সবচে বেশি পছন্দ করেন। এই যে বৃহৎ পাঠকগোষ্ঠী, তাদের সাথে কানেক্টেড হবার একমাত্র উপায় হচ্ছে বই। একজন পাঠক বই পড়ে যদি আনন্দ পায়, সে নিঃস্বার্থভাবেই আরও দশজনকে বই পড়তে উৎসাহিত করে। এমনকি অনেকে তো বন্ধুদের বাধ্যও করে। এভাবেই লেখকের পাঠক সম্প্রদায় বিস্তৃত হতে থাকে। একজন দশজনকে, দশজন একশজনকে, একশজন হাজারজনকে—এভাবেই লেখককে ছড়িয়ে দেওয়া হয় হৃদয়ে হৃদয়ে।
এতটুকু যারা পড়েছেন, তাদের প্রতি আহ্বান, হে প্রিয় লেখক! আপনার হাতে যে দায়িত্ব, সেটা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করুন; পরের দায়িত্ব নিজের কাঁধে টেনে নেবার প্রয়োজন হবে না।
এবার আমি বর্তমান সময়ে লেখকের তরফ থেকে বই প্রচারের কিছু আদর্শ উপায় নিয়ে আলাপ করব। এর আগেই আমি বুঝিয়েছি, ভালো বইয়ের জন্য লেখককে প্রচারকের ভূমিকা পালন করতে হয় না। কিন্তু নিজের বইকে লেখক নানাভাবেই উপস্থাপন করতে পারেন পাঠকমহলের কাছে। তার কয়েকটি হলো :
১. বই নিয়ে প্রফেশনাল গ্রন্থ আলোচনা
বই প্রকাশের পর এমন কিছু সাহিত্যসমালোচকের দ্বারস্থ হন, যারা মূলত একাডেমিক ধাঁচে বইয়ের ভালোমন্দ নিয়ে লিখতে পারেন। তাদেরকে বই হাদিয়া দিলে, গ্রন্থ আলোচনা লিখে দেবার বিনিময়ে উপযুক্ত সম্মানি দিলে সেটা অপাত্রে অর্থব্যয় হবে না। এই আলোচনাগুলো লিটলম্যাগে, দৈনিক পত্রিকায়, বিভিন্ন ওয়েব জার্নালে প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে বইয়ের মূল অডিয়েন্সের কাছে সহজেই বইয়ের বার্তা পৌঁছে যাবে। লেখকরা অনেক ক্ষেত্রে মনে করেন, সমালোচক যদি বইয়ের মন্দ দিকগুলো তুলে ধরেন, তাহলে বোধহয় বইয়ের বিক্রি কমে যাবে। এটা ভুল ধারণা। সত্যিকারের পাঠকরা অথেনটিসিটি পছন্দ করে।
২. পাঠকদের অভিব্যক্তি মূল্যায়ন
একটি ভালো বই পড়বার পর পাঠকরা লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে চান। নিজের অভিব্যক্তি জানাতে চান। অনেক ক্ষেত্রে সোস্যাল মিডিয়ায় পোস্টে, কমেন্টে কিংবা লেখকের ইনবক্সে তারা অভিব্যক্তি জানিয়ে থাকেন। লেখকের উচিত, পাঠকের এ হৃদয়জ অভিব্যক্তি সাদরে গ্রহণ করা, তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো। এতে পাঠকের মনে লেখক দৃঢ় স্থান করে নেন। পরবর্তী বইয়ের জন্য নতুন করে ওই পাঠকের কাছে প্রচারণা করতে হয় না।
৩. ফ্রি ভ্যালুয়েবল কন্টেন্ট
লেখকরা কীভাবে সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবে, এ নিয়ে আমি আরেকটি লেখায় বিস্তারিত বলব। এখন শুধু বলতে চাই, লেখকদের উচিত প্রচুর ফ্রি কন্টেন্ট তৈরি করা। এ কন্টেন্টগুলো মানসম্মত হওয়া চাই, প্রকাশিত বইয়ের সাথে রিলেটেড হওয়া চাই। যেমন ধরুন, কেউ মোটিভেশনাল বই লিখেছেন, তার উচিত এ বিষয়ে প্রচুর মানসম্মত রিসোর্স ফ্রিতে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা। এতে করে পাঠক অ্যাঙ্গেজ হবে, তার লেখা পড়ে উপকৃত হবে, একসময় তার বইয়ের ক্রেতা হিসেবে কনভার্ট হবে।
৪. বইয়ের সাথে ইস্যু রিলেট করা
জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক যেকোনো ইস্যুকে যদি জুতসই উপায়ে নিজের বইয়ের সাথে সম্পৃক্ত করা যায়, তাহলে মানুষ দ্রুত বইটি কিনতে আগ্রহী হয়। আমাদের ইস্যুনির্ভর বাংলাদেশে এ কৌশলটি খুব কার্যকর। তবে এক্ষেত্রে লেখক সরাসরি নিজে প্রচার না করে প্রকাশককে কন্টেন্ট হস্তান্তর করতে পারে।
৫. সেলস মার্কেটিংয়ে অংশ না নেওয়া
লেখকের কাছে বই সন্তানতুল্য, আর প্রকাশকের কাছে বই একটি পণ্য। সুতরাং বইয়ের প্রতি উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পার্থক্য রয়েছে। লেখক যদি সেলস মার্কেটিং বা বিক্রয় প্রচারণায় অংশ নেন, তাহলে তার আত্মমর্যাদা হ্রাস পেতে থাকে। সুতরাং লেখককে তার মর্যাদার স্থান সযত্নে আগলে রাখতে হবে। প্রকাশক চাইবেন লেখক সারাক্ষণ তাদের পণ্যটি নিয়ে প্রচারণায় মেতে থাকুক। এ ক্ষেত্রে লেখককে সচেতন থাকতে হবে।
৬. প্রকাশককে মার্কেটিং রিসোর্স দেওয়া
তাই বলে আমরা শুধু বই লিখে ক্ষান্ত হবো—এ যুগে এমনটা অনুচিত। বইয়ের লেখক সবচে ভালো জানেন তার বইয়ের টাচিং পয়েন্ট কী। কোন পদ্ধতিতে প্রচার করলে বইটি পাঠকের নজর কাড়তে পারে, সেটাও লেখকের ভালো জানা থাকা স্বাভাবিক। তাই লেখকের উচিত, বই প্রকাশের আগেই প্রকাশককে মার্কেটিং রিসোর্স প্রস্তুত করে দেওয়া। যেমন, বইয়ের কিছু শর্ট কন্টেন্ট, বিভিন্ন স্তরের পাঠকদের জন্য বইয়ের প্রয়োজনীয়তা, বইয়ের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য, ভিডিওগ্রাফির জন্য স্ক্রিপ্ট ইত্যাদি। লেখকের যদি মার্কেটিং নিয়ে জানাশোনা থাকে, তিনি একটি পূর্ণ মার্কেটিং প্ল্যান তৈরি করে দিতে পারেন। প্রয়োজনে শুধু প্রচারণা কৌশল নিয়ে একদিন মিটিং করে নিতে পারেন। এতে প্রকাশকের সাথে তার রিলেশন ভালো থাকবে।
মোটকথা, লেখকের উচিত প্রকাশককে সর্বোচ্চ সহায়তা করা, আবার নিজেকে সেলস মার্কেটরের ভূমিকা থেকেও নিরাপদ দূরত্বে রাখা। লেখকের পূর্ণ সময় ও মনোযোগ ব্যয় করা উচিত পরবর্তী বইয়ের পেছনে। এটাই তার মূল কর্তব্য।
আমার এ আলোচনাটুকু কেবলই আমার নিজস্ব অভিমত। শুধু লেখকদের জন্যই এ কথাগুলো ব্যক্ত করা হয়েছে। লেখকদের আত্মপ্রচারণা বা সেলফ মার্কেটিং এবং প্রকাশককের বই প্রচারণা নিয়েও লিখব—ইনশাআল্লাহ।