সূচীপত্র

প্রবন্ধ

ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনামলে সাংবাদিকতা

23 December, 2025

সভ্যতা-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশজুড়ে রয়েছে সাংবাদিকতার প্রভাব। পৃথিবীর আদিকাল থেকে সংবাদ আদানপ্রদানের রীতি পরিলক্ষিত হয়। সময়ে সময়ে তার আদল বদলেছে মাত্র। উপমহাদেশে ব্রিটিশদের হাতে মুদ্রণশিল্পের প্রবর্তনের পর আধুনিক সাংবাদিকতার সূচনা হয়। কিন্তু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন মুসলিমশাসিত ভারতবর্ষে নানাভাবে সাংবাদিকতার চর্চা হয়েছে। শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে শাসকগণ সাংবাদিকতার গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং এর বিকাশে বহুমাত্রিক ভূমিকা রাখেন। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করবো, প্রাক আধুনিককালে সাংবাদিকতার ধরন ও প্রকরণ নিয়ে।

সুলতানি আমলে সাংবাদিকতা

১২০৬ থেকে ১২১০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির প্রথম সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের শাসনামল ছিল। ইতিহাসগ্রন্থে সে আমলের ডাকব্যবস্থার ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি আরবদের অনুকরণে দিল্লি থেকে বাংলা পর্যন্ত অশ্বারোহী দূতের মাধ্যমে এক ধরনের ডাকব্যবস্থা চালু করেন। সে যুগে সংবাদ বহনকারীকে বলা হতো কাসিদ। এই ব্যবস্থার সংস্কার করে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি সর্বপ্রথম ডাকচৌকি স্থাপন করেন। তিনি ১২৯৬ সালে অশ্বারোহী ও পদাতিক ডাকবাহকের সাহায্যে তথ্য পরিবহণের ব্যবস্থা চালু করেন। তার সময়ে ডাক বিভাগকে বলা হতো মাহকামা-ই-বারিদ। এই বিভাগ পরিচালনা করত অভিজ্ঞ দুজন কর্মকর্তা। প্রধান কর্মকর্তাকে মালিক বারিদ-ই-মামালিক এবং তার সহযোগীকে নায়েব বারিদ-ই-মামালিক বলা হতো। তিনি প্রতিটি শহরে সংবাদলেখক (মুন্সি) নিয়োগ করতেন।

সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে (১৩২৫-১৩৫১) দিল্লিতে প্রথম স্থাপিত হয় হস্তচালিত ছাপযন্ত্র বা প্রেস মেশিন। এটা ছিল এই উপমহাদেশের প্রথম প্রেস। চীনের কুবলাই খানের অনুসরণ করে মুহম্মদ বিন তুঘলকও কাগজের নোট চালু করেন। দিল্লিতে স্থাপিত কাঠের প্রেসে ছাপা হতো সেই কাগজের নোট। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সময়ে পূর্বের ডাকব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। একে আরও সন্নিবেশিত করে দু-ভাগে বিভক্ত করা হয় : ১. অশ্বারোহী বাহিনী ২. পদাতিক বাহিনী। পদাতিক বাহিনীকে বলা হতো রানার। রানাররা খবরের বোঝা নিয়ে পর্যায়ক্রমে এক চৌকি থেকে অন্য চৌকিতে ছুটে চলত। সিন্ধু থেকে দিল্লি পৌঁছতে সাধারণত পঞ্চাশ দিন সময় লাগত, রানার বা সংবাদবাহকেরা সেই পথ মাত্র পাঁচ দিনে অতিক্রম করত। তুঘলকদের শাসনামলে ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা আংশিকভাবে পুলিশের দায়িত্বও পালন করত। ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনিতে এই কথাগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়।

সিকান্দার লোদির শাসনামলে (১৪৮৯-১৫১৭) সাংবাদিকরা ছিল চরম সতর্ক ও চালাক। এতটা গোপনে সংবাদ সংগ্রহ করা হতো যে, মানুষ সংবাদদাতার ব্যাপারে ধারণাও করতে পারত না। ঘরের ভেতরের একান্ত বিশেষ খবরও বাদশাহ জেনে যেত এদের মাধ্যমে। সিকান্দার লোদি কাজিদের কাছেও নিজের সাংবাদিক ও গোয়েন্দা রাখতেন, যাতে বিচারকার্যের সংবাদ পাওয়া যায়।

শের শাহ সুরি তার শাসনামলে (১৫৪০-১৫৪৫) সংবাদ সংগ্রহ ও পাঠানোর ক্ষেত্রে বৃহৎ ব্যবস্থাপনার সূচনা করেছিলেন। সংবাদ আদানপ্রদানের স্বার্থে চারটি শাহী সড়ক নির্মান করেছিলেন তিনি :

১. সোনারগাঁও, আগ্রা, দিল্লি হয়ে সিন্ধু নদী পর্যন্ত (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড)

২. আগ্রার কেল্লা থেকে জোধপুর পর্যন্ত

৩. আগ্রা থেকে বোরহানপুর পর্যন্ত

৪. লাহোর থেকে মুলতান পর্যন্ত

এই সড়কগুলোর দুপাশে গাছ লাগানো হয়েছিল। সড়কের পাশে সামান্য দূরত্ব পর পর কুয়া ও প্রতি চার মাইল পর পর সরাইখানা নির্মিত ছিল। এই সরাইখানাগুলোর সংখ্যা ছিল ১ হাজার সাতশোটি। শুরুতে সংবাদ ডাকের মাধ্যমে গ্রামের মধ্য দিয়ে পৌঁছত, সরাইখানা নির্মাণের পর তা সরাইখানা হয়ে হয়ে পৌঁছানো শুরু হলো। প্রত্যেক সরাইখানায় ডাকের ঘোড়া বাঁধা থাকত, এই ঘোড়াগুলোর সংখ্যা ছিল তিন হাজার চারশো। বাংলার খবর রোহতাসে পৌঁছে যেত মাত্র তিনদিনে—যখন বাংলা থেকে রোহতাসের দূরত্ব ছিল একহাজার পাঁচশো ক্রোশ। প্রত্যেকটি সরাইখানায় ঘোড়ার সাথে একটি ঘন্টা থাকত। ডাকবাহী ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হতেই তার সামনে খাবারসহ দস্তরখান সাজানো হতো ও ঘন্টা বেজে উঠত। এই ঘন্টার শব্দ শুনে ধারাবাহিক সব সরাইখানায় ঘন্টা বাজানো হতো। এতে সংবাদবাহকের আগমনী বার্তা পৌঁছে যেত। সাংবাদিকদের মধ্যে মুসলিমদের জন্য পাকানো খাবার আর হিন্দুদের জন্য আটা ও ঘি-মিশ্রিত খাবার পরিবেশন করা হতো। সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে এতটা গুরুত্ব ও সমৃদ্ধ ব্যবস্থাপনা পরবর্তীতে মুঘল সাম্রাজ্যকে পথ দেখিয়েছিল।

মুঘল আমলে সাংবাদিকতা

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইবরাহিম লোদির বিরুদ্ধে বাবরের জয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। ১৫৫৬ সালে আকবরের ক্ষমতারোহণের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্রুপদি অধ্যায় শুরু হয়। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় মুঘল আমলে কিছুটা সমৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। মুঘলপূর্ব শাসকরা তাদের শাসনের নানা ঘটনা ও কার্যক্রম লিখে রাখার জন্য সংবাদ লেখক নিয়োগ করতেন। এই লেখকদের পরিধি ছিল রাজদরবারে সীমাবদ্ধ। কিন্তু মুঘল শাসনামলে তাদের কার্যক্রমের পরিধি রাজদরবারের বাইরে সম্প্রসারিত হয়।

সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৫) সাংবাদিকতার গঠনপ্রণালী এতটা সমৃদ্ধ ছিল যে, তাকে আধুনিক সাংবাদিকতার প্রাথমিক রুপ বললে ভুল হবে না। তার দরবারে যোগ্যতাসম্পন্ন, ভুবনদর্শী প্রভাবশালীদের সাংবাদিক হিসেবে নিয়োজিত করা হতো। নির্ধারিত ব্যক্তিরা বিশেষ স্থানগুলোতে অবস্থান করত। তাদের এক নাম ছিল বিতিগচি। তুর্কিতে এর অর্থ লেখক। এরা দৈনন্দিন নিজেদের সংবাদ সংগ্রহ করত ও চৌদ্দদিন পর বাদশাহর কাছে প্রেরণ করত।

কিন্তু আকবরের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে—সাংবাদিকতার নীতি প্রচলিতকরণ। যার ফলে ১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দে রেকর্ড অফিস তৈরি হয়। উইলিয়াম বেভারেজের মতে ওই একই বছর আবুল ফজলও আকবরের দরবারে আসেন। ধারণা করা হয়, ওই রেকর্ড অফিস প্রস্তুতকরণে আবুল ফজলের পরামর্শ আকবরকে উৎসাহী করেছিল। আবুল ফজল এই রেকর্ড অফিসের জমাকৃত তথ্য দিয়েই পরবর্তীতে লিখেছিলেন আইনে আকবরী

আল্লামা আবুল ফজল তাঁর রচিত আইনে আকবরী গ্রন্থে সে সময়কার তিন শ্রেণির লেখকের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন, ওয়াকিয়া নবিস, সাওয়ানিহ নিগার ও খুফইয়া নবিস। তবে উল্লিখিত এই তিন ধরনের লেখক সম্পর্কে আবুল ফজল বিস্তারিত কিছু জানাননি। মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন বইয়ে যদুনাথ সরকার লিখেছেন, যে মাধ্যমগুলোতে মুঘল সম্রাটরা সংবাদ সংগ্রহ করতেন, তা ছিল—ওকায়ে নেগার, সাওয়ানেহ নেগার, খুফইয়া নবিস, হারকারা। হারকারা ছাড়া বাকি তিন ধরণের লোক সংবাদ লিখে পাঠাত। হারকারাগণ সেই সংবাদ পাঠ করে শোনাত। ওকায়ে নবিসের কাজ ছিল সবধরনের সংবাদ সংগ্রহ করা, আর সাওয়ানেহ নেগারের কাজ ছিল বিশেষ গুরুত্ববহ সংবাদের জানান দেওয়া। মোটকথা, তিন বা চার শ্রেণির লোক কাজ করত এই সংবাদসংগ্রহের কাজে।

ওয়াকিয়া নবিস

‘ওয়াকিয়া’ অর্থ সংবাদ বা ঘটনা আর ‘নবিস’ অর্থ লেখক। আক্ষরিক অর্থে যিনি ঘটনা লেখেন বা খোঁজখবর রাখেন, তিনিই ওয়াকিয়া নবিস। ওয়াকিয়া নবিসরা সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো থেকে বিভিন্ন ঘটনাবলি সম্রাটকে অবহিত করতেন। বর্তমান কালের মফস্বল সংবাদদাতাদের মতো ছিল তাদের দায়িত্ব। আবুল ফজল তার আইনে আকবরী গ্রন্থে ওয়াকিয়া নবিসদের কিছু দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে যেসকল ওয়াকিয়া নবিস ছিলেন, তারা বাদশাহর চুড়ান্ত হুকুম, রোজনামচা, বাদশাহের কাছে উপস্থাপিত অভিযোগের হিসেব, বৈদেশিক সন্ধি লিখে বাদশাহকে শুনাতেন। বাদশাহ সেগুলো মঞ্জুর বা নিশ্চিত করলে তাতে মোহর দিয়ে দস্তখত করতেন। এছাড়া বাদশাহর পানাহার, শিকার করার আয়োজন সম্পর্কেও ওয়াকিয়া নবিস লিখত। গ্রামীণ ও ছোটোখাটো পরগণার সংবাদ প্রেরণের জন্য ওয়াকিয়া নবিসদের অধীনে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হতো। প্রাদেশিক শাসনকর্তার প্রকাশ্য দরবার অনুষ্ঠিত হলে ওয়াকিয়া নবিসরা আধুনিক যুগের সাংবাদিকদের মতো সভাস্থলে উপস্থিত থেকে শাসকের কার্যাবলির ধারা-বিবরণী তাৎক্ষণিক লিখে নিত। প্রাদেশিক সদর দফতরের এসব সংবাদ এবং অধীন সংবাদদাতাদের প্রেরিত বিবরণ একত্র করে তারা সপ্তাহে একদিন তা কেন্দ্রীয় শাসকের নিকট অর্থাৎ সম্রাটের দরবারে প্রেরণের ব্যবস্থা করত।

আবুল ফজল আইনে আকবরীতে প্রামাণ্য তথ্য ও সূত্র হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন তাঁর পূর্বযুগের ওয়াকিয়া নবিসদের বর্ণিত বিবরণসমূহ। আওরঙ্গজেবের রচিত ঐতিহাসিক পত্রগ্রন্থ খত্তে আলমগিরিতেও বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে কয়েকজন ওয়াকিয়া নবিসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা শামসুদ্দিন সিরাজ, আফিক প্রমুখ ছিলেন মধ্যযুগের বিশিষ্ট ওয়াকিয়া নবিস বা রিপোর্টার। মুঘল রাজত্বের শুরু থেকেই ভারতবর্ষে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পর্যটক ভ্রমণ করেন। তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকেও জানতে পারা যায় মুঘল আমলের সাংবাদিকতা সম্পর্কে। যেমন, ফরাসি পর্যটক ফ্রাসোঁয়া বেনিয়ার ‘ওয়াকিয়া নবিসের’ সত্যতা নিয়ে লিখেছেন। ওয়াকিয়া নবিস তার ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছিল স্বাধীন। তারা সম্রাট ছাড়া রাষ্ট্রের আর কোনো কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। ওয়াকিয়া নবিসকে কেবল রাষ্ট্রীয় কাজেই নয়, সামরিক কাজেও সম্পৃক্ত করা হতো। তারা সংবাদ সংরক্ষণের জন্য সাধারণত সব ধরনের সামরিক অভিযান এবং বিদেশে পাঠানো দূতের সফরসঙ্গী হতো। যখন একজন নতুন ওয়াকিয়া নবিস নিয়োগ করা হতো, তখন তাকে সত্য বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রেরণ করতে বলা হতো এবং কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা প্রলোভনে পড়ে সংবাদ বিকৃত করতে নিষেধ করা হতো। যদুনাথ সরকারের ম্যানিউয়্যাল অব অফিসারস ডিউটিজ-এ উল্লেখ আছে, ওয়াকিয়া নবিস প্রতি সপ্তাহে একবার ঘটনাবলির প্রতিবেদন প্রেরণ করত।

খুফইয়া নবিস

খুফইয়া নবিস হচ্ছে গোপন লিপিলেখক। এরা মূলত ছিল সম্রাটের গুপ্তচর বা গোয়েন্দা। খুফইয়া নবিসরা ছিল বিশ্বস্ত ও গোপন সংবাদদাতা। স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অজ্ঞাতে, অগোচরে তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ রক্ষা না করেই খুফইয়া নবিস গোপন সংবাদ কেন্দ্রে প্রেরণ করত। স্থানীয় কতৃপক্ষ তাদের নামও জানত না। অনেক ক্ষেত্রেই এরা ছদ্মবেশী হয়েও ঘোরাফেরা করত। স্থানীয় প্রশাসনসহ অসাধু জনগণও এদের ভয়ে তটস্থ থাকত। ওয়াকিয়া নবিসরা স্থানীয় প্রাদেশিক শাসকদের যোগসাজশে কিংবা অন্য কোনো কারণে যাতে সংবাদ প্রেরণের ক্ষেত্রে কোনো মিথ্যা বা অসাধুতার আশ্রয় না নিতে পারে, সেজন্য খুফইয়া নবিসদের নিয়োগ দেওয়া হতো। ওয়াকিয়া নবিসরা যেখানে সপ্তাহে একবার সংবাদ প্রেরণ করত, সেখানে এরা সপ্তাহে দু’বার সংবাদ পাঠাত।

সাওয়ানিহ নেগার

এরা মূলত জীবনীকার ছিল। ফরমায়েশি লেখালিখির জন্য এদের ডাকা হতো। অর্থের বিনিময়ে সম্রাট, যুবরাজ বা সাম্রাজ্যের নামি ব্যক্তিত্বরা জীবনী লেখার জন্য সাওয়ানিহ নেগারদের নিয়োগ দিতেন।

হারকারা

হারকারা শ্রেণির লোকেরা সংবাদবহনকারী হিসেবে কাজ করত। এদের মূল কাজ ছিল প্রাদেশিক স্থানগুলো থেকে রাজদরবারে সংবাদ পৌঁছে দেওয়া। তারা অশ্বারোহী ও পদাতিক—উভয়ভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সংবাদ আনা নেওয়া করত।

আকবরের আমলে সংবাদ আদানপ্রদান ব্যবস্থা ছিল এমন : প্রত্যেক গ্রামেই পাঁচ মাইল পর পর কিছু ঘোড়া ও হারকারা উপস্থিত থাকত। এরা যেখানে থাকত তাকে ডাকচৌকি বলা হতো। আমিরদের সংবাদ, ফরমান ইত্যাদি এই চৌকিগুলোতে আসত। এক চৌকি থেকে অন্য চৌকিতে হারকারারা পৌঁছে দিত। এভাবে আগ্রা থেকে আহমদাবাদে পাঁচদিনে পৌঁছে যেত সংবাদ। বাদশাহর কিছু বিশেষ সংবাদদাতাও ছিল, এরা আরও দ্রুত সংবাদ পৌঁছাতে পারত। চার হাজার হারকারা ছিল এই কাজে নিয়োজিত। পদাতিক হারকারারা সাতশো মাইলের পথ দশদিনে অতিক্রম করত। ডাকচৌকিতে দুই হাজার ওয়াকিয়া নবিস দৈনন্দিন রোজনামচা লিখে পাঠাত। আদালত-কাচারী এমনকি বাজারের সংবাদও এসব রোজনামচায় উল্লেখ হতো। আকবরের ওয়াকিয়া নবিসদের মাঝে এনআমুল্লাহ বিন শাহবাজ খাঁর নাম পাওয়া যায়, যিনি সারাজীবন সংবাদ সংগ্রহে ব্যয় করেছেন।

কেউ কেউ লেখেন, আকবর ও তার পরবর্তী সময়কালে আখবার দরবারে মুআল্লা নামে সংবাদপত্র ছিল, পরবর্তীতে শাহজাহানের শাসনামলে এই পত্রিকার নাম আখবারে দারুল খিলাফাহ শাহজাহানাবাদ-এ পরিবর্তিত হয়। এই সংবাদপত্রে প্রথমবারের মত বাদশাহ, আমিররা ছাড়াও সাধারণ মানুষদের বিভিন্ন সংবাদ প্রচার হতে থাকে।

সম্রাট জাহাঙ্গির তার শাসনামলে (১৬০৫-১৬২৭) খবর আদানপ্রদানের এক অভিনব পদ্ধতি বের করেছিলেন। তিনি যখন শুনলেন আব্বাসীয় খলিফারা বাগদাদে কবুতরের মাধ্যমে সংবাদ আদানপ্রদান করতেন, তার সাম্রাজ্যের কবুতরবাজদের বললেন কবুতরকে এই প্রশিক্ষণ দিতে। এরপর কবুতরবাজরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন কবুতর তৈরি করল, যারা খুব দ্রুত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সংবাদ পৌঁছাতে পারে। মান্ডো ও বোরহানপুরের মাঝে এই কবুতরগুলো উড়ত।

১৬০৮-১৬১৩ সময়কালে ইসলাম খান চিশতি বাংলায় মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করেন। ১৬১০ সালে ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করে এর নতুন নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর। ইসলাম খান চিশতির বাংলায় অভিযানের একজন সেনানায়ক ছিলেন মীর্জা নাথান। তিনি যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি সরাসরি যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ তথা ইতিহাস রচনার কাজটিও করে যান। পরবর্তীকালে তাঁর রচিত ইতিহাস গ্রন্থটি বাহারীস্তান-ই-গায়বী নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত এ ইতিহাস গ্রন্থে সেসময় বাংলায় ওয়াকিয়া নবিস তথা সাংবাদিক প্রেরণের বিষয়টি জানা যায়। ইসলাম খান চিশতির পুরো সময় ও আরো পরেও যিনি সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করেন, তিনি হলেন খাজা ইয়াঘমা ইস্পাহানি। বাহারীস্তান-ই-গায়বীর বর্ণনায় ‘বাংলায় ওয়াকিয়া নবিস প্রেরণ’ শিরোনামের লেখায় বলা হয়েছে,

ইয়াঘমা ইস্পাহানিকে নির্দেশ দেওয়া হয় বাংলায় গিয়ে ওয়াকিয়া নবিসের (সংবাদ লেখক) কার্যভার গ্রহণ করার জন্য। প্রতি সুবাহতে (প্রদেশে) একজন সংবাদ লেখক নিয়োগ করা ছিল তখনকার সবচেয়ে প্রচলিত প্রথা। তাঁকে উপদেশ দেওয়া হয়, প্রাদেশিক গভর্নরদের ঘটনা ও কার্যাবলির ধারাবাহিক রিপোর্ট শাহী দরবারে প্রেরণের জন্য। সেসব রিপোর্ট সুবাহদারদের না দেখানোর জন্যও তাকে উপদেশ দেওয়া হতো। ইয়াঘমা তার পদের উপযুক্ত সম্মানসূচক পোশাক প্রাপ্তির পর এক শুভ মুহূর্তে দ্রæত বাংলা অভিমুখে রওনা হন। এ সংবাদ ইসলাম খাঁর নিকটও পৌঁছে।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল ইয়াঘমা ইস্পাহানির।

সম্রাট জাহাঙ্গিরের শাসনামলে ১৬১০ সাল থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দিল্লির ডাক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ডাক গ্রহণ ও প্রেরণের জন্য ডাকচৌকির দারোগা বা সুপারিনটেন্ডেন্ট নিয়োগ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্রের ধরণ ছিল এমন :

ফরমান : বাদশাহের আদেশ।

শুক্কুক : সরাসরি কোনো ব্যক্তির প্রতি বাদশাহর পত্র।

নিশান : বাদশাহ ছাড়া রাজ পরিবারের অন্য কোনো ব্যক্তির পত্র।

হসবুল হুকুম : সম্রাটের নির্দেশক্রমে লেখা মন্ত্রীর পত্র।

সনদ : নিয়োগপত্র।

পরওয়ানা : নিম্নপদস্থ কর্মচারীর প্রতি প্রশাসনিক নির্দেশ।

দস্তক : প্রশাসনিক অনুমতিপত্র।

সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগির তার শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭) সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর সময়ে সংবাদপত্র রাজকীয় গণ্ডি অতিক্রম করে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। ঐতিহাসিক নিকোলা মানুচি আওরঙ্গজেবের আমলে সাংবাদিকতা নিয়ে লেখেন,

মুঘল সাম্রাজ্যের নির্ধারিত নিয়ম ছিল, শাহী ওয়াকিয়া নবিস, খুফইয়া নবিসরা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি সপ্তাহে একবার সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করত। রাত নয়টায় তা বাদশাহর সামনে পেশ করা হতো, বেগমরা তা পড়ে শোনাত। এভাবেই পুরো সাম্রাজ্যের সংবাদ বাদশাহর কানে পৌঁছত। অর্ধরাত্রি পর্যন্ত বাদশাহ এসব শুনতেন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।

সে সময় সম্রাটের অনুমোদন ও সহায়তায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর সময়ে প্রকাশিত পত্রিকার নমুনা লন্ডনের রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত আছে। ১৮২৮ সালে কর্নেল জেমস টড মুঘল দরবারে কয়েকশ হাতে লেখা সংবাদপত্র আবিষ্কার করেন। ফারসি ভাষায় হাতে লেখা এসব পত্রিকার আকার ছিল লম্বায় ৮ ইঞ্চি এবং চাওড়ায় ৪ ইঞ্চি। এই সব সংবাদপত্রের সঙ্গে পেশাদার সংবাদদাতারা যুক্ত ছিলেন।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব সংবাদ প্রকাশ ও সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এর উদাহরণ দিতে গিয়ে মুনতাখাবুল লুবাব গ্রন্থের লেখক খাফি খান উল্লেখ করেছেন,

বাংলা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রে নির্বিঘ্নে বাদশাহর নাতি মির্জা আজিমুশশানের সমালোচনা করেছিল। কিন্তু প্রাদেশিক শাসক কিংবা সম্রাটের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় থেকেই মূলত মুসলিম সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের আধুনিকায়ন শুরু হয়। মুঘল শাসনের ক্রান্তিলগ্নে সরকারি বা বেসরকারিভাবে প্রকাশিত সংবাদপত্র এতটাই প্রভাব ফেলে যে, সচেতন জনসাধারণ সংবাদপত্র পাঠে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সংবাদপত্র রাজকীয় গণ্ডি অতিক্রম করে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এর ফলে সাধারণ মানুষ সরকারের কার্যকলাপের সমালোচনা করার সুযোগ পায়। সৈনিকদের মাঝেও সংবাদপত্র যথারীতি সরবরাহ করা হতো, যাতে তারা রাষ্ট্রীয় শাসন সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে এবং নিজেদের মাঝে ঐক্য বজায় রাখতে পারে।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্য বহুদূর বিস্তৃত ছিল। তার সৈন্যরা সেনা সদরদপ্তর থেকে নিয়মিত খবর প্রচার করত। এসব তথ্য সংরক্ষণের জন্য কর্তৃপক্ষ একটি পৃথক তথ্যদপ্তর চালু করে। এই দপ্তর প্রতিটি রাজ্যে ব্যুরো অব ইনটেলিজেন্স ধরনের একটি করে অফিস খোলে। সেখানে খবর লেখক নিয়োগ করা হয়। তাদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ করা হতো। পরে নিউজ লেটারগুলো দিল্লিতে সম্রাটের কাছে পাঠানো এবং খবরের সারাংশ সম্রাটকে পড়ে শোনানোর ব্যবস্থা ছিল। মোটকথা, আওরঙ্গজেব সাংবাদিকতার আধুনিকায়নে ছিলেন অগ্রসরমান একজন ব্যক্তি। সেসময়ের ইতিহাসবিদরা সাম্রাজ্যের অবস্থা লিখতে গিয়ে বাধ্য হয়েছেন সাংবাদিকদের দ্বারস্থ হতে। মুনতাখাবুল লুবাব গ্রন্থের লেখক খাফি খান স্বীকার করেছেন,

আলমগীর শাসনামলের অবস্থা লিখতে গিয়ে সাংবাদিকদের সহায়তা প্রয়োজন হয়েছে।

আলমগীরনামার লেখক মুনশী মুহাম্মদ কাজিম বিন মুহাম্মদ আমীন লেখেন,

বাদশাহর কাছে আমার রচনাপদ্ধতি পছন্দ হলো। তিনি বললেন, সালতানাতের সঠিক অবস্থা লিখো ও পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন সুবা ও প্রদেশের সাংবাদিকদের কাছে সত্যায়নের জন্য পাঠাও।

এভাবেই মুঘল সাম্রাজ্যের শেষদিকে সংবাদমাধ্যম ও ডাকবিভাগ পরিচালনার নিজস্ব সমৃদ্ধ নীতি প্রতিষ্ঠিত হলো। ইংরেজরা উপনিবেশ করার পর সেই নীতিগুলোকে অনুসরণ করেছে ও ধীরে ধীরে তার রদবদল ঘটিয়েছে। সমালোচনার স্বরে অনেকে বলে থাকেন, তৎকালীন সাংবাদিকতা ছিল কেবল সাম্রাজ্যের ফরমায়েশি। এর উত্তরে এস. সি স্যানিয়াল লেখেন,

কিছু লোকের ধারণা, এ ধরণের সংবাদমাধ্যম কেবল সাম্রাজ্যের স্বার্থে সংবাদসংগ্রহ করেছে, কিন্তু সতেরো শতকের সংবাদপত্র, রোজনামচাগুলোর উদ্দেশ্য কেবল বাদশাহ, আমিরদের কানে সংবাদ পৌঁছানো ছিল না। বরং ওসব জনসাধারণের কানে খবর পৌঁছানোর কাজও করত। সে সংবাদপত্রে সব ধরণের সংবাদ থাকত, যেমনটা বর্তমান সময়ের পাবলিক প্রেসে থাকে।

কেবল সতেরো শতকে নয়, উপরোল্লিখিত বিবরণে আমরা দেখতে পাই, নীতি ও আদর্শগত স্থানে সাম্রাজ্য সবসময় সাংবাদিকদের দিয়েছে সীমাহীন স্বাধীনতা।

আধুনিক সাংবাদিকতার বীজবপন হয়েছিলো মধ্যযুগেই। নানাভাবে সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমেই সম্রাটরা বৃহৎ সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন। মুঘল আমলে ওয়াকিয়া নবিসদের মতামতকে রাষ্ট্রীয়, প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সাংবাদিকতার অসংগতি ও সীমাবদ্ধতা সে সময়েও ছিল। প্রাদেশিক শাসকরা সবসময় সাংবাদিকদের হাতে রাখার চেষ্টা করতেন, তাদের খবর যেন দিল্লি পর্যন্ত না পৌঁছে। সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করা, বিকৃত তথ্য প্রচার করা, স্বার্থ রক্ষার খাতিরে সত্য গোপনের প্রবণতা আজকের মতো সে যুগেও ছিল। মোদ্দাকথা, আধুনিক সাংবাদিকতার গোড়া খুঁজতে গেলে মধ্যযুগের মুসলিম শাসনামলে ফিরে যেতে হবে অনিবার্যভাবে।

গ্রন্থপঞ্জি

১. আইনে আকবরি, আল্লামা আবুল ফজল, মৌলভী মুহাম্মদ ফিদা আলী সাহেব তালেব অনূদিত, প্রথম খন্ড, দারুত তবা’ জামিয়া উসমানিয়া।

২. বাহারীস্তান-ই-গায়বী, মির্জা নাথান, খালেকদাদ চৌধুরী অনূদিত, আকাশ প্রকাশনী।

৩. তারিখে সাহাফাত, ইমদাদ সাবেরী, প্রথম খন্ড।

৪. তারিখে সাহাফাত, মুহাম্মদ ইফতেখার খুখড়, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৫ খ্রি. মুকতাদারা কওমী জবান।

৫. হিন্দুস্তান মেঁ ফার্সী সাহাফাত কি তারিখ, আখলাক আহমদ আহিন, প্রকাশকাল ২০০৮, এডুকেশনাল পাবলিশিং হাউজ, দিল্লি।

৬. রাহনুমায়ে সাহাফাত, নুরুস সালাম নদভী, প্রথম প্রকাশ ২০১২

৭. সংবাদ ও সাংবাদিকতার সোনালি অতীত, প্রবন্ধ, মাহফুজুর রহমান আখন্দ, অনলাইন ভার্সন দৈনিক সংগ্রাম।

৮. প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতবর্ষে সাংবাদিকতা : একটি পর্যালোচনা, প্রবন্ধ, মো. মিঠুন মিয়া, বাংলা একাডেমি পত্রিকা, জানুয়ারি-জুন ২০১৯

শেয়ার করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

প্রবন্ধ

হাকিমুল উম্মাত আশরাফ আলি থানবির পারিবারিক জীবন

মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ. বহুমাত্রিক জ্ঞানসাম্রাজ্যে বিচরণকারী আলেম ও পুরোদস্তুর খানকাহকেন্দ্রিক বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর…

4 January, 2026
আরও পড়ুন