সূচীপত্র

উপন্যাস

আলোকবর্তিকা (দ্বিতীয় পর্ব)

19 January, 2026

ইফতিখার খুব ভালোভাবে জানে, স্যার টেইলর অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ছাড়া এত সকালে অফিস করেন না। গত রাতেই ইফতিখারকে বলে দেওয়া হয়েছে—খুব ভোরেই যাতে সে টেইলর সাহেবের বাংলোয় উপস্থিত থাকে। সাধারণত সকাল দশটায় শুরু হয় অফিস কার্যক্রম, টেইলর সাহেবের ইনসমনিয়া আছে; রাতে ঠিকঠাক ঘুমোতে পারেন না। ফলে তার অফিসের রুটিনও নির্ভর করে রাতের ঘুমের উপর। মাঝেমধ্যে দুপুর গড়িয়ে যাবার পর অফিস ঘরে তিনি প্রবেশ করেন। আর ইফতিখার বাংলোর বাইরে প্রকাণ্ড বৈঠকঘরের টেবিলে থাকা ইংরেজি-উর্দু পত্রিকা পড়ে সময় কাটায়।

ইফতিখারের বয়স এখন ছাব্বিশ। গায়েগতরে অতটা সুঠামদেহী নয়। তবে ফরসা চেহারা আর লালচে চুল দেখে অনুমান করা যায় সহজেই—ও কাশ্মিরি বংশোদ্ভূত। কৈশোরে বাবা-মায়ের সাথে জেদ করেই দিল্লিতে এসেছিল ইফতিখার। কিছু মানুষের সাথে সৌভাগ্য আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে থাকে, তারা যেদিকেই যায়—সেদিকেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। ইফতিখারের ব্যাপারটাও ছিল এমন। দিল্লির জনৈক তুলা ব্যবসায়ীর আড়তে কর্মচারী হিসেবে চাকরি পেয়ে যাবার পর তার প্রতি চোখ পড়ে ইংরেজ মিশনারি স্টুয়ার্টের। ছেলেটা দুর্দান্ত মেধাবী, প্রতুৎপন্নমতিত্বের অধিকারী, সারাদিনের কাজ দশ মিনিটে শেষ করে বসে থাকার অভ্যাস তার, পড়াশোনা করলে ও অনেক বড় হবে—এসব ভেবে স্টুয়ার্ট সাহেব তাকে নানা ফন্দি করে মিশনারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। কিন্তু ইফতিখার কি পড়াশোনার ছেলে! ও বছরখানেক পড়াশোনা করে আবার লাপাত্তা হয়। আবার গিয়ে জুড়ে বসে কোনো ব্যবসায়ীর কারবারে।

সাত-আট বছর দিল্লিতে বিচিত্র সব কারবারে জড়িয়ে ইফতিখারের মগজ পোক্ত হয়েছে। দিল্লির আবহাওয়ার গতিবিধি বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করে নিয়েছে সে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ব্যাপারটাও অনেকখানি বুঝে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, দিল্লির সাহিত্য-সাংবাদিকতার মাঠেও তার খানিক যাতায়াত হয়েছে। ইফতিখার যাদের কাছেই পা রেখেছে, তারাই বুঝতে পেরেছে—এই ছেলের ভেতর সম্ভাবনা রয়েছে; সে কিছু একটা করে ফেলতে পারবে সহসাই। কিন্তু কেউই দিনশেষে বুঝতে পারেনি, ইফতিখার কী করতে চায়! বোধহয় ইফতিখার নিজেও কখনও বুঝতে চায়নি। ভাগ্য তাকে যেদিকে টেনে নিয়েছে, সে সেদিকেই দৌঁড়ে গেছে। ভাগ্যের ঘূর্ণায়মান চাকা তাকে একদিন টেনে আনে টেইলর সাহেবের বাংলোয়।

টেইলর সাহেব দিল্লি রেসিডেন্সির উর্ধ্বতন ব্রিটিশ কর্মকর্তা। যদিও তিনি নিজেকে ব্রিটিশ বলতে পছন্দ করেন না। তিনি প্রায়শই মজা করে বলেন—‘আমি হলাম ইস্ট ইন্ডিয়ান।’ চাকরি জীবনের শুরুতে মারাঠা সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। এরপর সরকারি রাজস্ব বিভাগেও কাজ করেছেন। এখন কোম্পানি সরকারের শিক্ষা-বিষয়ক নানা গবেষণায় তিনি ব্যস্ত সময় কাটান।

ভারতের হাওয়া মেখে দীর্ঘসময় কাটাবার পরও টেইলর বুঝে উঠতে পারেননি ভারতীয়দের মনস্তত্ত্ব। ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি করেছে। তখন টেইলরের হাতে সরকার যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তাতে জনসম্পৃক্ততার প্রয়োজন প্রকট। ফলে এমন কাউকে তিনি চাচ্ছিলেন, যার হাতধরে আরও সুপরিকল্পিতভাবে ভারতীয়দের সাথে বোঝাপড়া তৈরি সহজ হবে। ইংরেজ অফিসারদের সবচে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে—ভাষায়। ভারতীয়দের ভাষা রপ্ত করা বড় জটিল কাজ। এক দেশে এত পরিমাণ ভাষার বৈচিত্র্য থাকতে পারে—তা ইংরেজরা কখনও কল্পনা করেনি। ফলে দেশীয় কাউকে লাঠির মতো সঙ্গে নিয়ে ঘোরার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয় অনেক সময়।

ইংরেজরা দেশ ও জাতির শত্রুর ভূমিকায় রয়েছে। কোথাও গিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে দাঁড়াবার উপায় নেই। সবাই ঘৃণা ও আক্রোশের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এমতাবস্থায় যদি একজন স্থানীয় সুপারভাইজার থাকে, তাহলে অনেক কাজ সহজ হয়। সবমিলিয়ে টেইলর এমন কাউকে খুঁজছিলেন, যাকে দিয়ে নানান রকমের কাজ করানো যাবে। ইফতিখারকে যখন ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হলো—তাকে দেখে টেইলর খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছেন, তিনি এমন কাউকেই চাচ্ছেন।

ছেলেটা ইংরেজি বলতে পারে, ভুল-শুদ্ধ মিলিয়ে বেশ ভালোই বলে। দিল্লির পথঘাট, শিক্ষাকেন্দ্র, উপাসনালয়, জ্ঞানী-বিদ্বান থেকে নিয়ে পুরান দিল্লির মুচি-মেথরদের আখড়া পর্যন্ত তার নখদর্পনে। বলা যায় ছোটোখাটো এনসাইক্লোপিডিয়া সে। কালবিলম্ব না করে ইফতিখারকে রেখে দেন টেইলর।

ইফতিখারও এমন সুখের চাকুরি পেয়ে বেশ আনন্দিত। কোনো শারিরীক কসরত নেই, শুধু বাংলোয় বসে থাকা, সাহেবের ডাক পড়লে অফিসে ঢোকা, তাকে বিভিন্ন তথ্য যোগাড় করে দেওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্যাদি ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করে দেওয়া, দিল্লির পাড়া-মহল্লায় ঘোরাঘুরি করা—এমন স্বপ্নের চাকুরিই তো খুঁজছিল ইফতিখার।

‘স্যার ডাকছেন।’ পাংখাপুলার হিন্দু ছেলেটি অফিস কক্ষ থেকে মাথা বের করে কিছুটা চিৎকার করেই বলে।

ইফতিখার পত্রিকা রেখে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে অফিস কক্ষে। টেইলর সাহেব চশমা পরে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছেন একটি কাগজে। ইফতিখার কক্ষে প্রবেশ করতেই টেইলর বললেন,

‘এসো। সিট ডাউন। সকাল সকাল আসতে বলেছি বলে বিরক্ত হওনি তো?’

‘না স্যার। বিরক্ত হবো কেন!’

‘একটা জরুরি চিঠি এসেছে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে। জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন পাঠিয়েছে। তোমাকে বলেছিলাম চার্টার অ্যাক্টের কথা?’

‘হ্যাঁ বলেছিলেন স্যার। পড়ে শুনিয়েছিলেন।’

‘হ্যাঁ, সরকার শিক্ষা খাতে অভাবনীয় একটা পরিবর্তন আনতে চাচ্ছেন। দ্রুত সময়ে আমাকে একটা জরিপ চালাতে হবে দিল্লিতে। আগামী কয়েক মাস আমাদের বসে থাকার উপায় নেই। ইটস ভ্যারি ইম্পর্ট্যান্ট।’

‘আমি প্রস্তুত স্যার।’

ইফতিখার আঁচ করতে পেরেছিল, এমন কিছু একটা শীঘ্রই হতে যাচ্ছে। সরকার চায়—শিক্ষাব্যবস্থায় জেঁকে বসতে। ঔপনিবেশিক সরকারের লক্ষ্য এমনটা হবে, এটাই স্বাভাবিক। ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ বলে একটা কথা আছে। মেরুদণ্ডে আঘাত হানলে গোটা জাতিকেই ঘায়েল করা যায় সহজে।

ওরা ভারতবর্ষে এসেছিল বাণিজ্যের লক্ষ্যে। কিন্তু যখন ওরা বেশ ভালোভাবে বুঝে ফেলল, এ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমাগত পঙ্গুত্ব বরণ করছে, গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে ঐতিহ্যের মুঘল শাসন বিলুপ্তির পথে হাটছে, নিজেদের মধ্যে লড়াই-বিদ্রোহের সুবাদে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে সুবিশাল সাম্রাজ্য, এহেন পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদীরা ফায়দা না লুটে বসে বসে আঙুল চুষবে—এ ধারণা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। শুরু হলো ওদের কূটনৈতিক লড়াই। পারস্পরিক যুদ্ধে কেরোসিন ঢেলে আরও জমিয়ে তুলল রাজনীতির খেলা। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের পর আনুষ্ঠানিকভাবেই ভারতবর্ষের শাসনভার হাতে তুলে নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এরপর যে লুটপাট আর ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস রচিত হয়েছে, তার বিবরণ সম্পর্কে কেউ অজ্ঞাত নয়।

রাজনৈতিক ক্ষমতার আসনে ইংরেজ কোম্পানি অধিষ্ঠিত হবার পর শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক বিবর্তন দেখা দেয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দেখভাল করতেন আমির-উমারাগণ। যখন তাদের নিজেদের জীবনযাপনই দুর্বিষহ হয়ে উঠল, তখন শিক্ষাঙ্গনের অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা সহজেই বোধগম্য। থেমে গেলো শিক্ষার চাকা। শিক্ষাকেন্দ্র বিরান ঘরে পরিণত হলো। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে বহু মাদরাসা বন্ধ হয়ে গেলো।

এরপর যে যুগের সূচনা ঘটেছে, তা ইংরেজি শিক্ষা কিংবা পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা বিস্তারের যুগ। ইংল্যান্ড পার্লামেন্ট ভাবল—ভারতে উপনিবেশ স্থায়ী ও সুদৃঢ় করতে হলে ভারতীয়দের শিক্ষাক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে হবে। অপরদিকে খ্রিষ্টবাদী তৎপরতা বিস্তারের জন্য ইংরেজ কোম্পানির সাথে সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য মুখিয়ে আছে মিশনারি সংগঠনগুলো। ইতিমধ্যে তারা মিশনারি স্কুল কার্যক্রমকে অনেকটুকু বেগবান করেছে। এবার যদি কেন্দ্রীয় সরকার ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের জন্য উদ্যোগ নেয়, তাহলে মিশনারিদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হয়ে উঠবে।

সব জল্পনা-কল্পনার পর ১৮১৩ সালে ইংল্যান্ড পার্লামেন্ট চার্টার অ্যাক্ট বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আইন প্রস্তুত করে। চার্টার অ্যাক্টের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা ছিল—ঔপনিবেশিক ভারতে শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য কোম্পানি সরকারকে ন্যুনতম বার্ষিক এক লাখ রূপি ব্যয় করতে হবে। এতে করে ভারতীয়দের মাঝে শিক্ষার প্রসার ঘটবে। অন্যভাবে যদি আমরা বলি—ভারতীয়রা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, তাদের ভেতর সহজে বপন করা যাবে পশ্চিমা সভ্যতার বীজ, আরও সুগম হবে শিক্ষাকেন্দ্রে খ্রিষ্টবাদী সাহিত্য অন্তর্ভুক্তিকরণের পথ।

কোম্পানি সরকার এ ধারা বাস্তবায়নের জন্য খাতা-কলম নিয়ে বসে। ঠিক কীভাবে শিক্ষা সম্প্রসারণের যাত্রা শুরু করা যায়, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়। সরকার জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন নামে একটি কমিটি তৈরি করে। এই কমিটি ১৮২৩ সালের শেষদিকে দিল্লি, আগ্রা, বেনারস ইত্যাদি জেলার স্থানীয় কমিটিকে পত্র পাঠায়।

দিল্লি রেসিডেন্সির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা টেইলর যখন পত্র হাতে পান, তখন তার ভেতর নানামাত্রিক চিন্তা জেগে ওঠে। টেইলর খুব করে চেয়েছিলেন, ভারতীয়দের মাঝে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটুক। এতে মানুষগুলো সভ্য হবে। ইউরোপীয় সংস্কৃতির সাথে এদের পরিচয় ঘটবে। সভ্যতার গোড়াপত্তন ঘটাতে না পারলে ইংরেজদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হবার নয়। তবে ইংরেজি শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। দেশের মানুষ ইংরেজদের ঘৃণা করে। হিন্দু কি মুসলিম—সবাই ভেবে বসে আছে, ইংরেজি শেখানোর নামে তাদের ধর্ম কেড়ে নেওয়া হবে। ধর্ম তো ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিষয়। যার যে ধর্ম ইচ্ছে—সে তা গ্রহণ করবে। ইংরেজরা যদি তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির মাধ্যমে খ্রিষ্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে পারে, তাহলে ভারতীয়রা প্রভাবিত হয়ে যিশুর মুক্তিপ্রাপ্ত দলে প্রবেশ করতেই পারে—এতে দোষের তো কিছু নেই। কিন্তু এ মুহূর্তে এ কথা মুখে তোলা ভীষণ অনুচিত। খ্রিষ্টধর্মের প্রসার ঘটানোর চেয়ে এ জাতিকে শিক্ষার আলো দেখানোর প্রয়োজনীয়তা ঢের বেশি। মাথায় বহু সুদীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।

চিঠি পেয়ে টেইলরের মনে হয়েছে, ফোর্ট উইলিয়াম থেকে যোগ্য ব্যক্তির হাতেই দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হয়েছে। টেইলর ছাড়া দিল্লিতে আর কোন সরকারি চাকুরে আছে—যার ভেতর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করবার এ দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা আছে? আনন্দে গর্বে তার বুক উঁচু হয়ে উঠেছে। রাতে ঘুম হয়নি, আবার সাতসকালে অফিস কক্ষে বসতেও কষ্ট হয়নি। সারারাত টেইলর ভেবেছে—এমন প্রস্তাবনা দাঁড় করাব, ফোর্ট উইলিয়ামের মিটিংয়ে করতালি পড়ে যাবে। নিখুঁত তথ্যের সাথে আবেগ ও অনুভূতির সর্বোচ্চ প্রয়োগ সমন্বয় করে প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে। এর সাথে সুক্ষ্মভাবে নিজের পরবর্তী উচ্চ-অবস্থানও সুনিশ্চিত করতে হবে।

‘একটা ইনডেক্স আমি দাঁড় করিয়েছি। শুরুতেই দিল্লির প্রতিটি মাদরাসার তালিকা করবে। এরপর তথ্য সংগ্রহ করবে—তাতে কয়জন স্টুডেন্ট, কয়জন টিচার, কী পড়ান, কোন পদ্ধতিতে পড়ান, তারা অর্থের যোগান দেন কীভাবে। মনে রাখবে, আমাদের উদ্দেশ্য হলো সরকারকে বোঝানো, এই মাদরাসাগুলো সরকারি সহায়তার মুখাপেক্ষী। ওই চোখেই তোমাকে দেখতে হবে।’

‘কিন্তু স্যার, মাদরাসাগুলো হয়তো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংগ্রাম করছে, এবং এটা তো হবারই কথা, কিন্তু সহসা তারা সরকারি সহায়তা নিতে প্রস্তুত হবে—এমনটা মনে করা বোকামি।’

‘আমি জানি। মুসলমানরা ইংরেজদের ঘৃণা করে। হয়তো তুমিও আমাকে মনে মনে ঘৃণা করো। নো প্রবলেম। কিন্তু আমার কাজটা আমাকে করতে হবে। আমরা চাইব, তাদের মতো করেই তারা কার্যক্রম চালিয়ে নেবে, আমরা কেবল ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট দেবো।’

‘কেন দেবেন? অবশ্যই ইংরেজি শিক্ষা ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে?’

‘ইয়েস। কিন্তু সেটা এখন নয়। সবকিছুর মোক্ষম একটা সময় আছে। দেখো ইফতিখার, শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি করতে হলে মুসলিমদের সাথে একটা গুড আন্ডাস্ট্যান্ডিং প্রয়োজন। কিন্তু এছাড়া আমাদের সামনে এগোবার উপায় নেই।’

‘আমি চেষ্টা করব আপনার মুখ উজ্জ্বল করতে। আপনার স্বপ্নপূরণের সঙ্গী হবো।’

‘থ্যাংকিউ ইফতিখার। আই নো।’

সেদিন থেকেই ব্যস্ততা শুরু হয় ইফতিখারের। বসে থাকার চাকুরি পরিণত হয় দৌঁড়ঝাপে। টেইলর সাহেবের অভ্যাস হলো, তিনি কোনো বিষয় জানতে হলে একেবারে সবিস্তারে খুটিয়ে খুটিয়ে জানবার চেষ্টা করেন। সামান্য তথ্য ছেড়ে দেন না। এর আগে একবার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তথা মুচি-মেথর-কামার ইত্যাদি পেশার মানুষগুলোকে নিয়ে কী একটা গবেষণা করেছিলেন তিনি। ওইবার ইফতিখারের সাথে তিনি আচানক মেথরপট্টিতে গিয়ে জনৈক মেথরের ঘরে রাতের আহার সেরেছিলেন—ওরা কী খায় এবং ওদের ঘরের পরিবেশ কেমন তা বোঝার জন্য।

ইফতিখার যেহেতু টেইলর সাহেবের কর্মনীতি ভালোভাবে জানে, তাই মাঠে নামার আগে নিজ থেকেই সে একটি খসড়া তৈরি করে নেয়। তাতে সংক্ষেপে লিখে ফেলে তার কর্মপদ্ধতি। এরপর শুরু করে দৌঁড়ঝাপ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় নিয়মমাফিক সারাদিনের রিপোর্ট তুলে ধরতে হয় টেইলর সাহেবের কাছে। তিনি অফিস রুমের প্রকাণ্ড বোর্ডে তথ্যগুলো টুকে রাখেন। নতুন কোনো নির্দেশনা থাকলে দিয়ে দেন। ইফতিখারও খুব প্রাজ্ঞহাতে সহকারী গবেষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

সপ্তাখানেকের কসরতে দিল্লির ইসলামি শিক্ষা নিকেতনের প্রাথমিক একটা তালিকা ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি টেইলর সাহেবের ডেস্কে জমা হয়। এবার পূর্ণ বিবরণ, প্রতিষ্ঠাতাদের পরিচয়, পাঠ-কার্যক্রম, পাঠ্য সিলেবাস, আয়তন, অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে সবিস্তারে জানতে চাইলেন টেইলর সাহেব। ইফতিখারকে এবার লিস্টেড প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্ধারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য যেতে হবে।

যে প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য পাওয়া গেছে, এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে টেইলর নিজেও গভীর অনুসন্ধান চালাতে থাকলেন। প্রথম প্রতিষ্ঠানটির নাম—মাদরাসায়ে শাহ আবদুল আজিজ। প্রতিষ্ঠাতার নামেই মাদরাসার নামকরণ হয়েছে। শাহ সাহেবকে না চেনার কোনো কারণ নেই। তিনি দিল্লির বরেণ্য মুসলিম ব্যক্তিত্ব। তার বাবা শাহ ওয়ালি উল্লাহকে নিয়ে ইতিপূর্বে কিছুটা পড়াশোনা করেছিলেন টেইলর। গোটা ভারতবর্ষের ধর্মীয় অঙ্গনে তার সীমাহীন প্রভাব। টেইলর তার বোর্ডে রিমাইন্ডার নোট দিয়ে রাখেন, এক ফাঁকে তার সাথে দেখা করে শিক্ষাব্যবস্থার এ অভূতপূর্ব উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা জানাতে হবে।

দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটি মাদরাসায়ে রশিদ উদ্দিন খান। প্রতিষ্ঠাতা নিজেও শাহ আবদুল আজিজের ছাত্র। কিন্তু বর্তমান সময়ে তার মাদরাসাই সর্বাধিক আলোচিত। রশিদ উদ্দিন খান প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। নানান শাস্ত্রে তার অভিজ্ঞতা। তার সাথেও দেখা করা দরকার মনে করেন টেইলর।

তৃতীয় প্রতিষ্ঠানের নাম মাদরাসায়ে গাজিউদ্দিন খান। প্রাচীন এই মাদরাসার অবস্থা খুব জরাজীর্ণ। মাত্র একজন মৌলবি সাহেব সেখানে কজন ছাত্রকে পড়ান। প্রথম দুটো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এটি যেন অভিভাবকহীন। টেইলরের মাথায় বারবার ঘোরপাক খাচ্ছে—এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে নতুনভাবে কিছু ভাবা যায় কি না। তবে ভাসা ভাসা চিন্তাকে পরিপক্ব বানাতে হলে আরও কিছু পড়াশোনা করে নিতে হবে। অন্তত জানতে হবে—এই মাদরাসার ইতিবৃত্ত।

শেয়ার করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট