নানুতা। ছোট এক পল্লীর নাম। প্রকৃতির শোভাশূন্য নিরব ধূসর এ বসতির নেই কোনো বিশেষ বৈচিত্র্য। সাহারানপুর থেকে সোজা রাজধানী দিল্লির দিকে ছুটে যাওয়া মহাসড়কের পাশে এর অবস্থান। এ পল্লীকে সাপের মতো প্যাচিয়ে রেখেছে আম্বেটা, গাঙ্গুহ, শামেলি, থানাভবন, বাঘড়া, মুজাফফরনগর, দেওবন্দ, সাহারানপুর। প্রতিবেশি গ্রামগুলোর মতো নানুতার নাম হিন্দুস্তানিদের মুখে মুখে উচ্চারিত নয়, ইতিহাসের পাতায়ও সবিশেষ উপস্থিতি নেই তার, তবু যেন সীমাহীন মায়া জড়িয়ে আছে নানুতায়।
বলা হয়ে থাকে, আট-নয়শো বছর আগে স্থানীয় সরদার নানু সাহেবের নামে এ গ্রামটির নাম প্রসিদ্ধ হয়েছে। তখন এ বিবর্ণ পল্লীর অবয়ব ঠিক কেমন ছিল, ইতিহাস তা আমাদের জানতে দেয়নি। তাই নানুতা যে চিরকাল এমন বিবর্ণ ছিল, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ঐতিহ্যের মুঘল শাসনামল যখন পতনের দ্বারপ্রান্তে, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল যখন বহিরাগত লুটেরা ও শাসনপ্রত্যাশীদের হামলার শিকার, নানুতাও তখন মুক্তি পায়নি সহিংসতা থেকে। শিখ ও মারাঠিরা ধুলো উড়িয়ে এসেছে, তাণ্ডব চালিয়ে মানুষকে সর্বশান্ত করে চলে গেছে। এরপর যারা ছিল সামর্থ্যবান, তারা নানুতা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে। কী এক অলক্ষুণে চিত্র আঁচ করতে পেরে তারা এ পল্লী ছেড়ে যেন বেঁচে গেছে। ফলে নানুতা পরিণত হয়েছে বিরানভূমিতে। চারিদিকে তাকালে তখন কেবল ধু ধু শূন্যতা। বিত্তবানদের বিলাসী ঘরদোড়, ব্যবসার আস্তানা ঠায় পড়ে আছে, মানুষ সব পালিয়েছে। এতসব দুর্যোগ সংকটের মাঝেও কিছু মানুষ মায়ার মোহজালে আবদ্ধ হয়ে নানুতায় দাঁতকামড়ে পড়ে থাকে। সত্যি বলতে, তাদের খুব সামর্থ্য ছিল না বলেই হয়তো অন্য সবার মতো সুবিধার স্থানে সরে যেতে পারেনি। ইতিহাসের নানা বাঁকবদলের সাক্ষী হয়ে যারা এ মাটির সাথে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের মধ্যে সাদাত ও সিদ্দিকি বংশের নাম সপ্রশংস উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে এ দুই বংশ ভারতবর্ষকে উপহার দিয়েছে বহু মহামনীষী। তাদের নামের শেষে জড়িয়ে গেছে নানুতার নাম। এ বিবর্ণ পল্লীর নাম ছড়িয়ে গেছে বিশ্বধরায়। সেই হীরকোজ্জল আলোকবর্তিকাদের জীবনে আমরা ক্রমাগত প্রবেশ করতে থাকব।
সাদাত বংশে হিজরি দশম শতকে জন্মগ্রহণ করেন সাইয়েদ আহমদ নানুতুবি নামের এক আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ। তিনি ছিলেন শাইখ সুলাইমান মান্ডোবির ঘনিষ্ঠ খলিফা। এ মুহূর্তে মনে করিয়ে রাখি, এই শাইখ সুলাইমান মান্ডোবির আরেক শাগরিদ ছিলেন তাসাওউফের আলোকিত মহাপুরুষ, শাইখ আবদুল কুদ্দুস গাঙ্গুহি। আমরা হয়তো সামনে প্রসঙ্গক্রমে তার জীবন নিয়েও আলোকপাত করব। সাইয়েদ আহমদ নানুতুবির ইন্তেকালের পর তার সুযোগ্য পুত্র শাইখ মুসতফা নানুতুবি মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গিরের শাসনামলে নানুতার ইলমের মসনদে সমাসীন হন। এ বংশের আরেক বুজুর্গের নাম সাইয়েদ গোলাম শাহ নানুতুবি। তার ভাই সাইয়েদ শাহ সাবের আলি নানুতুবিও ছিলেন সাদাত বংশের সুপ্রসিদ্ধ বুজুর্গ। তাদের জীবনকাল ঘেঁটে দেখলে অনুমান করা যায়, আধ্যাত্মিকতা ও ইলমের সাম্রাজ্যে তাদের উত্থানকাল ছিল মুঘল শাসনামলের প্রারম্ভকালে। আর সিদ্দিকি খান্দানের উত্থান ঘটে আরও বহু পরে; মুঘলদের অন্তিমকালে।
সিদ্দিকি খান্দানের পুর্বপুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে এসেছেন শাইখ মাজহার উদ্দিন। সে বহু আগের কথা। ভারতবর্ষের ক্ষমতার মসনদে তখন বাহলুল লোদি সদর্পে অধিষ্ঠিত। তার ছেলে শাহজাদা সিকান্দার লোদির একান্ত বাসনা ছিল, বিশ্বের আনাচকানাচ থেকে আধ্যাত্মিকতায় সিদ্ধহস্ত আল্লাহওয়ালা দরবেশরা যেন ভারতবর্ষে হিজরত করে আসেন, এতে এ দেশের মাটি হয়ে উঠবে রত্নগর্ভা। সাধারণ মানুষ পাবে হেদায়েতের দিশা। বুজুর্গদের বরণ করে নেবার জন্য সিকান্দার তৎপর হয়ে উঠলেন। তার এ ধর্মীয় উদারতা দেখে বহু বুজুর্গ হিন্দুস্তানকে ইসলাম প্রচারের জন্য উর্বর ভূমি বিবেচনা করে এখানে হিজরত করে এলেন। অনেক বুজুর্গকে লোদি নিজে বিশেষভাবে দাওয়াত দিয়ে আবেদন জানিয়ে নিয়ে এলেন। শাইখ মাজহার উদ্দিনের ইলম ও বুজুর্গির কথা তখন লোকমুখে আলোচিত। সিকান্দার লোদির আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে না পেরে তেহাত্তর বছর বয়সে তিনি হিজরত করে এলেন হিন্দুস্তানে। এতে সিকান্দার লোদি অশেষ আনন্দিত হলেন এবং তাকে জাহানাবাদের কাজি নিযুক্ত করলেন।
সে যুগে নানুতায় যারা বসবাস করত, তারা ছিল চরম উচ্ছৃঙ্খল ও বিদ্রোহী। ক্ষমতাসীন লোদিদের বিপক্ষে যখন তখন তারা ক্ষেপে উঠত। এ নিয়ে লোদি সরকার খানিকটা চিন্তিত ছিল। গোত্রগুলোর বিদ্রোহ দমন ও নানুতায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লোদি বাদশাহ শাইখ মাজহার উদ্দিনের সুযোগ্য পুত্র কাজি মিরা-কে নানুতার প্রশাসক নিযুক্ত করেন। কাজি মিরা নানুতায় পৌঁছে তার বুদ্ধিমত্তা ও রাজক্ষমতার শক্তিতে নানুতার বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে প্রতিহত করেন এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনেন। কাজি মিরার মাধ্যমেই নানুতায় সিদ্দিকি খান্দানের বসবাস শুরু হয়। ইন্তেকালের পর তিনি নানুতার মাটিতেই সমাহিত হন। যেহেতু সিদ্দিকি খান্দান লোদিদের ক্ষমতাবলে নানুতায় বসতি গেড়েছিল এবং তাদের নির্দেশনাতেই কাজি মিরা লোদি সরকারের বিদ্রোহীপক্ষ দমন করেছিল, ফলে যখন লোদিরা ক্ষমতাচ্যুত হলো, তখন সিদ্দিকিদের উপর নেমে এলো দূর্বিষহ পরিস্থিতি। পূর্বের বিদ্রোহীরা নতুন করে মাথা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠল। সিদ্দিকিদের উপর হামলে পড়ল তারা। শোনা যায়, এ বংশের ছোট ছোট শিশুকেও শত্রুপক্ষ হত্যা করেছিল। এসব নির্যাতন নিপীড়ন সয়ে সয়ে দূর্বল হয়ে পড়ে সিদ্দিকি খান্দান। হারিয়ে যেতে থাকে তাদের জৌলুস। মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াবার মতো জো থাকে না তাদের।
সেই যে আধিপত্য হারিয়েছে, বহুকাল তা ফিরে পায়নি সিদ্দিকিরা। বঞ্চনা নিয়েই মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে নানুতায়। মহান আল্লাহর কুদরতি ইশারায় এতসব জুলুম, অত্যাচার ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও নানুতা থেকে কাজি মিরার বংশধর বিলুপ্ত হয়ে যায়নি; ধীরে ধীরে শাখা বিস্তার করেছে। বহু সময় গড়িয়ে যাবার পর, লোদিদের হটিয়ে শাসনের মসনদে বসা মুঘল সম্রাটদের একে একে বিদায়ের পর যখন মহামতি আওরঙ্গজেব ভারতবর্ষের অধিপতি, সেকালে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় সিদ্দিকিদের। আবার তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ পায়।
বলা হয়ে থাকে, কোনো এক রমজানে বাদশাহ আওরঙ্গজেব যুদ্ধভ্রমণে ছিলেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি এমন একজন হাফেজ খোঁজার নির্দেশ দিলেন, যে তাকে একরাতে তারাবিহর নামাজে পুরো কুরআন শরিফ শুনিয়ে দিতে পারবে। সৈন্যরা হন্য হয়ে খুঁজতে শুরু করল। বহু খোঁজাখুজির পর যাকে পাওয়া গেল, তিনি ছিলেন কাজি মিরার বংশধর, সিদ্দিকি খান্দানের এক সুকণ্ঠ হাফেজে কুরআন। যথানির্দেশ তিনি আওরঙ্গজেবকে একরাতে পুরো কুরআন শুনিয়ে দিলেন। এতে বাদশাহ তার প্রতি অত্যাধিক খুশি হলেন। এভাবেই বাদশাহর সাথে হাফেজ সাহেবের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তিনি সুযোগ পান তার বংশের উপর চলমান নিপীড়নের কথা সবিস্তারে খুলে বলার। বাদশাহও তার সাথে শাহি ফৌজ পাঠিয়ে সিদ্দিকিদের শত্রুপক্ষকে দমন করেন। ফের আলোকিত হয় তাদের মুখ। বহুকাল পর তারা আবার বুকটান করে দাঁড়ায়।
কাজি মিরার ষষ্ঠ অধস্তন পুরুষ মৌলবি হাশেম ছিলেন আল্লাহওয়ালা ও বুজুর্গ ব্যক্তি। সিদ্দিকি খান্দানের এই মানুষটির উত্তরসূরী থেকেই আল্লাহ তাআলা বড় বড় মনীষী তৈরি করেছিলেন। মৌলবি হাশেমের প্রপৌত্র ছিলেন শাইখ আবুল ফাত্তাহ। তার তিন ছেলে মুহাম্মাদ আকিল, শাইখ আলাউদ্দিন ও হাকিম আবদুল্লাহর ঘরে জন্ম নিয়েছেন ভারতবর্ষের আলোকিত বহু সূর্যপুরুষ। তাদের মাধ্যমে উজ্জল হয়েছে নানুতার নাম। সিদ্দিকি খান্দানকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আল্লাহ তাআলা গোটা ভারতবর্ষের ইলম ও তাসাওউফের আধিপত্য দান করেছিলেন এ খান্দানের হাতেই। আমরা সে গল্পে শীঘ্রই প্রবেশ করব।
শাইখ আবুল ফাত্তাহের প্রপৌত্র ছিলেন মৌলবি আহমদ আলি। দীনি জ্ঞানসম্পন্ন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন তিনি। সেকালে মাওলানা কিংবা আলেম শব্দের চেয়ে ‘মৌলবি’ শব্দের ব্যবহার ছিল অধিক প্রচলিত। নানুতার সিদ্দিকি খান্দানে এমন ‘মৌলবি’ ছিলেন অনেকেই, আর সেইসাথে ইলমুত তিব্ব তথা চিকিৎসাশাস্ত্রে সিদ্ধহস্ত ব্যক্তিও ছিলেন খান্দানে। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে এই খান্দানে মৌলবি আহমদ আলির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন মামলুকুল আলি। মামলুক শব্দের অর্থ গোলাম। সেকালে নানুতা ও তৎসংশ্লিষ্ট গ্রামগঞ্জে শিয়া মতবাদের প্রভাব ছিল বেশ। সম্ভবত সেই প্রভাবের ফলে আহমদ আলি তার সন্তানের নাম রাখেন মামলুকে আলি—তথা আলির গোলাম। পরবর্তীকালে ছেলেটি যখন বড় হয়, জ্ঞানেগুণে সমৃদ্ধ হয়, তখন নিজেই নাম বদলে রাখেন মামলুকুল আলি; আলিয়্যুন হচ্ছে মহান আল্লাহ তাআলার গুণবাচক একটি নাম, আর এ হিসেবে মামলুকুল আলির অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহর গোলাম। আমরা তাকে মামলুকুল আলি নামেই সম্বোধন করব।
সিদ্দিকি খান্দানে দীনি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির বাহুল্য ছিল—আমরা জেনেছি। খোদ মৌলবি আহমদ আলিও ছিলেন আলেম। তাই মামলুকুল আলির প্রাথমিক পড়াশোনা চুকে যায় ঘরোয়া পরিবেশেই। বংশীয় পরম্পরায় তিনি অর্জন করেন শাইখ মাজহার উদ্দিনের ইলমের উত্তরাধিকার। এরপর স্বাভাবিকভাবেই উচ্চতর জ্ঞানার্জনের কথা সামনে আসে। মৌলবি আহমদ আলি ছেলেকে পাঠান সেকালের প্রখ্যাত আলেম শাইখ মুফতি ইলাহি বখশ কান্ধলবির দরবারে; যিনি তখন নানুতা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ইলমে ইলাহির দ্যুতি ছড়াচ্ছিলেন।
ভারতবর্ষে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি যে বিপ্লবী সংস্কারধর্মী আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, মুফতি ইলাহি বখশ ছিলেন সেই মহান ইলমি ধারার সুযোগ্য উত্তরসূরী। হিন্দুস্তানকে দারুল হরব ঘোষণাদাতা, শাহ ওয়ালি উল্লাহর সুযোগ্য সন্তান—শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলবি ছিলেন তার উসতাদ। যখন শাহ ওয়ালি উল্লাহ ইহকালের শেষপ্রান্তে উপনীত, মুফতি ইলাহি বখশ তখন দিল্লিতে—তার সংশ্রবপ্রার্থী। কিন্তু শাহ সাহেবের সান্নিধ্য গ্রহণের সুযোগটুকু তার ভাগ্যে জোটেনি। পিতার ইন্তেকালের পর ওয়ালিউল্লাহি আন্দোলনের লাঙল হাতে তুলে নেন শাহ আবদুল আজিজ। তার সামনে সর্বপ্রথম যে পাঁচজন ছাত্র হাটুগেড়ে বসেছিলেন, তারই একজন ছিলেন ইলাহি বখশ। পড়াশোনা শেষে সনদপ্রাপ্তির পাশাপাশি তিনি শাহ আবদুল আজিজের আধ্যাত্মিক দীক্ষাও পেয়েছিলেন। আরও পেয়েছিলেন—ইতিহাসের মহানায়ক সাইয়েদ আহমদ শহিদের খেলাফত।
ফলে ধরে নেওয়া যায়, তখন নানুতা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ওয়ালিউল্লাহি আন্দোলনের বরকতময় প্রভাব বহুলাংশে বিদ্যমান ছিল। মুফতি ইলাহি বখশের যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে খোদ তার উসতাদ স্বীকৃতি দিয়েছেন—‘আমার ছাত্রদের মধ্যে মৌলবি রফিউদ্দিন ও মৌলবি ইলাহি বখশ যোগ্য।’ এরচে বড় সনদ আর কী হতে পারে!
সেকালের নানুতা, কান্ধলা, থানাভবন ও আশপাশের এলাকায় মুফতি ইলাহি বখশের খ্যাতি ছিল শীর্ষে। তার ইলমি মজলিস জমজমাট থাকত সর্বদা। দূরদূরান্ত থেকে ইলমপিপাসু শিক্ষার্থীরা ছুটে আসত তার মজলিসে। তিনি তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতেন হেরার জ্যোতি। এ ইলমের নুরে আলোকিত হবার লক্ষ্যে ১৮ বছর বয়সে তার কাছে ছুটে যান মামলুকুল আলি। বংশীয় মুরব্বিদের কাছে তিনি ততদিনে গ্রহণ করেছেন প্রাথমিক শিক্ষা। এবার ইলাহি বখশের কাছে গ্রহণ করেন আরবি সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ। প্রাচীন যুগের আরবি কবি-সাহিত্যিকদের চিরায়ত গ্রন্থাবলি থেকে সাহিত্যসুধা পান করেন তৃপ্তিভরে।
ওই সময়ে আরও একজন আলেম ছিলেন সুবিখ্যাত—মাওলানা সাইয়েদ কলন্দর জালালাবাদি। তিনিও মুফতি ইলাহি বখশের যোগ্য শাগরিদ ছিলেন। তার হাদিসের দরস ছিল সুপ্রসিদ্ধ। সবচে বড় যে পরিচয়—তিনি ছিলেন প্রকৃত আশেকে রাসুল। দিবারাত্রি নবীজির দিদার লাভে ধন্য হতেন তিনি। এ মহাসৌভাগ্যবান ব্যক্তির কাছে মামলুকুল আলি হাজিরা দেন হাদিসের সুধাপানের জন্য। এখানে বলে রাখি, মাওলানা কলন্দরের আরও একজন শাগরিদ ছিলেন—নাম তার ইমদাদুল্লাহ। আমরা তাকে আরও কিছুকাল পরে হাজি ইমদাদুল্লাহ নামে সম্বোধন করব।
আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্তে উপনীত বুজুর্গদের সান্নিধ্যে পোক্ত হয় মামলুকুল আলির জ্ঞানগরিমা। পিপাসা জাগ্রত হয় আরও শেখার, আরও জানার। কিন্তু এ তল্লাটে এরচে বেশি জ্ঞানার্জনের উপায় কোথায়! যেতে হবে বহুদূরে—সেই দিল্লিতে।
তখন ছিল ইংরেজ আধিপত্যের যুগ। শিক্ষা-সংস্কৃতির চাবি ওদের হাতে। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানোর জন্য মরিয়া কোম্পানি সরকার। আর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বুকের ভেতর একরাশ ঘৃণা—ওই দখলদার নরাধম ইংরেজদের প্রতি। ইংরেজি শিক্ষা মানে ধর্মকে বিসর্জন দেওয়া, এ পথে পা বাড়ানোর অর্থ নিশ্চিত ধর্মান্তর, ঈমানের দৌলত হারিয়ে ফেলা—এই ছিল মুসলমানের ভাবনা। তখনও দিল্লির ইলমি মহলে দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলবি। বয়স তার প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। দিল্লির আনাচেকানাচে তার শাগরিদরা তখন মুক্তামালার মতো জ্বলজ্বল করছে। দুহাতে তাদের উন্মুক্ত জ্ঞান-তরবারি; তারা মোকাবেলা করছেন ইংরেজি শিক্ষার আড়ালে গজে ওঠা খ্রিষ্টবাদী আধিপত্যের। এমন টালমাটাল সময়ে নানুতা থেকে মামলুকুল আলি রওনা হলেন দিল্লির পথে। তার সঙ্গী আসাদ আলি।
দিল্লি পৌঁছবার পর মামলুকুল আলি উসতাদের খোঁজ শুরু করেন। চারিদিকে বহু যুগশ্রেষ্ঠ বিদ্বান ছড়াচ্ছেন জ্ঞানের উত্তাপ, কিন্তু কার সামনে হাটুগেড়ে বসে ইলমে ওহি অর্জন করবেন, মামলুকুল আলি তা ভেবে ঠাহর করতে পারছিলেন না। কেটে গেল বেশ কয়েকটি দিন। এরপর খুব ভাবনাচিন্তা ছেড়ে মামলুকুল আলি একে একে জ্ঞানতাপসদের দুয়ারে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। ভাবলেন, হয়তো উসতাদ হিসেবে কাউকে পেয়ে যাব এভাবেই, যার হাতে নিশ্চিন্তে নিজের লাগাম তুলে দেওয়া যাবে। কিন্তু নানুতা ছেড়ে আসা এই আগন্তুকের সামনে ঘটা করেই দেখা দিলো অনাকাঙ্ক্ষিত যন্ত্রণা। উসতাদ হিসেবে গ্রহণের জন্য মামলুকুল আলি যার দরবারেই হাজিরা দিচ্ছিলেন, তিনিই তাকে হতাশ করছিলেন। দুয়েকটি সবক বরকতস্বরূপ পড়াবার পর কেউই তাকে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাদানে আগ্রহী হচ্ছিলেন না। তরুণ মামলুকুল আলি খুঁজে পাচ্ছিলেন না এই প্রত্যাখ্যানের কারণ। শুধু বেদনাহত হয়ে একের পর এক শাইখের দরবারে ধরনা দিচ্ছিলেন তিনি।
একদিন হঠাৎ মনে হলো—যিনি এ সময়ের সবচে বড় জ্ঞানপণ্ডিত, দিল্লির ইলমি মহলে দ্যুতি ছড়ানো সকল উসতাদের উসতাদ যিনি, তার সাথে একবার দেখা করি। কিন্তু বুকের ভেতর ভয়ও জাগে, দারুল হারবের ফতোয়াদাতা শাহ আবদুল আজিজ তো সাধারণ কেউ নন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জগতে তিনি সময়ের সবচে প্রতাপশালী। শাহ ওয়ালি উল্লাহর রক্ত বইছে তার শিরা-উপশিরায়। আরও বড় কথা—এখন পর্যন্ত মামলুকুল আলির সবচে কাছের উসতাদ মুফতি ইলাহি বখশ হলেন শাহ সাহেবেরই শাগরিদ। মুফতি সাহেব দরসে বারংবার উসতাদের জ্ঞানগরিমার কথা আলোচনা করতেন। কীভাবে শাহ সাহেব একমুহূর্তে ইংরেজ পাদরিদের মুখে কুলুপ এঁটে দিতেন, বলতেন তার চমকপ্রদ বৃত্তান্ত। মামলুকুল আলি তখন সেই নানুতায় বসেই মনে মনে কল্পনা করতেন দিল্লি শাহি জামে মসজিদের চিত্র। কল্পনার চোখে দেখতে চাইতেন, ভরা মজলিসে বক্তৃতা দিচ্ছেন শাহ আবদুল আজিজ, আর অকস্মাৎ জনৈক ইংরেজ পাদরি মাঝখান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে থামিয়ে দিলেন শাহ সাহেবকে। বললেন,
‘থামুন। রাখুন আপনার বক্তৃতা। আগে আমার সওয়ালের জওয়াব দিন।’
‘কী আপনার সওয়াল?’
‘কে বলেছে নবি মুহাম্মাদ বড়? তিনি শুয়ে আছেন মাটির নীচে, আর মসিহ বসে আছেন সুউচ্চ আসমানে।’
‘বসুন পাদরি সাহেব। মসিহ হলেন আসমানের বুদ্বুদ, আর মুহাম্মাদ সা. হলেন মৃত্তিকাগর্ভে থাকা বিরল মুক্তা।’
মুফতি ইলাহি বখশ খুব মজা করে শোনাতেন শাহ আবদুল আজিজের ইলমি বীরত্বগাঁথা। কী দুর্দমনীয় উপস্থিত জবাব দেবার সক্ষমতা তার। এর ছিঁটেফোটাও যদি পেতাম—আফসোস করে বলতেন উসতাদ। আর আজ সেই প্রভাবশালী ব্যক্তি মাত্র কয়েক ক্রোশ দূরে বসে আছেন, আর মামলুকুল আলি তার চেহারাটুকু দেখবার সাহসও করে উঠতে পারছেন না। অসীম ইচ্ছে মনে, কিন্তু বুকে সাহস নেই। লোকমুখে শোনা যাচ্ছে, শাহ সাহেবের শারিরীক অবস্থাও খুব ভালো যাচ্ছে না। নিয়মতান্ত্রিক পাঠদান তো আগেই ছেড়ে দিয়েছেন, ইদানীং ভক্তকুলের সাক্ষাতও তিনি কামনা করছেন না। এমতাবস্থায় কীভাবে তার কাছে যাওয়া যায়—তা নিয়ে ভাবনা যেন ফুরোচ্ছে না।
কিন্তু আর কতদিন এভাবে বসে থাকা যায়? দিল্লিতে ঘুরে বেড়াবার জন্য তো আসেননি মামলুকুল আলি। উচ্চতর জ্ঞানার্জনে নিজেকে বিলিয়ে দেবার জন্য এসেছেন। একদিন মনের টালমাটাল সিদ্ধান্তের সাথে বিদ্রোহ করে হাঁটা দিলেন দরিয়াগঞ্জের দিকে। যেতে যেতে ভাবলেন, যেভাবেই হোক আজ শাহ সাহেবের সাথে দেখা করব।
দরিয়াগঞ্জের কালানমহলে অবস্থিত মাদরাসায়ে শাহ আবদুল আজিজ। প্রকাণ্ড এই হাবেলি ওয়াকফ করেছিলেন মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ। মেহেন্দিয়ানের মাদরাসায়ে রহিমিয়ায় ইলমপিপাসু শিক্ষার্থীদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় শাহ আবদুল আজিজ মাদরাসা স্থানান্তর করে নিয়ে আসেন কালানমহলে। এরপর থেকে মাদরাসায়ে রহিমিয়া হয়ে গেছে মাদরাসায়ে শাহ আবদুল আজিজ। হাবেলির একাংশে পরিচালিত হচ্ছে দরস-তাদরিসের কার্যক্রম, অপরাংশে শাহ ওয়ালি উল্লাহর পুত্রগণ স্বপরিবারে বসবাস করছেন। পুরান দিল্লির ধুলোমাখা পথে হেঁটে বিখ্যাত জামে মসজিদ পেছনে ফেলে মামলুকুল আলি যখন কালানমহলের দোড়গোড়ায় পৌঁছলেন, তখন তার ভেতর পূর্বের সেই ভীতি আবার প্রকটভাবে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে। মন বলে, এখনও সময় আছে ফিরে যাও। কিন্তু প্রবল সাহস সঞ্চার করে মামলুকুল আলি প্রবেশ করলেন জগদ্বিখ্যাত সেই মাদরাসায়।
তালিবুল ইলমদের মাধ্যমে শাহ সাহেবের কামরা খুঁজে পেতে সময় লাগেনি। ধীরপদে মামলুকুল আলি কামরার দিকে এগিয়ে গেলেন। উঁকি দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, শাহ আবদুল আজিজ চোখ বুঁজে আধোশোয়া হয়ে আছেন। কামরায় আর একটি মানুষও নেই। খুব নিস্তব্ধ থমথমে পরিবেশ, তালিবুল ইলমদের কয়েকজন দূর থেকে একাকী শাহ সাহেবের কামরার দিকে এগিয়ে যাওয়া মামলুকুল আলির দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো এ মুহূর্তে শাহ সাহেবের কামরায় প্রবেশের অনুমতি নেই। কিন্তু মামলুকুল আলি ঢুকে পড়লেন অদৃশ্যের কোনো হস্তক্ষেপে। শাহ সাহেব চোখ না খুলেই সামান্য মাথা ঘুরিয়ে বললেন,
‘কে?’
‘মামলুকুল আলি। নানুতা থেকে এসেছি।’
‘মামলুকুল আলি? কী চাই?’
‘একটি বিষয় বলার ছিল।’
‘বলো।’
‘দিল্লিতে এসেছি ইলম হাসিলের জন্য। কিন্তু উসতাদ খুঁজে পাচ্ছি না। যাদের কাছেই যাচ্ছি, সবাই আমাকে শাগরিদ বানিয়ে নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছেন।’
‘নানুতায় কার কাছে পড়েছো?’
‘মুফতি ইলাহি বখশ কান্ধলবি।’
‘আচ্ছা! কাল বিকেলে এসো।’
এরপর আর একটি বাক্য উচ্চারণের সাহসও হলো না মামলুকুল আলির। অদৃশ্যের যে সত্ত্বা সাহস জুগিয়েছিল হুজরায় প্রবেশের, সেই সত্ত্বা বলে উঠল—‘শীঘ্রই বের হও।’ মামলুকুল আলি পা টিপে বেরিয়ে পড়লেন। কামরা থেকে বেরোবার পর তার মুখে রাজ্যের উৎফুল্লতা। শাহ সাহেবের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া যেন এ সময় ভাগ্যের ব্যাপার। সেই ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়ে ধরা দিয়েছে তার হাতে।
পরেরদিন নির্ধারিত সময়ে মাদরাসায় উপস্থিত হলেন মামলুকুল আলি। এবার শাহ সাহেবের কামরায় আরও জনকয়েক মানুষ বসে আছে। মামলুকুল আলি দরজায় দাঁড়িয়ে সালাম দিলে শাহ সাহেব চোখ নীচু করেই বললেন—‘মামলুকুল আলি! এসো।’
মামলুকুল আলি ভেতরে প্রবেশ করলেন। কামরায় থাকা অন্যরা তার দিকে ঈর্ষাকাতর হয়ে চেয়ে রইলো। শাহ সাহেব বললেন,
‘আমার শরীরের অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। চোখের জ্যোতি ফুরিয়ে এসেছে। কাল একটু জ্বরও ছিল শরীরে। এজন্য তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। নাও, কোনো কিতাব হাতে নাও।’
মামলুকুল আলি অকস্মাৎ এ নির্দেশের মুখোমুখি হয়ে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। শাহ সাহেব সামনের তেপায়ায় থাকা কিতাবটির দিকে আঙুল তুলে ইঙ্গিত করলে তৎক্ষণাৎ মামলুকুল আলি কিতাবটি হাতে নিয়ে পাতা উল্টান। শাহ আবদুল আজিজ হেদায়াতুন্নাহু থেকে মুখস্ত কিছু অংশ পড়েন, মামলুকুল আলি আঙুল দিয়ে ধরে ধরে সবক গ্রহণ করেন। ভেতরে প্রবল আনন্দ, সেইসাথে প্রচণ্ড হৃদকম্পন, চোখের কোণে আনন্দ-অশ্রু, আর গলায় কাঁপা কাঁপা স্বর—মামলুকুল আলি না চাইতেই বনে গেলেন শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলবির শাগরিদ। ঠিক যে সময়ে শাহ সাহেব দরস-তাদরিস থেকে অনেকটা হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। নানা রোগ-ব্যাধির কবলে পড়ে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন দীর্ঘকাল। মাদরাসার ইহতিমামের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন ছোট ভাই শাহ রফিউদ্দিনের হাতে। এমন সময়ে বহিরাগত কেউ এসে শাহ সাহেবের কাছে সবক নেবে, তা কল্পনাতীত ব্যাপার।
‘যাও। এবার তুমি যার কাছে ইচ্ছে পড়াশোনা শুরু করো। আশা করছি কেউ আর তোমাকে ফিরিয়ে দেবে না।’
সবক দেবার পর শাহ সাহেব মামলুকুল আলির দিকে তাকিয়ে এ ভবিষ্যদ্বাণী শোনালেন। খুব শীঘ্রই এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হলো। সেদিনের পর মামলুকুল আলি খোঁজখবর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, দিল্লির সুপ্রসিদ্ধ আলেম মাওলানা রশিদ উদ্দিন খান দেহলবির কাছে পড়াশোনা করবেন। রশিদ উদ্দিন খান শাহ সাহেবেরই শাগরিদ। চারিদিকে তার জ্ঞানগরিমার প্রশংসা শোনা যায়। বিতর্ক-বাহাসে তিনি অকুতোভয় পণ্ডিত। বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানে সিদ্ধহস্ত। শাহ রফিউদ্দিনের অগাধ পিতৃসম স্নেহ ও শাসনে গড়ে উঠেছে তার মেধা ও মনন। ওয়ালিউল্লাহি খান্দানের পূর্ণ রঙ তিনি পেয়েছেন খুব নিপুণভাবে। মামলুকুল আলি নানাবিধ চিন্তার পর তার কাছেই নিজের উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা জানানো সঙ্গত মনে করলেন।
যেমনটা শাহ সাহেব বলেছিলেন, ঠিক তেমনটাই হলো। রশিদ উদ্দিন খান দেহলবি প্রথমদিনেই মঞ্জুর করলেন মামলুকুল আলির আবেদন। এরপর শুরু হলো পাঠযাত্রা। ইলাহি বখশ কান্ধলবি দক্ষহাতে যে মস্তিস্ক সুগঠিত করে দিয়েছিলেন, রশিদ উদ্দিন খান তাতে নানারঙা বৈচিত্র্যময় জ্ঞানের প্রলেপ লাগিয়ে দিতে থাকলেন।