সহকর্মী আবুল খায়ের পিয়াসের দাদির পিতৃলয় তাহিরপুরে। এখন ওই গ্রামে তার একমাত্র চাচা বসবাস করেন। প্রায় ছয়মাস ধরে এ নিয়ে অফিসে বেশ আলাপ হচ্ছে, কবে কীভাবে এই সুযোগে তাহিরপুর ঘুরে আসা যায়। তাহিরপুর মানেই নিলাদ্রী লেক, বিখ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওড়, মায়াভরা যাদুকাটা নদী, শিমুল বাগান—আরও বহু দর্শনীয় স্থানের সমাবেশ। তবে আমার কাছে তখনও এবং এখনও সবচে মুখ্য ব্যাপার—হাওড়ের জনজীবন। আমি কোনোদিন কেবল পর্যটন কেন্দ্র বা লোকমুখে প্রশংসিত দর্শনীয় স্থান দেখবার লোভে কোনো জেলায় ভ্রমণ করেছি বলে মনে পড়ে না। যেখানেই যাই, লোভ শুধু মানুষ দেখাতেই। নতুন জনপদে নতুন মানুষ, নতুন তাদের চলন-বলন, নতুন তাদের চাহনি, নতুন তাদের পরিবেশ প্রতিবেশ; এসব দেখাতেই বড় সুখ। পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে সুন্দর ও দুর্বোধ্য কিছু আছে বলে বিশ্বাস করি না।
এবার বাৎসরিক অফার শেষে দুদিন ছুটি পেলাম। মাঝে শুক্রবার মিলিয়ে মোট তিনদিন। সবার সেই পুরোনো পরিকল্পনা জাগিয়ে তোলা হলো। যাবো তাহিরপুর। হানিফের নাইট কোচে টিকিটও করে ফেললাম রাতারাতি। চারজনের টিম। বাকি একজন শামীম আল হুসাইন পারিবারিক ঝুটঝামেলায় পড়ে সঙ্গী হতে পারল না। দূরপাল্লার বাস ভ্রমণেও তার অসুবিধে।
বর্ষার মৌসুমে এ পথে পর্যটকদের ভীড় দেখা যায়। হাওড় তখন পানিতে টইটম্বুর থাকে। অসংখ্য হাউজবোটে অবকাশ যাপনের জন্য শহুরে ভদ্রলোকেরা ছুটে যায়। আর আমরা যাচ্ছি অফসিজনে। এ সময়ে কেবল সাধারণ যাত্রী ছাড়া কেউ সচরাচর ভ্রমণ করেন না।
সারারাত জার্নি শেষে সকালবেলা সুনামগঞ্জ শহরে নেমেই আপ্যায়িত হলাম পিয়াসের চাচাত ভাইয়ের বাসায়। সব আগেভাগেই বন্দোবস্ত করা ছিল। হরেক পদের খাবার পরিবেশিত হলো খাবার টেবিলে। হাওড়ের বুকে এসেছি বলে মাছের প্রতিই লোভ ছিল বেশি। এর আগেই সুনামগঞ্জ শহরের কিছু ছবি মনে ধারণ করবার চেষ্টা করেছি। খুব ছিমছাম নির্ঝঞ্ঝাট পুরোনো শহর। চারিদিকে যা দালানকোঠা দৃষ্টিগোচর হয়েছে, ঝকঝকে চকচকে অবয়ব দেখিনি। পথঘাট দোকানপাট থেকে বাসা-বাড়ি, সবকিছুতেই আদিম আভিজাত্য। নিকট অতীতে শহরটায় খুব ভালো সংস্কার হয়েছে বলে মনে হয় না। আমরা যে বাসায় বসে সকালের আহারপর্ব সেরেছি, এটাও প্রাচীন আমলের দ্বিতল ভবন। অভিজাত কোনো ভদ্রলোক নিজের মতো করে নির্মাণ করেছিল বোঝা যায়। পুরো দোতলা ভবনটির ভাড়া মাত্র পনেরো হাজার। এ শুনে একবার মনে হলো ঢাকা ছেড়ে এখানটায় থিতু হয়ে পড়ি।
সুনামগঞ্জ শহর ছেড়ে আমরা বেরোলাম ঠিক মধ্যদুপুরে। তাহিরপুরে যাবার জন্য একটা সিএনজি রিজার্ভ করা হলো। দেড় ঘণ্টার পথ, ভাড়া সাতশো টাকা। নিখুঁত পাকা সড়ক ধরে আমরা তাহিরপুরের দিকে এগোলাম। চল্লিশ মিনিটের মতো পথ পেরোবার পর হাওড়ের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ ছবির মতো ভেসে উঠল। উঁচু সড়ক থেকে সবুজের ক্যানভাসে আমরা অপলক তাকিয়ে রইলাম। পথের দুপাশে সারিবদ্ধ হিজল। ধুলোবালি আছে বটে, তবু বাতাসকে মনে হলো বিশুদ্ধতম। প্রাণভরে শ্বাস নিলাম। তখন অবধি হাওড়ের সৌন্দর্য আমাদের মাঝে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা তৈরি করতে পারেনি অবশ্য। এজন্য অপেক্ষা করতে হলো আরও কিছু সময়।

তাহিরপুর বাজার ছাড়িয়ে বৌলাই সেতু অতিক্রমকালে দেখেছি—সাড়ি সাড়ি হাউজবোট আলসে সময় পাড় করছে। কেউ কেউ ঝাড়পোছ করছে, রঙ লাগাচ্ছে, নদীর পানিতে ধুয়ে দিচ্ছে; বর্ষাকাল অবধি এটুকুই কর্তব্য। বৌলাই নদীটি হাওড়াঞ্চলকে প্যাঁচিয়ে রেখেছে সাপের মতো। কোথাও সরু খালের মতো সবুজ ধানখেতের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছে, কোথাও প্রশস্ত নদীর মতো দূরত্ব তৈরি করেছে দুধারের মাঝে। আয়তনে ৭২ কিলোমিটারের এ নদী গোটা সুনামগঞ্জেই বিস্তৃত হয়েছে। যে সেতুটি আমরা পেরোচ্ছি, এর ঠিক ডান ও বামদিকে গোলাকার বৃত্ত তৈরি করে নদীটি গিয়ে মিশেছে রক্তি-যাদুকাটা নদীর সাথে, এরপর তা ভারতে গিয়ে রানীকর নামধারণ করেছে। এই গোলাকার বৃত্তের মাঝেই তাহিরপুরের বৃহৎ অংশটুকু।
আমরা যখন সেতুটি অতিক্রম করে হাতের বামদিকের সরু মাটির সড়ক দিয়ে নীচে নেমে আবার ডানদিকে মোড় নিয়ে বিলের মধ্য দিয়ে ছুটে চলা পিচঢালা পথে নেমে এলাম, ওই যে বলেছি, আমাদের সবাই কিছু সময়ের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। মাটির সাথে মিশে গেলো আমাদের যাত্রাপথ, আর হাওড়ের সুবিশাল সবুজ ভূমি—বহু উঁচু থেকে এতক্ষণ যা চোখে দেখে এলাম—আমাদের যেন বুকে জড়িয়ে স্বাগত জানালো। আমরা ঠিক অনুভব করলাম, যেমনটা অনুভূত হয় বহুকাল পর অপেক্ষমাণ পিতার বুকে ঝাপিয়ে পড়া সন্তানের। বাতাসের ঝাপটা এসে লাগল নাকেমুখে। দূর থেকে দেখা অসংখ্য করচগাছের দল আমাদের খুব কাছে তখন। হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দেখা যায়। পৌষের শীত প্রতিরোধের জন্য আমরা ঢাকা থেকে যে ভারী বস্ত্র বয়ে এনেছিলাম, তা নিতান্ত অহেতুক বস্তু বলেই মনে হলো। হাওরের স্বচ্ছ-কোমল বাতাসকে বুকের ভেতর টেনে নিতেই ইচ্ছে হলো সবার।

আঁকাবাঁকা এ পথ গিয়ে ঠেকেছে টেকেরঘাটে, যেখানে নিলাদ্রী লেক, বস্তুত বাংলাদেশের সীমান্ত। আমরা এরও বহু আগে বড়দল নামের গ্রামে আমাদের গন্তব্যে নেমে পড়লাম।
বড়দল সুবিশাল গ্রাম। এ গ্রামের সিংহভাগ অংশে জনবসতি নেই। মাটিঘেঁষা যে সড়কটি ধরে আমরা তাহিরপুর বাজার থেকে এসেছি, এই সড়কের একধারে যতদূর চোখ যায়—শুধু সবুজের চাদর, মাঝে মাঝে উঁকি দেয় হিজল-করচ, এর মধ্যেই এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে বৌলাই ও তার শাখা-প্রশাখা। আরেকধারে শুকনো মাঠ, এরই মাঝে স্থানে স্থানে সারিবদ্ধ করচগাছ, আর কিছুদূর পর জমি থেকে নিরাপদ উচ্চতায় শৃঙ্খলাবদ্ধ বাড়িঘর। প্রকৃতির সুনিপুণ সুসামঞ্জস্য চিত্রায়ন যাকে বলে, এ যেন ঠিক তাই। সুবৃহৎ এ শুকনো মাঠে ফসল প্রস্তুত করে চাষীরা গোলায় ভরে নেয়। যখন আমরা গিয়েছি, কিছুদিন হলো বোরো ধান বুনেছে চাষীরা, ধানের চারা বড় হয়েছে খানিক, ফলে এ শুকনো মাঠে ব্যস্ততা নেই। হাওড়পাড়ের ছেলেরা দলবেঁধে ছোটাছুটি করছে।

মেজবানের বাড়িতে আমরা উঠে পড়লাম। বলা হলো, যতটুকু সময় আমরা আছি, নিজের বাড়ি মনে করেই যেন থাকি। বড়সড়ো একটি কামরা আমাদের জন্য বরাদ্ধ হলো। আমরা সেখানেই আয়েশ করে একটি রাত কাটিয়ে দিলাম।
হাওড় অঞ্চলের মানুষগুলোর কথা এ মুহূর্তে সংক্ষেপে বলে ফেলি। গায়েগতরে তারা মলীন, পরিশ্রমী, প্রকৃতির নানামাত্রিক সংকটের সাথে লড়াকু, নিস্কলুষ, স্বল্পভাষী ও অতিথিপরায়ণ। কথায় ভণিতা নেই, যা বলার সোজাসাপ্টা বলতে পছন্দ করেন। এ মানুষগুলোর আয়-উপার্জনের বড় অংশ ধানচাষের সাথে সম্পৃক্ত। যারা অভাবী, তারাও চাষাবাদে দিনমজুর খেটে দিনাতিপাত করেন। পরস্পর একে অন্যের সহযোগী। শুনেছি, যার চালের প্রয়োজন, নানান পণ্য তারা বিক্রি করেন চালের বিনিময়ে। বর্ষার মৌসুমে হাওড়ের পর্যটকদের নিয়ে ভালো বাণিজ্য হয়, হাউজবোটের ব্যবসা করেন অনেকেই, এদের অনেকেই আবার শুকনো মৌসুমে মোটরসাইকেলে ভাড়ায় যাত্রী বহন করেন।
সে রাতটি আমরা বড়দলের এই বাড়িতে কাটিয়ে দিই। পরেরদিন ভোর থেকেই শুরু হয় দুটো বাইকের অপেক্ষা। বাইক চলে এলে আমরা বেরিয়ে পড়ি দর্শনীয় স্থানগুলোর উদ্দেশে। স্বভাবতই আমি দর্শনীয় স্থানের চেয়ে এই গ্রাম ও গ্রামীন জীবনকে বেশি উপভোগ করতে চেয়েছি। এই লেখায় তাই পরেরদিনের বিবরণটুকু এড়িয়ে যাচ্ছি।

যা দেখেছি, যা ঘুরেছি, সবচে প্রকটভাবে মনের দেয়ালে গেঁথে আছে বড়দল গ্রামের সবুজ ও ধূসর ছবি। বিকেলবেলায় আমরা সবুজ ধানখেতের আইল ধরে কিছুদূর হেঁটেছি। শাপলার বিলের ধারে বসে প্রকৃতির নিখুঁত শিল্প উপভোগ করেছি। স্থানীয় ছেলেপুলেদের সাথে সুবিশাল মাঠে ক্রিকেট খেলেছি। ঠিক যখন সন্ধ্যা নেমে আসে, সবুজ চাদর গলিয়ে রক্তিম সূর্য কীভাবে দিগন্তে মিলিয়ে যায়, উপভোগ করেছি। উঁচু লোকালয় থেকে অফুরন্ত সবুজের দিকে তাকিয়ে কল্পনা করতে চেষ্টা করেছি—বর্ষার দিনে হাওড় যখন ভরা যৌবনে উত্তাল, চারিদিকে যখন থইথই পানি, মাঝে মাঝে হিজল-করচ মাথা উঁচিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে, ঠিক তখন কী অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যের অবতারণা ঘটে বড়দলে! আরও একটি ব্যর্থ ইচ্ছের কথা বলি, গভীর রাতে ধানখেতের আইল ধরে হাঁটার ইচ্ছে ছিল খুব, শারিরীক ক্লান্তি সে ইচ্ছে পূরণ হতে দেয়নি।

তাহিরপুরে যখন ভোর হয়, তখনকার অনুভূতি জীবনানন্দের একটি পঙ্ক্তির মতো—‘প্রতিদিন ভোর আসে ধানের গুচ্ছের মতো সবুজ সহজ।’

আমরা যখন বড়দল ছেড়ে ফেরার গন্তব্যে রওনা হই, তখন সন্ধ্যা ফুরিয়ে রাত নেমেছে হাওড়ে। চারিদিকে আবছা আলোয় দেখা যায়—ছবির মতো সুন্দর বিল, মাঝে মাঝে কাঁদাজলে ডুবে থাকা নৌকা, অচেনা পাখপাখালির নীড়ে ফেরার তাড়না। আমরা তখন এক পৃথিবী অতৃপ্তি নিয়ে নাগরিক কোলাহলে ফেরার অপেক্ষায়।