শৈশবে মায়ের মুখে মুখে শুনতাম, স্মৃতিপটে আজও প্রতিধ্বনি বাজে :
খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে
ধান ফুরোলো পান ফুরোলো খাজনার উপায় কী?
আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।
স্মৃতিমধুর শৈশবে বর্গী নামের শব্দে যে ‘ভয়াবহতা’ লুকিয়ে আছে, তা ধরতে পারতাম না। ছন্দের মোহে চোখ নুয়ে আসতো। এখন নিশ্চয় শব্দে ছন্দে কেবল মোহ নয়, হতে হয় অনুসন্ধিৎসু। ফিরে যাই কবিতার বর্গীতে। বর্গী কারা?
আঠারো শতকের কথা বলছি। সেই শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত দুটি ঘটনা ছিলো বর্গীয় হাঙ্গামা ও ছিয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ। ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা; তখন বাঙলা, বিহার, উড়িষ্যা শাসন করতেন ধর্মনিষ্ঠ ও দূরদর্শী নবাব আলিবর্দি খান। নাগপুরের মারাঠা শাসক রঘুজি ভোঁসলের দেওয়ান ভাস্কররাম কোলাহাতকরের (উরফে ভাস্কর পণ্ডিত) নেতৃত্বে একদল মারাঠা অশ্বারোহী সৈন্য বাঙলায় এসে উৎপাত শুরু করে। এরা লুটতরাজ সৃষ্টি করল পশ্চিম বাঙলার সীমান্তাঞ্চলে। অভিযানে বের হতে এরা সাথে নিত সাত হাত কম্বল আর একটি বর্শা। মারাঠি ভাষায় এই বর্শাকে বলা হতো ‘বরচি’। এই বরচি থেকেই বর্গীর সৃষ্টি।
১৭৪২ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত টানা নয় বছর এই বর্গীরা বাঙলায় ত্রাস প্রতিষ্ঠা করে। নয় বছরের এই সময়ে তারা লুটপাট ছাড়াও প্রচুর নারী ধর্ষণ করতো৷ মানুষ ‘ঐ বর্গী আইলো রে!’ শুনলেই আতঙ্কে ঢুকে যেত ঘরে। এভাবে পশ্চিম বাঙলার বর্ধমান, মেদিনীপুর আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা নির্বিচারে সমগ্র বাংলা জুড়ে লুটতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ১৭৪২ সালের মে মাসে মুর্শিদাবাদ লুণ্ঠনের পর প্রত্যাবর্তনকালে বর্গীরা পথিমধ্যে অসংখ্য গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ১৭৪২ সালের জুনে বর্গীরা হুগলী দখল করার পর তাদের উপদ্রবে এই অঞ্চলের লোকের দুর্দশা চরমে পৌঁছে। বর্গীরা অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। ধারণা করা হয়, বাংলার প্রায় ৪,০০,০০০ অধিবাসী বর্গীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিল। বহু মানুষ তাদের পরিবারের নারীদের সম্মান রক্ষার জন্য তাদের বাড়িঘর ত্যাগ করেন।
আলিবর্দি খান তাদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রভূত বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, কিন্তু বর্গি আক্রমণ ঠেকাতে সমর্থ হননি। নবাবের বাহিনী মারাঠা অশ্বারোহীদের গতি ও দক্ষতার সামনে অসহায় ছিল। এই বর্গীদের আগমন হয়েছিলো কেন?
১৭৪০ সালের এপ্রিল মাসে বিহারের শাসনকর্তা আলিবর্দি খান গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ খানকে পরাজিত ও নিহত করে বাঙলার (বাঙলা, বিহার, উড়িষ্যা) নবাব হন। সরফরাজ খাঁর শ্যালক ছিল উড়িষ্যার নায়েব নাজিম (উপশাসক) রুস্তম জং। সে আলিবর্দি খানের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে। আলিবর্দি বালাশূরের নিকট ফলওয়াইয়ের যুদ্ধে রুস্তম জংকে পরাজিত করে নিজের ভাইপোকে উড়িষ্যার উপশাসক নিয়োগ করেন। রুস্তম জং এরপর নাগপুরের মারাঠা শাসক প্রথম রঘোজি ভোঁসলের সাহায্য প্রার্থনা করে। এরপরই ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে আগমন হয় বর্গীদের। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিলো উড়িষ্যাকে কেন্দ্র করে। নয় বছর পর বাধ্য হয়ে ১৭৫১ সালের মে মাসে আলিবর্দি খান মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। এই সন্ধিচুক্তি অনুযায়ী তিনি উড়িষ্যার অধিকার ছেড়ে দেন। এরপর বাংলায় বর্গি হানা বন্ধ হয়।
বর্গীয় হাঙ্গামা ঘটেছে পলাশীরও আগে, তখনও ইংরেজরা দেওয়ানি লাভ করেনি৷ ভয়াবহ এই সময়টি এখনও তার প্রভাব রেখে চলেছে। ভারতচন্দ্র রায় তার ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে সেই সময় নিয়ে লিখেছেন,
লুঠি বাঙলার লোক করিল কাঙাল
গঙ্গাপার হইল বাঁধি নৌকার জাঙ্গাল
কাটিল বিস্তর লোক গ্রাম গ্রাম পুড়ি
লুঠিয়া লইল ধন ঝিহুড়ী বহুড়ী
এই আলিবর্দি খানের পর তার দৌহিত্র সিরাজুদ্দৌলা ২৩ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাবের ক্ষমতা অর্জন করেন। আলিবর্দি খান জীবদ্দশায়ই অনেক যুদ্ধ ও বর্গীয় হাঙ্গামা প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সিরাজকে। অকুতোভয় সিরাজে মুগ্ধ হয়েই তিনি সিংহাসনে বসিয়েছিলেন তাকে৷ তিনিই ছিলেন বাঙলার শেষ নবাব। তাঁর সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন ও এরপর রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে।