বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ পবিত্র কালামুল্লাহকে প্রতিটি মুসলিম তার যাপিত জীবনে ধারণ করে থাকে। এর অন্তর্নিহিত মধুভাণ্ডকে নানামাত্রিক শৈল্পিকতার পরশে উন্মুক্ত করে আসছে মহাকালের কুরআনপ্রেমী কবি-সাহিত্যিকগণ। ভাবসমৃদ্ধ সরস কাব্য বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। কাব্যের ঐতিহ্যমাখা চর্চা হয়ে আসছে হাজার বছর ধরে। মুসলিম কাব্যচর্চায় ‘পবিত্র কুরআন’ ও তার আদর্শ যুগে যুগে প্রতিফলিত হয়েছে অনিবার্যভাবে৷ ধর্মীয় আদর্শের চর্চা প্রতিটি যুগের প্রধানতম সাহিত্যধারায় হয়েছে, আজও হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতা মধ্যযুগ থেকে আজ পর্যন্ত সগৌরবে বহমান। কাব্যচর্চায় পবিত্র কুরআনের এ ধারাটিকে আমরা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করবো।
মধ্যযুগে কাব্যানুবাদ ও শাহ মুহম্মদ সগীর
১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক কবি শাহ মুহম্মদ সগীর বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম যুগপৎ বাংলা পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে পবিত্র কুরআনের সুরা অনুবাদ করেন। মধ্যযুগে সাহিত্য বলতে কবিতা-পুঁথি ছিলো মুখ্য। অজস্র কবিতা-পুঁথির বিষয় ছিলো ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে জুলেখা কিংবা হিন্দুসমাজের ধর্মীয় গুরু রাধা-কৃষ্ণর কাহিনী।
শাহ মুহম্মাদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা নিয়ে রচিত কিছু কবিতা এমন—সেগুলোকে যদি সুরা ইউসুফের অনুবাদ বলে দাবি করা হয়, তাহলে তা অস্বীকার করা কঠিন। যেমন সুরা ইউসুফের ৩১ নং আয়াতের অনুবাদ হলো,
‘স্ত্রী লোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল, তাদের প্রত্যেককে একটি করে চাকু দিল এবং যুবককে বললঃ তাদের সামনে বের হও। অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল তখন তারা তার সৌন্দর্যে অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল। তারা বললো, অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য! এতো মানুষ নয়, এতো এক মহিমান্বিত মালাক/ফেরেশতা!’
আর শাহ মুহম্মদ সগীর লিখেছেন,
দেখিলেন্ত পরতেখ কিবা এ স্বপন
এক দৃষ্টে নেহালন্ত পাসরি আপন
হাতেত তুরঞ্জ ফল কাতি খরসান।
হস্ত সমে ফল কাটে মনে নাহি জ্ঞান
কেহো ফল কাটিতে অঙ্গুলি কাটি নিল
কিবা কর কিবা ফল এক ন জানিল
স্তিরি সবে বোলে এহি মনুষ্য মূরতি।
স্বর্গ মর্ত্য পাতালি জিনিয়া রূপ খ্যাতি
আধুনিক যুগে কাব্যানুবাদের ধারা
আমপারা : আমির উদ্দিন বসুনিয়া (১৮০৮/১৮৬৬)
১৮০৮/১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে আমপারার একটি প্রত্যক্ষ বঙ্গানুবাদের সন্ধান মেলে। অনুবাদক ছিলেন আমির উদ্দীন বসুনিয়া। কোন গবেষকের মতে বাংলা গদ্যভাষায় তিনিই সবার আগে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করেন। অন্য এক গবেষক বলেছেন, বসুনিয়ার ‘অনুবাদটি ছিল বাংলা পুঁথি সাহিত্যের ভাষায় আমপারার কাব্যানুবাদ।’ আমির উদ্দিন বসুনিয়ার অনুবাদটি ছিল খণ্ডিত, পবিত্র কুরআনের ৩০তম পারা বাংলা পয়ার ছন্দে তিনি অনুবাদ করেন। বসুনিয়া ছিলেন রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলা চিলাখাল মটুকপুর গ্রাম নিবাসী। রংপুরের কুন্ডি পরগনার গোপালপুরস্থ শ্যামপুর রেলস্টেশনের কাছে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করার পর পূর্ববঙ্গের সর্বপ্রথম পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’ প্রকাশ হতো ১৮৪৭ ঈসায়ী সনে। সম্ভবত এই প্রেসেই পরবর্তীতে ছাপা হয়েছিলো সেকালের লিথো প্রেসে মুদ্রিত কাব্যানুবাদটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিলো ১৬৮। মুদ্রণের তারিখ জানা না গেলেও মুদ্রণরীতির বৈশিষ্ট্যে গ্রন্থখানি প্রাচীনত্বের দাবি করতে পারে। এর একটি খন্ড বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থাগারে আজও সংরক্ষিত।
বসুনিয়ার কাব্যানুবাদটির প্রকাশকাল নিয়ে গবেষকদের মাঝে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। শেখ ফজলুল করিম (১৮৮২-১৯৬৬) সম্পাদিত অধুনালুপ্ত ‘বাসনা’ পত্রিকায় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে ‘উত্তর বঙ্গের মুসলমান সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে হামেদ আলী মন্তব্য করেন,
‘একশত বৎসর পূর্বে আমীর উদ্দীন বসুনিয়া এই আমপারার অনুবাদ রচনা করেন।’
সূতরাং এ সূত্রে উক্ত অনুবাদের রচনা বা প্রকাশকাল স্থির হয় ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দ।
প্রখ্যাত লেখক ও প্রাচীন পুঁথি সংগ্রাহক আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩ খ্রি.) তার সংকলিত বাংলা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ গ্রন্থে আমীর উদ্দিন বসুনিয়ার বাংলা আমপারার কথা লিখেছেন গুরুত্বের সাথে। তিনি বলেছেন,
‘আমার বিশ্বাস, এদেশে বাংলা টাইপ প্রচলনের পূর্বে এ গ্রন্থটি ছাপা হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করে থাকেন, আমির উদ্দীন বসুনিয়ার এই সরল বাংলা কাব্যানুবাদখানি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৬ ঈসায়ীতে।’
গিরিশ পবিত্র কুরআন শরীফের বঙ্গানুবাদ করেছিলো ১৮৮১ ঈসায়ী থেকে ১৮৮৬ ঈসায়ী পর্যন্ত। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, গিরিশের ২০ বছর পূর্বে রংপুরের আমির উদ্দীন বসুনিয়া আংশিক হলেও পবিত্র কুরআন শরীফের সর্বপ্রথম বঙ্গানুবাদক হিসাবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
তরজমা আমছেপারা : মাওলানা আকবর আলি (১৮৬৮)
আমির উদ্দীন বসুনিয়ার পর কুরআনের কাব্যানুবাদে কলকাতার মির্জাপুরের পাটোয়ার বাগানের অধিবাসী মাওলানা আকবর আলির নাম পাওয়া যায়। আকবর আলীর অনুবাদটি ‘তরজমা আমছেপারা’ নামে বাংলা পুঁথি সাহিত্যের ভাষায় কলকাতা সৈয়দ আবদুল্লাহ আহমদী প্রেস থেকে থেকে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। খুলনা জেলার বাহিরদিয়া গ্রামের অধিবাসী নওমুসলিম আবদুল্লাহ খাঁ এ গ্রন্থটির সংগ্রাহক। গ্রন্থটি বর্তমানে বাংলা একাডেমীতে সংরক্ষিত আছে।
আকবর আলীর ‘তরজমা আমছেপারা’র বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি সুরার শুরুতে আরবী ও বাংলা অক্ষরে সেই সুরার নাম, নাযিলের স্থান, আয়াত সংখ্যা ও বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং সুরা ফাতিহার বাংলা পয়ার ছন্দে বিসমিল্লাহ’র কাব্যিক অনুবাদও প্রদত্ত হয়েছে। উক্ত গ্রন্থে প্রতিটি সুরার আয়াত সমূহের হারাকাত উল্লেখপূর্বক সেই সুরার তরজমা সম্পাদন করা হয়েছে। তরজমার পর ব্যাখ্যাস্বরূপ ‘ফায়েদা’ সংযোজিত হয়েছে। লেখক এতে ‘ফায়েদা’ শিরোনামে আয়াতসমূহের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলা ভাষায় অনূদিত ও ব্যাখ্যাত কুরআনের মধ্যে এটাকেই প্রথম প্রয়াস হিসেবে গণ্য করা যায়।
নমুনাস্বরূপ দেখা যাক আকবর আলীর সুরা ত্বীনের অনুবাদ ও ফায়েদা—
শুরু করি এ কেতাব নামেতে আল্লার।
বড়া মেহেরবান সেই উপরে সবার।
সকলি তারিফ আছে ওয়াস্তে আল্লার
পালোনে ওয়ালা সেই সকল সংসার।
ছুরা তীন মক্কায় উতরিল ৮ আয়াতের
কিরে করি আমি আঞ্জির আর জয়তুনের।
আর কিরে করি আমি তুর ছিনিনির।
আর কিরে এই সহোর ওয়ালার।
অনেক বাতের আমোন এই মক্কা মাঝার।
ফায়েদা
আঞ্জির আর জৈত্তন এহার বাগান ডানে বামে বয়তেল মুকাদ্দেছ স্থান।
ফায়েদা
মুছা নবি জে পাহাড়ে কালাম কোরেছিল। তুরছিনিন নাম জে তাহার হৈয়া গেল
দাঙ্গা আর খুন নাহি মক্কা সহোর বিচে।
আর বণ্ডত বাতের আমন তাহে আছে
ওই সকলের আল্লাতালা কিরে করিয়া
নিচের লিখিত মজনুন দিলো জানাইয়া।
বানাইলাম অতি খুব গঠোন এনছানের
তাহা পরে ফেলিলাম নিচে সকলের
ফায়েদা
জতো আছে দুনিয়ার জান জানোয়ার
সবা হোতে ভাল ছুরত বানাইলাম তার
তাহা পরে গোনাহের ছববে তাহার
সবাকার নিচে হৈলো জায়গা তাহার।
দোজখেতে হবে জবে যায়গা তাহার
এই হাল দেখে কবে জান জানওয়ার।
কিন্তু জারা সবে ঈমান আনিলো
আর কাম তাহারা ভালে জে করিলো।
তাহাদের লাগিয়া ণ্ডজুরে আল্লার
মজুরি তাহাকে আল্লা দিবে বেসোমার।
কি জন্ন্য জানিলে ঝুট এনছাফ হওয়ারে
আল্লা তো হাকেম বড়ো কুল হাকেম পরে।
ফায়েদা
তামাম হাকেমের হাকিম আল্লাতালা সেই
এনছান তজবিজ কি করিবেক নাই।
সবাকার তজবিজ জরুর জে হইবে
আমোলের মতো লোকে আজাব পাইবে।
পবিত্র কুরআনের বাংলা অনুবাদের বিশিষ্ট গবেষক মোফাখখার হুসেইন খান সরাসরি মন্তব্য না করলেও আকবর আলীকেই বাংলা ভাষায় প্রথম কুরআন অনুবাদক সাব্যস্ত করেছেন।
আমপারা : শ্রী কিরণ গোপাল সিংহ (১৯০৮)
কলকাতার বেনেপুকুর এলাকার অধিবাসী শ্রী কিরণ গোপাল সিংহ পবিত্র কুরআনের আমপারার কাব্যানুবাদ করেন। তাঁর এ কাব্যানুবাদটি ‘আমপারা’ শিরোনামে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এর প্রথম সংস্করণ ইটালী বণিক ইউনিয়ন প্রেস থেকে শ্রী বলয় চাঁদ দত্ত কর্তৃক মুদ্রিত হয়। প্রকাশক ছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদ আলী। এ গ্রন্থটি বর্তমানে কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিতাকারে কালিপ্রসন্ন সিংহ কর্তৃক কলকাতা থেকে কাব্যানুবাদটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তাঁর কাব্যানুবাদে আমপারার প্রতিটি সুরার শানে নুযুলসহ টীকা-টিপ্পনী যোগ করেন।
‘আমপারা’র দ্বিতীয় সংস্করণে অনুবাদক ও প্রকাশকের নিবেদনে উল্লেখ হয়েছে, শ্রী কিরণ গোপাল সিংহ সম্পূর্ণ কুরআনের কাব্যানুবাদ তৈরি করেছিলেন এবং প্রতি মাসে এক এক পারা করে অবশিষ্ট ২৯ পারা প্রকাশ করার চিন্তা ভাবনাও করেছিলেন। পরবর্তীকালে পাঠকদের অনাগ্রহের কারণে তিনি আর অগ্রসর হননি। তিনি তাঁর এ কাব্যানুবাদটিকে সুখপাঠ্য করার লক্ষ্যে দ্বিতীয় সংস্করণে কাব্যাকৃতি ও আনুসাঙ্গিক বিষয়ে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে চণ্ডীপুরের মাওলানা আব্বাছ আলীর (১৮৫৯-১৯৩২) পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। ফলে দ্বিতীয় সংস্করণের ভাষা প্রথম তুলনায় যথেষ্ট সরল ও সাবলীল হয়েছিলো। তাঁর কাব্যানুবাদের নমুনা হিসেবে সুরা আসর পড়া যেতে পারে—
দাতা ও দয়ালু ঈশ্বরের নামে আরম্ভ করিতেছি
বৈকালের দিব্য করে বিশ্বাস স্থাপন
কিম্বা সৎকার্য্য করে যে মানবগণ
সত্য ভাবে পরস্পরে করে উপদেশ
তাহারা ব্যতীত অন্যমানব নিশ্চয়
ক্ষতির মধ্যেতে আছে জানিও নিশ্চয়
শ্রী কিরণ গোপাল সিংহ পেশায় ব্যবসায়ী হলেও সাহিত্য-চর্চা ও ধর্মের প্রতি তাঁর যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। ইসলামী সাহিত্যচর্চায় আমপারার কাব্যানুবাদ ও ব্যাখ্যা হলো তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান।
কোরান শরীফ তফছির ছাত্তারী ছুরা এখলাছ, কোরান শরীফ তফছির ছাত্তারী ছুরা কওছর : আবদুল ছাত্তার সুফী (১৯১৭)
আবদুল ছাত্তার সুফী কলকাতা থেকে ১৯১৭ সালে পবিত্র কুরআনের আয়াত কাব্যানুবাদ করে প্রকাশ করেন। বাংলা কবিতার ত্রিপদী ছন্দে কুরআন অনুবাদে ছিলেন তিনিই প্রথম। তিনি কলকাতার বালিগঞ্জের অধিবাসী ছিলেন— এছাড়া তাঁর সম্পর্কে আর কোন তথ্য জানা যায়নি। পবিত্র কুরআনের সুরা ইখলাস ও সুরা কাওসারের কাব্যানুবাদ টীকা-টিপ্পনীসহ দুইখন্ডে প্রকাশিত হয়েছিলো। যথাক্রমে উভয়খন্ডের নাম ছিলো ‘কোরান শরীফ তফছির ছাত্তারী ছুরা এখলাছ’ ও ‘কোরআন শরীফ তফছির ছাত্তারী ছুরা কওছর’।
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল কলকাতা থেকে গ্রন্থাকার কর্তৃক আরবীবিহীন কাব্যানুবাদটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মুদ্রক ছিলেন মুন্সী করিম বখশ, আলতাফী প্রেস, ৩৩ নং বেনেপুকুর রোড, কলকাতা। ১৬ পৃষ্ঠার এ সংস্করণটির মূল্য ছিল এক আনা। তাঁর কাব্যানুবাদ থেকে সুরা ইখলাসের নমুনা প্রদর্শন করা হলো—
শুরু করি তফছির আমি নামেতে আল্লার
দাতা ও দয়ালু নাম প্রকাশ যাহার
তারিফ প্রশংসা করি আমরা তাহার।
ছোবহান আল্লা। পাক আল্লা করিম মান্নানো
তার কি শান, কি প্রমাণ করিব বয়ানো
হেন জনা, সে দিওয়ানা, লেখে কি প্রমাণো,
একা আল্লা, কোলণ্ড আল্লা, তাহার প্রমাণো।
মহা কুরান কাব্য : মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ছিদ্দিকী (১৯২৭)
মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ছিদ্দিকী ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলাধীন শাহ ওমরাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ ও ভাষাতত্ত প্রভৃতি বিষয়ের উপর ২৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে ১৭টি প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থাগুলোর মাঝে ‘মহা কুরান কাব্য’ শিরোনামে পবিত্র কুরআনের আমপারার কাব্যানুবাদটি হলো তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
গদ্য ও পদ্য—দুই রীতিতে তাঁর কুরআন অনূদিত হয়েছিল, আর এটা ছিল বঙ্গ ভাষায় কুরআন অনুবাদের একটি ব্যতিক্রম রীতি। এটি মিহির চন্দ্র ঘোষ কর্তৃক মুদ্রিত হয়ে নিউ স্বরস্বতী প্রেস, ২৫/এ মেছুয়া বাজার স্ট্রীট, কলকাতা থেকে মুহাম্মদ মাশুক আহমদ সিদ্দিকীর মাধ্যমে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়।
‘মহা কুরান কাব্য’ নামক তাঁর এ গ্রন্থের বিশেষ আকর্ষণ হল প্রথমে সূরা অবতীর্ণের কারণ, অতপর ঐতিহাসিক ঘটনা বা পটভূমির বর্ণনা, তারপর মূল আরবী, তারপর গদ্যানুবাদ এবং সব শেষে কাব্যানুবাদ প্রদত্ত হয়েছে। এ অনুবাদের কোন কোন স্থানে পাদটীকাও সংযোজন করা হয়েছে। তাঁর কাব্যানুবাদ থেকে সুরা কাওসারের অংশটি নমুনা হিসেবে তুলে ধরছি—
সূরা কৌছার
বন্ধু মোহাম্মদ! করহে কুরবান,
তোমারে দিয়েছি অনন্ত কল্যাণ,
আপন প্রভূর কর উপাসনা,
তিনিই করেছে কৌছার প্রদান
পুত্রহীন বলে নিন্দে তোমা যারা,
পুত্রহীন রূপে লুপ্ত হবে তারা,
তোমারি স্মরণে রহিবে জগতে,
কোটী কন্ঠে তব ঘোষিবে বিধান
কাব্য আমপারা : কাজী নজরুল ইসলাম (১৯৩৩)
পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণকারী বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি বলে পরিচিত কাজী নজরুল ইসলাম পবিত্র কুরআনের ‘আমপারা’ অংশের কাব্যানুবাদ করেন। তা ‘কাব্য আমপারা’ নামে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। কবি নজরুলের অনুবাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কাব্যানুবাদ শেষে মার্জিনের নিচে আরবি সুরার বাংলা অর্থ পরিবেশন করেছেন। কাব্যানুবাদে সুরা ফাতিহার ভাষ্য ছিলো এমন—
শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,
করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।
সকলি বিশ্বের স্বামী আল্লাহ মহিমা,
করুণা কৃপার যার নাই নাই সীমা।
বিচার দিনের বিভু! কেবল তোমারি,
আরাধনা করি আর শক্তি ভিক্ষা করি।
সহজ–সরল পথে মোদের চালাও
যাদেরে বিলাও দয়া সে পথ দেখাও।
অভিশপ্ত আর পথ–ভ্রষ্ট যারা, প্রভু,
তাহাদের পথে যেন চালায়ো না কভু!
কোরআন কুসুমাঞ্জলি : সৈয়দ আবুল মনসুর (১৯৩৫)
সৈয়দ আবুল মনসুর সিলেটের অধিবাসী ছিলেন। কলকাতা থেকে ১৯৩৫ সালে ‘কোরআন কুসুমাঞ্জলি’ নামে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। পরে ‘কোরআন মঞ্জরি’, ‘কোরআন মঙ্গল’ ইত্যাদি নামে আরো কিছু সুরার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দের অনুসরণ করে তিনি কুরআন কাব্যানুবাদের অনুশীলন করেছিলেন।
স্বর্গীয় কানন : আইয়ুব আলী চৌধুরী (১৯৩৬)
আইয়ুব আলী চৌধুরী (১৮৭৭-১৯৩৬) বাংলা পয়ার ছন্দে সুরা ফাতিহার কাব্যানুবাদ করে ১৯৩৬ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। এর নামকরণ করা হয় ‘স্বর্গীয় কানন’ নামে। কাব্যানুবাদে সুরা ফাতিহা নিয়ে তাঁর মনগড়া অনেক শব্দও তিনি এতে প্রয়োগ করেন।
নূরের ঝলক ও বেহেশতী সওগাত : মীজানুর রহমান (১৯৪৪)
মীজানুর রহমান ‘নূরের ঝলক’ ও ‘বেহেশতী সওগাত’ নামে দু’টি বইয়ে আমপারার কাব্যানুবাদ রচনা করেন। নূরের ঝলক গ্রন্থে তিনি আমপারার কাব্যিক ভাবানুবাদ উপস্থাপন করেছেন। এটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে। শ্রী যোগেশ চন্দ্র দাস, নিউ ক্রাউন প্রেস, ৯৫ বৈঠকখানা রোড, কলকাতা থেকে মুদ্রিত ও কিতাব মহল, ৫২ লোয়ার সার্কুলার রোড, কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো কাব্যানুবাদটি৷ আর ‘বেহেশতী সওগাত’ নামে তিনি আমপারার যে কাব্যানুবাদটি রচনা করেছেন তার প্রথম সংস্করণ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগষ্ট রমনা, ঢাকার মাহবুব জামান কর্তৃক, কমার্শিয়াল প্রিন্টিং ওয়ার্কস, ৫৬/১ ক্যালিং স্ট্রীট, কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর এ কাব্যানুবাদে আরবী ও বাংলায় প্রতিটি সুরার নাম, অবতীর্ণ স্থান, আয়াত সংখ্যা, তাসমিয়া, আয়াতের ক্রমিক নম্বরসহ মূল আরবী, অতপর বাংলায় কাব্যানুবাদ প্রদত্ত হয়েছে। তিনি অনুবাদ শেষে কাব্যাকারে সুরার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ও তাশরীহ শিরোনামে গদ্যাকারে সুরার শানে নুযূল ও শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করেছেন।
মীজানুর রহমান বি-বাড়ীয়া জেলাধীন বাঞ্চারামপুর উপজেলার মরিচাকান্দি গ্রামে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এম.এ ডিগ্রীধারীদের অন্যতম। ছাত্র জীবন থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর মায়ের নির্দেশে তিনি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে আমপারার কাব্যানুবাদ শুরু করেন। চাকুরী জীবনের ফাঁকে ফাঁকে ও অবসরকালীন সময়ে তিনি ১৫টিরও অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে নূরের ঝলক’ ও ‘বেহেশতী সওগাত’ উল্লেখযোগ্য কর্ম।
হাফীজীল কাদেরী : মাওলানা মুনীর উদ্দীন আহমদ (১৯৪৭)
মাওলানা মুনীর উদ্দীন আহমদ ‘হাফীজীল কাদেরী’ শিরোনামে বাংলা ত্রিপদী পয়ার ছন্দে পবিত্র কুরআনের কাব্য তাফসীর করেন। এ গ্রন্থটি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ আলী কর্তৃক রংপুর থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর এ গ্রন্থে সুরা ফাতিহা ও সুরা বাকারার আংশিক কাব্য তাফসীর স্থান পেয়েছে। কাব্যানুবাদটিতে আরবী ভাষায় তাসমিয়া তা‘আউউজ লিপিবদ্ধের পর বাংলা ত্রিপদী পয়ার ছন্দে উভয়ের কাব্যানুবাদ প্রদত্ত হয়েছে। এই তাফসীরে আরবী বাংলায় সুরাদ্বয়ের নাম, রূকু ও আয়াতের সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর আরবীতে এক এক আয়াত উল্লেখপূর্বক সংশ্লিষ্ট আয়াতের কাব্য তাফসীর উপস্থাপন করা হয়েছে।বাংলা সাহিত্যে তাঁর এ কাব্য তাফসীর একটি অনন্য সংযোজন।
মাওলানা মুনীর উদ্দীন আহমদ রংপুর জেলার গংগাচরা থানাধীন শংকর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবনকাল সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। তিনি রংপুর থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত আলহক (১৯১৯-১৯২০) নামক দ্বিমাসিক একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
কাব্যে কুরআন পাক : মুহাম্মদ আবদুল বারী (১৯৯৬)
অসাধারণ কাব্য প্রতিভার অধিকারী কবি আব্দুল বারী পবিত্র কুরআন শরীফের প্রথম দশ পারার কাব্যরুপ ‘কাব্যে কুরআন পাক’ নামে প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। অসংখ্য হাদিসেরও কাব্যরুপ দিয়ে গেছেন তিনি। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। নিজেকে তিনি অভিহিত করে গেছেন একজন স্বভাব কবি হিসেবে। প্রচারবিমুখ কবি আব্দুল বারী ১৯৩২ সালের ২ ফেব্রুয়ারী মাগুড়া জেলার বর্তমান ইসলামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
এছাড়াও গোলাম মোস্তফা, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ফররুখ আহমদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মুহম্মদ নূরুল হুদা প্রমুখ খণ্ডিতভাবে কুরআনের বিভিন্ন অংশবিশেষ কাব্যানুবাদ করেছেন।
বর্তমান যুগে পূর্ণাঙ্গ কাব্যানুবাদ
ছন্দোবদ্ধ বাংলা কোরআন : কবি পান্না চৌধুরী (২০০৬)
কানাডা প্রবাসী কবি পান্না চৌধুরী পবিত্র কুরআনের ৩০ পারার পূর্ণাঙ্গ কাব্যানুবাদ সমাপ্ত করেন। ২০০৬ সালে ‘ছন্দোবদ্ধ বাংলা কোরআন’ নামে গন্তব্য প্রকাশনী থেকে কাব্যানুবাদটি প্রকাশিত হয়। কবির ভাষ্যমতে দীর্ঘ ১২ বছরের সাধনায় পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার ২৩ টি অনুবাদ ও তাফসীর গ্রন্থ পাঠ ও বিখ্যাত মুফাসসিরদের থেকে লব্ধ জ্ঞান আত্মস্ত করে প্রবাসে বসে তিনি এই অনুবাদটি সমাপ্ত করেন।
ছন্দোবদ্ধ বাংলা কুরআনের ভূমিকায় পান্না চৌধুরী লিখেন,
‘কানাডাতেই সৌদীআরবের একজন ইউনিভার্সিটি প্রফেসরের সাহচর্যে আসি। তিনি ডক্টর আব্দুল্লাহ্। কুরআনের হাইপারমেট্রিক ছন্দের ব্যাপারে তিনিই আমাকে ধারণা দিলেন। আরও বললেন, কুরআন কোনো সাহিত্যকর্ম নয়। জীবনধারণের জন্য স্বচ্ছ উপদেশ সম্বলিত গ্রন্থ। যে উপদেশ এসেছিল স্বয়ং আল্লাহতায়ালা থেকে। ছন্দের মাধ্যমে মানব চেতনাতে উপদেশগুলো প্রোথিত করার জন্য। উপদেশ গ্রহণ করতে হলে এবং সেই মূল্যবোধে জীবন-যাপন করতে হলে অবশ্যই মাতৃভাষায় তা রিসাইট্ করতে হবে। উনি আরও বলেছিলেন কুরআন শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে যা পূনঃ পূনঃ পাঠ করা হয়। আর তিলাওত শব্দের অর্থ হচ্ছে উপলব্ধি। আমি বুঝলাম যে কুরআন উপলব্ধিসহ বার বার পাঠ করলেই জীবনের অন্তর্নিহিত অনেক অর্থই পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। কুরআনের বানীগুলো তাই নিজের মাথার মধ্যে প্রেথিত করার জন্য ডক্টর আব্দুল্লাহর পরামর্শে মাতৃভাষায় আমার নিজের মতো করে ছন্দায়িত করার কাজে নিয়োজিত হই। দীর্ঘ বারো বৎসর যাবৎ নিরলস প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে একসময় আমার মধ্যে অন্য আরেক উপলব্ধির বিকাশ লাভ করে। সেটা হলো স্বভাষী জাতির প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন দায়িত্ববোধ। বুঝতে পারলাম কুরআনের বাণীগুলি চিরন্তন। এই বাণীগুলির মধ্যে নিহিত রয়েছে অত্যন্ত সহজ সরল একটা আকুতি। প্রকৃতপক্ষেই বাণীগুলি বার বার পাঠ করলে শরীর ও মনে এক প্রকার ভাইব্রেশনের সৃষ্টি হয়। আর সেই উপলব্ধির পথ বেয়ে আমি সেই বৃহৎ স্বত্ত্বার খুব কাছাকাছি যেতে পারি।’
কবি পান্না চৌধুরীর কাব্যানুবাদ থেকে সুরা ফাতিহার ভাষ্য উল্লেখ করা হলো—
আল্লাহর জন্য রহে যতো গুনগান
পালন করেন যিনি সকল জহান
পরম করুনাময় তিনি দয়াবান।
রোজ কিয়ামতে যিনি করিবেন বিচার
ইবাদত আমরা কেবল করি আপনার।
আপনারই সাহায্য চাই মোরা ইবাদতে
চালান মোদেরে যেন সেই সোজা পথে।
চলেছে যারা সব সেই পথ ধরে
আপনার দয়া রয় যাদের উপরে।
আর যারা চলে সব সেই পথে নয়
আপনার গজব যেথা আপতিত হয়
আরো যেই লোকেরা ভুল পথে রয়
আল কোরআন বাংলা কাব্যানুবাদ : প্রফেসর মুহাঃ মনসূর উর রহমান (২০০৬)
প্রফেসর মুহাঃ মনসূর উর রহমান রচিত কুরআনের পূর্ণাঙ্গ কাব্যানুবাদ ‘আল কোরআন বাংলা কাব্যানুবাদ’ নামে তিনখন্ডে প্রকাশিত হয়। এর প্রথম খন্ড ঝিনুক প্রকাশ থেকে ২০০৬ সালে, দ্বিতীয় খন্ড ২০১৮ সালে ধ্রুবতারা প্রকাশনী থেকে ও তৃতীয় খন্ড ২০২১ সালে ধ্রুবতারা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। প্রফেসর মুহাম্মদ মনসূর উর রহমান ১৯৪৪ সালে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানার আটরাই গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বাংলা বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।
তাঁর কাব্যানুবাদ থেকে সুরা ফাতিহা—
স্তুতি যা কিছু সব বিশ্ব-পালকের
দয়ার্দ দয়াল তিনি বড় কৃপাময়,
মালিক সেই শেষ বিচারের।
শুধুমাত্র তোমারই করি আরাধনা,
তোমারই কাছে চাই আশ্রয়।
আমাদের চালাও প্রভু সরল সঠিক পথে,
তাদের সে পথে…
যে পথে পেয়েছে তোমার অনুগ্রহ অপার।
তাদের সে পথে নয়,
যে পথে বর্ষিত দণ্ড অভিশাপ,
যে পথে তারা সুপথ হারা।
কাব্যে আল কুরআন : প্রকৌশলী কাজী আকবর শাহ (২০১৩)
প্রকৌশলী কাজী আকবর শাহ কুরআনের পূর্ণাঙ্গ কাব্যানুবাদ করেন দুই খন্ডে ২০১৩ সালে। ‘কাব্যে আল কুরআন’ নামে এর প্রথম খন্ড ওরাকল পাবলিকেশন্স ও দ্বিতীয় খন্ড শিকড় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। এই কাব্যানুবাদটিতে গদ্যাকারেও অনুবাদ সংযুক্ত করা হয়েছে।
কাব্যে আল কুরআন থেকে সুরা ফাতিহা—
আল্লাহ তুমি মালিক সবার
তারিফ সকল তোমারি
সারা জাহান পয়দা তোমার
পালক মোদের সবারই।
করো মোদের মেহের বাণী
প্রভু তুমি রহমান
দয়া করে দিও মোদের
দোজাহানে দিও শান।
বিচার তুমি করবে জানি
এনে সবে হাশরে
দিও নাগো মওলা মোদের
আযাব তোমার বিচারে।
মালিক শুধু তোমায় জানি
করি তোমার উপাসন
চাওয়া-পাওয়া তোমার কাছে
করি সকল নিবেদন।
সরল সে পথ দেখাও মোদের
যে পথ তোমার দয়াতে
পেল তোমার বন্ধু সুজন
চলাও মোদের সে পথে।
নিয়ো না সে পথে মোদের
যে পথ শুধু গজবের
সাথী তাদের করণাকো
শাপে ভরা পাপীদের।
মূল আরবিসহ আল-কুরআনের সহজ-সরল কাব্যানুবাদ : মোসাম্মৎ ফাতীমা কবীর (২০১৮)
মোসাম্মৎ ফাতীমা কবীরের অনুবাদ ও হুসাইন আল জাওয়াদ , হাফেজ মাওলানা মুফতী জাকারিয়া, মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান ফারুকীর সম্পাদনায় ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় কুরআনের পূর্ণাঙ্গ কাব্যানুবাদ। ‘মূল আরবিসহ আল-কুরআনের সহজ-সরল কাব্যানুবাদ’ নামে ৯২৮ পৃষ্ঠার কাব্যানুবাদটি প্রকাশিত হয় মাকতাবায়ে ইবনে মাসউদ রা. থেকে।
কাব্যে আল-কোরআন : আ.শ.ম বাবর আলী (২০২১)
কবি ও সাহিত্যিক আ. শ. ম. বাবর আলীর দীর্ঘদিনের সাধনায় ২০২১ সালে প্রকাশিত হয় কুরআনের পূর্ণাঙ্গ কাব্যানুবাদ। ‘কাব্যে আল-কোরআন’ নামে ১১৯২ পৃষ্ঠার কাব্যানুবাদটি প্রকাশিত হয় খানবাহাদুর আহছানউল্লা ইনস্টিটিউট নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশন নলতা শরীফ, সাতক্ষীরা থেকে। কাব্যানুবাদটি সম্পাদনা করেন বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ও আহসানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজমের সহকারী অধ্যাপক শাঈখ মুহাম্মদ উছমান গনী।
কাব্যে আল-কোরআন থেকে সুরা ফাতিহা—
সকল স্তুতি তার সারা বিশ্বের প্রভু অাল্লাহ যিনি,
অতি দয়াময় করুণার আধার রহমানুর রহীম তিনি।
বিচারদিনে সব ক্ষমতা একমাত্র তাঁর,
আনুগত্য করি সাহায্য চাই শুধু যে তোমার।
চালাও তুমি আমাদেরকে সঠিক সরল পথে,
তাঁদের পথে, ধন্য যাদের করেছো নিয়ামতে।
নয় সে পথে, তোমা” হতে অভিশপ্ত যারা,
সহজ পথের দিশা ভুলে হয়েছে পথহারা।
আল কোরআনের কাব্যানুবাদ : মুহিব খান (২০২১)
কুরআনের কাব্যানুবাদের এই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সমৃদ্ধ কর্ম হচ্ছে মুহিব খান রচিত ‘আল কোরআনের কাব্যানুবাদ’। রাহনুমা প্রকাশনী থেকে ২০২১ এর শেষে ৮০০ পৃষ্ঠার এই বৃহৎ পূর্ণাঙ্গ কাব্যানুবাদটি প্রকাশিত হয়। গবেষকদের মতে, ব্যাপক জনপ্রিয় কাব্যানুবাদটি পূর্বে প্রকাশিত অন্য কাব্যানুবাদগুলোর তুলনায় যথেষ্ট বিশুদ্ধ। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এর অনুবাদক একাধারে একজন আলেম ও জনপ্রিয় কবি।
কাব্যানুবাদের ভুমিকায় মুহিব খান লিখেন,
‘বাংলাভাষায় এ যাবৎ বিভিন্ন গবেষক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক কুরআনের বেশ কিছু সুন্দর সমৃদ্ধ অনুবাদ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত এবং প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নতুন নয়। কোনোটি সাধু, কোনোটি প্রমিত, কোনোটি জটিল শাব্দিক অর্থ, কোনোটি সরল ভাবার্থ, কোনোটি আয়াত ও সুরার বিন্যাসে সজ্জিত, কোনোটি সামগ্রিক গবেষণা-নিঃসৃত সারমর্ম অবলম্বনে রচিত, কোনোটি বা আরও ভিন্নতর কিছু। এক্ষেত্রে কুরআনের কাব্যানুবাদ একটি বিস্ময়কর ও ব্যতিক্রমী সংযোজন, যা এ যাবৎ পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায়, এমনকি বাংলাভাষায়ও ‘পূর্ণাঙ্গরূপে’ সুসম্পন্ন হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলেও তা কুরআনের প্রকৃত ভাব-ভাষা ও মর্মার্থের দিক থেকে ‘মূলানুগ’ ও ‘বিশুদ্ধরূপে’ হয়েছে কিনা, সেইসাথে কাব্য ও সাহিত্যমান-বিচারেও ‘উত্তীর্ণ’ ও ‘যথার্থরূপে’ হয়েছে কিনা, তা বিশেষভাবেই বিবেচ্য।’
মুহিব খান সুরা ফাতিহার কাব্যানুবাদ করেছেন এভাবে—
প্রশংসা সব আল্লাহর যিনি সারা জাহানের রব;
দয়ালু, মহানুভব;
(আর) যিনি বিচারদিনের সব।
আমরা সবাই কেবলই তোমার ইবাদত করে যাই এবং আমরা তোমার কাছেই সহায়তা শুধু চাই।
তুমি আমাদের দেখাও তোমার সরল-সঠিক পথ তাদের সে পথ, যাদেরকে দান করিয়াছ নিয়ামত।
যাদের উপর রুষ্ট হয়েছ, তাদের সে পথ নয়
এবং তোমার সৎপথ হতে বিচ্যুত যারা হয়।
এই ধারার শেষ কাজটি করেছেন মুহিব খান। তবে শেষ নয়; আগামী প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকরা নতুন উপকরণে ভিন্নমাত্রায় কাব্যানুবাদের এই চর্চায় হয়তো যুগ-যুগান্তর ধরে বিকীরন ছড়াবে৷ কুরআনের কাব্যানুবাদচর্চা একটি স্পর্শকাতর স্থান। অতিসুক্ষ্ম ভাষাজ্ঞান, উলুমুল কুরআন, তাফসীরশাস্ত্রে বিস্তর পাঠ, সাবধানী কাব্যচয়ন ও ছন্দের স্বাধীনতায় নিখুঁত দৃষ্টিপাত কবির জন্য অনিবার্য। তাই—এ যাবতকালের কাব্যানুবাদগুলোর যথার্থতা, সমৃদ্ধতা ও বৈষয়িক পূর্ণাঙ্গতা বিবেচ্য। সাহিত্যকর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও কুরআনের বিশুদ্ধতা রক্ষার ক্ষেত্রে পদস্খলন ঘটেছে অনেকের। উপরোল্লিখিত তালিকাটি কেবল কাব্যানুবাদের এই ধারাটিকে একত্র করেছে, এই অনুবাদগুলোর বিচারকার্যে আসীন হয়নি।
গ্রন্থপঞ্জি :
১. পবিত্র কুরআন প্রচারের ইতিহাস ও বঙ্গানুবাদের ইতিহাস, মোফাখখার হুসেইন খান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
২. বাংলাভাষায় কুরআন চর্চাঃ উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদ, আল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ একাডেমী, প্রকাশকাল ২০০৯
৩. বাংলা ভাষায় কোরান চর্চা, অমলেন্দু দে, অভিযান পাবলিশার্স কলকাতা
৪. ইউসুফ জোলেখা, শাহ মুহাম্মদ সগীর, মুহম্মদ এনামুল হক সম্পাদিত, ফার্মা কে এল মুখোপাধ্যায় কলিকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৪
৫. বাংলা ভাষায় তাফসীর চর্চা : বিশেষত তফসীরে নূরুল কোরআন (পিএইচডি অভিসন্দর্ভ), মোঃ আবুল কালাম আজাদ পিএইচ.ডি. গবেষক রেজিঃ নং-৪৬/২০০৯-২০১০, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অক্টোবর-২০১৩।
৬. কাব্যে আল-কোরআন, আ.শ.ম বাবর আলী, খানবাহাদুর আহছানউল্লা ইনস্টিটিউট নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশন নলতা শরীফ, সাতক্ষীরা, প্রকাশকাল ২০২১
৭. আল কোরআনের কাব্যানুবাদ, মুহিব খান, রাহনুমা প্রকাশনী, প্রকাশকাল ২০২১
৮. কাব্যে আল কুরআন, প্রকৌশলী কাজী আকবর শাহ, প্রথম খন্ড, ওরাকল পাবলিকেশন্স, প্রকাশকাল ২০১৩
৯. ছন্দোবদ্ধ বাংলা কোরআন, কবি পান্না চৌধুরী, গন্তব্য প্রকাশনী, প্রকাশকাল ২০০৬