সূচীপত্র

গদ্য

আল্লামা নোমান ফয়জী : হৃদয়ে হৃদয়ে তাঁর বিচরণ

4 January, 2026

তখন ২০১১ সাল। শৈশবে বাবার হাত ধরে সবেমাত্র চট্টগ্রামের ধুলিমেখে আঁকাবাঁকা সরুপথের মেখল গ্রামে এসেছি। আমার বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরে। সেদিন বাবা এক শান্ত শুভ্র ব্যক্তির হাতে আমাকে সঁপে দিলেন। তার চেহারায় ছিলো দীপ্তি, বাচনে ছিলো মায়া। আটটি বছর সে মায়ার কারাগারে বদ্ধ রয়ে গেলাম, মোটেও ক্লান্তি ধরেনি আত্মায়। একে ওকে জিজ্ঞেস করে সেদিন তাঁর নাম জেনেছিলাম; আল্লামা নোমান ফয়জী। অতীতে মুফতি আজম ফয়জুল্লাহ রহ. বিদআতের আঁধার ধুয়েমুছে সুন্নাতের আলোয় প্রদীপ্ত করেছিলেন যে সমাজ, নোমান ফয়জী ছিলেন তাঁরই আলোকিত আগামী। প্রোজ্জল যে ধারাটি দেশ থেকে বিদেশে, পৃথিবীর আনাচকানাচে দ্যুতি ছড়িয়েছে, তারই যুগাবতার ছিলেন আল্লামা নোমান ফয়জী।

শরীরে বজ্রপাত ঘটলো—যখন শুনলাম হুজুর আর নেই। তাঁকে ছাড়া সুবিশাল হামিউসসুন্নাহ কীভাবে থাকবে চলমান? চার হাজার ছাত্রের মাথায় মায়ার পরশ বুলিয়ে কে করবে অভিভাবকত্ব? কার কথায় ছাত্ররা থমকে দাঁড়াবে! শাসনে অনুতপ্ত হবে! বয়ানে পরিতৃপ্ত হবে! দরসে প্রস্ফুটিত হবে নবজ্ঞানে অবগাহনে! শত প্রশ্নের উত্তর নেই একটিরও৷ শুধু সান্ত্বনার কান্নারা ভেজালো চোখ। আজ এতদিন পর যখন হুজুরকে নিয়ে লিখছি, আমি দেখতে পাচ্ছি রৌদ্রোজ্জল দুপুরে ধীরপদে বাদাম গাছের ছায়া মাড়িয়ে এগিয়ে চলছেন শান্তসৌম্য নোমান ফয়জী৷

দরসে তিনি যখন বলতেন, ছাত্ররা মুগ্ধচোখে তাকিয়ে রইত। চল্লিশ-পয়তাল্লিশ মিনিটের ঘন্টা কখন ফুরাত— ঠাওরানো যেত না৷ মনে হতো—এ সকাল দীর্ঘ হোক। আমরা হুজুরের কাছে মিজান-মুনশাঈব পড়তাম তখন। শান্ত তিনি মাঝেমধ্যে শাসনের লাঠি ঘোরাতেন। সে শাসনেও ছিল মায়ার প্রলেপ। সাধারণত মজা করে পড়াতে ভালোবাসতেন। ছাত্রদের মাথায় বোঝা চাপিয়ে দিতেন না। এমনটা আমি দেখিনি—ছাত্ররা সবক নিতে চাচ্ছে না আর তিনি জোর করে খাইয়ে দিচ্ছেন। উসুলুশ শাশী, হিদায়ার মতো কিতাবগুলোকে তরল পদার্থের মতো গিলে ফেলার উপকরণে প্রস্তুত করতেন। ছাত্ররা ক্লাসে তাঁকে পেত বন্ধুর মতো। রুদ্রমূর্তি, রুক্ষভাষী, কঠোর-মলীন তিনি ছিলেন না মোটেও। ছিলেন সদা হাসোজ্জল। ছাত্রদের মেজাজ বুঝতেন বলে তাঁর দরসের প্রেমী ছিল গোটা মাদরাসার সবাই। আমরা ছোট জামাতে পড়াকালীন মিজান/শরহেজামী/হিদায়ায় আল্লামা নোমান ফয়জীর দরসগুলোর প্রতি আত্মার টান অনুভব করতাম।

পরিক্ষা এলে সবার হার্টবিট বেড়ে যেত। হলরুমে গিয়ে একসমুদ্র চিন্তামাথায় যখন সবার শরীর ঘেমে যেত, তিনি এসে জাদুকরের মতো সবার চিন্তাকে মুছে ফেলতেন। মজার কথা, প্রশ্ন সহজীকরণ, কিংবা সাহসপ্রদান— নানাভাবে ছাত্রকে উত্তীর্ণ হবার পথ খুলে দিতেন। তিনি থাকলে সবার মাঝে থাকত একজন বাবা, যিনি প্রাণপণে চান আমার সন্তান ভালো করুক।

এ যাবত মেখল মাদরাসা বোধহয় তিনিই সবচে দীর্ঘকাল পরিচালনা করেছেন। তরুণ বয়সে কাঁধে নিয়েছেন এশিয়ার বিখ্যাত মাদরাসার দায়িত্ব। তাঁকে নিয়ে ছাত্রদের মাঝে ছোটখাটো প্রশ্ন তুলতেও দেখিনি কোনদিন। প্রতিটি ছাত্র তাঁকে ভালোবাসত। এক অনন্য আদর্শের প্রতীক ছিলেন তিনি। আমরা কখনও তাঁর সাক্ষাতে গেলে প্রাণখুলে আলাপ করতেন। ব্যস্ত থাকলে সোজাসাপ্টা বলতেন ‘পরে আসো’। মাদরাসার জটিল জটিল সমস্যা মুহূর্তেই সমাধান করতেন দক্ষহাতে। উস্তাদদের মুখে শুনেছি তাঁর দক্ষতার কথা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো মুহতামিম বনাম সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য ছিল না মেখলে। সমস্ত উস্তাদ তাঁকে এককথায় মেনে নিতেন। শ্রদ্ধাভরে তাঁর কথা আমাদের বলতেন। ছাত্রদের কঠোর নিয়মে আবদ্ধ করে ফেলতেন না, আবার আদর্শের জলাঞ্জলিও দিতেন না। মুখে থাকত সর্বদা মুফতি আজমের কথা। বারবার আমাদের শোনাতেন সোমবারের বয়ানে, হিদায়ার দরসে, ব্যক্তিগত সাক্ষাতে।

চলাফেরায় সারল্য ছিলো। এতবড় মাদরাসার পরিচালকের ছিল না বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি। একটি সিএনজিতে চলতেন এদিকওদিক। পোষাকে আভিজাত্য ছিল, আড়ম্বরতা ছিল না। দলবল নিয়ে বেড়াতে অপছন্দ করতেন। নিরবে নিভৃতে কাচারিতে বসে থাকা মুফতি আজম ফয়জুল্লাহ রহিমাহুল্লাহর মতো ছিল তার যাপিত জীবন। দেশের আনাচে-কানাচে তিনি ভ্রমণ করতেন কেবল মাদরাসা আবাদের জন্য। প্রচলিত মাহফিলের চেয়ে ঢের বেশি প্রশান্তি পেতেন মাদরাসার মজলিসে কথা বলতে। আমি হুজুরের সাথে বেশ কয়েকটি মাদরাসায় সফর করেছি। হুজুর গ্রামের ছোটখাটো মাদরাসাগুলোর পরিচালকদের পরামর্শ দিতেন, উৎসাহ দিতেন। সবাই যেন তাকে পেয়ে ভরসা পেত। খুলে বলতো সব সমস্যার কথা। অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে তিনি দিতেন সমাধান।

মেখল মাদরাসার মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানকে আপন মায়ায় বেঁধে তিনি এগিয়ে নিয়েছেন। প্রচলিত বড় বড় সংগঠনে তাঁর পদ-পদবী ছিলো না। শেষ জীবনে হাটহাজারীর ছাত্র আন্দোলনে হাটহাজারীর প্রধান শুরা সদস্য হিসেবে তিনি কিছুটা ফোকাসড হয়েছিলেন। এর আগে সোস্যাল মিডিয়া বা রাজনৈতিক আলাপে তাঁর স্থান ছিল না। তিনি নিরবে হেঁটে আসতেন দরসগাহে, দরসের পর বসতেন অনাড়ম্বর কামরায়, ছাত্রদের ছুটির আবেদন মঞ্জুর করতেন, একা একা মাঝেমধ্যে ঘুরে দেখতেন প্রাণের প্রতিষ্ঠানকে, এরপর বাড়িতে চলে যেতেন। ছাত্ররা তাঁর জন্য যেমন পাগল ছিল, তিনিও ছাত্রদের জন্য ততটা পাগল ছিলেন। ৫ই মের আলোচিত ট্রাজেডির পর মেখলের কয়েকজন বন্দী ছাত্রের জন্য প্রতিদিন ফজরের পর তাঁর কান্না আজও হৃদয়ে নাড়া দেয়। স্বল্প সময়েই স্মৃতির পাতা বেড়ে যাচ্ছে। আমরা হারিয়ে ফেলছি প্রিয় শিক্ষকদের। হুজুরকে আল্লাহ জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। আমরা জীবদ্দশায় তাঁকে বলতে পারিনি—এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসি। হাজার হাজার ছাত্রের হৃদয়ে হৃদয়ে তাঁর বিচরণ।

শেয়ার করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

গদ্য

তাহিরপুর

সহকর্মী আবুল খায়ের পিয়াসের দাদির পিতৃলয় তাহিরপুরে। এখন ওই গ্রামে তার একমাত্র চাচা বসবাস করেন।…

17 January, 2026
আরও পড়ুন