সূচীপত্র

উপন্যাস

আলোকবর্তিকা (তৃতীয় পর্ব)

1 February, 2026

আবেদ খানের জন্ম সমরকন্দে। বিখ্যাত সুফিসাধক শাইখ শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির বংশধর তিনি। সমরকন্দে বেড়ে উঠেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি কৈশোর থেকেই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তির-ধনুক আর অশ্বচালনায় সিদ্ধহস্ত হয়েছেন। এরপর চলে গেছেন বুখারায়। জ্ঞানগরিমায় প্রাজ্ঞ হবার ফলে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানে।

১৬৫৭ সালে আবেদ খান হজব্রত পালনের ইচ্ছেপোষণ করেন এবং এ উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কাবুল হয়ে হিন্দুস্তান পাড়ি দেবার সময় তার আগ্রহ জাগে তৎকালীন মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সাথে সাক্ষাতের। তিনি চলে যান শাহজাহানের দরবারে। বুখারা থেকে আগত প্রাজ্ঞ মেহমানকে পেয়ে শাহজাহান খুশি হন। সম্মানসূচক খিলাত পরিয়ে দেন। উপঢৌকন প্রদান করেন ছয় হাজার রূপি।

আবেদ খান জ্ঞানী মানুষ। বংশীয়ভাবেও তিনি অভিজাত। রণশাস্ত্রেও অগাধ দখল তার। এমন ‘একের ভেতর সব’ হাতের কাছে পেয়ে শাহজাহান মতামত ব্যক্ত করেন—‘আপনি চাইলে আমার অধীনে সম্মানজনক একটি চাকুরি গ্রহণ করতে পারেন।’ আবেদ খান এমন প্রস্তাব পেয়ে তা নাকচ করতে পারলেন না। তিনি হ্যাঁ বলে দিলেন। কিন্তু ব্যাপার হলো—তিনি বেরিয়েছেন হজের সফরে, পথিমধ্যে ভাবনা বদল করে পার্থিব বিষয়াশয়ে লিপ্ত হয়ে পড়বেন, এমনটা তার আত্মমর্যাদা সায় দিচ্ছিল না। বাদশাহকে জানালেন সে কথা। শাহজাহান খুশিমনে হজ পালনের অনুমতি দিলেন। হজ শেষেই তিনি যুক্ত হবেন মুঘল রাজদরবারে।

হজ থেকে ফিরে এসে যথারীতি তিনি যোগদান করলেন দরবারে। ততদিনে শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। যুবরাজদের মাঝে চলছে গৃহযুদ্ধের প্রস্তুতি। আবেদ খান আওরঙ্গজেবের সাথে যুক্ত হওয়াকেই যুক্তিসঙ্গত মনে করেন। শাহজাহানের জীবদ্দশাতেই তার পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে কয়েক দফা লড়াই হয়। সামুগড়ের ভাতৃযুদ্ধে আওরঙ্গজেবের হয়ে আবেদ খান অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন। এ লড়াইয়ে বিশেষ অবদান রাখার ফলে তাকে সদরুস সুদুর উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

মহান আওরঙ্গজেব ক্ষমতার লড়াইয়ে বিজয়ী হন। এরপর গোটা হিন্দুস্তানকে এক পতাকাতলে নিয়ে আসবার প্রচেষ্টায় তাকে বিশ্বস্ততার সাথে সঙ্গ দেন আবেদ খান। আওরঙ্গজেবও তার বিশ্বস্ত এই সেনাপতিকে যথেষ্ট সমাদর করেন। তাকে ‘কিলিচ খান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তুর্কিতে কিলিচ শব্দের অর্থ তরবারি।

১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দে আওরঙ্গজেব গোলকুন্ডা দূর্গ অবরোধ করেন। পূর্বেও শাহজাহানের যুবরাজ হিসেবে তিনি এ দূর্গ জয়ের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করেছিলেন। এবার উদ্দেশ্য—গোলকুন্ডা সালতানাত ধ্বংস করে দক্ষিণাঞ্চলকে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা। এ অবরোধ কার্যক্রমে আওরঙ্গজেব তার সেনাপতি হিসেবে নির্বাচন করেন গাজিউদ্দিন খানকে; যিনি ছিলেন কিলিচ খান তথা আবেদ খানের পুত্র। বীরত্ব ও সাহসিকতায় তিনি পিতার যোগ্য উত্তরাধিকারী। খোদ কিলিচ খানও পুত্রের নেতৃত্বে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

গাজিউদ্দিন খান দূর্গটি যেভাবেই হোক দখল করতে চাচ্ছিলেন। আক্রমণাত্মক সব কৌশল তিনি পরখ করে দেখছিলেন। সেই সূত্রেই বাবা কিলিচ খানতে তিনি আক্রমণকারী একটি দলের নেতৃত্ব দিয়ে সম্মুখে পাঠান। কিলিচ খান সামনে এগোবার পর কামানের একটি গোলার আঘাতে প্রচণ্ড আহত হন। তার হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ওই যুদ্ধেই তিনি ইন্তেকাল করেন। গোলকুন্ডা দূর্গটি জয় করে মুঘল সাম্রাজ্যে যুক্ত করেন তার সাহসী পুত্র গাজিউদ্দিন খান। পিতার মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেবের বিশ্বস্ত হাত হয়ে উঠেন গাজিউদ্দিন। পিতার মতো তিনিও বাদশাহর পক্ষ থেকে ফিরোজ জঙ্গ খেতাবে ভূষিত হন।

এটুকু ইতিহাস খুব সহজ প্রচেষ্টায় জানতে পারেন টেইলর। কিন্তু এর পরে কীভাবে তিনি দিল্লির আজমেরি গেইটের কাছে একটি দৃষ্টিনন্দন মাদরাসা গড়ে তুললেন—তার পূর্ণ বিবরণ কোথাও পাওয়া যায় না। ফারসি ভাষার দুর্বোধ্য কিছু হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছে ইফতিখার। তা থেকে জানা যায়—এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দ। কিন্তু স্পষ্টতই এ তথ্যে কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে। তা নিয়েই সকাল থেকে ইফতিখারের সাথে কথা বলছিলেন টেইলর।

‘যা তথ্য পেলাম এ অবধি, সবখানেই ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দের কথা লেখা আছে। এর অর্থ হলো, গাজিউদ্দিন খান জীবদ্দশায় নিজ হাতে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেননি। তার নিজস্ব জমিতে মৃত্যুর পর মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।’

‘আসলে কাগজে-কলমে এমনটা রয়েছে। কিন্তু আমি ওখানকার উস্তাদের সাথে কথা বলে জেনেছি, মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকাল হচ্ছে ১৭০২ খ্রিষ্টাব্দ। গাজিউদ্দিন খান মৃত্যুর আট বছর পূর্বে এই স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।’

‘সেটা তো কেবল শোনা কথা! গবেষণায় শোনা কথার চেয়ে লিখিত বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।’

‘এমনটা কি হতে পারে না স্যার—ওই সময়ের তথ্য সংরক্ষিত নয়? ইতিহাসের বহু অধ্যায় নিয়েই তো লেখকরা কলম ধরেননি। এক্ষেত্রে লোকমুখের কথা কি একেবারে ফেলে দেওয়া যায়? এছাড়া, বিষয়টি দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে—গাজিউদ্দিন খান ওখানে মূলত একটা কমপ্লেক্স করেছেন। মসজিদ নির্মাণ করেছেন, জীবদ্দশাতেই নিজের জন্য কবরের স্থান নির্ধারণ করেছেন, পাশে ইমারত তুলেছেন। বোঝা যায়, তিনি মাদরাসা, মসজিদ ও কবরস্তান—অথবা হতে পারে এতিমখানা একত্রে রেখেছেন। আমাদের ধর্মমতে, মসজিদ-মাদরাসার পাশে কবর থাকলে নিত্যদিন কবরে পূণ্য পৌঁছবার উপায় তৈরি হয়। আর, স্থাপনাগুলো দেখলেও বোঝা যায়, সব একসাথেই নির্মাণ করা হয়েছে। এর প্রাচীনত্ব সমান।’

‘আচ্ছা মেনে নিলাম তবে। ১৭০২ খ্রিষ্টাব্দে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হলো। এরপরের ঘটনা কী শুনলে? পাণ্ডুলিপি, দলিল-দস্তাবেজ থেকে যা পাওয়া যাচ্ছে, ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে গাজিউদ্দিনের উত্তরপুরুষগণ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন; হতে পারে তার নির্মিত ভবনে! হতে পারে এর আগে ওই ভবন অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হতো!’

‘এমনও হতে পারে এবং আমি এমনটাই শুনেছি, গাজিউদ্দিন খান মাদরাসা কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করবার আট বছর পর ইন্তেকাল করেন। এরপর ক্রমান্বয়ে মাদরাসার অধঃপতন হতে থাকে। একটা সময় মাদরাসা প্রায় বিরান হয়ে পড়ে। ১৭৯২ সালে তার উত্তরপুরুষ এবং কতিপয় মুসলিম ধনকুবের মিলে মাদরাসাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। হয়তো তখন থেকে জোরেশোরে মাদরাসা কার্যক্রম চলমান হয়, যা ইতিপূর্বে খুব আটপৌড়ে ছিল।’

‘ব্রিলিয়ান্ট। তোমার অনুমান সত্য হতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে—রিপোর্টে আমাকে ১৭৯২ লিখতে হবে। নাহয় এ দীর্ঘ ফিরিস্তি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে তুলে ধরতে গেলে আমার আর মূল আলাপে ঢোকা সম্ভব হবে না। যাহোক, ওখানকার যে টিচারের সাথে তুমি কথা বলেছ, তার পরিচয় কী?’

‘তার নাম মওলানা আবদুল্লাহ আলাবি। পাঠান বংশের লোক। শামসাবাদে তার জন্ম। নিজের সম্পর্কে খুব বেশি বলতে চান না তিনি। তবে তার ছাত্ররা বলেছে, তিনি বহু শাস্ত্রে অভিজ্ঞতা রাখেন। তিব্ব নিয়েও তার জানাশোনা আছে।’

‘আই মিন মেডিক্যাল সাইন্স?’

‘হ্যাঁ, তার ছাত্র হাকিম আসগর হুসাইন বিখ্যাত চিকিৎসক।’

‘ইন্টারেস্টিং! এত বড় জ্ঞানী ব্যক্তির ভাগ্যে জুটেছে পুরোনো দালান আর মাত্র ন’জন ছাত্র। আমরা তাদের লাইফ চেঞ্জ করে দিতে যাচ্ছি।’

‘স্যার, সবিনয়ে একটি মতামত জানাচ্ছি, মৌলবি সাহেব হয়তো পুরোনো দালান আর ন’জন ছাত্র নিয়ে আপনার মতো চিন্তিত নন। বরং আমার তো মনে হয়, আপনারা ওই দালান হস্তগত করে ফেললে তারাও দূরে সরে পড়বে।’

টেইলর মাথা নেড়ে ইফতিখারের কথায় সায় জানান, তবে মুখে কিছু বলেন না। নানামাত্রিক সংকট সামনে আসতে যাচ্ছে, এটা টেইলর জানেন। ঔপনিবেশিক শক্তি মুসলমানদের শিক্ষাকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করবে—এটা মুসলিম বিদ্বানদের পক্ষে সহজে মেনে নেবার মতো নয়। ইংরেজ আধিপত্য বিস্তারের একটা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ নিয়ে কাজ করলেও টেইলরের মনে শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বঞ্চিত মুসলিমদের প্রতি আত্মিক টানও রয়েছে। এ কথা শুধু টেইলরই জানেন। তবে টেইলরের সেই ভাবনার সাথে মুসলিম সমাজের ঘোর আপত্তি রয়েছে। টেইলর যেভাবে মুসলিম সমাজের উৎকর্ষ সাধন করতে চান, খোদ মুসলিমরা সে পদ্ধতিকে ঘৃণিত বলে জানে।

গাজিউদ্দিন খানের মাদরাসা প্রস্তাবিত দিল্লি কলেজ হবার জন্য সবচে উপযুক্ত বলেই মনে হয় টেইলরের। শাহ আবদুল আজিজ ও রশিদ উদ্দিন খানের মাদরাসা স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেখানে আপাতদৃষ্টিতে কোনো সংকট নেই। পক্ষান্তরে গাজিউদ্দিন খানের মাদরাসা বিরান ও বিধ্বস্ত। ইতিপূর্বে ইংরেজ সরকার এই ভবন ধ্বসিয়ে দিতে চেয়েছিল। মজবুত ও সুগঠিত হবার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। মহান গাজিউদ্দিন খানের কবরও রয়েছে ওই চত্বরে, হয়তো ইংরেজ সরকার ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কবর বিলুপ্তির ইচ্ছে করেনি। এই ভবনকে সরকারি সম্পদ হিসেবেও ধরে নেওয়া যায়। ইমারতও সুপ্রশস্ত। তিন-চারশো ছাত্র অনায়াসে পড়াশোনা করতে পারবে। টেইলর পাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ব্যাপারটায়।

মাদরাসায়ে গাজিউদ্দিন খান যদি দিল্লি কলেজ হয়ে ওঠে, তাহলে কলেজের প্রধান শিক্ষক কে হবেন? আপাতত ‘মাদরাসা’ হিসেবেই কলেজটির সূত্রপাত ঘটাতে হবে। শুরু থেকেই যদি ইংরেজি শিক্ষার কথা প্রসার করা হয়, তাহলে হীতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা প্রকট। ফলে ‘মাদরাসা’ হিসেবে দিল্লি কলেজের অধ্যক্ষ হবার সবচে উপযুক্ত ব্যক্তি হলেন শাহ আবদুল আজিজ। ইফতিখারের প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, তিনি এখন নিজ মাদরাসার দায়িত্ব থেকে অনেকটা সরে এসেছেন। তার সহোদর শাহ রফিউদ্দিন মাদরাসার দেখভাল করছেন। তাহলে নামেমাত্র হলেও যদি তাকে প্রধান শিক্ষক রাখা যায়, অনেকটুকু সংকট কেটে যাবে এক দফাতেই। ইফতিখারকে বলে খুব দ্রুত শাহ আবদুল আজিজের সাথে সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করতে বলেন টেইলর।

শেয়ার করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট