সূচীপত্র

গদ্য

সাইয়েদ সুলাইমান নদবির সাথে আমার স্মৃতি

24 March, 2026

সাইয়েদ সুলাইমান নদভির সাথে আমাদের খান্দানের এত বৈচিত্র্যময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যে—তিনি কখনও কোনো যুগেই আমাদের জন্য আজনবি ছিলেন না। তিনি শুধু দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার ফাজেল ছিলেন না; বরং নদওয়ার জন্য তিনি ছিলেন গর্বের ধন। তিনি ছিলেন আমার বাবার প্রিয় শাগরিদ। আর ভাই সাহেবের এমন বন্ধু ছিলেন—যিনি বয়সে তারচে বড়, মর্যাদা ও সুখ্যাতিতে তারচে প্রাজ্ঞ। আমাদের দরসগাহের মুরব্বি ও উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি। আমার উসতাদ মাওলানা খলিল আরব সাহেবের সাথে তার সম্পর্ক ছিল এমন—আরব সাহেব যেমন তাকে সম্মান করতেন, আবার নির্দ্বিধায় হাসিঠাট্টাও করতেন। আরব সাহেব সেই যুগে নদওয়ায় শিক্ষাগ্রহণ করেছেন, যখন সাইয়েদ সাহেব ছিলেন সেখানকার উসতাদ। আরব সাহেব তার কাছে পড়ার সুযোগ পেয়ে থাকলেও সেটা ছিল কেবল নামকাওয়াস্তে। এরপর যখনই দুজনকে একসাথে দেখেছি, হাস্যরসিকতা আর অকৃত্রিম ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে থাকতেই দেখেছি। সাইয়েদ সাহেব তার একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুমহলে ছিলেন খুব রসিক, বাকপটু ও প্রফুল্লচিত্ত। কিন্তু তার রসিকতায়ও জ্ঞান ও সাহিত্যের ছাপ থাকত। লখনৌতে দীর্ঘকাল থাকবার ফলে ভাষিক সুক্ষ্মতা ও পরিচ্ছন্ন রসিকতায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন; রসিকতা যেন না হয়ে যায় নোংরামি আর ঠাট্টা যেন না হয়ে যায় উসকানি—এ বিষয়ে তিনি যথেষ্ঠ সতর্ক ছিলেন।

সাইয়েদ সাহেবকে আমি শুরুরদিকে দেখেছি খাজা সাইয়েদ রশিদ উদ্দিন মওদুদি মরহুমের কুঠিতে। যখন তিনি লখনৌতে আসতেন, অধিকাংশ সময় ওখানেই অবস্থান করতেন। খাজা রশিদ উদ্দিন—যাকে আচ্ছে সাহেব নামে সম্বোধন করা হতো, তিনি ছিলেন খাজা সাইয়েদ নুরুল হাসান খান মরহুমের জামাতা। আর মরহুম নুরুল হাসান খানের ছোট ভাই নবাব সাইয়েদ আলি হাসান খান মরহুম (নাজেম, নদওয়াতুল উলামা) ছিলেন তার শ্যালক। আচ্ছে সাহেবের বাংলো ছিল নবাব নুরুল হাসান খান মরহুমের কুঠির (যেটি ভুপাল হাউজ নামে প্রসিদ্ধ) পাশেই। ১৯২৩ থেকে ১৯২৫ পর্যন্ত লখনৌ মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ভাই সাহেব ওই কুঠিতেই থাকতেন। আমি মাসের পর মাস তার সাথে থাকতাম। আমার বয়স তখন ১১/১২ হবে। সাইয়েদ সাহেব যখন আচ্ছে সাহেবের বাংলোয় আসতেন, আমরা তাকে খুব কাছ থেকে দেখতাম। ওই সময়ের আর কোনো স্মৃতি এখন মনে পড়ে না। ১৯২৬-২৭ সালে আমরা ঝাউলাল বাজারে স্থানান্তরিত হই। ভাই সাহেব তখন ক্লিনিক শুরু করেন। আমাদের ও আরব সাহেবের বাসা ছিল মুখোমুখি। তখন আরব সাহেবের কাছে আমার আরবি শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। ওই দিনগুলোতে সাইয়েদ সাহেব ও মাওলানা মাসউদ আলি সাহেব মাঝেমধ্যে ভাই সাহেব কিংবা আরব সাহেবের সাথে দেখা করতে আসতেন। কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন সেখানে। সেই তখন থেকেই সাইয়েদ সাহেবের দেহাবয়ব আমার মনের ভেতর গেঁথে যায়। আপাদমস্তক আত্মমর্যাদাবান ও স্থিরচিত্ত, মধ্যমাকৃতির নীচু সৌষ্ঠব—নির্মল নিস্পাপ চেহারাখানা দেখেই হৃদয় সাক্ষ্য দিত, লোকটির মাঝে অন্যকে কষ্ট দেবার মতো শক্তি নেই। পোশাক নিতান্ত পরিচ্ছন্ন—কোথাও সামান্য দাঁগও দেখা যেত না। সবকিছু তার নিখুঁত ও পরিশীলিত; শেরওয়ানি কিছুটা লম্বা, মাথার পাগড়ি ধবধবে সাদা ও পরিস্কার, সুন্দরভাবে পেছনের অংশটুকু ঝুলিয়ে রাখা। বলতেন—‘আমি পাগড়ির অভ্যাস ধরেছি আপনার বাবাকে দেখে।’ কথা বলতেন এতটা সীমিত স্বরে, গুরুত্ব ও আগ্রহের সাথে শুনবার চেষ্টা না করলে যা শোনা যেত না। সাধারণত স্বল্পভাষী ও মেপে কথা বলার অভ্যাস ছিল, চোখে তাকালে লজ্জা ও বিচক্ষণতার সুস্পষ্ট প্রকাশ লক্ষ্য করা যেত—কিছুটা প্রচ্ছন্ন, কিছুটা ব্যক্ত। যখন কোথাও যেতেন, যারা তার পক্ষে বা বিপক্ষে, যারা তার মর্যাদা মেনে নেন বা অস্বীকার করেন—সবাই তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে বাধ্য হতেন। উসতাদ খলিল আরব সাহেব তার ব্যক্তিত্বের প্রতি অনুগত ছিলেন না, উলটো সমালোচক ছিলেন অনেকাংশে—তবু সবসময় সাইয়েদ সাহেবকে সম্মান করতেই দেখেছি।

১৯২৯ সালে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমি দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় পড়াশোনা শুরু করি। ওই সময় সাইয়েদ সাহেব দারুল উলুমের শিক্ষা সচিব ছিলেন। নদওয়ার পরিচালনা কমিটির বৈঠক ছাড়াও মাঝেমধ্যে তিনি আসতেন এবং কয়েকদিন অবধি নদওয়ায় থাকতেন। কখনও বিভিন্ন শ্রেণিতে বা ছাত্রদের জলসায়ও শরিক হতেন। একবার ছাত্রদের আরবি সেমিনার হচ্ছিল। আমার বক্তৃতার পালা যখন এলো, অভ্যাসমাফিক শ্রোতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে মাসনুন খুতবা ছাড়া বক্তৃতা শুরু করে দিলাম। সাইয়েদ সাহেব আমাকে থামিয়ে দিলেন, স্মরণ করিয়ে দিলেন সেই হাদিসটি—যাতে বর্ণিত হয়েছে, যে বক্তব্য বা রচনা হামদ ও সানা ছাড়া শুরু হয়, সেটি ত্রুটিপূর্ণ থাকে। আমার জন্য খুব জটিল ব্যাপার ছিল—ঠিক ওই মুহূর্তে হামদ ও সানার উপযুক্ত শব্দ এবং বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ খুতবা পড়া; যার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুতি নেইনি। ফলে আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বক্তব্য শুরু করলাম। সাইয়েদ সাহেব আমাকে আবার থামিয়ে দিলেন। আমি এবার বলে বসলাম, ‘আমি নীচুস্বরে পড়ে নিয়েছি।’ সাইয়েদ সাহেব মুচকি হাসলেন, বললেন :

كذا قال الشارح، كذا قال الشارح

যেমনটা ব্যখ্যাকার বলেছেন! যেমনটা ব্যখ্যাকার বলেছেন!!

সেপ্টেম্বর ১৯৩০ সালে দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার আরবি বিভাগের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন আল্লামা তকিউদ্দিন হেলালি মারাকিশি। এর মাধ্যমে শুধু দারুল উলুমেই নয়, বলা যায় গোটা হিন্দুস্তানেই (যে অবধি আরবি ভাষার সাথে সম্পর্ক রয়েছে) এক নবযুগের সূচনা ঘটে। হেলালি সাহেব সম্ভবত ১০৩১ সালের শেষদিকে পূর্বাঞ্চলের কিছু জেলা তথা বেনারস, আজমগড়, মেওয়া, মোবারকপুর সফর করেন। তিনি স্নেহবশত আমাকে সঙ্গ ও সহায়তার জন্য নির্বাচন করেন। আমি ওই পুরো সফরে তার সহকারী ও মুখপাত্রের ভূমিকা পালনের সৌভাগ্য লাভ করি। রমজানের মাস ছিল; ডিসেম্বর বা জানুয়ারি হবে। সফরকালে কয়েকদিন আমরা দারুল মুসান্নিফিনে অবস্থান করেছি। এটি ছিল দারুল মুসান্নিফিনে আমার প্রথম উপস্থিতি। ইফতার করতার সবাই একত্রে; তবে সাহরির জন্য আমাদের উভয়কে যেতে হতো সাইয়েদ সাহেবের বাসায়। আমি তাদের দুজনকে দেখেছি বহুক্ষণ ধরে জ্ঞান ও সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতে। ওই সফরেই দারুল উলুম থেকে একটি আরবি পত্রিকার যাত্রা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। এর তত্ত্বাবধান ও উপদেষ্টা হিসেবে সাইয়েদ সাহেব ও হেলালি সাহেব এবং সম্পাদক হিসেবে আমাদের বন্ধু মাওলানা মাসউদ আলম নদবি সাহেব নির্বাচিত হন। এ ছিল সাইয়েদ সাহেবের পুরোনো জ্ঞান ও সাহিত্য রূচির পুনরুজ্জীবন এবং একটি আরবি পত্রিকা প্রকাশের বহুপুরোনো স্বপ্নের বাস্তবায়ন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশ পায় মুহাররম ১৩৫১ হিজরি মোতাবেক মে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে। এর সম্পাদকীয় খোদ সাইয়েদ সাহেব লেখেন এবং খুব চমৎকার লেখেন। এ ছিল তার আরবি রচনায় সিদ্ধহস্তের উত্তম নমুনা। মোটেও বোঝা যায় না—আরবি লেখায় তার অনুশীলন স্তিমিত হয়েছে কিংবা কলমের মুসাফির পেয়েছে নতুন অচেনা উপত্যকার দিশা। এই সম্পাদকীয়তে সাইয়েদ সাহেব ভারতবর্ষে আরবি সাংবাদিকতার সংক্ষিপ্ত তত্ত্বতালাশও করেছেন, পাশাপাশি এর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছেন। ওই রচনায় কোথাও কোথাও গদ্যের স্বতঃস্ফূর্ততা, ছন্দ ও উপমার অভিনব উপস্থাপনা পুরোনো যুগের স্মৃতিকে তাজা করে দেয়।

এর পরবর্তীকালে সাইয়েদ সাহেব খুব কমই আরবি গদ্য লেখার সুযোগ পেয়েছেন। বেশিরভাগ পদ্যই প্রকাশ হয়েছে; আর তার উর্দুতে লেখা কতিপয় গবেষণা প্রবন্ধের অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে—যার অধিকাংশ অনুবাদ করেছেন মাওলানা মাসউদ আলম নদবি।

সাইয়েদ সাহেবের নৈকট্য এবং অপার স্নেহ ও মহব্বত অর্জনের সৌভাগ্য আমার হয়েছে নদওয়ার সাথে শিক্ষকতার সম্পর্ক স্থাপনের পর। আমার নিযুক্তির ক্ষেত্রে মাওলানা মাসউদ আলি নদবির মেহনত ও সাইয়েদ সাহেবের তাগাদা বেশ ইন্ধন জুগিয়েছে। ১লা আগস্ট ১৯৩৪ সালে তাফসির ও আদব বিভাগের শিক্ষক হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হয়। সাইয়েদ সাহেব তখন দারুল উলুমে আসনে, শিক্ষা বিষয়ে পরামর্শ দিতেন, বিভিন্ন শ্রেণিতে হাজির হতেন, প্রায়ই দরস শুরু করে দিতেন, মাঝেমধ্যে কয়েক ঘণ্টা অবধি এ দরস চলতে থাকত, ছাত্রদের চেয়ে আমরা বেশি উপকৃত হবার সুযোগ পেতাম। কয়েক দিন মেহমানখানায় তিনি অবস্থান করতেন, আর ওখানে ছাত্রদের চেয়ে উস্তাদরাই বেশি হাজিরা দিতেন, সংশ্রব নিতেন। ছাত্রদের এই গুরুত্বহীনতা নিয়ে সাইয়েদ সাহেব শুধু আফসোস নয়, ব্যথা অনুভব করতেন। একবার আমাকে বললেন, ‘মৌলবি আলি! (তিনি আমাকে এভাবেই সম্বোধন করতেন) ছাত্ররা আমার কাছে আসতে ভয় পায় কেন?’ আমি বললাম, ‘কারণ আপনি তাদের থেকে অনেক পরীক্ষা নেন।’ সাইয়েদ সাহেবের এই শিক্ষকতাসুলভ চেতনা জীবনের সান্ধ্যকাল অবধি বিদ্যমান ছিল। তিনি নাহু-সরফের দীক্ষা পেয়েছিলেন প্রাচীন ধারায়।[1] এর গুরুত্ব ও আগ্রহ শেষাবধি তার মাঝে দেখা গেছে। শব্দ ও ব্যুৎপত্তি নিয়েও তিনি খুব আগ্রহ রাখতেন। প্রত্যেক শ্রেণির ছাত্রকে তার যোগ্যতা ও পাণ্ডিত্য বিবেচনায় নাহু-সরফ ও লুগাত নিয়ে প্রশ্ন করতেন। কোনো আরবি পঙ্‌ক্তি পাঠ করে তার মর্ম জানতে চাইতেন। ছাত্ররা স্বভাবতই পরীক্ষা থেকে ভয় পায়; আবার ভালো মেধাবীরাও সাইয়েদ সাহেবের সামনে কুপোকাত হয়ে যেত; ছাত্রদের বৃহৎসংখ্যক সাইয়েদ সাহেবের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কেও অজ্ঞ ছিল; সাইয়েদ সাহেবের বৈঠকও হতো এমন সময়ে, ছাত্ররা যখন নিজ প্রয়োজনে বাজারে যাবে কিংবা খেলাধুলা করবে; ফলে ছাত্ররা তার বৈঠকে হাজির হতো খুব কম। সাইয়েদ সাহেব আমাকে বললেন, ‘আচ্ছা, আমি পরীক্ষা নেবো না। আপনি ছাত্রদের বুঝিয়ে বলুন।’ আমি ছাত্রদের বুঝিয়ে বললাম এ মূল্যবান সময়টুকুর গুরুত্ব অনুভব করতে এবং তার ঐতিহাসিক বৈঠকগুলোতে গনিমত বরং নেয়ামত মনে করতে। আমার কথা শুনে কিছু ছাত্র আসতে শুরু করে বটে, কিন্তু প্রায়শই সাইয়েদ সাহেবের ভেতর সেই পুরোনো অভ্যাস জেগে ওঠে, আবারও তিনি কারও দিকে প্রশ্নের বাণ ছুঁড়ে দেন, কখনও আবার ছাত্ররা ওই মজলিসে পরিতৃপ্ত হবার কোনো উপকরণ খুঁজে পায় না; ফলে বৈঠকে ছাত্রদের সংখ্যায় খুব বৃদ্ধি লক্ষ করা যায় না। অতঃপর সাইয়েদ সাহেব এ নিয়ে ফের আফসোস করেন, আমরা লজ্জিত হই—ছাত্ররা ঘরের এই দৌলত, জ্ঞান ও সাহিত্যের হুমা পাখির ছায়া পেয়েও বঞ্চিত হলো।

সাইয়েদ সাহেব বছরে কয়েক দফা আলিগড় সফর করতেন। তিনি ইউনিভার্সিটি কোর্টের মেম্বার ছিলেন। শিক্ষক নিযুক্তির ক্ষেত্রেও তাকে এক্সপার্ট হিসেবে ডাকা হতো। ইউনিয়নও মাঝেমধ্যে তাকে তলব করত। দিল্লি এবং পশ্চিম ও উত্তর ভারতেও তিনি সফর করতেন। প্রতিবার যাতায়াতের মাঝে লখনৌতে বিরতি নিতেন এবং কয়েকদিন অবস্থান করতেন। বলতেন, ‘কোথাও যাতায়াতের মাঝে নদওয়ায় এলে মনে হয় নিজের ঘরে চলে এসেছি।’ কয়েক সপ্তাহ ধারাবাহিক অবস্থান করতেন, এর মাঝে আমরা কতিপয় শিক্ষক মিলে তাকে প্রাচীন দর্শনের একটি কিতাব পড়ানোর জন্য রাজি করিয়েছি, যার ধারাবাহিকতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি; কিন্তু গ্রিক দর্শনের ব্যাপারে কিছু মৌলিক ধারণা আমরা পেয়ে যাই, যা পরে অনেক কাজে এসেছে।

সাইয়েদ সাহেবের জন্য জ্ঞানচর্চা কোনো পেশাদারিত্ব, আবশ্যকীয়তা, অপারগতা বা সুবিধার ব্যাপার ছিল না। জ্ঞান তার হাড্ডি-গোশতে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল; তার রক্তে রক্তে প্রবহমান ছিল। এটিই ছিল তার আহার্য, এটিই ছিল অবকাশ যাপনের উপকরণ, এটিই ছিল নিত্য পালনীয় ব্যস্ততা। প্রায়শই দেখা যেত, তাকে বহনকারী ঘোড়ার গাড়ি দারুল উলুমের ফটকে প্রবেশ করেছে, তিনি অবতরণের পর প্রথম যাকে সামনে পেয়েছেন তাকেই বলেছেন—‘অমুক অমুক উস্তাদকে খবর দাও’ কিংবা ‘কুতুবখানা থেকে অমুক অমুক কিতাব নিয়ে এসো।’ মেহমানখানায় গিয়ে শেরওয়ানি খুলে রেখেছেন, হাত-মুখ ধুয়ে চায়ের অপেক্ষায় বসেছেন, এর মধ্যে হাদিস ও ফিকহের উস্তাদরা চলে এসেছে আর কোনো ইলমি মাসআলায় আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কখনও ফিকহ, কখনও ইতিহাস, কখনও জীবনী, কখনও অনুবাদ—যতক্ষণ থাকতেন কোনো ইলমি মুজাকারা ও গবেষণা ছাড়া ভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন না। রাজনৈতিক বা নেতৃস্থানীয় কেউ চলে এলে সাময়িকের জন্য আলোচনা  বদলে যেত ঠিক, কিন্তু তা কেবলই অসংলগ্ন বিষয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত না। তবে যখন মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদি, মাওলানা মাসউদ আলি নদবি কিংবা মাওলানা আবদুল বারি নদবি বৈঠকে বসতেন, তখন কিছু মনোরঞ্জক কথাবার্তা, অতীতের স্মৃতিচারণ বা বিচিত্র রসাত্মক কথাবার্তা হতো। অনেক কম মানুষই জানেন, সাইয়েদ সাহেব সূক্ষ্ম ইঙ্গিতবহ বাক্যপ্রয়োগে পারদর্শী ছিলেন। তবে তার এ স্বভাব কখনও ক্রমবর্ধমান আত্মমর্যাদাবোধ ও আভিজাত্যকে বিনষ্ট করত না। তার এ রসবোধের প্রয়োগ ঘটত মাওলানা আবদুল মাজেদের মতো রসিক ও কথার ইঙ্গিত বোঝা ব্যক্তি কিংবা লখনৌর কোনো প্রাণোচ্ছল বুজুর্গ আগমন করলে। ভাই সাহেব মরহুম অথবা দারুল উলুমের মুহতামিম সাহেব এলে তিনি আলাপ করতেন নদওয়া নিয়ে, কিংবা বিভিন্ন বিষয়াশয় নিয়ে। এ ছাড়া সদাসর্বদা মূল আগ্রহ ও আলাপের বিষয় ছিল জ্ঞানতাত্ত্বিক, যা তার অবিচ্ছিন্ন অভ্যাস বনে গিয়েছিল এবং এ থেকে বিচ্ছেদ ঘটত না কঠিন রোগশোকের মুহূর্তেও।

আমার প্রতি সাইয়েদ সাহেবের বিশেষ স্নেহের সূচনা ঘটে তখন, যখন আল্লাহ তাআলা আমাকে সিরাতে সাইয়েদ আহমাদ শহিদ লেখার তাওফিক দান করেন। এটি ছিল সেই সময়, যখন সাইয়েদ সাহেবের আগ্রহ ও মনন মৃত চিত্র ছেড়ে জীবিত প্রাণ, দৃশ্য ছেড়ে প্রকৃতি এবং সংবাদ ছেড়ে পরিদর্শনের পিপাসায় ব্যতিব্যস্ত ছিল। সম্ভবত ১৯৩৭ বা ১৯৩৮ সালের শুরুর কথা। একবার তিনি লখনৌ এলেন এবং আমাদের বাড়িতেই দুয়েকদিন থাকলেন। আমি এর মধ্যে তার সামনে আমার সিরাতে সাইয়েদ আহমাদ শহিদের খসড়া পাণ্ডুলিপি পেশ করলাম। তিনি পুরো বইয়ে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। বইয়ের বিভিন্ন স্থানে আমার বাবা মাওলানা হাকিম আবদুল হাই সাহেবের সফরনামা ও রোজনামচা আরমুগানে আহবাবের সূত্র ছিল। সাইয়েদ সাহেব এ দেখে মূল বইটি দেখতে চাইলেন, যা তখনও লেখকের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি হিসেবে গচ্ছিত ছিল। পাণ্ডুলিপি দিলাম। তিনি দেখে তৎক্ষণাৎ সেটি অনুলিপির কথা বললেন। যথানির্দেশ অনুলিপি তৈরি হলো। এরপর তিনি সেই বইটি পরিচিতিমূলক ভূমিকাসহ মাআরিফে কিস্তি আকারে দেহলি আওর উসকে আতরাফ নামে প্রকাশ করলেন। তিনি নিজেই সেটিকে বিন্যস্ত করেন এবং বিভিন্ন স্থানে নিজহাতে ব্যখ্যামূলক নোট ও টীকা যুক্ত করেন।[2]

ওই সুযোগে আমি তার কাছে সিরাতের ভূমিকা লিখে দেবার আর্জি জানাই। তিনি বলেন, ‘কিতাব ছাপা হলে পাঠিয়ে দেবেন। আমি তখন কিছু লিখে দেবো।’ ১৯৩৮ সালের শেষে কিংবা ১৯৩৯ সালের শুরুতে যখন এর প্রিন্টের কাজ শেষ হয়, তখন আমি তাকে গ্রন্থাকারে বইটি পাঠিয়ে দিই। সাইয়েদ সাহেব বইটি হাতে পেয়ে নিম্নোক্ত পত্রটি লেখেন, যা সম্ভবত তার পক্ষ থেকে আমার প্রতি পাঠানো প্রথম পত্র ছিল :

দারুল মুসান্নিফিন, আজমগড়

প্রিয়, আল্লাহ আপনাকে উপকারী ইলম দান করুন। পাণ্ডুলিপি পেয়েছি। বিভিন্ন অধ্যায় পড়ে দেখেছি। কিছু অংশ তো বেশ প্রভাবোদ্দীপক মনে হয়েছে। পড়ে চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়েছে। আপনার বর্ণনাশৈলী ও গদ্য চমৎকার। আল্লাহ আপনার লেখার হাত আরও সুন্দর করে দিন।

আপনি আমাকে লিখতে বলেছিলের কিছু। কিন্তু আমার লেখার মতো কিই-বা ছেড়েছ! আমি চেয়েছি কিতাবের রুহ কিছু শব্দে ব্যক্ত করবার। কয়েক পৃষ্ঠা হয়েছে। আরও কিছুটা লিখে ফেলবার পর পাঠিয়ে দেবো। তারাজিমে উলামায়ে হাদিসের ভূমিকা দেখেছেন? ওই ধাঁচেই হবে কিছুটা।

ডাক্তার সাহেবের খেদমতে আমার সালাম জানাবেন। আলিগড়ের সফলতার জন্য তাকে মোবারকবাদ।[3]

ওয়াসসালাম

সাইয়েদ সুলাইমান

১৩ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৭ খ্রি.

সাইয়েদ সাহেব ভূমিকা লিখে দেন, হৃদয় উজাড় করে লেখেন। সাইয়েদ সাহেবের ওই লেখাটি বড় হৃদয়গ্রাহী ও সাহিত্যপূর্ণ। সম্ভবত এই ভূমিকা স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্যের বিবেচনায় তার রচনাকর্মের মাঝে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধারণ করে। তার রচনা থেকে স্পষ্ট অনুমেয়, এতে দেমাগের সাথে দিল এবং জ্ঞান ও গদ্যের তেজের সাথে প্রেম ও বিশ্বাসও মিশে ছিল। ভূমিকা লিখে পাঠাবার পর তার পরবর্তী পত্রটি সৌভাগ্যবশত পেয়ে যাই। এই গ্রন্থটি পড়া এবং এর সাথে সম্পর্ক তৈরি হবার সুবাদেই বোধহয় আমি কার্নাল ও পানিপতের একটি সফরে তার সঙ্গী হবার সুযোগ পেয়ে যাই। তিনি আমাকে লেখেন :

আজমগড়

প্রিয় ভাই, আল্লাহ আপনাকে নিরাপদ রাখুন। ভূমিকা পাঠিয়েছি। পছন্দ হলে গ্রন্থভুক্ত করে নিতে পারেন। বই প্রকাশের পর আমাকে পূর্ণ একটি কপি পাঠাবেন। কিছু কপি দারুল মুসান্নিফিনে বিক্রির জন্য কমিশনে রাখা চাই।

মার্চের শুরুতে কার্নালের মাদরাসায়ে ইসলামিয়া পরিদর্শনে যাচ্ছি। আপনিও যাবার জন্য প্রস্তুত থাকবেন। আলিগড়ের সফলতার জন্য মোবারকবাদ। এই পত্রটি পেলেন কি না জানাবে।

সাইয়েদ সুলাইমান

১৯৩৯ খ্রি.

সাইয়েদ সাহেবের সাথে এটি ছিল আমার প্রথম সফর। সফরটি আমার জন্য স্মরণীয় ও গৌরবান্বিত ছিল। সাইয়েদ সাহেবের মতো একজন আলেম, গবেষক ও সাহিত্যিকের সার্বক্ষণিক সাহচর্য, দীনি ও ইলমি কেন্দ্রগুলো ভ্রমণ, ঐতিহাসিক স্থান ও প্রাচীন নিদর্শন পরিদর্শন, বড় বড় জ্ঞানী ও মনীষীর সাক্ষাত, জ্ঞান ও সাহিত্যের মজলিস—সবদিক থেকে এই সফর আমার জন্য সৌভাগ্যের চাবিকাঠি হয়ে সামনে এলো। সাইয়েদ সাহেব শুরুতে কার্নালে গেলেন। ওখানে শমশিরে জঙ্গ নবাব আজমত আলি খানের ওয়াকফকৃত মাদরাসা পরিদর্শনের সূচি ছিল। ওখানকার কতিপয় উস্তাদের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট ছিলেন না, তাদের ব্যাপারে সাইয়েদ সাহেবের মতামত চেয়েছিলেন তারা। কার্নালের জামে মসজিদে অবস্থিত ওই মাদরাসায় তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন মাওলানা হামদুল্লাহ পানিপতি। তিনি শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান সাহেবের খাস শাগরিদ এবং তার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। রেশমি রুমাল আন্দোলনের মামলায় বারবার তার নাম সামনে এসেছিল। আমি তার সাথে সাক্ষাত করেছি। বয়স্ক ও দূর্বল হবার দরুণ কর্তৃপক্ষ তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ কাজে তারা সাহস করে উঠতে পারছিলেন না। সাইয়েদ সাহেবকে মূলত এ উদ্দেশ্যেই ডাকা হয়েছিল; কেননা তিনি রায় দিয়ে দেবার পর কারও পক্ষে আপত্তি জানাবার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু তারা এ উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হন। সাইয়েদ সাহেব তাকে স্বস্থানে বহাল রাখেন। ওই সময় কার্নাল জেলার ডেপুটি কমিশনার ছিলেন হাফেজ আবদুল মাজিদ আইসিএস। তার বাসভবন ছিল থানেশ্বরে। তিনি সাইয়েদ সাহেবের জ্ঞানগরিমায় জ্ঞাত ছিলেন এবং দারুল মুসান্নিফিনের কার্যক্রমে বেশ প্রভাবিত ছিলেন। ফলে আমাদের আগমনের কথা জানতে পেরে তিনি লাঞ্চের দাওয়াত দেন। আমিও এ সুযোগে সাওয়ানেহে আহমদিকালাপানির লেখক মৌলবি জাফর থানেশ্বরির মাতৃভূমিতে যাবার সৌভাগ্য অর্জন করি। এখানেই আমি সর্বপ্রথম পশ্চিমা খাবারদাবারের সাথে পরিচিত হই। সাইয়েদ সাহেব আগেই ইউরোপ সফর করেছিলেন। খাবারের ক্ষেত্রে তিনি আমাকে সহায়তা করেন। ওই খাবারের আসরেই আমি প্রথমবারের মতো জনৈক ব্যক্তির মুখে মাওলানা ইলিয়াস সাহেব ও তার তাবলিগি তৎপরতার কথা শুনি।

কার্নালের কাজকর্ম শেষ হলে আমরা পানিপত চলে আসি। সৌভাগ্যক্রমে এখানে আমরা খাজা আলতাফ হুসাইন হালির পুত্র খাজা সাজ্জাদ হুসাইন মরহুমের মেহমান হই। তিনি ওই ঘরেই থাকতেন, যেখানে মাওলানা হালি তার ইহজীবনের শেষদিনগুলো অতিক্রম করেছেন। ওই ঘর থেকেই তিনি পরকালের যাত্রা শুরু করেছেন। তার বিখ্যাত কিছু কবিতা বিশেষত ‘চুপ কি দাদ’ এ ঘরেই লিপিবদ্ধ হয়েছিল। এই কবিতার প্রসঙ্গ যখন এলো, তখন আরেকটি ঘটনাও বলে ফেলি। খাজা সাজ্জাদ হুসাইন মরহুম শুনিয়েছেন, একদিন খাজা গোলামুস সাকলাইন বা তার ভাই (এ মুহূর্তে নাম নিয়ে আমি দ্বিধান্বিত) খাজা গোলামুল হাসনাইন মাওলানা হালিকে আশ্চর্যকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘এক ব্যক্তি বলছিলেন মাওলানা হালির সবচে উত্তম কবিতা চুপ কি দাদ!’ মাওলানা হালি তাকে বলেছিলেন, ‘এ ব্যাপারে তোমার কী মত?’ তিনি কিছুটা অস্বীকৃতি জানালে মাওলানা ওই ব্যক্তির কথাকে ধরে বলেছিলেন, ‘তিনি ঠিক বলেছেন।’

ওই সময়ে উর্দুভাষার খ্যাতনামা লেখক মুনশি যাকাউল্লাহ দেহলবি মরহুমের পুত্র মৌলবি এনায়েতুল্লাহ বিএ মরহুমও পানিপতে থাকতেন, যিনি নিজেও ছিলেন সফল অনুবাদক। সাইয়েদ সাহেব তার সাক্ষাতে গেলেন। খাজা সাজ্জাদ হুসাইনও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। সাইয়েদ সাহেব বলেছিলেন, ‘এ মুহূর্তে উর্দুসাহিত্যের তিন কিংবদন্তী ও স্তম্ভসদৃশ লেখকের পুত্র জীবিত রয়েছেন : মাওলানা হালির পুত্র খাজা সাজ্জাদ হুসাইন, মুনশি যাকাউল্লাহ সাহেবের পুত্র মৌলবি এনায়েতুল্লাহ এবং মাওলানা শিবলির রুহানি পুত্রসকল।’

এই সফরে সাইয়েদ সাহেব পানিপতের ওলিগণের মাজার জিয়ারত করেন। চিশতিয়া সাবেরিয়া সিলসিলার দুই মহান বুজুর্গ খাজা শামসুদ্দিন তুর্ক পানিপতি ও কাবিরুল আওলিয়া শাইখ জালালুদ্দিন পানিপতি এখানেই শায়িত আছেন। খাজা বু আলি কালান্দারের দরগাহও এখানে। নকশবন্দিয়া মুজাদ্দিদিয়া সিলসিলার শাইখে কামেল হজরত কাজি সানাউল্লাহ পানিপতিও এখানেই চির বিশ্রাম নিচ্ছেন। মাওলানা গাউস আলি শাহ সাহেবও এ মাটিগর্ভে শায়িত। সাদাত বংশীয় কতিপয় বুজুর্গের মাজারও আছে এখানে, সম্ভবত শহরের বাইরে তার অবস্থান। সাইয়েদ সাহেব যেখানেই যেতেন, তার ইতিহাস জ্ঞান থেকে আমাদের উপকৃত করতেন। মাওলানা গাউস আলি শাহ সাহেবের মাজারের সামনে গিয়ে বললেন, ‘তিনি বিহারের বাসিন্দা ছিলেন।’ সম্ভবত তিনি এ-ও বলেছিলেন, ‘সাদাত বংশের বুজুর্গদের মাজারের প্রতি আমি বেশি ভক্তি রাখি।’ সাইয়েদ সাহেব সম্ভবত মাওলানা কারি আবদুর রহমান পানিপতির বাড়িতেও হাজির হয়েছেন। তার নাতি নিজে থেকেই দেখা করতে এগিয়ে আসেন, নাম ছিল সম্ভবত মাওলানা আবদুস সালাম সাহেব। তিনি জুমার পর জামে মসজিদে বক্তৃতার জন্য সাইয়েদ সাহেবকে অনুরোধ করেন। সাইয়েদ সাহেব বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যে উল্লেখ করেন পানিপতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মহত্ম্য। পানিপতের উলামা-মাশাইখ এবং এ মৃত্তিকাগর্ভের হীরকরত্নের প্রতি বিজ্ঞোচিত ঐতিহাসিকসুলভ ইঙ্গিত প্রদান করেন। আমরা পানিপতের ঐতিহাসিক সেই ময়দানটিও দেখি, যেখানে মারাঠিরা পরাজিত হয়েছিল এবং মুসলমানদের সাময়িক আধিপত্য অর্জন হয়েছিল; যার সুবাদে তারা এ ভুখণ্ডে জীবনের একটি অংশ ইজ্জতের সাথে অতিবাহিত করবার সুযোগ পেয়েছিল। পানিপতে এটিই ছিল আমার প্রথম ও শেষ সফর। এখন যদি দশবারও সেখানে যাই, একজন বরেণ্য ঐতিহাসিকের সঙ্গ নসিব হবে কোথায়!

পানিপত থেকে আমরা দিল্লির পথে রওনা হই। পথিমধ্যে এক ভদ্রলোক সঙ্গে জুটে যায়। তিনি ছিলেন তুলুয়ে ইসলামের সহকারী সম্পাদক। ওই সময় তুলুয়ে ইসলাম জনাব গোলাম আহমদ পারভেজ সাহেবের তত্ত্বাবধানে দিল্লি থেকে প্রকাশ হতো। এ ব্যক্তি দীর্ঘকাল ধরে হাদিস ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে লেগে ছিলেন। সহকারী সম্পাদক মহোদয় সাইয়েদ সাহেবের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ এ নিয়ে আলোচনা করতে থাকলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এ বুঝি সাধারণ কোনো মৌলবি, ঘটনাক্রমে যাকে হাতের নাগালে পেয়ে গেছি, তাকে ঘায়েল করে বিরক্তিকর সফরে কিছুটা মনোরঞ্জন করা যাক। সাইয়েদ সাহেবও নিজের পরিচয় গোপন করে সমানতালে আলাপ চালিয়ে গেলেন। দিল্লি স্টেশন এলে সাইয়েদ সাহেব নেমে গেলেন। আমি সামানপত্র গুছিয়ে নামাবার জন্য দাঁড়ালাম। এর মধ্যে ওই ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ মৌলবি সাহেবের পরিচয় কী?’ আমি তখনও জানতাম না, সাইয়েদ সাহেব কোনো কারণে তার নাম-পরিচয় আড়াল করেছেন। ফলে আশ্চর্য হয়ে বললাম, ‘আপনি তাকে এখনও চেনেননি? তিনি মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভি।’ এ শুনে ভদ্রলোক কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। কিন্তু ততক্ষণে বর্শা থেকে তির বেরিয়ে পড়েছে। আমি নীচে নামলাম। সাইয়েদ সাহেব আমাকে বললেন, ‘আপনি ওই ভদ্রলোককে আমার নাম বলেননি তো?’ বললাম, ‘আমি তো বলে দিয়েছি!’ তিনি বললেন, ‘বড় ভুল করেছেন। সফরে কারও নাম প্রকাশ করতে নেই।’ এরপর এই পঙ্‌ক্তি আওড়ালেন :

صوفی نه شود صافی تا در نه کشد جامے

بسیار سفر باید تا پخته شود خامے

সুফির পোশাক পরলেই কেউ নির্মল সুফি হয় না, সহ্য করতে হয় বহু পেয়ালার তিক্ততা। আর অসংখ্য ভ্রমণের পরই কাঁচা মস্তিস্ক ধীরে ধীরে পাকে।  

দিল্লিতে আমরা জামিয়া মিল্লিয়ার মেহমানখানায় গিয়ে উঠলাম। তখন জামিয়া মিল্লিয়া ছিল কারুলবাগে। আমার মনে পড়ে, মেহমানখানায় উঠেই দেখা হয় ওখানকার শিক্ষার্থী জনৈক নদবি ফাজেলের সাথে, আর তাকে সাইয়েদ সাহেব তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমাদের লাইব্রেরিতে কনৌজের ইতিহাস সংক্রান্ত অমুক ইংরেজি বইটি আছে?’ তখন ছিল সন্ধ্যা। সাইয়েদ সাহেবের চোখেও ব্যাধি ছিল। মনে নেই তখন বইটি পাওয়া গেছে নাকি পরেরদিন, তবে সাইয়েদ সাহেব ওই সফরেই বইটি পড়ে নিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি তখন হায়াতে শিবলি লিখছিলেন এবং ইউরোপের ঐতিহাসিক শহরগুলোর ব্যাপারে অধিকতর তথ্য সংকলকের ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। পরেরদিন শাইখুল জামিয়া ডাক্তার জাকির হুসাইন সাহেবের ঘরে দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ ছিল। ডাক্তার সাহেবকে কাছ থেকে দেখার এবং তার সাদাসিদে জীবন, মেধা ও মননের চিত্র দেখার সুযোগ মেলে। ওখানেই প্রথম আমি খান আবদুল গাফফার খানকে দেখি। তাকে শাইখ শফিকুর রহমান কিদওয়ায়ি মরহুম বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র ও তার কার্যক্রম দেখাবার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। সম্ভবত এ পরিদর্শনের জন্য সাইয়েদ সাহেবকেও কিছুটা তকলিফ দেওয়া হয়।

অক্টোবর ১৯৩৫ সালে সাইয়েদ সাহেব মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা দূরদূরান্ত থেকে শুশ্রূষায় যেতে থাকেন। ভাই সাহেবও প্রথমবারের মতো আজমগড় যান এ উদ্দেশ্যে। দুদিন তিনি সেখানে থাকেন। প্লুরিসির শক্ত আক্রমণ ছিল। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল আত্মায়। ডাক্তাররা সব ধরনের ব্যস্ততা ও চিন্তা ছেড়ে পূর্ণ বিছানাবন্দী হবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাই সাহেবের ভাষ্যে—তার মস্তিস্ক বরাবরের মতোই কর্মতৎপর ছিল। এ মুহূর্তে একটি মজার গল্প বলি। ভাই সাহেব তাকে বলেন, ‘এখন উচিত, আপনি কিছুদিনের জন্য মস্তিস্ককে শান্তি দিন এবং বিশ্রাম নিন। প্রবন্ধের বিন্যাস, এর তথ্যতালাশ এবং মাথায় এর ছক আঁকা থেকে বিরতি নিন।’ সাইয়েদ সাহেব বলেন, ‘এটা কীভাবে সম্ভব?’ ভাই সাহেব বলেন, ‘এর দুতিনটি পদ্ধতি হতে পারে। তাশ ও দাবা খেলা একটি পদ্ধতি, এতে একেবারে ডুবে যাওয়া যায়, কিন্তু এসব তো আপনার সাথে যায় না। গল্প-উপন্যাসও আপনি পড়বেন না। আরেক পদ্ধতি হলো, আপনি ইলেকশনে দাঁড়ান। এতে দীন-দুনিয়া সব ভুলে যাবেন। অথবা কবিতা লেখা শুরু করুন। এতেও আপনার অন্য বিষয়ে হুঁশজ্ঞান থাকবে না।’ ঠোটে হাসির ঝিলিক রেখে এ কথোপকথন সমাপ্ত হয়। সাইয়েদ সাহেব এই পরামর্শ আমলে নেন না।

সাইয়েদ সাহেব যখন এ মারাত্মক ব্যাধি থেকে সেরে উঠেন এবং সবার জন্য সাক্ষাতের অনুমতি হয়, তখন দারুল উলুমের কতিপয় উস্তাদ তাকে দেখতে আজমগড় যান। এ দলে আমাদের উস্তাদ এবং নদওয়ার শাইখুল হাদিস মাওলানা হায়দার হাসান খানও ছিলেন। মাওলানা মাসউদ আলম সাহেব এবং আমি অধমও ছিলাম। সাইয়েদ সাহেব আমাদের সাথে অত্যন্ত স্নেহপরবশ হয়ে মোলাকাত করেন। সতর্কতা ও ভারসাম্য বজায় রেখেই শুরু হয়ে যায় ইলমি আলোচনা। সাইয়েদ সাহেবের পুরোনো শিক্ষকসুলভ স্বভাবও জেগে উঠে মুহূর্তেই। একদিন তিনি বৈঠকে সুরা জুমআ এবং তার আয়াতের পারস্পরিক মেলবন্ধন ও বিন্যাস নিয়ে এত জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনা করলেন এবং এত সূক্ষ্ম ইলমি নুকতা তুলে ধরলেন, আমাদের মনে হলো সাইয়েদ সাহেবের মূল আগ্রহের বিষয় বুঝি তাফসির ও তাদাব্বুরে কুরআন। ওই আলোচনাটুকু লিখে না রাখার ব্যাপারে আজও আফসোস হয়।

অসুস্থতা ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার পর সাইয়েদ সাহেব সর্বপ্রথম লখনৌতে আগমন করেন। আমরা তাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য অতি উৎসাহী হয়ে বহু পরিকল্পনা গোছাতে থাকি। এর একটি ছিল—জামিয়ার শিক্ষক ও ছাত্রদের পক্ষ থেকে তার প্রতি আরবিতে প্রশংসাপত্র তুলে ধরা। প্রশংসাপত্র তৈরির আলাপ শুরু হলে শিক্ষকদের তরফ থেকে এটি প্রস্তুতের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে অর্পিত হয়। ছাত্রদের পক্ষে মাওলানা মাসউদ আলম নদবি দায়িত্ব বুঝে নেন। আমরা দুজন বড় আগ্রহের সাথে সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে প্রশংসাপত্র লিখতে শুরু করি। আমি আমার প্রশংসাপত্র তৈরির ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখি, যাতে এর গদ্যে সাইয়েদ সাহেবের সকল গ্রন্থের নামের প্রতি ইঙ্গিত করা যায়। তাকে প্রতিবার সম্বোধনে আলাদা আলাদা নতুন শৈলী অবলম্বন করলাম। মোদ্দাকথা, এই প্রশংসাপত্র উলামায়ে কেরাম এবং শহরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে ১৫ই মার্চ ১৯৩৬ সালে আঞ্জুমান আল-ইসলাহের জামালিয়া হলরুমে তুলে ধরা হয়। এ ছিল মনোমুগ্ধকর এ দৃশ্য। ফিরিঙ্গিমহলের খ্যাতনামা উলামায়ে কেরাম, শহরের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, প্রসিদ্ধ মুসলিম আইনজীবি, হাইকোর্টের কতিপয় মুসলিম জজ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সবাই ছিলেন সাইয়েদ সাহেবের সুস্থতায় আনন্দিত। সাইয়েদ সাহেব পরিশেষে উর্দুতে বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যে তিনি তার প্রিয় ইলমি খান্দানের সদস্যদের প্রতি তাদের ভালোবাসার কৃতজ্ঞতা জানান। জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা এবং ছাত্রদের জন্য কিছু উপকারি নসিহতও ছিল সে বক্তব্যে। আমার জীবনে এ ঘটনা স্মরণীয় হয়ে থাকবে; এ কেবল এক বুজুর্গের সুস্থতার আনন্দ ছিল না, ছিল জ্ঞান-সাহিত্য, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি আর ক্ষুরধার গবেষণার সতেজ নবযাত্রার উচ্ছাস।

দারুল উলুমের সাথে সাইয়েদ সাহেবের আবেগ ক্রমাগত বেড়ে যেতে থাকে। তিনি ওই পুরোনো যুগের স্মৃতিকে তাজা করবার চিন্তায় নিমগ্ন হলেন, যখন দারুল উলুম তার শিক্ষক মাওলানা শিবলি নোমানির তত্ত্বাবধানে হিন্দুস্তানের আহলে ইলমদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল এবং তার সম্পাদিত আননদওয়া পত্রিকাটি হিন্দুস্তানের জ্ঞানপাড়ায় এক নতুন গ্রহের মতো উদিত হয়েছিল। সাইয়েদ সাহেব এটি পুনরায় প্রকাশের নির্দেশ দিলেন। আমার এবং মাওলানা আবদুস সালাম কিদওয়ায়ি সাহেবের তত্ত্বাবধানে পত্রিকাটি ১৯৪০ সালে ফের প্রকাশিত হতে থাকল। সাইয়েদ সাহেব এতে বিভিন্ন প্রবন্ধ লেখেন এবং তার বহু বক্তৃতাও এতে প্রকাশ হয়। নভেম্বর ১৯৪০ সাল থেকে পত্রিকায় ‘মেরি মুহসিন কিতাবেঁ’ শিরোনামে একটি ধারাবাহিক সিরিজ শুরু হয়। এ সিরিজে প্রথম প্রবন্ধ লেখেন নবাব সদরইয়ারজঙ্গ মাওলানা হাবিবুর রহমান খান শিরওয়ানি। দ্বিতীয় প্রবন্ধটিই ছিল সাইয়েদ সাহেবের। সাইয়েদ সাহেব পত্রিকাটির ব্যাপক প্রসার এবং এর মানোন্নয়ন নিয়ে ভাবতে থাকেন। কিন্তু একে তো দেশে এমন গুরুগম্ভীর পত্রিকার রেওয়াজ ছিল না, আবার আমরাও নিজেদের শিক্ষকতার ব্যস্ততা এবং স্বল্পবয়সের ফলে এর মানোন্নয়নে সুবিধা করতে পারলাম না। ফলে শেষমেশ ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দু-বছর পথচলার পর পত্রিকাটির যাত্রা সমাপ্ত হয়ে যায়।

১৯৪০-৪১ সালের কথা। সাইয়েদ সাহেব জ্ঞান ও গবেষণার নির্ঝর থেকে পরিতৃপ্ত হয়ে, দীন-ধর্ম ও সাহিত্য-ইতিহাসের সাগরে বারংবার অবগাহনের পর রুহের ভেতর পিপাসা এবং কলবের ভেতর কোনো ভিন্ন বস্তুর তালাশ অনুভব করতে লাগলেন। আর তার প্রিয় বন্ধু ও খ্যাতনামা সমকালীন ব্যক্তিত্ব আল্লামা ইকবালের ভাষায় নিরবে নিভৃতে যেনে নিজেকে বলে উঠতেন—

تیری نظر میں ہیں تمام میرے گزشتہ روز و شب

مجھ کو خبر نہ تھی کہ ہے علم تخیل بے رطب

تازہ مرے ضمیر میں معرکۂ کہن ہوا

عشق تمام مصطفی عقل تمام بولہب

তোমার দৃষ্টিতে আমার অতীতের দিনরাত সবই উন্মুক্ত; আমি জানতাম না যে কল্পনাজগত নতুন করে এভাবে সজিব হবে। বিবেকের ভেতর যেন পুরোনো এক যুদ্ধ জেগে উঠেছে; যা কিছু ইশক সবই মুস্তফা, আর যা কিছু আকল সবই বু-লাহাব।

হয়তো সেকালের জ্ঞানীদের মাঝে—অন্তত মাদরাসাপড়ুয়া আলেমদের মাঝে কারও মস্তিস্কে যুক্তি ও প্রেম, প্রাচীন ও আধুনিক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, ধর্ম ও সাহিত্য বা ধর্ম ও দর্শনের মধ্যকার এ সংঘর্ষ এভাবে জাগ্রত হয়নি; যেভাবে নদওয়ার এ কৃতিসন্তান, সিরাতুন নবীর এ লেখক, রাজনীতি ও সাহিত্যাঙ্গনের এ রহস্যজ্ঞাতা এবং ইউরোপের এ পরিব্রজকের পরিপক্ক মস্তিস্কে জাগ্রত হয়েছিল। তিনি চিন্তার শস্যক্ষেত্রে পানি সিঞ্চনও করেছিলেন, এর ঘন ছায়ায় বহুকাল বিশ্রামও করেছিলেন, এর ইতিহাসও রচনা করেছিলেন, এর জীবন-মৃত্যুর দর্শনও ব্যক্ত করেছিলেন—কিন্তু তার পরিচ্ছন্ন কলব ও বিচলিত রূহ সাক্ষ্য দিচ্ছিল, চিন্তার সবুজ সতেজ প্রস্রবণে সিক্ত হননি তখনও। (যদিও সাইয়েদ সাহেবের বহু ভক্ত অনুরাগী ও শিক্ষার্থীগণ একথা মানতে নারাজ যে, তার মাঝেও কোনো নতুন কিছুর পিপাসা রয়েছে।) তার গ্রন্থাবলি—বিশেষত খুতুবাতে মাদ্রাজ, সিরাতুন নবীসিরাতে আয়েশার পাতায় পাতায় হাজারও মানুষ খুঁজে পেয়েছে ইমানের স্বাদ। কিন্তু উঁচু হিম্মতওয়ালা এ সাধক নিজেই এ মহান দৌলতের আকাঙ্ক্ষী ছিলেন; যাকে হাদিসে ইহসান এবং কুরআনে তাজকিয়া শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। জ্ঞান ও সাহিত্যের অচেনা উপত্যকায় সফল পদচারণের জন্য যেমন তিনি পেয়েছিলেন আল্লামা শিবলির মতো পথপ্রদর্শক, ইহসান ও তাজকিয়ার দুর্ভেদ্য দূর্গে প্রবেশের জন্যও তার প্রয়োজন ছিল এক মরদে খোদার। এ ক্ষেত্রে তার জীবনোপাখ্যান ও আত্মিক অনুধাবন মিলে যায় হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালির সাথে। তিনিও যখন জ্ঞানগরিমা ও প্রসিদ্ধির চূড়ায় উপনীত হয়েছেন, জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও চিন্তার যাত্রায় দেখতে পেয়েছেন শুধু মরীচীকা। এরপর ইলম ও একিনের আবে হায়াতের তালাশে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন এবং পরিতৃপ্ত হয়ে ফিরে এসেছেন।

তাজকিয়াতুন নফসের এ পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি পেয়ে যান হাকিমুল উম্মাত আশরাফ আলি থানভিকে। যেহেতু এ উত্তাপ ও আস্বাদ গ্রহণে তার অভ্যন্তর ছিল পুরো প্রস্তুত, ফলে তিনি বছরের পথ মাসে, মাসের পথ সপ্তাহে এবং সপ্তাহের পথ কয়েকদিনে অতিবাহিত করেন। এরপর শাইখের ভরসা ও সত্যায়ন পেয়ে খুব দ্রুত সৌভাগ্যবান খলিফাদের কাতারে যুক্ত হন।

শাইখের প্রতি সাইয়েদ সাহেবের অপার মহব্বত এবং তার প্রতি শাইখের অসীম অনুগ্রহের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে—ঠিক এমন সময়ে ১৬ই রজব ১৩৬২ হিজরি মোতাবেক জুলাই ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মাওলানা থানভি আখেরাতের যাত্রা শুরু করেন। সাইয়েদ সাহেব এ খবর পেয়েছেন ঠিক তখন, যখন লখনৌর উদ্দেশ্যে তিনি সফরে বেরোচ্ছেন। ওই মুহূর্তে তার মাঝে অভাবনীয় বেদনা আর বিরহ যাতনা শুরু হয়। আল্লাহর হেকমতে ঠিক ওই দিনগুলোতেই মাওলানা ইলিয়াস সাহেবও লখনৌতে তাশরিফ এনেছিলেন। শাইখুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া সাহেব এবং একটি তাবলিগি জামাত তখন নদওয়ায় অবস্থান করছিল। উভয় বুজুর্গ নদওয়ার মেহমানখানায় ছিলেন। মাওলানা ইলিয়াস সাহেবের সংস্রব এবং তাবলিগি মজলিসে অংশগ্রহণে সাইয়েদ সাহেবের ব্যথিত হৃদয় কিছুটা প্রশমিত হয়। সাইয়েদ সাহেব মাওলানার সাথে ওই সম্মান ও বিনয়ের সাথে নিজেকে মেলে ধরেন, যেমনটা কোনো সুলুকের পথযাত্রী তার শাইখের সামনে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে থাকেন। মাওলানা ইলিয়াস সাহেবও তাকে খুব সম্মান করতেন। তার জ্ঞান ও অবস্থান, তার সত্যানুসন্ধান ও ইখলাসের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতেন এবং মর্যাদা প্রদর্শন করতেন। সাইয়েদ সাহেব ওই সময়গুলোতে উচ্চৈঃস্বরে জিকিরের প্রতি বেশ আগ্রহী ছিলেন। মাওলানা ইলিয়াস সাহেব সাইয়েদ সাহেবের এ আগ্রহ দেখে বেশ উৎফুল্ল ছিলেন। সাইয়েদ সাহেব তার সাথে কানপুরেও সফর করেছিলেন। হালিম মুসলিম কলেজের এক জলসায় প্রভাবোদ্দীপক এক বক্তৃতাও করেছিলেন। মাআরিফে খুব উঁচুকণ্ঠে মাওলানা ইলিয়াস সাহেব এবং তার দাওয়াতি তৎপরতার প্রশংসা করেছেন। পরবর্তীকালে মাওলানার ইন্তেকালের পর আমার রচিত মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াস আওর উনকি দীনি দাওয়াত গ্রন্থে ভূমিকাস্বরূপ সমৃদ্ধ একটি ভূমিকা লিখেছেন; যার প্রতিটি শব্দে ভক্তি ও প্রভাবের প্রকাশ ঘটেছে। ভূপাল যাবার পর এবং পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হবার পরও তাবলিগি জামাতের সাথে তার সম্পর্ক অটুট থেকেছে। তিনি এ জামাতের ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাত, এর প্রতিষ্ঠাতার বড়ত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা এবং এ কাজের দীনি মেজাজ ও সালাফের অকুণ্ঠ অনুকরণের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতেন। জামাতের সাথিরা তাকে যখন তাবলিগি মজলিসে দাওয়াত দিতেন, রুখসতি জামাতের জন্য যখন দোয়ার আবেদন জানাতেন, তিনি নিঃসঙ্কোচে ছুটে যেতেন। শারিরীক সুস্থতার কথা না ভেবে এ উদ্দেশ্যে তিনি কিছু দীর্ঘ সফরও করেছেন।

আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষায় নতুন মাত্রা এবং বয়সবৃদ্ধির সাথে সাথে দারুল উলুমের ব্যাপারেও সাইয়েদ সাহেবের চিন্তায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়। এবার তিনি দারুল উলুমকে শুধু এক ইলমি ইদারা কিংবা পঠন-পাঠন আর প্রয়োজনমাফিক আধুনিক জ্ঞান আহরণের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাইলেন না; অন্যভাবে বললে, তিনি নদওয়ার বিশেষত্বের ব্যাপারে যুগের ভাষ্যকার আকবর ইলাহাবাদির সেই সংক্ষিপ্ত কিন্তু মর্মবোধক পরিচিতিকে পছন্দ করতে চাইলেন না, যা খোদ তার যৌবনকালে ইলাহাবাদি ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে :

اور ندوہ ہے زبان ہوشمند

আর নদওয়া হলো সচেতন কণ্ঠ।

সাইয়েদ সাহেব নদওয়াকে দেখতে চাইতেন—বেদনাহত হৃদয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মনন ও প্রজ্ঞাবান কণ্ঠের সমন্বিত রূপে। আর ক্রমান্বয়ে এর বিন্যাস হবে এমন, শুরুতে থাকা চাই হৃদয়ে বেদনা, এরপর চাই মননে আকাঙ্ক্ষা, আর এরপর এসবের ভাষ্যকার হিসেবে চাই সচেতন প্রজ্ঞার কণ্ঠস্বর। নদওয়ার সাথে দীনি ব্যক্তিত্ব ও দীনি মারকাজগুলোর যে দূরত্ব সুদীর্ঘকাল ধরে তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা কমে আসে খোদ সাইয়েদ সাহেবের এই নব্য চেতনা ও সম্পৃক্ততায়। কিছুটা দূরীভূত হয় মাওলানা ইলিয়াস সাহেবের সাপ্তাহিক অবস্থানের ফলে; তিনি নদওয়ার মেহমানখানাতেই থাকতেন এবং এমতাবস্থায় তিনি ওই পরিবেশকে তার আত্মার উদ্‌বেগ ও জ্বলনের মাধ্যমে পুরোদস্তুর চঞ্চল ও তৎপর রেখেছেন। কিন্তু সাইয়েদ সাহেব আরও বেশি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। তার একান্ত ইচ্ছে ছিল, এখন থেকে নদওয়ার সন্তানরা কেবল সাহিত্য ও ইতিহাসকেই নিজ প্রচেষ্টা ও বিজয়ের নিশানা এবং সফরের শেষ মঞ্জিল মনে করবে না। তিনি ফের ইকবালের ভাষায় যেন বলে উঠতেন—

خودی کی یہ ہے منزلِ اولیں

مسافر  یہ تیرا نشیمن نہیں

এই তো আত্মসত্তার প্রথম গন্তব্য

হে পথিক! এ তোমার স্থায়ী আবাস নয়।

তিনি চাইতেন, নদওয়ার সন্তানদের জন্য শুধু তারা অনুসরণযোগ্য ও চূড়ান্ত আদর্শ না হোক, যারা জ্ঞান, সাহিত্য ও ইতিহাস শাস্ত্রে প্রতীকতূল্য। এরচে বরং তারা নিজেদের আন্দোলনের মহান আহ্বায়ক ও শিক্ষাকেন্দ্রের মহান প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্য থেকে তাদেরকেও অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে মেনে নিক, যারা দীনদারি, দক্ষতা এবং পার্থিব-অপার্থিব ক্ষেত্রে, জ্ঞান ও সাহিত্যের সামগ্রিকতায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যধারী ছিলেন। আমার খুব মনে পড়ে, একবার দারুল উলুমের ভবনের পেছন দিক থেকে বেরোবার সময় আমাকে বললেন, ‘মৌলবি আলি! সকল গোষ্ঠী ও বুদ্ধিমান শ্রেণির জন্য একটি আইডিয়াল ব্যক্তি থাকেন। তিনি ওই গোষ্ঠীর মন ও মননে, কল্পনার কপাটে আষ্টেপিষ্টে লেপটে থাকেন। তাকে ঘিরেই অনুসারীরা জীবনের বার্তা ও কর্মের অনুপ্রেরণা লাভ করে থাকে। আমার মতে দারুল উলুমের জন্য আইডিয়াল হচ্ছেন চার ব্যক্তি—মাওলানা মুহাম্মাদ আলি মুঙ্গেরি, মাওলানা শিবলি নোমানি, আপনার বাবা মাওলানা হাকিম সাইয়েদ আবদুল হাই ও নবাব সাইয়েদ আলি হাসান খান। তারা সবাই জ্ঞান ও ধর্মের বিচিত্র সব পথঘাট বিচরণ করেছেন। তাদের সবাইকে মিলিয়ে দেখলে একটি সমৃদ্ধ সামগ্রিক রোলমডেল তৈরি করা যায়।’

সাইয়েদ সাহেবের এই নতুন প্রবণতা ছাত্রদের মাঝে ওই গ্রহণযোগ্যতা বা সফলতার মুখ দেখেনি, যা তার ব্যক্তিত্বের বিবেচনায় প্রত্যাশিত ছিল। উলটো এর ফলে একপ্রকার মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে পড়ে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ওই স্ট্রাইক, যা ১৯৪৩ সালে দুভার্গজনকভাবে ঘটে যায়। যদিও স্ট্রাইকের সূচনা ছিল ব্যবস্থাপনাগত কিছু বিষয়কে ঘিরে, কিন্তু এর অভ্যন্তরে অস্থিরতা ও মানসিক সংঘাতই মূল ইন্ধন জুগিয়েছে। স্ট্রাইকের সম্মুখসারিতে আমাদেরই কতিপয় প্রিয় শাগরিদরা ছিল। ওরা ছিল দারুল উলুমের মেধাবী ছাত্র। ওদের কাছে আমাদের ও দারুল উলুমের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। ওদের মধ্যে সবচে উল্লেখযোগ্য ছাত্রটি ছিল আমার অত্যন্ত প্রিয় শাগরিদ আলি আহমাদ কায়ানি। আমার শিক্ষকতা জীবনের দশ বছরে, এরপর যখন সহকারী সচিব ও সচিব হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি এ সময়কালে এই তরুণের চেয়ে অধিক মেধাবী, যোগ্য ও ভদ্র কাউকে দেখিনি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি থেকেই তার মেধার প্রখরতা ছিল এত বেশি যে, তার থেকে নাহু-সরফের কোনো ভুল হওয়া ছিল খুব মুশকিল। ও যখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র, আমার উস্তাদ খলিল আরব সাহেব একবার ওর পরীক্ষার খাতা দেখে বলেন, ‘এই খাতা আমাকে দিয়ে দাও, আর যত ইচ্ছে বলো আমি নদওয়ার জন্য চাঁদা কালেকশন করে আনব।’ চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠে সে রীতিমতো আরবিতে চমৎকার বক্তব্য দিতো। স্মৃতিশক্তি ছিল এত প্রখর, ইকবাল আকবর ও জফর আলি খানের হাজার হাজার কবিতা ঠোটের প্রান্তভাগে বেজে উঠত। আমার কিছু আরবি প্রবন্ধের অনুবাদও করেছিল। স্ট্রাইকের পর যখন সে করাচিতে গিয়েছিল, তরুণ হওয়া সত্ত্বেও করাচির ইলমি মজলিসে আল্লামা কায়ানি নামে সে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। ছাত্র আন্দোলনে যেমনটা হয়ে থাকে, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় ছাত্রদের দাবি পূরণের ক্ষেত্রে সে নেতার ভূমিকায় চলে আসে। তার এই অবস্থানে সকল উস্তাদ বিশেষত আমার মনে ভীষণ দুঃখ হয়েছিল। সবচে বেশি এ কারণে যে এই স্ট্রাইকের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল সাইয়েদ সাহেবের মতো ব্যক্তিত্ব এবং তার দায়িত্ব। অথচ তিনি ছিলেন তখন নদওয়ার প্রধান মুরব্বি ও উপদেষ্টা। নদওয়ার জন্য তিনি ছিলেন উৎসর্গপ্রাণ। সাইয়েদ সাহেব এই আন্দোলনে খুব ব্যথিত হন। নদওয়ার খেদমত এবং ছাত্রদের তরবিয়ত নিয়ে তার বড় গর্ব ছিল। আর এ আন্দোলনের মাধ্যমে তার সকল আশা রক্তরঞ্জিত হয়, সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থতার রূপে দৃশ্যমান হয়। বহু হৃদয় ভেঙে খানখান হয়ে যায়। ওই দিনগুলোতেই অকস্মাৎ আলি আহমাদের উপর পাগলামির প্রভাব দেখা দেয়। পরিস্থিতি এতটাই করুণ হয়ে পড়ে যে, তাকে পরিবারের লোকেরা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে আর তার ভাই আমার অগ্রজ ডাক্তার সাইয়েদ আবদুল আলি সাহেবকে নিয়ে যান আলি আহমাদের শারিরীক পরিস্থিতি দেখাতে। আমিও আলি আহমাদের প্রতি বিশেষ স্নেহ থাকায় ভাই সাহেবের সাথে যাই। তাকে যখন রশিতে বাঁধা অবস্থায় দেখি, আমার চোখে পানি চলে আসে। ভাবতে থাকি—যে তরুণ তার সুতীক্ষ্ণ মেধার ফলে সঙ্গীদের ঈর্ষার পাত্র ছিল, আজ তার কী করুণ পরিণতি! ভাই সাহেব তার জন্য প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে ফিরে আসেন। সাইয়েদ সাহেব সেই দিনগুলোতে এতটা মনঃক্ষুণ্ণ ছিলেন যে দারুল উলুমে থাকতেনও না; আমাদের ঘরেই থাকতেন। আমি একবার নিরিবিলি সময়ে তাকে একাকী পেয়ে বললাম, ‘আমার মনে হয়, আলি আহমাদের মুখ থেকে আপনার ব্যাপারে কোনো মন্দবাক্য বেরিয়ে পড়েছে। এ অবিবেচনার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মুহূর্তে ওর মাঝে অতি আবেগপ্রবণতা তৈরি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়; আর হয়তো এতেই মুখ থেকে কিছু বেরিয়ে পড়েছে। হাদিস শরিফে আছে—যে আমার ওলিকে কষ্ট দেবে, আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা করছি। আর আপনি তো তার হিতৈষী মুরব্বিও।’ সাইয়েদ সাহেব আমার কথার উত্তরে নিতান্ত বিনয়ের সাথে বললেন, ‘আমি আর কী হয়ে গেছি!’ আমি আবারও পুনরাবৃত্তি করলাম কথাগুলো, সাথে তার জন্য দোয়ার আবেদনও জানালাম। সাইয়েদ সাহেব কিছু বললেন না। চুপ করে রইলেন। এর দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন আমাকে বললেন, ‘মৌলবি আলি সাহেব! আমি আপনার নির্দেশ পালন করে নিয়েছি।’ এরপরের ঘটনাকে আপনি সাইয়েদ সাহেবের কারামাত মনে করুন কিংবা অন্য কিছু, আলি আহমাদ সুস্থ হয়ে যায়। আমার যতদূর জানা—এরপর আর সে এমন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়নি। আফসোসের ব্যাপার হলো, উঠতি যৌবনেই ১৯৫০ সালে এ জ্বলন্ত শিখা চিরদিনের জন্য নিভে যায়।

حسرت ان غنچوں پہ ہے جو بن کھلے مرجھا گئے

আক্ষেপ সেই কলিগুলোর জন্য, না ফুটেই যা ঝরে গেল।

সাইয়েদ সাহেব কিছু বিশেষ কারণে ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে রাজ্যের কাজি, দারুল উলুম আহমদিয়ার দায়িত্বশীল ও দীনি শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে ভুপালে চলে যান। অক্টোবর ১৯৪৯ অবধি ওখানেই থাকেন। ভুপালে থেকেও তিনি দারুল উলুমের সাথে সম্পর্ক অটুট রেখেছেন। দারুল উলুম তার কাছে নিজ সন্তানের মতোই স্নেহ পেত। কখনও হৃদয় থেকে দারুল উলুমের ছবি ম্লান হতে দিতে পারতেন না তিনি। স্নেহসুলভ পত্রাবলীর মাধ্যমে তিনি নদওয়ার দায়িত্বশীলদের উদ্দীপনা জোগাতেন, শিক্ষা বিষয়ক মূল্যবান পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিতেন। এখানে একটি পত্র উল্লেখ করছি, যা কিছু দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এতে সাইয়েদ সাহেবের প্রকৃত চিন্তা ফুটে উঠেছে। জীবনের কতিপয় তিক্ত বাস্তবতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার ইঙ্গিতও পাওয়া যায় এতে। এই পত্রটি ১৮ই এপ্রিল ১৯৪৮ তারিখে প্রেরণ করা হয়েছে :

ভুপাল

প্রিয়, আল্লাহ আপনাকে সাফল্যমণ্ডিত করুন।

আসসালামু আলাইকুম

আপনার প্রত্যাবর্তনের[4] কথা শুনে ইচ্ছে হলো পত্র লিখি। কিন্তু এখানে আমার দিবারাত্রির প্রতিটি মুহূর্ত মূল কাজের চেয়ে আনুসঙ্গিক কাজে বেশি ব্যয় হচ্ছে। আমি এখানে অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম। সবসময় চাইতাম নদওয়ার জন্য মানুষের দ্বারে হাত পেতে অর্থ জোগাড় করতে, যাতে মূল কাজের সুযোগ তৈরি হয়। তখন খুব আফসোস হতো, যদি কোনো রাজ্য বা সাম্রাজ্য এদিকটায় মনোযোগী হয়, অর্থনৈতিক পেরেশানি থেকে আমাদের চিন্তামুক্ত রাখে, তাহলে মূল কাজে আমাদের পূর্ণ শক্তি ব্যয় করতে পারব। কিন্তু এখানে দেড় বছর থেকে আমার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে, সাম্রাজ্যের কৃপায় আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবার হয়। ফলে আমারই ইচ্ছে, যত দ্রুত পারা যায় এখান থেকে বিছানাপত্র গুছিয়ে নেবো। সিদ্ধান্ত এতটাই পাকা করে ফেলেছি, হয়তো এখনই বিদায় নেবো অথবা হজের মৌসুম পর্যন্ত থাকব।

এ তো আমার এখানে অবস্থানের বিবরণ বললাম। ওদিকে আমার শারিরীক অবস্থারও অবনতি ঘটেছে। পুরো উদ্যমতার সাথে কাজ করতে পারি না। এজন্য আমি….কে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, যাতে তার শক্তি ও আমার মেধা কাজ করে। কিন্তু আপনার অনুপস্থিতিতে তাকে ঘিরে উস্তাদদের পারস্পরিক মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। আমি বলেছি, ভালো হয় এবার আপনাদের মধ্য থেকে কেউ দায়িত্ব নিক। সুতরাং….দায়িত্ব নিয়েছে।[5] এখন মনে হচ্ছে তার দ্বারাও হবে না।

چیست یاران طریقت بعد ازیں تدبیر ما

বলো তরিকতের সঙ্গীরা! এরপর আমাদের তদবির আর কী হতে পারে?

দারুল উলুমের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমার হৃদয়ে এ কথা গেঁথে গেছে, মুসলমানদের থেকে যেন সম্মিলিতভাবে কাজ করার শক্তি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যুগের পরিবর্তন এবং দেশের রূপান্তর ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে মুসলমানদের জন্য দিনদিন অতি প্রয়োজনীয় করে তুলেছে। কিন্তু আফসোসের কথা হলো, মুসলমানদের আলস্য উদাসীনতাও একই হারে বেড়ে চলেছে। আমার তো মাঝেমধ্যে মনে হয়, এমন না হোক—এই ভূমি মাওলানা হালির ভাষায় ‘জাতিগ্রাসী ভূমি’-তে পরিণত হয়ে মুসলমানদের গ্রাস করে ফেলে। যাহোক, এই কাহিনী তো দীর্ঘ—

کبھی فرصت سے سن لینا بڑی ہے داستاں میری

কখনও অবসর পেলে শুনে নিয়ো আমার সুদীর্ঘ কাহিনী

নদওয়াকে ঘিরে আমার চিন্তা ঠিক তেমনই, যেমনটা আপনি লালন করেন। আমি তো সবসময় এ সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করি—এবার এ গুরুভার আপনি কাঁধে তুলে নিন।

جواں ہو تم لبِ بام آچکا ہے آفتاب اپنا

তোমরা তরুণ—তোমাদের সূর্য তো ছাদের কিনারায় উঠে এসেছে।

আমি সবসময় আপনাকে সহায়তা করব। আপনি বললে মাঝেমধ্যে ওখানে অবস্থানও করব, শর্ত হলো আপনার সমচিন্তক হিসেবে অন্য উস্তাদরাও সহায়তা করবে।

ডাক্তার সাহেবের পত্রও পেয়েছি। তার পূর্ণ সুস্থতার জন্য অনেক দোয়া। তিনিও আমাকে স্মরণ করেছেন। কিন্তু এখন এপ্রিল পর্যন্ত উপস্থিত হওয়া জটিল। যদি আগামী পরীক্ষা পর্যন্ত (যা মাসদুয়েক চলবে) ব্যস্ততা থেকে ফুরসত পেতাম!

আপনি আমার ব্যাপারে হেজাজের জ্ঞানী ব্যক্তিদের যে সুধারণার কথা জানিয়েছেন, তা আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। সত্যিই যদি এমনটাই হতো!

ওয়াসসালাম

সাইয়েদ সুলাইমান

১৮ই এপ্রিল ১৯৪৮ খ্রি.

ভূপালে থেকে দারুল উলুমের দায়িত্ব যথাযথভাবে পুরো করা যাচ্ছে না ভেবে সাইয়েদ সাহেব আমাকে সহকারী সচিব নির্বাচনের ব্যাপারে তাগিদ দিতে থাকেন। দারুল উলুমের কমিটি ৭ জানুয়ারি ১৯৪৯ সালে এ আবেদন মঞ্জুর করে। এরপর আমি সাইয়েদ সাহেবের তত্ত্বাবধান ও পরামর্শে কাজ শুরু করে দিই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে আমি সাইয়েদ সাহেবের শরণাপন্ন হতাম, তিনি আমাকে স্নেহসুলভ দিকনির্দেশনা দিয়ে পূর্ণ সহায়তা করতেন। এখানে একটি পত্র উল্লেখ করছি, যাতে কিছু ঐতিহাসিক তথ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ তথ্য থেকে তার জীবনী বিন্যস্তকরণেও পুঁজি পাওয়া যাবে। সেই চিন্তাগত মতবিরোধ সম্পর্কেও জানা যাবে, সাইয়েদ সাহেব ইলমি ও দীনি অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। পত্রটি ২৫শে জুন ১৯৪৯ সালে নিজ মাতৃভূমি দেসনা থেকে তিনি লিখেছিলেন। তিনি তখন সেখানেই অবস্থানরত ছিলেন :

দেসনা, পাটনা

২৫শে জুন ১৯৪৯ খ্রি.

প্রিয় ভাই, আল্লাহ আপনার মর্যাদা বাড়িয়ে দিন।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

আপনার পত্র পেয়েছি। পত্রে দুটি বিষয় জানতে চেয়েছেন, আমার অবস্থান সম্পর্কে এবং নেসাব সম্পর্কে। আমি অপেক্ষায় ছিলাম আপনি নেসাবের খসড়া আমাকে পাঠাচ্ছেন নাকি পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেটি আমি এখনও পাইনি। খসড়ার অপেক্ষায় থেকেই জবাব লিখছি। দেখুন, আমার কর্মতৎপরতার যুগ শেষ হয়ে এসেছে। প্রতি যুগের জন্যই যথোপযুক্ত ব্যক্তি রয়েছেন। আমি মনে করি এই যুগে আপনার প্রস্তাবনা অধিক গুরুত্ববহ হবে। যেহেতু আপনার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস ও ভরসা রয়েছে, তাই সেটি দেখা ছাড়াই আমি পছন্দ করে নিয়েছি। আল্লাহ তাআলা সেটিকে উপকারী সাব্যস্ত করুন।

আমার অবস্থানস্থল সম্পর্কে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। মানসিক স্থিরতা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক অনৈক্য থেকে বাঁচবার জন্য আমি আজমগড় ছেড়েছি। তৎক্ষণাৎ হায়দারাবাদের শিক্ষা কার্যক্রম ছেড়ে ভূপালের ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছি। যদিও রাজ্যের আন্দোলন সংক্রান্ত হাঙ্গামার পরও এখন অবধি ওখানে আমার অবস্থান নিরাপদ, তবু ওখানে গেলেই মূল অবস্থা জানা যাবে। কিন্তু মূল ব্যাপার হলো, মৌলিকভাবে সেখানে আর এখন ইসলামি রাজ্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। এজন্য মনে করি ওখানে অবস্থানের ব্যাপারে আর আমার মন সায় দেবে না। অনেকের ইচ্ছাও এটা যে, এখন আমাকে ওখান থেকে সরে পড়া উচিত। ফলে অনেক জায়গা থেকে আমাকে স্মরণ করা হচ্ছে। এক প্রতিবেশী রাষ্ট্র[6] থেকেও তাদের ধর্মীয় ও শরয়ি আইনের ক্ষেত্রে কাজ করবার জন্য আমাকে স্মরণ করা হচ্ছে বলে শুনেছি। ধর্মীয় ও পার্থিব শিক্ষাব্যবস্থায় কীভাবে নবজোয়ার সৃষ্টি করা যায় এবং কী কী সংশোধনমূলক প্রস্তাবনা তৈরি করা যায়—তা বাস্তবায়নের জন্য আমার নাম প্রস্তাব করা হচ্ছে। কিন্তু এখনও আমার তবিয়ত এ ব্যাপারে স্থির হয়নি।

মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলাম—কিছুদিন নির্জনে একাকীত্বের জীবন যাপন করতে পারি কি না তা দেখতে। কিন্তু এখানে কতিপয় বয়োজ্যোষ্ঠের সম্পত্তির দাবিদাওয়া ও স্বজনদের বিদ্বেষ আমাকে অস্থির করে তুলেছে।

দারুল উলুম নদওয়ার খেদমত সর্বদা আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্য ‍ছিল। এখনও এ ব্যাপারে আমার অস্বীকৃতি নেই। কিন্তু নদওয়ার জন্য এখন সবচে বেশি জরুরি হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তথা চাঁদা তোলা। আমি এ কাজের জন্য এখন অনুপযুক্ত। আর ওখানে পরিবার নিয়ে অবস্থান করা এবং আমার অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের কোনো সুব্যবস্থাও দৃষ্টিগোচর হয় না।

মোটকথা, এ সংকটগুলো আমার সিদ্ধান্তে প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে। সামনের পথ সুস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। এখন হজের সফর সমাগত। সফর শেষে হয়তো কোনো পথ উন্মুক্ত হবে এবং আমিও স্থিরচিত্ত হতে পারব।

আজ ১৫ই জুন। ১৭ই জুনে এখান থেকে রওনা হবো। লখনৌ এবং উন্নাও[7] হয়ে রমজানের আগেই ভূপালে পৌঁছবার ইচ্ছে। আশা রাখি সেখানে গিয়ে কিছু সংশয় কেটে যাবে। আপনি যদি ভূপালের ঠিকানায় আমাকে কিছু পরামর্শ লিখে পাঠাতে পারেন, তাহলে কৃতজ্ঞতা।

ওয়াসসালাম

সাইয়েদ সুলাইমান

যেমনটা পত্রে ইঙ্গিত করা হয়েছে, সাইয়েদ সাহেব ভূপালে কিছুদিন অবস্থানের পর হজের সফরে রওনা হন। ১৩৬৮ হিজরি মোতাবেক ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত হওয়া এটি ছিল তার দ্বিতীয় বা তৃতীয় হজ। হেজাজের তাবলিগি জামাত সাইয়েদ সাহেবের মাধ্যমে ব্যাপক উপকৃত হন এবং সৌদি আরবের সর্বমহলে এই দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব ও ভারত্ব তৈরির ক্ষেত্রে সাইয়েদ সাহেব মুখপাত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সাইয়েদ সাহেব বরাবরের মতোই এ খেদমত থেকে হাত গুটিয়ে রাখেননি। যখন সুযোগ পেয়েছেন তাবলিগি মজলিসে যুক্ত হয়ে ওখানকার সাথি সঙ্গীদের সাহস জুগিয়েছেন। তিনি সফর থেকে ফেরার পর আমি সম্ভবত কোনো পত্র লিখেছিলাম, যাতে তার এ দাওয়াতি তৎপরতায় ভূমিকা ও উৎসাহ প্রদানের ব্যাপারে উপযুক্ত ভাষায় অভিব্যক্তি জানানো হয়েছিল। সাইয়েদ সাহেব তার জবাবি পত্রে যা লিখেছিলেন, তা নিম্নে উদ্ধৃত করছি :

ভূপাল

২৪শে জানুয়ারি ১৯৫০ খ্রি.

প্রিয় ভাই, আল্লাহ আপনাকে সাফল্যমণ্ডিত করুন।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

আপনার পত্র পেয়েছি। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আল্লাহর রহমতে কল্যাণ ও সুস্বাস্থ্যের সাথেই রয়েছি। দূর্বলতাও কিছুটা কেটে উঠেছে।

হেজাজের তাবলিগি জামাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে আমার অংশগ্রহণের ব্যাপারটিকে আপনারা বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। মাওলানা ইউসুফ সাহেব ও মাওলানা জাকারিয়া সাহেব পর্যন্ত এর জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এবং দোয়া করেছেন। আমি দোয়ার মুখাপেক্ষী, তাই এটা ঠিক আছে; কিন্তু কৃতজ্ঞতা কেন? কেউ নামাজ পড়লে কি তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়? আমি কথাগুলো এজন্য বলছি যে অনেকেই এমনটা করেছেন।

নিঃসন্দেহে আপনার জন্য যে বিষয়টি সৌভাগ্যের, তা হলো, আল্লাহর রহমতে দু-বছর পরও আপনার নাম ও কাজকে আমি হেজাজে জীবিত দেখতে পেয়েছি। বরং বলা যায় আপনার সাথে সম্পর্কের ফলে আমি অধিক সম্মানিত হয়েছি।

আপনার সাক্ষাত লাভ এবং নদওয়ার অবস্থা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। এখন তো ভূপালের উদ্দেশ্যে আপনার সফরের প্রস্তুতি নেওয়া চাই।

ওয়াসসালাম

সাইয়েদ সুলাইমান

এই হজের সফরে পাকিস্তানের কতিপয় দায়িত্বশীল ব্যক্তির পক্ষ থেকে সাইয়েদ সাহেবকে আবেদন জানানো হয়। নব্য এ ইসলামি রাষ্ট্রে সাইয়েদ সাহেবের জন্য সেই বিস্তর সুযোগ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের কথা জানানো হয়, যা সাইয়েদ সাহেবের চেয়ে ভালো আর কোনো আলেমে দীন আঞ্জাম দিতে সক্ষম নন। পাকিস্তানে ইসলামি আইন বিন্যস্তকরণের প্রসঙ্গ ছিল, ওখানকার শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামিকরণের ব্যাপারটিও সামনে ছিল। এ দুটি বিষয় সম্পর্কে সাইয়েদ সাহেবের ঐকান্তিক আগ্রহ ও মানসিক ঝোঁকও ছিল। কিন্তু এরপরও দীর্ঘকাল যাবত তিনি মানসিক দূর্বলতা ও স্পর্শকাতর বিষয় বিবেচনায় পাকিস্তান যাবার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। অবশেষে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সমাপ্তি ঘটে। একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয় এবং সাইয়েদ সাহেবও সুযোগ পান ওখানকার অবস্থা স্বচোক্ষে পরিদর্শনের। তিনি পাকিস্তানের সরকারি দায়িত্বশীলদের সাথে সাক্ষাত ও মতবিনিময়ের পর নিশ্চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফুরসত পান। ১৯৫০ সালে দিল্লি থেকে হিন্দুস্তানি বরেণ্য মুসলিমদের একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে যাচ্ছিলেন। এই দলে মাওলানা হাবিবুর রহমান লুধিয়ানবি সাহেবও সম্মুখসারিতে ছিলেন। সাইয়েদ সাহেবের পক্ষ থেকে এই দলে অংশগ্রহণের আবেদন জানানো হয়। তারা সম্ভবত সাইয়েদ সাহেবের পাকিস্তান পরিদর্শনের সুযোগের কথা ভেবে আবেদন মঞ্জুর করেন। দলটি ১৪ই জুন ১৯৫০ সালে করাচি পৌঁছায়। সাইয়েদ সাহেবের প্রত্যাবর্তনের তারিখ সুনির্ধারিত ছিল। এ ব্যাপারে তার মাঝে কোনো দ্বিধাও ছিল না। কিন্তু ওখানকার নিকটজন—বিশেষত তার কন্যা ও জামাতা এবং বংশীয় ব্যক্তিগণ তার এই আকস্মিক আগমনের পূর্ণ সদ্ব্যবহার ঘটালেন। তারা এমন অবস্থা তৈরি করে ফেললেন যে সাইয়েদ সাহেবের প্রত্যাবর্তন অসম্ভব হয়ে পড়ল। কাছের মানুষদের পীড়াপীড়ি দেখেও নিজের মতের উপর দৃঢ় থাকার অভ্যাস সাইয়েদ সাহেবের আগেও ছিল না। আর এখন তো তিনি মানসিকভাবে আরও অনেকটা দূর্বল। ফলে অবস্থা দাঁড়ালো এই, তিনি সফর স্থগিত করে পাকিস্তান থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। তার এ সিদ্ধান্তে ওই সকল শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু ও তার মূল্য সম্পর্কে সবিশেষ অবগত মানুষজনের হৃদয়ে ব্যথা অনুভূত হলো, যারা হিন্দুস্তানে তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন। যারা হিন্দুস্তান থেকে এই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভাণ্ডারের বঞ্ছনাকে জাতীয় দুর্ঘটনা মনে করতেন। কিন্তু যা হবার তা হয়ে গেছে। তখন আফসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তখন সবার দোয়া ছিল কেবল এটুকুই, এই নব্য ইসলামি রাষ্ট্র—যার প্রতি বিশ্বের বহু মুসলমান বড় বড় আকাঙ্ক্ষা লালন করেন, সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যক্রমে সামাজিক জীবনে ইসলামি শিক্ষা ও ইসলামি আইন বাস্তবায়নের যোগ্যতার প্রশ্নে যে কঠিন পরীক্ষায় যে রাষ্ট্রটি অবতীর্ণ হয়েছে—সাইয়েদ সাহেবের সত্তা থেকে, তার গুণাবলি ও বিস্তর অভিজ্ঞতার ডালি থেকে অধিকতর উপকার লাভ করুক। কিন্তু হতাশার ব্যাপার হলো, এমনটা হয়ে উঠেনি। যে আকাঙ্ক্ষা আমরা করেছিলাম, তা পূরণ হয়নি। সাইয়েদ সাহেবের ব্যক্তিত্বের সাথে সঙ্গত উপকার লাভ তারা করতে পারেনি। ওখানে অবস্থানকালে সাইয়েদ সাহেবকে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যা স্মরণ করাও তার অজস্র ভক্তবৃন্দের জন্য নিদারুণ কষ্টের ব্যাপার। এখানে ওই সংকটের কারণ ও বিস্তর বিবরণ দেবার অবকাশ নেই। ওখানে কী কী অপারগতা ছিল, কী ঘটনা সামনে এসেছিল, দায়িত্ব কতটুকু ছিল, সাইয়েদ সাহেবের ব্যক্তিগত দূর্বলতা ছিল কতটুকু—এ সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব জটিল; আর এটি নিয়ে আলোকপাত করা আমার বর্তমান বিষয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণও নয়।

মার্চ ১৯৫৩ সালে সাইয়েদ সাহেব একবার (এবং শেষবার) হিন্দুস্তানে আগমন করেন। সাইয়েদ সাহেব ওই মাসেরই কোনো তারিখে ঢাকার হিস্টোরি কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করতে গিয়েছিলেন। ঢাকায় তিনি তার প্রজ্ঞা ও দুরদর্শিতায় মেশানো সেই ঐতিহাসিক সভাপতির বক্তব্য পাঠ করেন, যাতে বাঙালি মুসলমানদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, তারা যেন বাংলা লেখার ক্ষেত্রে ফারসি লিখনশৈলী ব্যবহার করে, যেমনটা তারা ইংরেজ আমলের আগে লিখত। সাইয়েদ সাহেব প্রমাণ করেন, এই লিখনশৈলীর পরিবর্তন খুব গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ, যার মাধ্যমে বাঙালিদের ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে বহু দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখন বাঙালি মুসলমান, হিন্দুস্তানি ও পাকিস্তানি মুসলমানের মাঝে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা দুরীভূত করবার জন্য এটাই একমাত্র পথ যে—বাঙালিরা ফারসি বর্ণ গ্রহণ করে নিন। এটা সুস্পষ্ট যে, সাইয়েদ সাহেবের এই পরামর্শ ছিল নিরেট বন্ধুত্বসুলভ ও সংস্কারসুলভ। আর এতে সেই দুরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার ঝলক দেখা যাচ্ছিল, যা ইকবাল ব্যক্ত করেছেন এ কবিতায় :

ولی با من بگو آن دیدہ ورکیست

کہ خاری دید و احوال چمن گفت

কিন্তু আমাকে বলো, সে দূরদৃষ্টিবান কে, যে একটি কাঁটা দেখেও গোটা বাগানের অবস্থা বর্ণনা করতে পারে?

আর যে প্রজ্ঞার সত্যায়ন করেছে সেই দুঃখজনক ঘটনা, যা ১৯৭১ সালের শেষে এবং ১৯৭২ সালের শুরুতে ঘটে যায়; যার ফলাফলস্বরূপ মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশটি পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে পড়ে।

বাঙালিরা, বিশেষত ইউনিভার্সিটি ও কলেজের শিক্ষার্থীরা এই আন্তরিক পরামর্শকে যেভাবে স্বাগত জানিয়েছিল, তা ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক উপাখ্যান হিসেবে সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি ছিল সেই ঝড়ের পূর্বাভাস, যেটি রক্তবর্ষণ করতে করতে গোটা দেশকে লণ্ডভণ্ড করে বয়ে গিয়েছিল। ছাত্র-যুবকরা জাতির এই বয়োবৃদ্ধ কাণ্ডারী, ইসলামি জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রতীকের উপর সহিংস ঢিল নিক্ষেপ শুরু করে। ডা. মাহমুদ হুসাইন খান ও তার কিছু সঙ্গী তৎক্ষণাৎ সাইয়েদ সাহেবকে ঘিরে নেন এবং গাড়িতে তুলে দরজা বন্ধ করে দেন। এভাবে তার দেহ সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু দেহ সুরক্ষিত থাকলেও তার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এর পরপরই তিনি হিন্দুস্তানে ফিরে আসেন। আমরা যখন তাকে দেখলাম, তিনি একেবারে নিস্তব্ধ ছিলেন। তার ভেতর কোনো উচ্ছাস কিংবা আকাঙ্ক্ষার ছিটেফোটা দেখা যাচ্ছিল না। কোনো বিষয়েই ছিল না কোনো আগ্রহ। আমার আবেদনে—যা সাধারণত কখনও তিনি নাকচ করতেন না—দারুল উলুমের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে মাগরিবের পর মসজিদে কিছুক্ষণ বক্তব্য দেন। এই বক্তব্যও ছিল না প্রাণবন্ত। লখনৌর কাচারি রোডের তাবলিগি মারকাজে তিনি এক রাত অতিবাহিত করেন, পুরো সময়টাতে ছিলেন নিরব। সকালে তার সাথে দেখা করতে এলেন মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদি। এ দুজনের সম্পর্ক ছিল খোলামেলা। দেখা হলেই মন খুলে কথা বলতেন। সূক্ষ্ম রসাত্মক আলাপ কিংবা পুরোনো স্মৃতি রোমন্থনে দিল উজার করে দিতেন। এবার সেই মাওলানা দরিয়াবাদি বহু চেষ্টা করেও সাইয়েদ সাহেবের মন খুলতে পারলেন না। মাওলানা মুহাম্মাদ উয়াইস নাগরামি নদবি ও মাওলানা আবুল ইরফান নদবি সাহেবের (যারা সাইয়েদ সাহেবের সাথে উন্নাও পর্যন্ত গিয়েছিলেন) বক্তব্য মতে, সাইয়েদ সাহেব পুরোটা পথ নিশ্চুপ ছিলেন। কেবল গঙ্গা সেতু এলে তিনি বলেছিলেন—‘এটা গঙ্গা।’

পাকিস্তান পৌঁছবার পর সাইয়েদ সাহেব আর বেশিদিন এ দুনিয়ায় থাকেননি। হৃদয়ের অভিযোগ ছিল পুরোনো। মে ১৯৪৫ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত সব দুর্ঘটনা তাকে এমনিতেই অর্ধমৃত বানিয়ে ফেলেছিল। সবশেষ ১৪ই রবিউল আউয়াল ১৩৭৩ হিজরি মোতাবেক ২২শে নভেম্বর ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তার অন্তিম লগ্ন উপস্থিত হয়। আমরা হিন্দুস্তানে বসে হঠাৎ শুনতে পাই, তিনি এই ইহকাল ছেড়ে রফিকে আলার সান্নিধ্যে গমন করেছেন।

এ পর্যন্ত যা কিছু লিখলাম, তা ব্যক্তিসম্পর্ক, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা এবং পত্রাবলির আলোকে লিখেছি। এখন সাইয়েদ সাহেবের ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলির কিছু বিশেষ দিক সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে আলোকপাত করব, যযা আমার দৃষ্টিতে তার আদর্শ ও গুণাবলির ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র্য মর্যাদা ধারণ করে; এবং যা থেকে আমি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছি।

উলামায়ে কেরামের মাঝে সাইয়েদ সাহেবের সবচে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার জ্ঞানের সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য। তার মাঝে প্রাচীন ও আধুনিক জ্ঞানের পরিচিতি, জ্ঞানের গভীরতা ও সাহিত্যের রূচি, সমালোচক ও ঐতিহাসিকের বাস্তববাদিতা ও বিবেচনাবোধ, সাহিত্যিক ও লেখকদের স্বাদ ও সৌন্দর্য, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির নমনীয়তা এবং অধ্যয়নের বিস্তৃতি এমনভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল, যা সাধারণত বিরল। সাইয়েদ সাহেব যে যুগের শিক্ষার্থী ছিলেন, সে যুগে প্রাচীন ও আধুনিক জ্ঞানের মাঝে শক্ত প্রতিবন্ধকতা ছিল। এক ব্যক্তি একই সময় উভয় ধারার লেখকদের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারত না। এখনও এ উভয় ধারার সম্মিলন দুস্কর (আর সম্ভবত নদওয়াতুল উলামায় তার মাঝেই প্রথমবার এই সম্মিলন ঘটেছিল)। দীনি ইলম ও দেশের ভাষা ও সাহিত্যের মাঝে সীমান্ত তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এ সীমান্ত অতিক্রম করা ছিল দুঃসাধ্য কাজ। ওই যুগের অন্তিমকাল ঘনিয়ে আসছিল, যে যুগ নজির আহমাদ, হালি ও শিবলির মতো আলেম ও লেখক তৈরি করেছে। এবার শুরু হচ্ছিল শাস্ত্রীয় পণ্ডিত আলেমদের যুগ। এ যুগে সাহিত্য ও কাব্যচর্চাকে মনে করা হতো সভ্যতা-পরিপন্থি। এমন বহু লোক ছিলেন, যারা উঠতে বসতে সহজ সাবলীল উর্দুতে লেখালিখি করাকে নিজের আলেমসুলভ মর্যাদাবোধের বিপরীত মনে করতেন। ভুগোল ও ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতাকে মনে করা হতো উলামায়ে কেরামের চরিত্র। প্রাচীন জ্ঞানবিজ্ঞান সম্পর্কেও ছিল নানাবিধ অজ্ঞতা। যারা ফকিহ ও মুহাদ্দিস হতেন, তারা সাহিত্যিক হতেন না। যারা সাহিত্যিক ছিলেন, তাদের মাঝে ছিল না দীনি ইলমের সাথে কোনো সম্পর্ক। শিক্ষককে লেখালিখির লায়েক ভাবা হতো না, আবার লেখক ও বক্তাকে শিক্ষকতার যোগ্য মনে করা হতো না। নদওয়াতুল উলামার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল সমৃদ্ধির চিন্তা লালন করে। জীবনের প্রভাব ও জাতির পথপ্রদর্শনের জন্যও অনিবার্য ছিল দেশের ভাষা ও সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং কার্যক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করা। খোদ নদওয়ার পরিচালকদের মাঝেও ছিলেন শিরুল আজাম, মুওয়াজানায়ে আনিস ওয়া দাবিরের লেখক ও উর্দুভাষার স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যধারী সাহিত্যিক (মাওলানা শিবলি), তাজকিরায়ে গুলা রানার লেখক (মাওলানা হাকিম সাইয়েদ আবদুল হাই) এবং গালিবের সরলতা ও আভিজাত্যের জীবন্ত স্মরণিকা (মাওলানা হাবিবুর রহমান খান শিরওয়ানি)-এর মতো আলেম ও সাহিত্যিকগণ। সেই দরসগাহের সবচে সফল ও যোগ্য ছাত্র ছিলেন মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদবি। যিনি অর্ধশতাব্দিরও বেশিকাল ধরে জীবন্ত থাকা উলামায়ে কেরামের সেই প্রাচীন সমৃদ্ধির পুনরুজ্জীবন ও প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ধর্মীয়, শিক্ষা ও সাহিত্যের অঙ্গনে একইসাথে তিনি শুধু বিচরণই করেননি, বলা যায় শাসন করেছেন। তার বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্মতৎপরতার দিকে তাকালে এই সমৃদ্ধির কথা আঁচ করা যায়। এক সময়ে তাকে দেখা যায় দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার আদবের শিক্ষক ও আননদওয়ার সহকারী সম্পাদকরূপে, এরপর দেখা যায় আলহেলালের মতো যুগান্তকারী পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক ও মাশহাদে আকবরের মতো জীবন্ত প্রবন্ধের লেখক হিসেবে। যিনি গোটা দেশে নতুন এক উদ্দীপনা ও সহমর্মিতার রেশ তৈরি করে দিয়েছিলেন। যখন খেলাফত কমিটি মাওলানা মুহাম্মাদ আলির নেতৃত্বে ইংল্যান্ডে তাদের প্রতিনিধিদল প্রেরণ করতে যায়, তখন এর সদস্য ও হিন্দুস্তানি মুসলমানের প্রতিনিধিরূপে এই নওজোয়ান আলেমের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। হঠাৎ তাকে দেখা যায় নিজ মুরব্বি ও উস্তাদের (মাওলানা শিবলি) একান্ত সহযোগী হিসেবে। তার ইন্তেকালের পর দারুল মুসান্নিফিনের পরিচালক ও প্রাণস্পন্দন, মাআরিফের মতো উচ্চাঙ্গের পত্রিকার ব্যবস্থাপক এবং দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার শিক্ষাসচিব হিসেবেও দেখা যায় তাকে। খেলাফত কমিটি যখন সুলতান ইবনে সউদের দাওয়াতে ইসলামি কনফারেন্সে যোগদান এবং হিন্দুস্তানি মুসলমানের চিন্তাধারা তুলে ধরবার জন্য একটি প্রতিনিধিদল তৈরি করে, তখন এর নেতৃত্ব দেবার জন্যও তারচে উপযুক্ত ব্যক্তি দৃষ্টিগোচর হয় না; যিনি মুসলিম বিশ্বের সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নিজেদের চিন্তা ও আদর্শের কথা আরবি ভাষায় তুলে ধরবার সক্ষমতা রাখেন এবং হিন্দুস্তানি মুসলমানের দীনি ও ইলমি বড়ত্বের নকশা অঙ্কন করতে পারেন। আফগানিস্তানের শাহ নাদের খান নিজ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন সমৃদ্ধ নীতি প্রণয়ন করতে চান, যা একইসাথে জাতীয় ও ধর্মীয় দাবি পূরণ করতে পারে, যা দীনের নীতিমালা ও সমকালীন প্রয়োজনীয়তাকে ধারণ করে, এই জটিল ও স্পর্শকতার কাজটির জন্য তার দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হয় হিন্দুস্তানের তিন ব্যক্তির উপর—প্রথমজন ডা. স্যার মুহাম্মাদ ইকবাল, দ্বিতীয়জন স্যার রাস মাসউদ[8] ও তৃতীয়জন মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান। এরপর আমরা এই যুগে একইসাথে তাকে কনগ্রেসের বিশেষ বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণ এবং খেলাফত ও জমিয়তুল উলামার বার্ষিক সভাগুলোতে সভাপতিত্ব করতে দেখি। সবখানে তার মতামত সশ্রদ্ধ গুরুত্ব পেত, তার ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞান স্বিকারোক্তি পেত। একইসাথে মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স জামিয়া মিল্লিয়্যা, আঞ্জুমানে তরক্কিয়ে উর্দু এবং হিন্দুস্তানির একাডেমিকে দেখা যায় তার গুরুত্বপূর্ণ ইলমি বক্তৃতা ও প্রবন্ধে ধন্য হতে। এরপর এই সকল ব্যস্ততার মাঝেও আমরা তার জ্ঞানের একাগ্রতা ও লেখনীর ধারাবাহিকতায় কোনো পার্থক্য দেখতে পাই না। এই সময়ের মাঝেই তিনি তার গবেষণাসমৃদ্ধ গ্রন্থগুলো রচনা করেছেন, যা পড়ে মোটেও টের পাওয়া যায় না, লেখক এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সাথে সম্পৃক্ত এবং দেশের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার বোদ্ধা সহচারী। এরপর আমরা দেখি, তিনি তার জ্ঞান ও সাহিত্যের বিজয় নিয়েই সন্তুষ্ট নন, নিরেট লেখালিখি ও গবেষণার জীবনেই তৃপ্ত নন, তিনি বেদনাহত হৃদয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মনন ও প্রজ্ঞাবান কণ্ঠের সমন্বিত সম্পদের অধিকারী। তিনি সে যুগের একজন স্বতঃসিদ্ধ বুজুর্গ (মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ.)-এর সম্পর্ক ও সান্নিধ্যে এই শ্রেণিতেও চূড়ান্তভাবে উতরে যেতে চাচ্ছেন; আর এরপর স্বল্পসময়ের মাঝে তিনি শাইখের ভরসা ও সত্যায়ন পেয়ে সৌভাগ্যবানদের কাতারে যুক্ত হচ্ছেন। এরপর আমরা এই সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিককে দেখি ভূপালের বিচারপতি হিসেবে মোকদ্দমার রায় শোনাতে এবং ফিকহি সমাধান দিতে, এরপর বিশ্বের এক বৃহৎ ইসলামি রাষ্ট্রের দীনি পথপ্রদর্শক হিসেবে। এ সকল বিচিত্র গুণাবলি ও কর্মতৎপরতা সাইয়েদ সাহেবের সমৃদ্ধ জীবন ও তার জ্ঞানগড়িমার বিস্তৃতির উত্তম নমুনা।

তার রচনাবলির প্রতি সা্মগ্রিক দৃষ্টি বুলালে বোঝা যায়, তার রূচি ও পাঠ এবং তার জ্ঞানগত সামঞ্জস্য কতটা বিচিত্র রকমের। একদিকে দেখা যায় সিরাতুন নবীর চারটি ঢাউস খণ্ড (কোনো ইসলামি ভাষায় যার নজির নেই) আর খুতুবাতে মাদরাজের মতো নবীজীবনের আতর (এরচে উত্তম তরিকায় এখনও সিরাতকে তুলে ধরা যায়নি), আরেকদিকে দেখা যায় আরব ও হিন্দের আদি সম্পর্ক, আরবদের জাহাজ চালনার ব্যাপারে তার গবেষণা প্রবন্ধ এবং উমর খৈয়ামের ব্যাপারে তার সমালোচনামূলক গ্রন্থ; যা একজন বড় মাপের লেখক ও গবেষকের জন্য হতে পারে পুরো জীবনের পুঁজি।

কুরআন মাজিদে যেসব রাজ্য ও শহরের কথা উল্লেখ হয়েছে, তার ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক তথ্য-সংবলিত অমূল্য রচনা আরদুল কুরআন; যেটি এখন পর্যন্ত উর্দুভাষায় সর্বশেষ কাজ এবং এ বিষয়ের সবচে বড় সূত্রগ্রন্থ। অতঃপর যোগ্যতার এই বহুব্যপ্তি প্রায় তার সবগুলো গ্রন্থেই দেখা যায় যে, তিনি জ্ঞান ও সাহিত্যের সম্পর্ক কখনও ভাঙতে দিতেন না। যত শুস্ক নিরস কিংবা নিরেট তাত্ত্বিক বিষয় হোক, তার সাত্ত্বিক সাহিত্যরূচি ও দক্ষ কলম চালনায় (মাওলানা শিবলি থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে যা তিনি পেয়েছিলেন) সেটি হয়ে উঠত সজিব সতেজ; তার সাহিত্য উপাদান বইকে পাঠকের কাছে বোঝা হয়ে উঠতে দিত না। সিরাতুন নবীর মোজেজার অধ্যায় পড়ুন কিংবা আরদুল কুরআনের ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক তথ্য পড়ুন, সবখানে আপনার সাহিত্যেন্দ্রিয় তৃপ্তি লাভ করবে। আপনাকে টেনে নেবে পাঠগ্রহণের নিমিত্তে। এটা সত্য যে, সাইয়েদ সাহেবের গদ্য মাওলানা শিবলির মতো স্বতঃস্ফূর্ত ও চতুর ফারসি ব্যকরণিক আভিজাত্যে মোড়ানো ছিল না, তবু ছিল পরিপূর্ণ সুমিষ্ট ও সাবলীলতার সৌন্দর্যে বেষ্টিত। তার কতিপয় ইলমি রচনার অংশবিশেষও শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। খুতুবাতে মাদরাজের কিছু প্যারাগ্রাফ, সিরাতুন নবীর কিছু পৃষ্ঠা এবং মাআরিফের বহু পাতায় এমন সব লেখা ছড়িয়ে আছে, আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার যার মালিকানা দাবি করতে পারে। সাহিত্যের বিবেচনায় নুকুশে সুলাইমানির এমন কতিপয় নকশা তাবিজ বানিয়ে রাখার উপযুক্ত।

মূল কথা হলো, আমি হিন্দুস্তানে ও বহির্বিশ্বে ভ্রমণসাহিত্য ও মুসলিম বিশ্বের ব্যাপারে ধারণা রাখার ক্ষেত্রে মাওলানা হাবিবুর রহমান শিরওয়ানির মতো বিস্তৃত গুণের অধিকারী এবং মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভির মতো শাস্ত্রীয় জ্ঞান ও বিচিত্র রূচিবোধের অধিকারী ব্যক্তি আর দেখিনি।

উর্দু ছাড়া আরবি সাহিত্যেও ছিল তার বিশেষ রচনাশৈলী। ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের পরিপক্বতা এবং আধুনিক সাহিত্যের সাবলীলতা—উভয় গুণের সমষ্টি ছিল তার মাঝে। মাওলানা হামিদ উদ্দিন ফারাহির কিতাব ইমআনের ভূমিকা এবং আরবি পত্রিকা আয-যিয়ার প্রারম্ভিক প্রবন্ধ থেকে অনুমিত হয়, আরবি লেখালিখির চর্চা অব্যহত রাখলে তিনি এ ক্ষেত্রে আলাদা বিশেষত্ব তৈরি করতে পারতেন।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, সাধারণত মানুষ সাইয়েদ সাহেবকে ঐতিহাসিক বা সাহিত্যিক হিসেবে চিনে থাকেন; বিশেষত প্রাচীন উলামায়ে কেরামের মাঝে তাকে এ পরিচয়েই উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সাইয়েদ সাহেবের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সংস্পর্শের সুবাদে এটুকু বুঝতে পেরেছি, তার বিশেষ দখল ছিল কুরআন মাজিদ ও ইলমুল কালামে। আমি সমকালীন অন্য কারও মাঝে কুরআন ও উলুমে কুরআনের এত বিস্তৃত ও গভীর অধ্যয়ন কারও মাঝে দেখতে পাইনি। কালামশাস্ত্র ও আকিদার ক্ষেত্রে সাইয়েদ সাহেবের দৃষ্টি ছিল খুব প্রখর ও প্রশস্ত। ইলমুল কালামকে সালাফদের উসুল ও কুরআন সুন্নাহর আলোকে সমকালীন চিন্তা ও চেতনার সমন্বয়ে তুলে ধরবার বিশেষ যোগ্যতা ছিল তার মাঝে। এটা সম্ভবত মাওলানা হামিদ উদ্দিন ফারাহির দীর্ঘ সংস্রব, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার গ্রন্থাবলি অধ্যয়ন এবং সিরাতুন নবী রচনার সুদীর্ঘ অধ্যবসায়ের ফলাফল।

এখানে এই বাস্তবতা স্বীকার করতেই হয়, সাইয়েদ সাহেব জ্ঞান ও গবেষণা এবং প্রশস্ত অধ্যয়নের ক্ষেত্রে স্বীয় উস্তাদ ও মুরব্বি মাওলানা শিবলি মরহুমের চেয়ে অনেক এগিয়ে গিয়েছিলেন। নতুন নতুন গ্রন্থ প্রকা্শ, ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক অধ্যয়ন ও পরিশ্রমের দিকে তাকালে এতে মোটেও আশ্চর্য বোধ হয় না।

কোনো শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য ও খ্যাতি অর্জন এক বিষয়, আর তাতে গভীর পাঠোদ্দীপনা, ঝোঁক ও অধ্যাবসায় ভিন্ন বিষয়। আমার পড়াশোনার ছোট্ট এই জীবনে এমনটাই দেখেছি, অধিকাংশ পণ্ডিতকে বিশেষ কোনো পরিবেশে বা সময়ে জ্ঞানী ও রূচিবান বোঝা যায়; অন্য সময়ে তার মাঝে দেখা যায় না জ্ঞানের আকুলতা, পাঠের প্রবণতা আর বইয়ের প্রতি আসক্তি। মূলত তাদের মাঝে জ্ঞানান্বেষী সত্ত্বা দেখতে পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে আমি ব্যতিক্রম পেয়েছি দুজন মানুষকে। একজন মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি, আরেকজন মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদবি। প্রথমোক্ত মনীষীকে আমি খুব কম দেখেছি। দুয়েকবার সৌভাগ্য হয়েছে তার মজলিসে বসবার। তবে আমি তার মজলিসে জ্ঞান ও গবেষণার নির্ঝর বইতে দেখেছি। আর দ্বিতীয়জন তথা সাইয়েদ সাহেবকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সফরে বা ঘরে তার সঙ্গী হয়েছি। কয়েকদিন টানা সান্নিধ্য লাভ করেছি। তার জ্ঞান অন্বেষা সদা সর্বদা সবখানে বিরাজমান থাকত। অধ্যয়ন, চিন্তা-ভাবনা এবং আলেম ও বিশেষজ্ঞ মানুষদের সাথে মতবিনিময় ও আলাপ-আলোচনা জারি থাকত। তিনি প্রাকৃতিকভাবেই ছিলেন একজন ছাত্র। এই পরিচয়েই তার প্রকৃত মনোযোগ ও আগ্রহ নিবদ্ধ ছিল। অধ্যয়ন ছিল তার খাবার; অন্য ভাষায় বললে জীবনের অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। প্রবল অসুস্থতার মুহূর্তেও তার মেধা কর্মতৎপর থাকত। দূর্বল অবস্থাতেও তিনি পাঠ জারি রাখতেন। বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও প্রাচীন ও আধুনিক সমাজে এখন যেভাবে জ্ঞানের সাথে সম্পর্কহীনতা ও অনাগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, এতে করে সামনে হয়তো সাইয়েদ সাহেবের এই নিমগ্নতা স্মরণীয় হয়ে উঠবে।

একাডেমিক কাজের ক্ষেত্রে সাইয়েদ সাহেব ছিলেন খুব উদ্যমী ও পরিশ্রমী। প্রত্যেকটি রচনাকে তিনি এমনভাবে পূর্ণ করতে চাইতেন, এমনভাবে সেদিকে মনোযোগী হতেন, মনে হতো এটা তার জীবনের প্রধান ও শেষ কাজ। চেষ্টার কোনো কমতি করতেন না কাজের ক্ষেত্রে। হাজার পৃষ্ঠা পড়ে ফেলতেন। তথ্য জমা করতেন। এরপর তা বিন্যস্ত করতেন। এভাবে একটি কাজ শেষ হবার পর বিশ্রাম নেবার কথা না ভেবে অন্য কাজ শুরু করে দিতেন। পূর্বের মতোই উদ্যমী হয়ে লেগে পড়তেন নতুন কাজে। এই ব্যস্ততা সাইয়েদ সাহেবের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। দীর্ঘকাল ধরে তার মাঝে বার্ধক্য ও দৌর্বল্যের চিহ্ন দেখা গেছে। তিনি বেশ কয়েকবার আমাকে বলেছেন, ‘তোমার বাবা (মাওলানা হাকিম সাইয়েদ আবদুল হাই) আমাকে বলেছিলেন,

من نکردم شمار حذر بکنید

আমি তো হিসাব করতে পারিনি, তোমরা সতর্ক থেকো।

আমাকে তো লেখালিখি ও পড়াশোনা সময়ের পূর্বেই বুড়ো বানিয়ে দিয়েছে। তুমি সতর্ক থেকো।’ সাইয়েদ সাহেব বলতেন, ‘আমি তো এই ওসিয়তের উপর আমল করতে পারিনি। এখন এই আমানত তোমার হাতে সোপর্দ করছি।’ মূল ব্যাপার হলো, যে স্বভাবজাত জ্ঞানস্পৃহা তিনি নিয়ে এসেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তা হ্রাস করবার কোনো উপায় তার ছিল না। জ্ঞান ও গবেষণার কাজে তিনি নিত্যদিন ব্যস্ত থাকেন এবং এত বড় রচনাভাণ্ডার ছেড়ে যান, যা পুরো একটি শ্রেণিকে লেখক বানাবার জন্য যথেষ্ঠ। অনেক সময় ইউরোপ এশিয়ায় কয়েকজন মিলে জীবনের সকল সুবিধা ও সহজতা নিয়ে এতটা গবেষণামূলক কাজ করতে সক্ষম হতো না, সাইয়েদ সাহেব একহাতে যা আঞ্জাম দিতেন। এক সিরাতুন নবীই (যা শুধু সিরাতের কিতাব নয়, ইসলামি আকিদা ও আখলাকের এনসাইক্লোপিডিয়া) তার সক্ষমতার উজ্জ্বল প্রমাণ। হায়াতে শিবলি বাহ্যিকভাবে দেখতে একজন প্রসিদ্ধ আলেমের জীবনী, কিন্তু বস্তুত এটি এক শতাব্দীর ধর্ম, শিক্ষা, সভ্যতা ও চিন্তার বিবর্তনের ইতিহাস; যা ছাড়া মুসলমানদের জাতিগত চরিত্র ও বিদ্যমান যুগের প্রকৃতি বোঝা দৃস্কর। এই গ্রন্থে সমকালীন প্রায় সকল আন্দোলন ও সংগঠনের ইতিবৃত্তও উঠে এসেছে। শুধু এই একটি গ্রন্থে সাইয়েদ সাহেব সহস্র পৃষ্ঠার নির্যাস এবং বিশটি গ্রন্থের উপাদান একত্র করে দিয়েছেন।

এখানে আরেকটি মূল্যায়ন করা অসংলগ্ন হবে না, সাইয়েদ সাহেব প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছিলেন অধ্যয়ন, লেখালিখি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও গঠনমূলক কাজের জন্য। এ ধরণের চরিত্র নিয়েই তিনি এসেছিলেন। মাঠপর্যায়ের শোরগোল ও রাজনৈতিক আন্দোলনমুখর জীবন তার জন্য শোভা পেত না। নিজের মূল শক্তি ও অধিকাংশ সময়কে লেখালিখি ও গঠনমূলক কাজে ব্যয় করে তিনি নিজের উপর এবং উম্মাহর উপর অনুগ্রহ করেছেন। যখন তিনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কিংবা সর্বব্যাপী চরিত্রের বশবর্তী হয়ে নিজের এই গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়েছেন, তখনই অনুভব করেছেন তার জন্য বাইরের এ ময়দান নয়। একইভাবে এটাও বাস্তব যে, স্বভাবগতভাবে তিনি সাধারণ আলোচক বা স্টেজের বক্তা ছিলেন না। তার মূল শক্তি ছিল চিন্তা, তত্ত্বতালাশ, গবেষণা এবং লেখালিখিতে। আর এতে তিনি পূর্ণরূপে সফল ছিলেন।

সাইয়েদ সাহেব যে উস্তাদ ও মুরব্বিদের পথনির্দেশনা পেয়েছিলেন, যে পরিবেশে তিনি মানসিক উৎকর্ষ লাভ করেছিলেন, তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ তিনি প্রশস্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও ভারসাম্যপূর্ণ চরিত্রের অধিকারী হয়েছিলেন। অনেক প্রাচীনপন্থি আলেমের মতো তার মাঝে নিস্ক্রিয়তা ও দলান্ধতা ছিল না, আবার বহু আধুনিকপন্থিদের মতো অস্থিরতা, অগভীরতা ও ইউরোপের প্রতি মুগ্ধতাও ছিল না। তিনি তার শিক্ষাগত চিন্তা থেকে নিয়ে ফিকহি মতাদর্শ পর্যন্ত—সবখানে প্রশস্ত দৃষ্টিবান, উদার হৃদয়বান ও ভারসাম্যপূর্ণ ছিলেন। যদি এই গুণ তার মাঝে বিদ্যমান না থাকত, তাহলে তিনি মাওলানা মুহাম্মাদ আলির সঙ্গ, ইসলামি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ, আফগানিস্তান সফর, আলিগড় ও জামিয়া মিল্লিয়্যার সাথে সম্পৃক্তি—সকল ক্ষেত্রে জটিলতা অনুভব করতেন। এই উদার দৃষ্টিভঙ্গির ফলেই তিনি হিন্দুস্তানের এক খ্যাতনামা গবেষকশ্রেণি ও প্রসিদ্ধ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মুখ্য ব্যক্তি হয়েও, নিজের স্বতন্ত্র শিক্ষা ও সংস্কারমূলক চিন্তা নিয়েও মাওলানা আশরাফ আলি থানবির দিকে রুজু করেছেন। আর এই ইসলাহি যাত্রায় তিনি কোনো প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেননি। উদার দৃষ্টিভঙ্গির এ উপমা উলামায়ে কেরামের মাঝে খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়।

শেষ যে গুণটি তার গোটা জীবনে দৃশ্যমান হয়েছে, তা হলো তার চারিত্রিক শিষ্টতা। তিনি একেবারে নিরীহ ভদ্রগোছের মানুষ ছিলেন। তার জন্য জালেম হবার চেয়ে মজলুম হওয়া বেশি সহজ ছিল। তার এই গুণ এ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল যে, এটিকে দূর্বলতা হিসেবেই ব্যখ্যা করা যেত। এমন এক সোসাইটির মাঝে তিনি বসবাস করতেন, যারা এই গুণের যথাযথ মূল্যায়ন করতে সক্ষম ছিল না; ফলে তাকে এর চড়ামূল্য আদায় করতে হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। নিজের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও বহু সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছে। তার সুদীর্ঘ জীবনে বহু বিস্তৃত জনসম্পৃক্তির মাঝে কোনো একজনও বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে বলবে সাইয়েদ সাহেব তার কোনো ক্ষতি করেছেন বা নিজের ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিয়েছেন। একবার আমার সামনে আমিনাবাদে এক যুবক সাইয়েদ সাহেবের কাছে স্মরণিকা হিসেবে একটি নির্বাচিত পঙ্‌ক্তি লিখে দেবার ফরমায়েশ করলেন। সাইয়েদ সাহেব তাকে খাজা হাফিজের প্রসিদ্ধ এই কবিতাটি লিখে দিলেন,

آسائش دو گیتی تفسیر این دو حرف است

با دوستان تلطف با دشمنان مدارا

উভয় জগতের শান্তি মূলত এ দুটি কথারই ব্যখ্যা—বন্ধুদের সাথে নম্রতা, শত্রুদের সাথে সহনশীলতা।     

আমার ধারণামতে, এই কবিতা নির্বাচন ঘটনাক্রমে কিংবা বাহ্যিক কোনো বিষয় ছিল না, এ ছিল তার জীবনের মূলনীতি; যা তিনি সর্বদা মেনে চলেছেন।

এ ছিল কিছু স্মৃতিকথা। এ মুহূর্তে কলমের টানে যার উদ্‌গীরণ। তার জীবনী লিখবার জন্য, তার জীবনের নানাদিক নিয়ে বিশ্লেষণ করবার জন্য স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান রয়েছে, বড় বড় লেখকগণ রয়েছেন। বিশেষত তার উত্তরসূরী, শিবলি ঘরানার বর্তমান প্রধান ব্যক্তিত্ব, দারুল মুসান্নিফিনের পরিচালক, প্রিয় ভাই মাওলানা শাহ মুঈন উদ্দিন আহমাদ নদবি একটি স্বতন্ত্র জীবনী লিখছেন; যাতে তার পুর্ণ জীবন ও যোগ্যতার দৃশ্য চলে আসবে।[9] আমি তো শুধু কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছি। এতে অন্যের আত্মতুষ্টি কিংবা উপকার হোক বা না হোক, আমার ভাঙা হৃদয়ের সান্ত্বনা ও কৃতজ্ঞচিত্তের প্রশান্তির মাধ্যম হবে নিশ্চয়ই।

[1] এখানে একটি মজার ঘটনা মনে পড়ে। আমরা কতিপয় উস্তাদ (যাদের মাঝে মাওলানা মাসউদ আলম নদবি ও শাইখ মুহাম্মাদ আরাবি মারাকিশি উল্লেখযোগ্য) আরবি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে দারুল উলুমে পরীক্ষামূলক নতুন এক পদ্ধতির উদ্ভাবন ঘটাই। এ পদ্ধতিতে নাহু-সরফের অনুশীলন করানো হতো, ব্যকরণিক নিয়ম ও পরিভাষার বোঝা ছাত্রদের কাঁধে তুলে দেওয়া হতো না। একদিন সাইয়েদ সাহেব হাজির হলেন প্রথম শ্রেণির কক্ষে, যেখানে ক্লাস চলছিল। মাওলানা মাসউদ আলম নদবি পড়াচ্ছিলেন। সাইয়েদ সাহেব কোনো ছাত্রের কাছে একটি শব্দের কার্যকারণ (তালিল) জানতে চাইলেন। ছাত্ররা সম্ভবত এই শব্দ শোনেওনি। তারা জবাব দিতে সক্ষম হলো না। সাইয়েদ সাহেব মৌলবি মাসউদ আলম সাহেবের দিকে তাকালেন। তিনি বললেন, ‘সরফের ক্লাস আলি মিয়ার দায়িত্বে।’ আমাকে তালাশ করা হলো। সাইয়েদ সাহেব আমাকে বললেন, ‘কী মিয়া! আপনি ছাত্রদের তালিল শেখাননি?’ আমি বললাম, ‘তালিল তো সহজেই শেখানো যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমি শেখাতে গেলেই এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হই, যার জবাব আমার কাছে নেই।’ তিনি বললেন, ‘কী প্রশ্ন?’ আমি বললাম, ‘আমি যখন তাদের বলি, ‘ক্বালা’ মূলত ‘ক্বাওয়ালা’ ছিল, ওয়াও মুতাহাররিক তার মা-কবল মাফতুহ, ওয়াও কে আলিফ দ্বারা বদলে দেওয়া হয়েছে—ফলে ক্বালা হয়ে গেছে। তখন তারা জিজ্ঞেস করে, এ কোন যুগের ঘটনা? আরবরা কোন যুগে ক্বালার বদলে ক্বাওয়ালা বলত? আমার কাছে এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।’ সাইয়েদ সাহেব এ শুনে মুচকি হাসলেন, ঘটনাটি এখানেই শেষ হয়ে গেল।

[2] এ ধারাবাহিকতা জানুয়ারি ১৯৩৯ থেকে শুরু হয়ে জুন ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত চলমান থাকে। পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাকারে দেহলি আওর উসকে আতরাফ উনিসওয়ি সদি মে নামে আঞ্জুমানে তরক্কিয়ে উর্দু এবং মাকতাবায়ে দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে প্রকাশ হয়।

[3] মুসলিম ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে ঘোষণা ছিল, বি.এ ক্লাসের জন্য দিনিয়াতের একটি বই প্রয়োজন, যাতে আকিদা, উসুলুদ দীন, সিরাতুন নবী ও প্রয়োজনীয় মাসাইল লিপিবদ্ধ হয়। ভাই সাহেবও এ কাজের জন্য চেষ্টা করেছিলেন এবং সেটি গ্রহণ করা হয়েছিল। এর সম্মানিও প্রদান করা হয়েছিল। সাইয়েদ সাহেব ওই সফলতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

[4] উদ্দেশ্য—আমার হেজাজ থেকে ফেরা। আমি জুন ১৯৪৭ থেকে জানুয়ারি ১৯৪৮ পর্যন্ত হেজাজ সফরে ছিলাম।

[5] শূন্যস্থানে ওই নদবি ফাজেলদের নাম রয়েছে, যারা ক্রমান্বয়ে নদওয়ার মুহতামিমের পদ গ্রহণ করেছিলেন।

[6] এ থেকে পাকিস্তান উদ্দেশ্য।

[7] উন্নাওয়ে তখন সাইয়েদ সাহেবের জামাতা সাইয়েদ হুসাইন সাহেব ডেপুটি কালেক্টরের পদে নিযুক্ত ছিলেন।

[8] স্যার সৈয়দ আহমাদ খানের নাতি। -অনুবাদক

[9] আনন্দের খবর হলো, এই গ্রন্থটি হায়াতে সুলাইমানি নামে প্রকাশিত হয়েছে।

শেয়ার করুন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

গদ্য

তাহিরপুর

সহকর্মী আবুল খায়ের পিয়াসের দাদির পিতৃলয় তাহিরপুরে। এখন ওই গ্রামে তার একমাত্র চাচা বসবাস করেন।…

17 January, 2026
আরও পড়ুন