সূচীপত্র

গদ্য

বিরিয়ানি সমাচার

7 January, 2026

শুরুটা করি সূত্রাপুর থেইকা। সাতসকালে রহিমের বিরিয়ানির সামনে যেই ক্ষুধার্ত মানুষগুলাকে দেখা যায়, এরা হইতেছে পুরান ঢাকার জাত খাদক। ফজরের নামাজ শেষ কইরা রহিম মিয়া ধীরেসুস্থে উপবেশন করে তার মসনদে। এরপর একখান প্রকাণ্ড বিরিয়ানির ডেগ স্থাপিত হয় বিশেষ সাইজের মাচার উপরে। ডেগ সামান্য কাঁত হইয়া রহিম মিয়াকে স্বাগত জানায়—‘নাও, এইবার শুরু করবার পারো।’ বিসমিল্লাহ বইলা রহিম মিয়া ডেগের ঢাকনা খুললেই আশপাশ জুইড়া বিরিয়ানির গন্ধ ছড়াইয়া পড়ে। সেই গন্ধে হরেক রকমের মশলাপাতি, কালোজিরার চাইল, খাসির তাজা গোশত আর ঘানিভাঙা শরিষার তৈল মিলামিশা একাকার হইয়া যায়। শোনা যায়—এই সমস্ত উপকরণের সাথে নাকি রহিম মিয়া কয়েক পদের ফলের রসও যুক্ত করে। তবে অনেকের মতে এইটা মিথ। মার্কেটিং পারপাসে এমনটা বাজারে ছড়াইছে বইলা ধারণা।

এরপর ছোট্ট হাফপ্লেট দিয়া রহিম মিয়া বিরিয়ানিতে কোপ দিবে, চাউলের ভেতর থেইকা দৃশ্যমান হইতে থাকবে মেপে মেপে কাটা খাসির গোশতের পিসগুলা। এইবার ক্ষুধার্ত ঢাকাইয়্যাদের পেট আর বুকের মাঝখানটায় চিনচিন করবে, কেউ কেউ হাঁক দিয়া বলবে—‘কই রহিম মিয়া! দেরি করবার লাগচ কেলা!’ রহিম মিয়া বলবে, ‘বহেন, অইয়া গেচে তো।’

রহিমের বিরিয়ানি যারা একবার খায়, তারা নাকি এর স্বাদ সহজে ভুলবার পারে না। সূত্রাপুর বাজারের ঠিক যেইখানটায় সব দোকানপাট শেষ হইয়া গেছে, মসজিদ থেইকা সামান্য আগাইয়া, কয়েকটা ছোট ছোট হোটেলের সারিতেই একটা দোকানের সাইনবোর্ডে বড় কইরা লেখা—‘রহিম বিরিয়ানি।’ সারাদিন এই দোকান বন্ধ থাকে। ঠিক ফজরের পর থেকে আটটা—এর মধ্যেই রহিম মিয়ার হাড়ি খালি হইয়া যায়। আটটার পর কদাচিৎ গোশতশূন্য পোলাও আর সাথে সেদ্ধ ডিম মিলে। নিদ্রাকাতর অলস কিছু খাদক দৌঁড়াইয়া আইসা ওইটুকুই খাইয়া যায়। বছরের পর বছর এই দৃশ্য চলতেছে, কোনোদিন রহিম মিয়া ভাবেনাই, ব্যবসা যেহেতু হইতেছেই—তাইলে আরেক ডেগ বেশি বিরিয়ানি রান্ধি। আটটায় খালি ডেগ নিয়া রহিম মিয়া চইলা যায়, সারাদিন কী করে কে জানে। এইটাই রহিম বিরিয়ানির ব্রান্ডিং—তুমি আটটার পর আসলে এই সুস্বাদু জিনিস পাইবা না।

রহিমের বিরিয়ানি থেইকা সোজা আগাইয়া জনসন রোডে গেলে স্টার কাবাবের একটা শাখা পাওয়া যায়। এইখানেও শত শত আইটেমের ভিড়ে আপনারে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত আছে কাচ্চি বিরিয়ানি। কাচ্চির সাথে একখান সেদ্ধ ডিম আর কাবাব পাওয়া যায়। স্বাদেগন্ধে এই কাচ্চিও অনেকের কাছে অতীব পছন্দনীয়। তবে আমি বলি কি—স্টারের কাচ্চি পেট ভইরা খাওয়া যায় না। সামান্য খাইলেই বুক ধরফড় কইরা ওঠে। কাচ্চি রাইখা আমি যদি শুধু কাবাবটার কথা বলি, সেইটা অনন্য এক জিনিস। আশপাশে আর কোথাও এমন মজাদার কাবাব আপনি পাবেন না।

স্টার থেইকা বের হন। একটু সামনে গেলে একটা গলি পড়ে। হাতের ডানের ওই গলিতেই মাখন বিরিয়ানি। নামের মতোই তার গুণ—পুরা মাখাইয়া দিবে আপনার বর্তনে। একটু মাখা মাখা কোয়ালিটির এই বিরিয়ানি খাওয়ার জন্য উকিল-ব্যারিস্টার থেইকা আপামর জনতা বিশাল লাইন ধইরা দাঁড়াইয়া থাকে। ছোট্ট দোকানটার ভিতরে জায়গা অতীব স্বল্প। চারিদিকে রাউন্ড দিয়া দশজন বসলেই ফিলাপ। গাঞ্জাগাঞ্জি কইরা তারা খায়, বাকিরা বাইরে দাঁড়াইয়া উদরপূর্তি করে। পুরান ঢাকা মানেই জমিদারি। এই মাখন বিরিয়ানির দোকানিকে দেখলে এই কথা আপনার আরও একবার স্মরণ পড়বে। সে জমিদারের মতো বইসা টাকা গুণবে, আগে টাকা দিবেন, পরে খাদ্য পাবেন।

গলি থেইকা বের হবার পর একটু আগাইলেই সুলতানস ডাইন। বড়লোকদের দোকান। ঢাকা শহরের খ্যাতনামা বিরিয়ানির ব্রান্ড এইটা। জনসন রোডের শাখাটা নতুন। সবসময় ভীরবাট্টা লাইগা থাকে। সুলতানের বিরিয়ানি আমরা এককালে খুব পছন্দ করতাম। মনে পড়ে, ইফতার বছর অনেক দূর থেইকা বিরিয়ানি পার্সেল আইনা খাইছি প্রচুর। প্রচুর মশলাদার খাবার। সমস্যা এক জায়গাতেই, মন ভরে খাওয়া যায় না। একটু খাওয়ার পর পেট গুলাইয়া আসে। জনসন রোডের এই শাখায় ওরা মুরগির দম বিরিয়ানি নামের এক আইটেম চালু করছে। এইটা মোটের উপর ভালো জিনিস। খাইতে মোটামুটি আরাম লাগে।

এইবার আমরা চইলা যাই নাজিরাবাজারে। জনসন রোড থেইকা রিকশা নিলে চল্লিশ টাকা বা তার কমবেশি ভাড়া লাগে। নাজিরাবাজার হইতেছে ঢাকার ভোজনপল্লী। চৌরাস্তায় রিকশা থেইকা নামার পর আপনি দিশাহারা হইয়া পড়বেন—কী রাইখা কী খাবেন। একদিকে চুল্লি দিয়া রেশমি হারিয়ালি চিকেন টিক্কা ইত্যাদি কাবাবের ধোয়া উঠতেছে, একদিকে আপেল কমলা মাল্টা ড্রাগন লেমন মিন্ট ইত্যাদির জুস ব্লেন্ডার হইতেছে, আরেকদিকে শোনা যাচ্ছে হানিফ আর হাজি বিরিয়ানির ডেগের বাইরাবাইরি। কী খাবেন আগে? পেটে যথেষ্ট স্পেস থাকলে চলে যান হানিফে। সিরিয়াল ধরেন দ্রুত। হানিফের দোকানে ঢোকার আগে বইলা রাখি, হানিফ ইজ দ্য বিগেস্ট বিরিয়ানি ব্রান্ড ইন ঢাকা সিটি; ইভেন ইন বাংলাদেশ। এই বিরিয়ানি একবার খাইলে কোনোদিন ভুলতে পারবেন না।

হানিফের জমজমাট কারবারি শুরু হয় মূলত রাইতে। বেলা এগারোটার পরে দোকানে ভীড় শুরু হয়। দুপুরের লাঞ্চেও সিরিয়াল লাগে। তবে মূল খেলাটা জমে রাইত বারোটার পরে। মধ্যরাইতে গিয়া দেখবেন হানিফে মাত্র দিন শুরু হইছে। একেকটা টেবিলের সামনে বহু মানুষ সিরিয়াল ধইরা থাকে পরের ধাপে বইসা পড়ার জন্য। আপনি যখন খাওয়া শুরু করবেন, দেখবেন আরও বহু চোখ আপনার বর্তনের দিকে তাকাইয়া আছে, কখন আপনার হাড্ডি চিবানো শেষ হবে সেইটা দেখবার আশায়।

হানিফে একটা মাত্র আইটেম পাওয়া যায়—খালেস বিরিয়ানি যাকে বলে। পিওর তাজা খাসির মাংসের অফুরন্ত পিস, পর্যাপ্ত ও পরিমিত তৈল-মশলা, ঝরঝরা চাইল, আর এট্রাক্টিভ গন্ধ; মানে কখন এক প্লেট ঢুইকা যাবে পেটে, বলতেই পারবেন না। হাফ-ফুল-স্পেশাল; তিনটা কোয়ালিটি আছে। স্পেশাল নিলে গোশতের পিস বাড়াইয়া দেওয়া হয়। প্রতি লোকমায় একটা করে পিস খাইলেও দেখা যায় খাওয়া শেষে আরাম করে চিবানোর জন্য কয়েকটা গোশত রইয়া গেছে। এইখানে বিরিয়ানির সাথে সালাদ নামক কিছু দেওয়া হয় না। পাবেন আনলিমিটেড লেবু আর কাচা মরিচ। মূল কথা হইলো, বিরিয়ানি খাইতে গিয়া সালাদের ভাবনাও মাথায় আসে না। আরও একটা জিনিস মিস কইরেন না, হানিফের বোরহানি। স্বাদে তা তুলনাহীন। খাওয়া শেষ কইরা এক গ্লাস মেরে দেবেন বস, পেট শান্ত হইয়া যাবে।

হানিফের দোকানের মুখোমুখি হাজী বিরিয়ানি। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ওভারহাইপড বিরিয়ানির দোকান। এখনও প্রাচীন আভিজাত্য ধইরা রাখছে তারা। টিনের দোকান, মানুষের গাদাগাদি, পাতার বর্তনে বিরিয়ানি পরিবেশন ইত্যাদি তাদের ট্রেডমার্ক কালচার। যদিও কোনো দিক থেইকাই হানিফের ধারেকাছেও তারা নাই বর্তমানে। তবু এতকাল যারা শুনে আসছেন হাজীর কথা, তারা একবার খাইয়া দেখতেই পারেন। এছাড়া আশপাশেই গ্রান্ড নবাব আর মতি বিরিয়ানির মতো জনপ্রিয় দোকানও আছে। তবে একবার হানিফ খাইয়া ফেললে ওইগুলার কথা আর মাথায় আসবে না।

বিরিয়ানি আর বোরহানির পরে নাজিরাবাজার মোড় থেইকা একগ্লাস লেমন মিন্ট গিলেন, এরপর একখিলি মিষ্টি পান মুখে দিয়া গন্তব্যে রওনা হন। এ যাত্রা স্বার্থক হইয়া উঠবে ইনশাল্লাহ।

বিরিয়ানি নিয়া আলাপ করতে গেলে আরও বহু দোকানের নাম বলা লাগে। ওই নাজিরাবাজার থেইকা সামান্য দূরে বেচারাম দেউরিতে নান্না বিরিয়ানি; নান্নার কাচ্চি খুবই চমৎকার। সূত্রাপুরেই বুদ্দু বিরিয়ানি নামকড়া। পুরান ঢাকার বাইরে গেলে ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি জনপ্রিয়। কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ মোড়ে জজ মোল্লার তেহারি ওইদিকটায় সুপারহিট। এছাড়াও অগণিত বিরিয়ানির দোকানপাট ছড়াইয়া আছে ঢাকা শহরে। আমি নিজে খাইনাই—এমন দোকানের উল্লেখ করলাম না। ঢাকায় থাইকাও যদি এইসব দোকানে আপনার পদচিহ্ন না পড়ে, তাইলে আপনে হতভাগা কপালপোড়া।

 

 

 

 

শেয়ার করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

গদ্য

তাহিরপুর

সহকর্মী আবুল খায়ের পিয়াসের দাদির পিতৃলয় তাহিরপুরে। এখন ওই গ্রামে তার একমাত্র চাচা বসবাস করেন।…

17 January, 2026
আরও পড়ুন