সূচীপত্র

প্রবন্ধ

ভারতবর্ষের কোম্পানি শাসনামলে সাংবাদিকতা

23 December, 2025

আমরা আগে আলোচনা করেছি, ভারতবর্ষে মুদ্রণশিল্প প্রবর্তনের আগেও সাংবাদিকতা চর্চিত ছিল। প্রাক আধুনিক ভারতে ‘সাংবাদিকতা’ শব্দটি তখন ব্যবহৃত হয়নি। সংবাদ সংগ্রহের ব্যপারটি ছিল শাসনকার্যের অংশ। মুঘল সাম্রাজ্যের সমাপ্তিকালে সাংবাদিকতা জনসাধারণের সাথে সম্পৃক্ত হতে থাকে। পূর্বে সংবাদ পড়তেন কেবল বাদশাহরা, আর এবার দেশ বিদেশের সংবাদ সাধারণ মানুষও পেল। মুঘল সাম্রাজ্যের ক্লান্তিলগ্নে ইংরেজ উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। তাদের হাত ধরে গোড়াপত্তন ঘটে আধুনিক সাংবাদিকতার। কালের পরিক্রমায় চলে আসা সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের নীতিমালা আরও গতি ও সমৃদ্ধি পায়। প্রাক-ইংরেজ আমলের ওয়াকিয়া নবিস স্টাফ রিপোর্টারে আর খুফইয়া নবিস গুপ্ত সাংবাদিকে উন্নীত হয়। পরিভাষায় পরিকল্পনায় ইউরোপীয় গড়ন যুক্ত হয়। সংবাদ প্রসারের পরিধি বিস্তৃত ও সহজবোধ্য হতে থাকে সমাজের মাঝে। পূর্বে যেমন রাজা বাদশাহরা ব্যক্তিগত ওয়াকিয়া নবিস, সাওয়ানেহ নেগার বা খুফইয়া নবিস রাখতেন, আধুনিককালে বহিরাগত হর্তাকর্তারা নতুন উপনিবেশে নিজেদের প্রেস-পত্রিকার সয়লাব ঘটাতে থাকলেন। মিশনারিরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনামলে প্রেসব্যবস্থাকে উন্নীত করে। এতে সংবাদপত্রের পথ সুগম হয়। বাংলা, ইংরেজির পাশাপাশি উর্দু, ফারসি সংবাদপত্র প্রকাশে ভারতীয়রা উদ্যমী হয়। উর্দুভাষী পত্রিকাগুলো নবাগত কোম্পানি শাসকদের নিয়ে শাসিতদের অন্তর্নিবিষ্ট ভাবনার পরিগ্রাহক হয়। পাতায় পাতায় ভূমিহারানো প্রজাদের বিদ্রোহী চিন্তা চেতনার প্রভাব বিস্তার করে। হিন্দি বা বিভিন্ন প্রদেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্র সাধারণ সংবাদে গণ্ডিবদ্ধ থেকেই তুষ্ট হতে থাকে। ইংরেজি ভাষায় বের হতে থাকে মিশনারি, কোম্পানির চাকুরিজীবী বা ইংরেজ বণিকদের পত্রিকা, যাতে খ্রিষ্টধর্মের প্রচারণা ও ইউরোপীয় সংস্কৃতি বিকাশের প্রচেষ্টা ছাড়া দেশীয় মানুষের স্বার্থে কিছু রচিত হয় না।

উনিশ শতকের শুরুতেই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে প্রতিনিধিত্বের আসনগ্রহণ করে। ক্ষমতার প্রকোপ মোঘল ঐতিহ্যের ফারসি ভাষার উপরও পতিত হয়। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে ফারসির স্থানে উর্দুকে সরকারী ভাষা করা হয়। এই সিদ্ধান্তের পর উর্দু ভাষায় সাংবাদিকতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইংরেজদের মনে উর্দুপ্রীতি ছিল না মোটেও; বরং ফারসির দুর্বোধ্যতা ও উর্দুর সরলতায় সুবিধাভোগের লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যাপকভাবে হিন্দুস্তানি সাংবাদিকতার উন্নতির পেছনে ভারতের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর জেনারেল (১৮৩৫-১৮৩৬) চার্লস মেটকাফের অবদান ছিল। তিনি ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড ওয়েলেসলি কতৃক ভারতীয় ছাপাখানার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে দেন ও ভারতীয়দের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন।

কোম্পানি শাসনামলে আধুনিক সাংবাদিকতার বিকাশ ও একইসাথে মুসলিম সাংবাদিকতার গৌরবময় অভ্যুত্থানও ঘটে। হিন্দুস্তানি মানুষের মনের অভিব্যক্তি ফুটে উঠতে থাকে সংবাদপত্রের পাতায়। শিল্প সাহিত্যে ফুঁড়ে উঠে ইংরেজবিরোধী বয়ান। যার লক্ষ্যস্থল গিয়ে দাঁড়ায় ১৮৫৭ এর সিপাহি বিদ্রোহ। আমরা এই প্রবন্ধের শুরুতে আধুনিককালে সাংবাদিকতার সূচনাকে সংক্ষেপে আলোচনা করব। যেহেতু বর্তমান প্রবন্ধে কেবল মুসলিম সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তাই ভারতবর্ষের সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বিষয়ের অসামঞ্জস্যতার কারণে বাদ গেছে। শিরোনামকে ধরে আমরা চেষ্টা করব আলোচনাটি পূর্ণাঙ্গ করার।

ভারতবর্ষে আধুনিক সাংবাদিকতার উত্থানপর্ব

১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে আইরিশ শল্যচিকিৎসক জেমস অগস্টাস হিকির মাধ্যমে প্রকাশিত হয় হিন্দুস্তানের প্রথম কাগজে মুদ্রিত ও প্রথম ইংরেজি পত্রিকা হিকিজ বেঙ্গল গেজেট। ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি বেঙ্গল গেজেটের প্রকাশনা শুরু হয়। শুরুতে তিনি নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করতেন। পরবর্তীতে ইংরেজ গভর্ণর ওয়ারেন হেস্টিংসের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ হওয়াতে তার সংবাদপত্রটি  হুমকির মুখে পড়ে। হিকির পত্রিকা ডাক মারফত পাঠানো নিষিদ্ধ করেন হেস্টিংস। এদিকে হিকিও হেস্টিংসের এই আদেশকে স্বৈরাচারী আখ্যা দেওয়ার সাথে কলকাতার কিছু ব্রিটিশ নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তুলে আনেন। ইংরেজ গভর্ণরের হস্তক্ষেপে আইনি রোষানলে পড়ে হিকি। হেস্টিংসের তৈরি নতুন আইনি প্রক্রিয়ায় না পেরে তাকে কারাবরণ করতে হয় ও সবশেষে ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মার্চ বেঙ্গল গেজেটের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ইংরেজবিরোধীতার ফলে দু-বছরের মাথায় ভেঙে পড়ে আধুনিককালের প্রথম মুদ্রিত পত্রিকাটির কাঠামো। বেঙ্গল গেজেট ওয়ারেন হেস্টিংসের হস্তক্ষেপে বন্ধ হলেও ভারতীয়দের মাঝে ব্যাপকভাবে সংবাদপত্র প্রকাশনায় প্রভাব ফেলে। হিকির প্রিন্টিং অফিস ব্যবহৃত হয় পরবর্তীদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে। বেঙ্গল গেজেটের একটি দুর্বল ফাইল ব্রিটিশ মিউজিয়াম লন্ডন ও ন্যাশনাল লাইব্রেরী কলকাতায় সংরক্ষিত রয়েছে। বেঙ্গল গেজেট থেকে শুরু করে সিপাহি বিপ্লব পর্যন্ত ভারতের সংবাদপত্রের ইতিহাসকে তিনটি কালবিভাগ করা যায়।

প্রথম পর্ব : ১৭৮০ থেকে ১৮১৮

এই উনচল্লিশ বছর সাংবাদিকতায় ইংরেজদের একচেটিয়া কতৃত্ব ছিল। হিকির বেঙ্গল গেজেটের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কোম্পানি গভর্মেন্ট কলকাতা থেকে ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ নভেম্বর সাপ্তাহিক ইন্ডিয়া গেজেট প্রকাশিত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুই কর্মচারী বার্নার্ড মেসিঙ্ক ও পিটার রিডের মাধ্যমে এই পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ভারতবর্ষে মুদ্রিত দ্বিতীয় সংবাদপত্র।  ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন সনদ মঞ্জুর করা হয়। ব্রিটিশ কতৃপক্ষ কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার কেড়ে নেয়। ফলে কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য বাণিজ্য সংস্থা ভারতে আসতে থাকে ও সবাই নিজ স্বার্থে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে। এই পর্বের শেষদিকে ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন থেকে প্রেস বের হয় প্রথম বাংলা সাময়িকী দিগদর্শন। এটি ছিল একটি মাসিক সাময়িকী। বিখ্যাত খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক জোশুয়া মার্শম্যানের পুত্র জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় পরিচালিত হতো দিগদর্শন। এই পত্রিকাতে লিখতেন ড. উইলিয়াম কেরি, মি. ওয়ার্ড, মার্শম্যানসহ অন্যান্য মিশনারিরা। ভারতীয়দের মধ্য থেকে রামমোহন রায়ের মতো পণ্ডিতরাও লিখতেন। মূলত বিভিন্ন বিষয়ের অন্তরালে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারই মুখ্য ছিল। শ্রীরামপুর মিশন যখন দেখল, দিগদর্শন প্রকাশে ভারতীয়দের কোনো আপত্তি নেই, তখন তারা সুযোগ বুঝে আরেকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। একই বছরের ২৩মে প্রকাশিত হলো প্রথম বাংলা সংবাদপত্র সমাচার দর্পণ। নামেমাত্র সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান, মূলত উভয় পত্রিকা পরিচালিত হতো ড. উইলিয়াম ক্যারি, মি. ওয়ার্ড ও জোশুয়া মার্শম্যানদের সম্মিলিত তত্ত্বাবধানে। সমাচার দর্পণ কেবল খ্রিষ্টধর্ম প্রসারেই মনোযোগী হলো। এই পত্রিকাটির মাধ্যমেই শিক্ষিতশ্রেণির বাঙালিরা প্রথম গদ্যরচনার রস গ্রহণ করলো। সমাচার দর্পণ জনপ্রিয়তা পাবার ফলে বাংলা ভাষায় আরও পত্রিকা প্রকাশ পেতে থাকল।

দ্বিতীয় পর্ব : ১৮১৮ থেকে ১৮৩৫

এই পর্বে কেবল ইংরেজ নয়, ভারতীয়রাও প্রবলভাবে সংবাদপত্র প্রকাশে এগিয়ে আসে। ১৮১৮-তে প্রকাশিত হয় আধুনিককালের প্রথম ভারতীয় পত্রিকা গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য সম্পাদিত বাঙ্গাল গেজেটবাঙ্গাল গেজেট একইসাথে প্রথম কোনো বাঙালির সম্পাদিত পত্রিকা। পত্রিকাটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য শ্রীরামপুরের নিকটবর্তী বহেরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের কম্পোজিটর হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি বাঙ্গাল গেজেট প্রেস প্রতিষ্ঠিত করেন। এই সময়ের মাঝেই ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের জোয়ার গতিশীল হয়। সংস্কারের ভাষ্য ধারণ করতে থাকে সংবাদপত্রগুলো। সামাজিক ও হিন্দুধর্মীয় রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে উদারপন্থি মনোভাব নিয়ে রাজা রামমোহন রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশনা শুরু হয় সম্বাদ কৌমুদী। তৎকালীন হিন্দু সমাজের কুসংস্কার দূর করতে সংস্কারমূলক জনমত গড়ে তোলায় সম্বাদ কৌমুদী অবদান রেখেছিল। সম্বাদ কৌমুদীর সম্পাদক ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম কথাসাহিত্যিক ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায়। সংস্কারপন্থি রাজা রামমোহন রায়ের সাথে মতপার্থক্যের ফলে ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে সম্বাদ কৌমুদী ছেড়ে ভবানী নিজে সমাচার চন্দ্রিকা নামে আরেকটি পত্রিকা প্রকাশ করেন।

১৮২৮ থেকে ১৮৩৫ পর্যন্ত সময়কালকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই সময়কালে ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশনা শুরু করে ইশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কতৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষার প্রথম দৈনিক পত্রিকা সংবাদ প্রভাকরসংবাদ প্রভাকর শুরুতে সাপ্তাহিক ছিল, আট বছর পর ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে এটি দৈনিক সংবাদপত্রে রূপান্তরিত হয়। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় প্রথম উর্দু পত্রিকা জামে জাহাঁ নুমা। একই বছর বের হয় রামমোহন রায়ের ফারসি পত্রিকা মিরাতুল আখবার। একই বছর মুম্বাই থেকে প্রকাশনা শুরু হয় প্রথম গুজরাটি পত্রিকা ফার্দুনজি মারজান কতৃক প্রতিষ্ঠিত বোম্বে সমাচার। এই পত্রিকা ভারতের প্রাচীনতম একটানা প্রকাশিত সবচেয়ে পুরোনো সংবাদপত্র, ২০০ বছর ধরে সগৌরবে যার কার্যক্রম বহমান। হিন্দি ভাষার প্রথম পত্রিকা উদন্ত মার্তন্ড বের হয় ৩১ মে ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে। এই পর্বের শেষদিকে ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় আধুনিককালে মুসলমানদের সর্বপ্রথম পত্রিকা সাপ্তাহিক আয়নায়ে সিকান্দার। কলকাতা থেকে ফারসি ভাষার এই পত্রিকাটি প্রকাশ করেন মৌলবি সিরাজ উদ্দিন। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে আগ্রা থেকে ফারসি ভাষার পণ্ডিত আলেম মুনশী ওয়াজেদ আলীর তত্ত্বাবধানে ফারসি ভাষায় আগ্রা আখবার বের হয়। ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে এর নাম বদলে যুবদাতুল আখবার করা হয়।

৩য় পর্ব : ১৮৩৫ থেকে ১৮৫৭

১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের অস্থায়ী গভর্ণর মেটকাফ ভারতীয় সংবাদপত্রকে স্বাধীনতা দেন। ১৮৫৭ এর বিপ্লব অবধি সংবাদপত্রের এ স্বাধীনতানীতি বহাল ছিল। এই সময়ে বিপুলহারে প্রকাশিত হতে থাকে উর্দু সংবাদপত্র। সংবাদপত্রের মাধ্যমে ইংরেজদের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে ভারতীয়দের। সংবাদপত্রের নীতিতে ভারতীয়দের উপর মেটকাফ কিছুটা শিথিল ছিলেন। এই শিথিলতা সিপাহি বিপ্লবের বীজ তৈরি করতে থাকে। আমরা পরের অধ্যায়গুলোতে এই সময়কালের উর্দু সংবাদপত্র ও সিপাহি বিদ্রোহ নিয়ে আলোচনা করব।

উর্দু সংবাদপত্রের গোড়াপত্তন

সংবাদ সংগ্রহের মাধ্যম

১৮৫৭ পর্যন্ত উর্দু সংবাদপত্রগুলোর সংবাদ সংগ্রহের চারটি মাধ্যম ছিল :

১.        সরকারি ঘটনালেখকদের হাতে লেখা নথিপত্র—যা বিভিন্ন দরবার থেকে প্রস্তুত হতো।

২.        ইংরেজি পত্রিকা—যা সম্পূর্ণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতি অনুরাগী ছিল।

৩.        নিজস্ব সাংবাদিক—যারা ঘুরে ঘুরে কারো মধ্যস্ততা ছাড়া সংবাদ সংগ্রহ করত।

৪.        সমকালীন উর্দু-ফারসি পত্রিকা—সেকালে সংবাদ নকল করার প্রচলন ছিল ব্যাপক।

২৭শে মার্চ ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে প্রকাশ হতে থাকে উর্দুভাষার প্রথম পত্রিকা জামে জাহাঁ নুমা। এর মালিক ছিল হরিদত্ত। পরিচালক ছিল সদাসিখলাল। পত্রিকাটির লক্ষ্য ইংরেজবিরোধীতা ছিল না। সাপ্তাহিক জামে জাহাঁ নুমায় রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধ-শাস্তি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে সংবাদ প্রচার হতো। শুরুরদিকে এই পত্রিকাটি ইংরেজ বাণিজ্যকুঠির নিয়ন্ত্রণে ছিল, পরবর্তীতে রাজা রঞ্জিত সিংহের বিরুদ্ধে লেখা প্রকাশের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। জামে জাহাঁ নুমা বন্ধ হবার পর থেকে দিল্লি উর্দু আখবারের সূচনাকাল পর্যন্ত কোনো নিয়মতান্ত্রিক প্রকাশিত উর্দু পত্রিকার খোঁজ পাওয়া যায় না।

টিপু সুলতানের ফৌজি আখবার প্রসঙ্গ

কলকাতা থেকে প্রকাশিত জামে জাঁহা নুমাকে প্রথম উর্দু সংবাদপত্র বলে গবেষকরা উল্লেখ করেন। তবে কিছু গবেষকদের মতে এর আগেই টিপু সুলতান কতৃক প্রকাশিত ফৌজি আখবারকে প্রথম উর্দু সংবাদপত্র বলে আখ্যায়িত করা হয়। গুরবচন চন্দন তার জামে জাহাঁ নুমা গ্রন্থে লিখেছেন,

‘উর্দুতে প্রথম সংবাদপত্রের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে আরও একটি দাবি রয়েছে। সে দাবিমতে আঠারো শতকের শেষদিকে ১৭৯৪ এর আগেপরে মহিশূর থেকে টিপু সুলতানের ব্যবস্থাপনায় ফৌজি আখবার নামে পত্রিকা বের হতো।’

এছাড়া শেখ ইসমাঈল পানিপথি তাঁর গ্রন্থ উর্দু কা সবসে পহলা আখবার আওর টিপু সুলতান, ড. মুহাম্মদ সাদেক তাঁর হিস্টোরি অফ উর্দু লিটারেচর, সাঈদ আবদুল খালেক তাঁর মেসুর মে উর্দু গ্রন্থে টিপু সুলতানকে প্রথম উর্দু সাংবাদিকতার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে দাবি করেছেন।

১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর মহিশূর সালতানাতের ভার গ্রহণ করেন টিপু সুলতান। টিপু সুলতানের সাথে ফ্রান্সিসদের মিত্রতা ছিল। সে সুত্রে ফ্রান্সিসদের সাহায্যে ও কারিকুলামে ফৌজি আখবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে দাবি অনেকের। টিপু সুলতানকে উর্দু সাংবাদিকতার জনক বলে প্রথম দাবি করেছেন সাঈদ আবদুল খালেক। তার ভাষ্যমতে,

‘ফৌজি আখবার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল, যা মহিশূরের সরকারি প্রেস থেকে ছাপা হতো। এর বিতরণ টিপু সুলতানের ফৌজের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। এই সংবাদপত্রে ফৌজের খবরাখবর-নিয়মনীতি ছাড়াও ইংরেজদের সমালোচনা ও ফ্রান্সিসদের প্রশংসা করা হতো। টিপু সুলতানের শাহাদাতের পর এই পত্রিকার ছাপাখানা সিলগালা করা হয় ও যেখানেই এর কপি ছিল—বাজেয়াপ্ত করা হয়।’

সাঈদ আবদুল খালেকের মেসুর মে উর্দু বইটি পড়ে গুরবচন চন্দন লেখেন,

‘৮০ পৃষ্ঠার ছোট এই পুস্তিকা লেখার সময় লেখক হায়দারাবাদে ছাত্র শিক্ষার্থী ছিলেন। লেখকের তথ্যসুত্র বেঙ্গালুরের এক বয়স্ক মুরব্বি, যিনি তার মরহুম দাদা থেকে শুনেছেন। এর সুত্রধরে তিনি কোন দলিল দস্তাবেজ পেশ করতে পারেননি। লেখকও এ কথা লিখেছেন, এই পত্রিকার কোনো কপি অবশিষ্ট পাওয়া যায়নি। ইংরেজরা ১৮৯৯ এ মহিশূর বিজয়ের পর সমস্ত তথ্য মুছে ফেলেছে।’

সাঈদ আবদুল খালেকের মতে ফৌজি আখবার পাঁচ বছর পর্যন্ত চলেছে। সরকারিভাবে ছাপা হবার পরও এত বিপুল সংখ্যক কপির একটিও কোথাও না পাওয়াতে অনেক গবেষকই অবাক হয়েছেন। কেবল শোনা কথার উপর অনির্ভরতার কারণে প্রসিদ্ধ ও আস্থাশীল গবেষকরাও এই ব্যাপারে চুপ থেকেছেন। টিপু সুলতানের শাসনামলে মহিশূরের সরকারি ভাষা ছিল ফারসি। সে যদি কোনো পত্রিকা বের করে, তা ফারসি ভাষাতেই হওয়া উচিত হবে। এরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই অমিমাংসিত থেকে গেছে শহীদ টিপু সুলতানের ফৌজি আখবার প্রসঙ্গটি। যদিও ইংরেজরা আরও অনেক পত্রিকার তথ্যও মুছে ফেলেছে, এ ব্যাপারটি অস্বাভাবিক কিছু নয়।

সিপাহি বিপ্লবে সাংবাদিকতার ভূমিকা

১৮৫৭-এর সিপাহি বিপ্লবের নেপথ্যে বহু কারণ ছিল। এর রাজনৈতিক কারণ যেমন ছিল; তেমনি সামাজিক, অর্থনৈতিক, সামরিক কারণও ছিল। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভারতীয়দের উপর ইংরেজরা এতদিনে আধিপত্যের আসনে বসেছে। ধর্মীয় রীতিনীতিতেও কোম্পানি আইন বাঁধা দিয়েছে। মূলত নানা ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে অনেক আগে থেকেই বিপ্লবের বিজ বপন হয়েছিল প্রজাদের মাঝে। ভারতীয় সিপাহিদের মাধ্যমে এর সুত্রপাত হলেও মূলত দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ প্রকাশের মোক্ষম সুযোগ ভেবে সর্বভারতীয় জনগণ এই অভ্যুত্থানে জড়িয়ে পড়ে। ১০শে মে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে এই বিপ্লবের সূচনা হয়। ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের পর এনফিল্ড রাইফেল তৈরি হয়। ব্রিটিশরা এই রাইফেল সিপাহিদের ব্যবহারের জন্য ভারতবর্ষে নিয়ে আসে। এর কার্তুজের উপরাংশে থাকা কাগজকে মসৃণ করার উদ্দেশ্যে গরু-শূকরের চর্বি ব্যবহার করতে হতো। সিপাহিদের জাতপাতের দিকে খেয়াল করে শুরুতে কোম্পানি এই কার্তুজ মেষের চর্বি দিয়ে তৈরি করল। তা হলো ব্যয়বহুল, তাই বিলেতি কায়দায় গো শুকরের চর্বি দিয়েই বানানো হতে থাকল কার্তুজ। দেশি ফৌজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, তারা যে রাইফেল ব্যবহার করে, এর কার্তুজে গরু-শুকরের চর্বি মিশ্রণ করা হয়। এই কার্তুজ ব্যবহারের আগে মুখ দিয়ে কাটতে হতো। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশি সিপাহিদের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। হিন্দুদের গোমাতার চর্বি ব্যবহার আর মুসলমানদের কাছে নিকৃষ্টতম প্রাণি শূকরের চর্বি মুখে নেওয়ার নীতিতে ক্ষোভে ফেটে পড়ল সবাই। ব্রাক্ষ্মণ, পুরোহিত আর মুসলমান—সব এক কাতারে ঐক্যবদ্ধ হলো ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। এই সময়ে সাংবাদিকতার নবপ্রভাত শুরু হলো। সংবাদপত্রে বিভিন্নভাবে প্রচার হতে থাকল, এই কার্তুজে যেন কোনো দেশি সৈনিক হাত না লাগায়। খ্রিষ্টবাদ প্রসারের অংশ হিসেবে ব্রিটিশরা এ কাজ করছে—এমন কথাও প্রচার হতে থাকল। যেহেতু সিপাহি বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র ছিল দিল্লি, তাই দিল্লির সেকালের সংবাদপত্রগুলোই বিপ্লবে অগ্রসরমান ভূমিকা রেখেছিল।

সিপাহি বিপ্লব চুড়ান্তরূপে আবর্তিত হবার আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে উর্দু পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। উর্দু সাংবাদিকতায় ততদিনে এসেছেন মৌলবি মুহাম্মদ বাকের। তিনি ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লি উর্দু আখবার শুরু করেন। চার বছর পর্যন্ত ব্যাপক সমৃদ্ধি নিয়ে তা প্রকাশিত হতে থাকে। ১৮৪১ এ আরেকটি পত্রিকা আলোচিত হয়, যা সাইয়েদ মুহাম্মদ খানের সাইয়েদুল আখবার। ১৮৩৭ থেকে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কমপক্ষে ১২১টি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। যার মাঝে দিল্লি থেকে সর্বোচ্চ ২৪টি, এরপর আগ্রা, মাদ্রাজ, লাহোর, বেনারস, মুম্বাই, লখনৌ, শিয়ালকোট থেকে পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে। আমরা সিপাহি বিপ্লবে ভূমিকা রাখা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পত্রিকা নিয়ে সামান্য আলোকপাত করব।

দিল্লি উর্দু আখবার

মাওলানা বাকের দেহলবি, যিনি মৌলবি মুহাম্মদ বাকের নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন সিপাহি বিপ্লবের শহিদ সাংবাদিক। ইরানী বংশোদ্ভূত মৌলবি বাকের ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ের। পেশায় দিল্লি কলেজের শিক্ষক ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত দিল্লি উর্দু আখবার সিপাহি বিপ্লবকালে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাহী মহলেও জনপ্রিয় ছিল। দিল্লি উর্দু আখবারের যাত্রা কত সালে শুরু হয়েছিল তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। ১৮৩৬, ১৮৩৭ বা কেউ বলেছেন ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দ। মৌলবি বাকেরের পুত্র মাওলানা হুসাইন আজাদ তাঁর আবে হায়াত গ্রন্থে এই পত্রিকার শুরু ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দ লিখেছেন। সাপ্তাহিক পত্রিকাটির প্রথম পৃষ্ঠায় ‘হুজুরওয়ালা’ শিরোনামে মুঘল বাদশাহ ও শাহজাদাসহ শাহী মহলের যাবতীয় খবর প্রকাশ হতো আর ‘সাহেবে কালান’ শিরোনামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খবর ছাপা হতো। দেশ বিদেশের সংবাদের সাথে থাকত সাহিত্যের পাতা। সেখানে ছাপা হতো যওক্ব, মির্জা গালিব ও মুমিনের গজল। শুরুরদিকে দিল্লি উর্দু আখবারে কোম্পানিবিরোধী প্রতিক্রিয়া না থাকলেও ধীরে ধীরে সিপাহি বিপ্লবের সাথে তাল মিলিয়ে এর ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হয়। সিপাহি বিপ্লবের স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া ঘটে ১০মে মিরাঠে। ১১মে সিপাহিরা দিল্লিতে পৌঁছে। এরপর দিল্লি শহর হাঙ্গামায় জড়িয়ে যায়। ১৭মে দিল্লি উর্দু আখবারের সংখ্যা বের হয়, যার পাতাগুলো বিদ্রোহের সংবাদে পূর্ণ ছিল। কুরআনের আয়াত দিয়ে শুরু হওয়া সংখ্যাটিতে ধারাবাহিকভাবে বিপ্লবের খবর ও ব্যাপকভাবে বিদ্রোহে অংশগ্রহণের প্রতি আগ্রহী করে তোলার আহ্বান ছিল। লড়াইরত সিপাহিদের ভেতরে উদ্দীপনা তৈরিতে প্রকাশিত হতো প্রেরণাবাণী। যেমন ২১শে জুন ১৮৫৭ সংখ্যায় লেখা হয়েছিল,

‘তোমাদেরও ইতিহাস স্বরণ রাখবে, কতটা বিরত্বের সাথে তোমরা সাম্রাজ্যবাদীদের অহংকে গুড়িয়ে দিয়েছ, ফেরাউনি শাসন ও শাদ্দাদি হিংসাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছ।’

মৌলবি বাকেরের তৎপরতায় বাহাদুর শাহ জাফর অত্যান্ত খুশি হন ও ১২ই জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লি উর্দু আখবারের নাম বদলে আখবারুজ জফর রাখা হয়। পত্রিকাটির শেষ দশটি সংখ্যা এই নামেই ছাপা হয়েছিল। বাহাদুর শাহ জাফর ও লালকেল্লার সাথে দিল্লি উর্দু আখবারের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক মিলে একটি কেন্দ্র তৈরি হয়। তখন পত্রিকায় দিল্লি, মিরাঠ, সাহারানপুর, আম্বালা ও অন্য এলাকার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর প্রকাশ হতো। মৌলবি বাকেরের সংবাদ-সংগ্রহের নেটওয়ার্ক ছিল খুবই তুখোড়। দুরদরাজের খবর তার কাছে মুহুর্তেই চলে আসত। সিপাহি বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশরা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগাতে চেয়েছিল, তখন এর বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ কলম ধরেছেন মৌলবি বাকের। তিনি হিন্দু ও মুসলিমকে একত্রিত করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। কৌশলগত কারণে বাহাদুর শাহ জাফর সে বার ঈদুল আজহাতেও গরু কোরবানি করেননি, যাতে হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তুলতে ব্রিটিশরা সুযোগ না পায়।

সাংবাদিকতা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলার এ যুদ্ধে শেষমেশ ব্রিটিশরাই জয়ী হয়। সংঘবদ্ধতা, নেতৃত্বের অভাবে হিন্দুস্তানিরা পরাজিত হয়। চারমাস পর যখন দিল্লি পুনরায় ব্রিটিশরা দখল করে, মৌলবি বাকেরের উপর হত্যার অভিযোগ দাখিল করে তাকে গুলি করে শহিদ করা হয়। মৌলবি বাকেরকে হিন্দুস্তানের প্রথম শহিদ সাংবাদিক বলে আখ্যায়িত করা হয়। তার ছেলে মাওলানা হোসাইন আজাদ লাহোরে চলে যান ও দেশখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক হয়ে উঠেন। মৌলবি বাকেরকে হত্যাকারী উইলিয়াম স্টিফেন রাইকসন এর একবছর পর ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে লখনৌতে অজ্ঞাত ব্যক্তির গুলিতে নিহত হয়।

মৌলবি বাকেরের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আরেকটি মত পাওয়া যায়। মৌলবি বাকেরের নাতি আগা মোহাম্মদ বাকেরের বর্ণনায়—দিল্লি কলেজের প্রিন্সিপাল মিস্টার টেলর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। যখন দিল্লিতে বিপ্লবী সিপাহিরা প্রবেশ করল, তখন টেলর নিজের জীবন রক্ষার্থে কলেজের কিছু প্রয়োজনীয় কাগজ নিয়ে মৌলবি বাকেরের ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেখানে চারদিন লুকিয়ে থাকে। বিপ্লবী সিপাহিরা জেনে যায় তার অবস্থানের কথা ও মৌলবি বাকেরের ঘরে নানাভাবে তাকে ধরার চেষ্টা করে। পরেরদিন মাস্টার টেলর বাকেরের ঘরে নিজেকে অনিরাপদ ভেবে ইংরেজ সৈন্যদের সাথে মিলিত হবার উদ্দেশ্যে বের হয়। সে মৌলবি বাকেরকে কিছু কাগজ বুঝিয়ে দেয় যাবার আগে। মাস্টার টেলর কিছুদূর গিয়েই সিপাহিদের হাতে ধরা পড়লে তাকে হত্যা করা হয়। যখন দিল্লি ইংরেজরা দখল করে, মৌলবি বাকের মাস্টার টেলরের নির্দেশনা অনুযায়ী সেই কাগজগুলো নিয়ে ইংরেজ অফিসারদের কাছে যান। ইংরেজরা কাগজগুলো পড়ে জানতে চান টেলর কোথায়? টেলরের মৃত্যুর খবর শুনেই মৌলবি বাকেরকে গ্রেফতার করা হয় ও দু-চারদিন পর শহিদ করা হয়। স্যার আবদুল কাদের মাওলানা হুসাইন আজাদের বরাতে এ তথ্য দিয়েছেন, টেলরের সে কাগজগুলোই মৌলবি বাকেরের মৃত্যুর নির্দেশনা ছিল। ল্যাটিন ভাষায় সেখানে টেলর লিখেছিলেন, ‘মৌলবি বাকের শুরুতে আমাকে তার ঘরে জায়গা দিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সাহস ছেড়ে দেয় ও আমার জীবন বাঁচাতে কোন চেষ্টা করে না।’

ইমদাদ সাবেরি এই ঘটনাকে সামান্য ভিন্নভাবে ব্যখ্যা করেছেন। টেলর ছিল দিল্লি খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রতিনিধি। স্বীয় কাজকর্মে কথাবার্তায় হিন্দুস্তানিদের খ্রিষ্টান বানানোর উদ্দেশ্য লালন করত। মৌলবি বাকের খ্রিষ্টান মিশনারির ঘোর বিরোধী ছিলেন ও এর বিরুদ্ধে লেখালিখি করতেন। টেলর এ বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। দুজনের মাঝে এই ব্যাপারটি নিয়ে শত্রুতা তৈরি হয় ও সিপাহি বিপ্লব চলাকালীন মাওলানা বাকেরের ঘরে আশ্রয় নিলে মাওলানা শত্রুতাবশত তাকে বের করে দেন। এরপরই সিপাহিরা তাকে হত্যা করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মত থাকলেও এটা স্পষ্ট, মৌলবি বাকের সত্য ও সাহসী সাংবাদিকতা, ইংরেজ বিরোধীতা, খ্রিষ্টবাদের বিরুদ্ধাচরণ বা মুঘল সাম্রাজ্যের ঘনিষ্ঠতার জন্য নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেছেন।

মৌলবি বাকেরকে শিয়া সম্প্রদায়ের মুজতাহিদ আলেম বলে দাবি করা হয়। সাংবাদিকতার জীবনে মৌলবি বাকের কট্টরপন্থি ছিলেন না। সব মতাদর্শকে সমন্বয় করে সাংবাদিকতাকে ভিন্ন এক মাত্রা দিয়েছিলেন। শিয়া মতাদর্শের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার রচিত বইপুস্তক প্রকাশিত হতো জাফরিয়্যা প্রেস থেকে। দিল্লি উর্দু আখবার প্রেস থেকে নিজ মতাদর্শের প্রসার না ঘটিয়ে অসাম্প্রদায়িক মতকে সামনে রাখতেন। দিল্লি উর্দু আখবারে কখনও শিয়া-সুন্নি বিভেদ বা এ ধরণের গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মতানৈক্যের সংবাদ প্রকাশ হতো না, ইংরেজদের বিরুদ্ধে সব মতাদর্শের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করায় অবদান রেখেছিল পত্রিকাটি। ইমদাদ সাবেরি তার তারিখে সাহাফাত গ্রন্থে লেখেন,

‘মাওলানা বাকের শিয়া ছিলেন, তবুও সেকালের সুন্নী উলামায়ে কেরামরা তাকে শ্রদ্ধা করতেন।’

দিল্লি উর্দু আখবারের কপি ন্যাশনাল আর্কাইভজ দিল্লি, ইদারায়ে আদাবিয়্যাতে উর্দু হায়দারাবাদ, উসমানিয়া ইউনিভার্সিটি ও মাওলানা আজাদ লাইব্রেরী আলিগড়ে আজও সংরক্ষিত রয়েছে।

সাইয়েদুল আখবার

সাপ্তাহিক এই পত্রিকাটি দিল্লি থেকে ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাইয়েদ মোহাম্মদ খান। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাকালে স্যার সৈয়দের বয়স ছিল সতেরো বা আঠারো। স্যার সৈয়দের লেখালিখির সূচনাও এই পত্রিকার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তার কালজয়ী গ্রন্থ আসারুস সানাদিদের প্রথম এডিশন সাইয়েদুল আখবারের প্রেস থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল। সিপাহি বিপ্লবের পূর্বে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোর মাঝে সাইয়েদুল আখবারের সাথে মির্জা গালিবের বিশেষ সম্পর্ক ছিল।

সাদেকুল আখবার

সাদেকুল আখবার নিয়ে বিস্তারিত বলার আগে জানতে হবে, এই নামে গবেষকরা পাঁচটি পত্রিকাও পেয়েছেন। অনেকে দুটির কথা লিখেছেন। এই নামে একই সময়ের দুটি সংখ্যা দিল্লি ন্যাশনাল আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে। আবদুস সালাম খুরশিদ সাহাফাত পাকিস্তান ও হিন্দ মে গ্রন্থে সাদেকুল আখবার সম্পর্কে লেখেন,

‘সাদেকুল আখবার নামে দিল্লি থেকে সম্ভবত চারটি পত্রিকা বের হতো। প্রথমটি ফারসিতে বের হতো, পরবর্তীতে উর্দুতে বের হয়। দ্বিতীয়টি ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মুসতফা খানের ব্যবস্থাপনায় বের হয়। তৃতীয়টি ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে জামিল উদ্দীন হাজারের ব্যবস্থাপনায় ও চতুর্থটি শেখ খোদা বখশের সম্পাদনায় ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এই সবগুলোর মাঝে জামিল উদ্দীন হাজারের সাদেকুল আখবারই অধিক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।’

ইমদাদ সাবেরি উর্দু কে আখবার নবিস গ্রন্থে সাদেকুল আখবার সম্পর্কে লেখেন,

‘দিল্লি থেকে ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে এক সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হয়, যার মালিক ও ব্যবস্থাপক সাইয়েদ জামিল উদ্দীন হাজার ছিল। এই পত্রিকা সেসময়ে উল্লেখযোগ্য ছিল। এতে দেশি বিদেশি খবর প্রকাশ পেত। এর মালিক দেশ ও জাতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা ধারণ করতেন। অন্যায় অনাচার ও গোলামিকে বরদাশত করতেন না। যখন ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহি বিপ্লব শুরু হলো, তখন সাদেকুল আখবার তার প্রতিটি পৃষ্ঠাকে যুদ্ধের খবরাখবরের জন্য ওয়াকফ করে দিলো। বিপ্লব ছাড়া অন্য প্রসঙ্গ ছাপা হতো না। মুজাহিদদের হিম্মত বাড়াতে বিভিন্ন অধ্যায় রচিত হতো।’

আমরা জামিল উদ্দীন হাজারের সাদেকুল আখবার নিয়েই আলোচনা করব। ১৮৫৭ এর প্রেক্ষাপটে পত্রিকাটির কথা অনিবার্য এবং পত্রিকাটি বাহাদুর শাহ জাফরের মোকাদ্দামায় পেশ করা হয়েছিল। সাদেকুল আখবারে এমন খবর প্রকাশ হতো, যার মাধ্যমে মানুষের মাঝে জিহাদের প্রতি জযবা তৈরি হতো, ইংরেজদের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হতো। সাদেকুল আখবার এমন একটি ফতোয়া প্রকাশ করেছিল, যাতে তৎকালীন ৩৫জন বিজ্ঞ আলেম ইংরেজদের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইকে জিহাদ বলে সাব্যস্ত করেছিলেন। ফতোয়াটি সাদেকুল আখবারের জিলহজ ১২৭৩ হিজরির ৪ নং সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ফতোয়াটিতে স্বাক্ষর করেছিলেন মাওলানা নুর জামাল, আবদুল করিম, সিকান্দার আলী, সাইয়েদ মুহাম্মদ নজির হুসাইন, মুফতি মুহাম্মদ সদরুদ্দীন, আহমাদ সাঈদ আহমাদি, মৌলবি আবদুল গণী, সাইয়েদ মাহবুব আলী জাফরী প্রমূখ।

১৮৫৭-এর বিপ্লবে পরাজিত হবার পর সাদেকুল আখবারের উপর মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারের অভিযোগ তোলা হয়। এর সম্পাদক জামিল উদ্দীন হাজারকে তিন মাসের কারাদন্ড দেওয়া হয়। জামিল উদ্দীন হাজারের পুরো জীবন সাংবাদিকতায় অতিবাহিত হয়েছে। কারাদণ্ড ভোগের পরও তিনি অব্যাহতভাবে সাংবাদিকতা করেছেন।

পয়ামে আজাদি

সিপাহি বিপ্লবে নবোদ্যম সৃষ্টি করেছিল পয়ামে আজাদি নামের একটি পত্রিকা। হিন্দু মুসলমানকে এক কাতারে একতাবদ্ধ করার প্রচেষ্টায় ১৮৫৭ এর ফেব্রুয়ারিতে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নাতি মির্জা বেদার বখতের সম্পাদনায় পয়ামে আজাদির গোড়াপত্তন হয়। এই পত্রিকাটির বিশেষ তত্ত্বাবধানে ছিলেন আজিমুল্লাহ খান। দেশ ও জাতির জন্য পয়ামে আজাদি উৎসর্গিত ছিল। হিন্দু মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ করে হিন্দুস্তান থেকে ব্রিটিশদের তাড়ানো ছিল তার লক্ষ্য। ইংরেজ ও হিন্দুস্তানি ঐতিহাসিকদের অনেকেই পয়ামে আজাদিকে ভারতীয়দের প্রথম জাতীয় পত্রিকা বলে দাবি করে থাকেন। সেসময়ে বাহাদুর শাহ জাফরের স্বাধীনতার ঘোষণাও ছাপা হতো পয়ামে আজাদিতে। এর একটি কপি থেকে লন্ডন টাইমস উদ্ধৃত করেছিল একটি ঘোষণাকে,

‘হিন্দুস্তানের হিন্দু মুসলিমরা উঠো! ভাইয়েরা জাগো! খোদা তাআলা মানুষকে যত বরকত দিয়েছেন, এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান বরকত হচ্ছে স্বাধীনতা। ওই জালেম ফিরিঙ্গি! যারা ধোকাবাজির মাধ্যমে আমাদের থেকে এই বরকত কেড়ে নিয়েছে। সবসময়ের জন্য কি তারা আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে?’

১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডন থেকে The Narrative of indian নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। এতে পয়ামে আজাদির একটি অংশ উদ্ধৃত করা হয়, যা রোহিলাখন্ডের প্লাটুনকে আজাদি আন্দোলনে শরিক হতে দরদি ভাষায় আহ্বান করা হয়—

‘ভাইয়েরা! দিল্লিতে ফিরিঙ্গিদের সাথে আজাদির লড়াই হচ্ছে। আল্লাহর দয়ায় প্রথমবার আমরা তাদের পরাজিত করার পর যে ধাক্কা তারা খেয়েছে, অন্য সময়ে দশবার হেরে গেলেও তারা এতটা বিচলিত হয় না। অগণিত হিন্দুস্তানি বাহাদুররা দিল্লিতে উপস্থিত হয়েছে। এই ঘোষণা পাঠের সময়ে যদি আপনারা খাবার খেতে থাকেন, তবে দিল্লিতে এসে হাত ধুবেন। আমাদের কান আপনাদের আগমনের সংবাদে এতটাই ব্যাকুল, যতটা ব্যাকুল থাকে রোজাদার মুয়াজজিনের আওয়াজে। আপনাদের তোপের শব্দে মুখরিত হতে আমরা মরিয়া। আমাদের দৃষ্টি আপনাদের আগমনের সড়কে লেগে আছে। আপনাদের উচিত, জলদি চলে আসুন।’

পয়ামে আজাদি হিন্দু মুসলিমের মাঝে একতাবদ্ধতা তৈরি করেছিল। হেনরি কটন তার indian and home memorise বইয়ে লিখেছেন,

‘ইংরেজরা যখন পুনরায় দিল্লির শাসন ফিরে পেলো, তখন খুঁজে খুঁজে ওইসব লোককে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, যাদের কাছে পয়ামে আজাদির একটি কপিও ছিল।’

উইলিয়াম হাওয়ার্ড তার ডায়েরিতে লিখেছেন,

‘দিল্লি দখলের পর পয়ামে আজাদির সম্পাদক মির্জা বেদার বখতের শরীরে শূকরের চর্বি মেখে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।’

পয়ামে আজাদির কোনো কপি সংরক্ষিত নেই বলে অনেকেই এর কথা এড়িয়ে গেছে। তবে এর প্রামাণিকতা পোক্তভাবেই মানুষের মাঝে গেঁথে আছে।

সিরাজুল আখবার

১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে ফারসি ভাষায় এর যাত্রা শুরু হয়। সিরাজুল আখবার ছিল মুঘল সম্রাটের দিনলিপি বা সরকারি গেজেট। আট পৃষ্ঠার এই পত্রিকাটির শেষ তিন পৃষ্ঠায় দেশি-বিদেশি উল্লেখযোগ্য সংবাদও স্থান পেত। সপ্তাহের রবিবারে এর নির্দিষ্ট সংখ্যক কপি ছাপা হতো ও সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে বিতরণ হতো। সিরাজুল আখবারের ব্যবস্থাপক ছিলেন মুসলেহ উদ্দীন সাইয়েদ আবুল কাসেম। সম্পাদনায় ছিলেন সাইয়েদ আওলাদ আলী বেগ, তিনি শেষ শাহী ওকায়ে নেগার (সংবাদ লেখক) ছিলেন। মুঘল বাদশাহদের রোজনামচা লেখার প্রচলন যুগ যুগ ধরে ছিল, যা সমৃদ্ধ করেছিলেন বাদশাহ আকবর।

কোহিনুর

সিপাহি বিপ্লবে উর্দু সাংবাদিকতার ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু সেকালে এমন পত্রিকাও ছিল, যার পাতায় আজাদি আন্দোলনের মুজাহিদদের ‘নিমকহারাম, গাদ্দার’ বলা হতো। নিজেদের ঐতিহাসিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও কোহিনুর ছিল ইংরেজদের পদলেহী মদদপুষ্ট এক পত্রিকা। ২০শে সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে যখন ইংরেজরা পুনরায় দিল্লি দখল করে, তখন দিল্লি বিজয়ের সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছিল এই কোহিনুর। এই পত্রিকা ইংরেজদের পক্ষপাতিত্বের ফলে দিনদিন উন্নতির শিখরে পৌঁছতে থাকল। প্রথমে সপ্তাহে একটি সংখ্যা বের হতো। ধীরে ধীরে সপ্তাহে দুটি করে সংখ্যা বেরোতে থাকল, এরপর তিনটি করে। এভাবেই এর সংখ্যা সমকালীন সব পত্রিকার সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেলো। সিপাহি বিদ্রোহকালে বড় বড় পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হলেও কোহিনুর প্রকাশ পেত স্বাভাবিকভাবেই। এরপরও কোহিনুরের পুরো কন্ট্রোল নিশ্চিত করতে এর উপর সেন্সর লাগিয়েছিল ইংরেজরা। কোহিনুর অবিভক্ত পাঞ্জাবের প্রথম উর্দু পত্রিকা ছিল। এর মালিক ছিল হরি শিখ রায়। ব্যবস্থাপনায় লালা জগত নারায়ন ও প্রিন্টিংয়ে মুন্সী নথু রাম আনন্দ ছিল। ১৮৯০ এ হরি শিখ রায়ের মৃত্যুর পর ধুকে ধুকে ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কোহিনুর প্রকাশিত হয়, এরপর বন্ধ হয়ে যায়।

১৮৫৭ এ উর্দু সংবাদপত্রগুলো ইংরেজ সাম্রাজ্যে এতটাই প্রভাব ফেলে যে, লর্ড ক্যানিং বাধ্য হয়ে সাংবাদিকতার উপর গেজিং এক্ট চালু করেন ও জুলুমের ভিন্ন পদ্ধতি শুরু হয়। গেজিং এক্টের অধীনে প্রত্যেকটি ছাপাখানার উপর লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক হলো। সিপাহি বিদ্রোহের মতো হিন্দুস্তানি সাংবাদিকতাও ইংরেজদের ভেতরে ভীতি সঞ্চার করেছিল স্পষ্টতই, এজন্য জোর জবরদস্তিমূলক সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ করতে গেজিং এক্টের ব্যবহার ঘটায়।

১৮৫৭ এর প্রতিনিধিত্ব করা সংবাদপত্রের অধিকাংশ ছিল শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের অনুগত। দিল্লির উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্রগুলোর সাথে মুঘল সম্রাটের যোগসুত্র ছিল। হিন্দুস্তানের মানুষ বৃদ্ধ বাহাদুর শাহ জাফরের ভেতর তখনও ক্ষীয়মাণ আশা দেখছিল। ইংরেজদের হটিয়ে আবার মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন আশা করছিল অনেকেই। সিপাহি বিপ্লবে পরাজয়ের সাথে সাথে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে চিরতরে। সেই সাথে এর সহযোগী উর্দু সাংবাদিকতারও চরম বিপর্যয় নেমে আসে। সামরিক বিদ্রোহের মাধ্যমে এই বিপ্লবের সূচনা হলেও খুব দ্রুত এর আগুন সাধারণ মানুষের মাঝে এমনভাবে ছড়িয়ে গিয়েছিল—যা অকল্পনীয় ছিল। ব্রিটিশরা এই গণ অভ্যুত্থানকে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ বলতে আগ্রহী হলেও অনেকে ১৮৫৭-এ ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের গোড়াপত্তন ঘটেছে বলে দাবি করে থাকেন।

সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল হিন্দু মুসলমানের একতাবদ্ধতা। সিপাহি বিদ্রোহের দ্বারা বোঝা যায়, ১৮৫৭ এর আগে ভারতবর্ষের রাজনীতি ছিল অসাম্প্রদায়িক। ব্রিটিশরা নানা উপায়ে এই একতাবদ্ধ বলয়কে ভেঙে দিতে চেয়েছে। সংবাদপত্রগুলো তাদের আশাকে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। ১৮৫৭-এ ব্যর্থতার নানামাত্রিক কারণ ছিল। নেতৃত্বহীনতা, সাংগঠনিক প্রাক-প্রস্তুতিহীনতা, বিভিন্ন স্থানে অভ্যুত্থানকারীদের মাঝে সংযোগ বিচ্ছিন্নতা প্রধানতম কয়েকটি কারণ। শিখ, গোর্খা ও রাজপুতরা ছিল ইংরেজদের পক্ষে, তাদের ব্যবহার করে স্বজাতিদের দমন করেছে ইংরেজরা। সিপাহি বিপ্লবের ফলাফল কেবল হিন্দুস্তানের মানুষ নয়, সাংবাদিকতাকেও ভুগিয়েছে। ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে উর্দু পত্রিকার সংখ্যা ছিল ৩৫ আর সিপাহি বিপ্লবে পরাজয়ের পর এর সংখ্যা ১২তে এসে দাড়ায়। এর ৬টি ছিল নতুন প্রকাশিত। এর একটিই কেবল কোনো মুসলমানের অধিকৃত ছিল। চেতনা ও আদর্শের প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবেই উর্দু ও ফারসি ছাড়া অন্যন্য দেশি ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর উপর তেমন ঝড় বয়নি।

মুসলিম সাংবাদিকতার তিন দশক

১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে আয়নায়ে সিকান্দারের মাধ্যমে আধুনিক ভারতবর্ষে প্রথম কোনো মুসলিম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এই বছর থেকে সিপাহি বিপ্লব অবধি মোট ২৭ বছরে মুসলিমদের ৫৩টি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। যা উর্দু ও ফারসি ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই সময়কালকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায় :

১৮৩১ থেকে ১৮৪০

এই দশকে ছয়টি পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে। যার চারটি ফারসি ও দুটি উর্দু :

১. আয়নায়ে সিকান্দার

মৌলবি সিরাজ উদ্দিন ফেব্রুয়ারি ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে ফারসি ভাষায় আয়নায়ে সিকান্দার প্রকাশ শুরু করেন। এই পত্রিকাটি মির্জা গালিবের আশির্বাদপুষ্ট ছিল। গালিবের ফারসি গজল ছাপা হতো। এর বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল, প্রত্যেক সংবাদের শেষে একটি করে শের লেখা থাকত।

২. যুবদাতুল আখবার

১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে আগ্রা থেকে মুনশি ওয়াজেদ আলী ফারসি ভাষায় এই পত্রিকাটি প্রকাশ শুরু করেন। এর পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকজন রাজা ও নবাব শামিল থাকায় আর্থিক দিক থেকে ভালো অবস্থায় ছিল পত্রিকাটি। ওয়াজেদ আলী ছিল সচেতন সম্পাদক। ঝুকিপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ করতেন না। ইংরেজি পত্রিকাগুলোকে উৎস বানিয়ে চলতেন।

৩. মাহে আলম আফরোজ

জুন ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে মৌলবি ওয়াহাজ উদ্দিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এতে সাধারণ সংবাদের পাশাপাশি ইংরেজ অফিসার কতৃক জুলুম নির্যাতনের খবরাখবরও প্রকাশ হতো।

৪. সুলতানুল আখবার

এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি আগস্ট ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ফারসি ভাষায় রজব আলী লখনবি কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। অন্য পত্রিকাগুলোর সাথে এর বিশেষ পার্থক্য হলো, যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা ছিল ভয়ানক ঝুঁকির কাজ—তখন সুলতানুল আখবার সাহসের সাথে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সত্য বলেছে।

৫. দিল্লি উর্দু আখবার

মাওলানা হুসাইন আজাদের বাবা মৌলবি মুহাম্মদ বাকের ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লি থেকে প্রথম প্রকাশ করেন। ৩রা মে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে এর নাম দিল্লি আখবার থেকে দিল্লি উর্দু আখবার রাখা হয়। মৌলবি বাকের প্রথম শহিদ সাংবাদিক ছিলেন।

৬. সাইয়েদুল আখবার

স্যার সৈয়দ আহমদ খানের ভাই সাইয়েদ মুহাম্মদ খান ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লি থেকে মুসলিমদের দ্বিতীয় পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ খান ইন্তিকাল করলেন। এরপর থেকে সাইয়েদুল আখবারের দেখাশোনা স্যার সৈয়দ আহমদ করেন। স্যার আবদুল কাদেরের মতে—স্যার সৈয়দ আহমদ খানের সাংবাদিকতা শেখার মৌলিক ভিত্তি গড়েছে সাইয়েদুল আখবার। স্যার সৈয়দের সাথে মির্জা গালিবের বন্ধুত্ব ছিল। এজন্য সাইয়েদুল আখবারে গালিবের শের যথোপযুক্ত গুরুত্বের সাথে প্রকাশ হতো।

১৮৪১ থেকে ১৮৫০

এই দশকে প্রায় তেইশটি পত্রিকা বের হয়েছে। ইংরেজদের নিপীড়ন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল, এর সাথে মুসলমানদের মাঝে যে ক্ষোভ ও বিদ্রোহের শিখা জ্বলে উঠেছিল, তার প্রতিকৃতি ভেসে উঠে সেকালের সংবাদপত্রে।

১. মহরে মুনীর

ফারসি ভাষায় কলকাতা থেকে ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে ১লা জানুয়ারি থেকে প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদক ছিলেন মুহাম্মদ আলী। এক সপ্তাহে তিনবার প্রকাশিত হতো পত্রিকাটি।

২. সিরাজুল আখবার

দিল্লির এই সাপ্তাহিক ফারসি পত্রিকার সূচনা হয় ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে। এটা ছিল শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারের সরকারি গেজেট। এর পৃষ্ঠা হতো আটটি। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় বাদশাহর দিবারাত্রির সংবাদ ও বাকি পৃষ্ঠাগুলোতে দেশের খবরাখবর প্রকাশ হতো।

৩. আহসানুল আখবার

৯ই নভেম্বর ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এর যাত্রা শুরু হয়। মুম্বাই থেকে ফারসি ভাষায় এটা প্রকাশ হতো। মুঘল দরবারের খবর এতে গুরুত্বের সাথে রাখা হতো। এর সম্পাদকের নাম পাওয়া যায়নি।

৪. সাদেকুল আখবার

এই নামে প্রায় পাঁচটি পত্রিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। দিল্লি থেকে সাদেকুল আখবার নামে ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে শেখ এমদাদ হুসাইনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। জানুয়ারি ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় সাদেকুল আখবার শেখ খোদা বখশ প্রকাশ করেন। আতিক সিদ্দিকির মতে উভয়টি উর্দু ভাষায় ছিল।

৫. করিমুল আখবার

মৌলবি করিম উদ্দিন তার নামের নিসবতে ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লি থেকে উর্দুতে করিমুল আখবার প্রকাশ করেন।

৬. আসআদুল আখবার

১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দে মে মাসে আগ্রা থেকে কামরুদ্দিন সাপ্তাহিক উর্দু পত্রিকা আসআদুল আখবার শুরু করেন। এই পত্রিকা শাহী চিকিৎসক হাকিম আহসানুল্লাহর সৌজন্যে দিল্লি কেল্লার সুলতানি প্রেস থেকে ছাপা হতো।

এছাড়াও মাদ্রাজ থেকে আ’জমুল আখবারতাইসিরুল আখবার, শিমলা থেকে শিমলা আখবার, লাহোর থেকে দরইয়ায়ে নুর প্রকাশিত হয়েছে।

১৮৫০ থেকে ১৮৫৭

এই সাত বছরে মুসলিম সাংবাদিকদের প্রায় ২৫টি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। এতদিনে ইংরেজদের প্রতি ক্ষোভ চুড়ান্তে পৌঁছেছে মানুষের মাঝে। বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সেকালের প্রায় সব পত্রিকাতে। এই তিনটি দশকের সবগুলো পত্রিকার তালিকা প্রবন্ধের শেষাংশে যুক্ত করা হলো।

১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৭ এর সিপাহি বিপ্লব পর্যন্ত প্রকাশিত মুসলিম পত্রিকার তালিকা :

১. সাপ্তাহিক আয়নায়ে সিকান্দার (ফারসি), মৌলবি সিরাজুদ্দিন সম্পাদিত, কলকাতা, ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দ

২. সাপ্তাহিক যুবদাতুল আখবার (ফারসি), মুনশী ওয়াজেদ আলী সম্পাদিত, আগ্রা, ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ

৩. সাপ্তাহিক মাহে আলম আফরোজ (ফারসি), মৌলবি ওয়াহাজ উদ্দিন সম্পাদিত, কলকাতা, ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ

৪. সাপ্তাহিক সুলতানুল আখবার, রজব আলী হুসাইনী সম্পাদিত, কলকাতা, ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দ

৫. সাপ্তাহিক দিল্লি উর্দু আখবার, মৌলবি মুহাম্মদ বাকের সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দ

৬. সাপ্তাহিক সাইয়েদুল আখবার, সাইয়্যেদ মুহাম্মদ খান সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দ

৭. সাপ্তাহিক মহরে মুনির (ফারসি), মুহাম্মদ আলী সম্পাদিত, কলকাতা, ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ

৮. সাপ্তাহিক সিরাজুল আখবার (ফারসি), মুসলেহুদদৌলা সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ

৯. মাসিক মাজহারুল হক, শেখ এমদাদ হুসাইন সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দ

১০. সাপ্তাহিক আহসানুল আখবার (ফারসি), মুম্বাই, ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দ

১১. সাপ্তাহিক করিমুল আখবার, মৌলবি করিম উদ্দিন, দিল্লি, ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দ

১২. সাপ্তাহিক আসআদুল আখবার, কামরুদ্দিন সম্পাদিত, আগ্রা, ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দ

১৩. সাপ্তাহিক শিমলা আখবার, শেখ আব্দুল্লাহ সম্পাদিত, শিমলা, ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দ

১৪. সাপ্তাহিক মাতলাউল আখবার, শেখ খাদেম আলী সম্পাদিত, আগ্রা, ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দ

১৫. সাপ্তাহিক আ’জমুল আখবার, মাদ্রাজ, ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দ

১৬. পাক্ষিক মি’ইয়ারুশ শুয়ারা, মৌলবি মুহাম্মদ আবুল হাসান সম্পাদিত, আগ্রা, ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দ

১৭. পাক্ষিক তুহফাতুল হাদায়েক, মুহাম্মদ জাফর ও আলী আলী নকি সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দ

১৮. সাপ্তাহিক মিফতাহুল আখবার, হাকিম মাহবুব আলী সম্পাদিত, মিরাঠ, ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ

১৯. সাপ্তাহিক তাইসিরুল আখবার, কলিম আব্দুল বাসেত, মাদ্রাজ, ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ

২০. সাপ্তাহিক কুতবুল আখবার, আগ্রা, ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ

২১. সাপ্তাহিক আখবারুন নাওয়াহ, আগ্রা, ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ

২২. জিয়াউল আখবার, শেখ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ

২৩. রঈসুল আখবার, আগ্রা, ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ

২৪. সাপ্তাহিক চশমায়ে ফয়েজ, মুনশী দেওয়ান চান্দ সম্পাদিত, শিয়ালকোট, ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ

২৫. সাপ্তাহিক রিয়াজুল আখবার, শিয়ালকোট, ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ

২৬. সাপ্তাহিক দরিয়ায়ে নুর, ফকির সিরাজ উদ্দিন সম্পাদিত, লাহোর, ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ

২৭. সাপ্তাহিক মুহতাশিমুল আখবার, মির্জা নাসরুল্লাহ বেগ সম্পাদিত, ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ

২৮. সাপ্তাহিক রিয়াজে নুর, মুনশী মেহেদী খান সম্পাদিত, মুলতান, ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ

২৯. সাপ্তাহিক নুরুন আলা নুর, মুহাম্মদ হুসাইন খাঁ সম্পাদিত, লুধিয়ানা, ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দ

৩০. আখবার বোম্বে, রহিম উদ্দিন সম্পাদিত, মুম্বাই, ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দ

৩১. কায়সারুল আখবার, হাকিম বাসেত হুসাইন সম্পাদিত, মাদ্রাজ, ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ

৩২. নুরুল আবসার, তাফাজজল হুসাইন সম্পাদিত, এলাহাবাদ, ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ

৩৩. সাপ্তাহিক জামেউল আখবার, সাইয়্যেদ রহমতুল্লাহ সম্পাদিত, মাদ্রাজ, ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ

৩৪. সাপ্তাহিক চশমায়ে খুরশিদ, লাহোর, ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ

৩৫. সাপ্তাহিক খুরশিদে আলম, দেওয়ান চান্দ সম্পাদিত, শিয়ালকোট, ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ

৩৬. সাপ্তাহিক নুরুল আখবার, মুহাম্মদ হাশেম সম্পাদিত, বিহার, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৩৭. সাপ্তাহিক ফাতহুল আখবার, উসমান খান সম্পাদিত, আলীগড়, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৩৮. সাপ্তাহিক সাদেকুল আখবার, মুসতফা খান সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৩৯. সাপ্তাহিক শিআয়ে শামস, গোলাম নাসির উদ্দিন, মুলতান, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৪০. যুবদাতুল আনওয়ার, আমজাদ আলী সম্পাদিত, আগ্রা, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৪১. সাদেকুল আখবার, মুসতফা খান সম্পাদিদ, দিল্লি, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৪২. হুমায়ে বে বাহা, মুনশী দেওয়ান চান্দ, লাহোর, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৪৩. সাপ্তাহিক ভিক্টোরিয়া পেপার, মুনশী দেওয়ান চান্দ সম্পাদিত, শিয়ালকোট, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৪৪. নুরে মাশরেকি, সাইয়্যেদ আমির আলী সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দ

৪৫. মাতলাউল আনওয়ার, মুনশী দেওয়ান চান্দ সম্পাদিত, গুজরাট, ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দ

৪৬. মাসিক মুয়াল্লিমে হিন্দ, মুহাম্মদ আহসান কিলানুভী সম্পাদিত, লাহোর, ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দ

৪৭. সাপ্তাহিক গুলশানে নওবাহার (ফারসি), আবদুল কাদের সম্পাদিত, কলকাতা, ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দ

৪৮. সাপ্তাহিক নিরে আজম, মুনশী মুহাম্মদ বখশ সম্পাদিত, আম্বালা, ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দ

৪৯. কাশফে আখবার, মুনশী গোলাম হোসাইন সম্পাদিত, মুম্বাই, ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দ

৫০. সাদেকুল আখবার, সাইয়েদ জামিল উদ্দিন সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দ

৫১. সাপ্তাহিক মুফাররিহুল কুলুব (ফারসি), মুখলেস আ’লা মাশহাদী সম্পাদিত, করাচী, ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ

৫২. সাপ্তাহিক মুরতাজাঈ (ফারসি), মুখলেস আ’লা মাশহাদী সম্পাদিত, পেশাওয়ার, ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ

৫৩. সাপ্তাহিক মাজহারুল আখবার, খাজা বাদশাহ ইবরত সম্পাদিত, মাদ্রাজ, ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দ

৫৪. আখবারে বিহার, মুহাম্মদ হাফেজুল হক সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ

৫৫. সাদেকুল আখবার, মুহাম্মদ সাদেক সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ

৫৬. মযাক, আব্দুল জলিল নোমানী সম্পাদিত, রামপুর, ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ

৫৭. সাপ্তাহিক লাহোর গেজেট, মুনশী দিদার বখশ সম্পাদিত, লাহোর ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ

৫৮. তাফরিহুন নাযিরিন, মির্জা আলী হুসাইন সম্পাদিত, আগ্রা, ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দ

৫৯. সাপ্তাহিক তলসম, মৌলবি মুহাম্মদ ইয়াকুব, লখনৌ, ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দ

৬০. মা’দিনুল কাওয়ানিন, সায়্যিদ হুসাইন উলবী, আগ্রা, ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দ

৬১. সাপ্তাহিক তাজুল আখবার, মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ খান, লখনৌ, ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দ

৬২. পয়ামে আজাদি, মির্জা বেদার বখত সম্পাদিত, দিল্লি, ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দ

৬৩. হাবিবুল আখবার

এই তালিকাটির কয়েকটি পত্রিকা এমন আছে, যার সম্পাদক ভিন্ন ভিন্ন নামে পাওয়া যায়। কয়েকটির প্রকাশের সালও এক বছর আগে-পরে পাওয়া যায়। কিছু পত্রিকার স্থান/সম্পাদকের নাম পাওয়া যায়নি, যতটা পেয়েছি ততটা এনেছি। মতানৈক্যের ভিড়ে আমি চেষ্টা করেছি যথাসম্ভব সঠিক তথ্যটি নির্ভরযোগ্য সুত্র থেকে গ্রহণ করার।

তথ্যপঞ্জি

১. তারিখে সাহাফাত, ইমদাদ সাবেরি, প্রকাশকাল ১৯৫৩

২. তারিখে সাহাফাত, ইফতেখার খুখড়, প্রকাশকাল ১৯৯৫, মুকতাদারা কওমী জবান, ইসলামাবাদ।

৩. হিন্দুস্তানি আখবার নওয়িসি : কোম্পানি কি আহদ মে, আতিক সিদ্দিকী, প্রকাশকাল ১৯৫৭, আঞ্জুমানে তরক্কিয়ে উর্দু আলীগড়।

৪. আহওয়ালে সাহাফাত, সুহাইল আঞ্জুম, প্রকাশকাল ২০১২

৫. রুহে সাহাফাত, ইমদাদ সাবেরি, মাকতাবায়ে শাহেরাহ, উর্দুবাজার দিল্লি।

৬. সাহাফাদ পাকিস্তান ও হিন্দ মে, আবদুস সালাম খুরশিদ, প্রকাশকাল ১৯৬৩ মজলিসে তরক্কিয়ে আদব লাহোর।

৭. ভারতের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ইতিহাস ১৭৮০-১৯৪৭, তারাপদ পাল, প্রথম প্রকাশ ১৯৭২, পত্র ভারতী, কলকাতা।

৮. উর্দু সাহাফাত আওর জঙ্গে আজাদি ১৮৫৭, মাসুম মুরাদাবাদী, প্রকাশকাল ২০০৮, খবরদার পাবলিকেসন্স দিল্লি।

৯. মেসুর মে উর্দু, মুহাম্মদ সাঈদ আবদুল খালেক, দরসগাহে উর্দু হায়দারাবাদ।

১০. দিল্লি মে উর্দু সাহাফাত কে ইবতেদাঈ নুকুশ : দিল্লি উর্দু আখবার, মুহাম্মদ ইউসুফ, প্রকাশকাল ২০০৮, এডুকেশনাল পাবলিশিং হাউজ, দিল্লি।

১১. উর্দু সাহাফাত আওর মৌলবি মুহাম্মদ বাকের দেহলবি, আদিল ফারাজ, আরশিয়া পাবলিকেশন্স দিল্লি।

১২. সিপাহি বিদ্রোহের ১৫০ বছর : একটি ঐতিহাসিক দলিল, কমল চৌধুরী সম্পাদিত, প্রকাশকাল ২০০৮, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স কলকাতা।

শেয়ার করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

প্রবন্ধ

হাকিমুল উম্মাত আশরাফ আলি থানবির পারিবারিক জীবন

মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ. বহুমাত্রিক জ্ঞানসাম্রাজ্যে বিচরণকারী আলেম ও পুরোদস্তুর খানকাহকেন্দ্রিক বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর…

4 January, 2026
আরও পড়ুন