সন্ধ্যার পর কোনোক্রমেই কাজে মন বসাতে পারছি না। সারাদিন আজ অফিসেও যে খুব একটা কাজ করেছি—তাও নয়। যেদিন নিস্কর্ম থাকা হয়, সেদিন অফিসেও যা, বাসায়ও তা। জীবনানন্দের গল্পসমগ্র খুলে দুটো গল্প পড়ে ফেললাম। বহুদিন পর জীবনানন্দ। মাসকয়েক আগে নিয়ম করে শ্রেষ্ঠ কবিতা পড়তাম। কিছু কবিতা বারবার পড়ে অনেকটা বোধগম্য করে ফেলেছি। এতে যা উপকার হয়েছে, আজ গল্প পড়তে গিয়ে তা টের পেলাম। গদ্য খুব চেনা চেনা লাগছে। গল্পভাষ্যেও জীবনানন্দ চিরচেনা কাব্যিক। একেবারে কবিতাই যেন গদ্যের টানে লিখে দিয়েছেন।
‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গ’ নামের গল্পটি আমাকে ভালোরকম মুগ্ধতা দিয়েছে। খুব সহজ একটি গল্প; এক আইনজীবি স্বামী পিতৃলয়ে থাকা স্ত্রীকে পত্র লিখেছে। পুরোটা গল্পজুড়ে সে পত্রেরই বিবরণ। মাঝে শুধু একটিবারের জন্য চরিত্রটি পত্রের ভাষ্য ছেড়ে বেরিয়েছে মাত্র। এত সহজ গল্পেও বুঁদ হয়ে থাকার উপকরণ হচ্ছে গদ্য। আরও খানিকটা ডুবে গিয়েছিলাম—চরিত্রের মাঝে নিজেকে আবিস্কার করতে পেরে। বিশেষত, সে যখন স্ত্রীকে বলছে—
আমার কামনা কী জান? বইচি, ময়নাকাঁটা, বাবলা ফণীমনসা, বন-অপরাজিতার পাশ দিয়া এক-একটা সাদা ধুলা মাখা ভারী স্নিগ্ধ আঁকাবাঁকা গ্রামের পথ থাকে—তাহারই পাশে থাকে এক-একটা প্রান্তরের অপরিসীম নিশ্বাসের নিস্তার—সবুজ ঘাস আছে সেখানে, ঘাসের ভিতর শ্যামাপোকা আছে, দিয়ালিপোকা আছে, গঙ্গাফড়িং আছে, কাচ-পোকা আছে, সুদর্শন উড়িয়া আসে, হলুদ, কমলা, জর্দা নীল রঙের প্রজাপতি কাশফুলের ভিতর সমস্ত দুপুর ঘুরিয়া-ঘুরিয়া বেড়ায়—কোথাও হয় তো কতকগুলো পলাশ, অর্জুন গাছ, হিজল গাছ, উলুখড়ের জঙ্গল, মাছরাঙার ডানার শিরশিরানি, এমনই এক জায়গায়, ঘাসের নরম গন্ধের কাছে, প্রান্তরের এক টেরে বনের দেবতা অশ্বত্থ যেখানে অনেক দিন হইতে ছায়া রচনা করিয়া বাঁচিয়া আছেন, রাত্রি দিন শালিখ, বুলবুলি, কোকিল ও কাককে আশ্রয় দিয়া আসিতেছেন, সেইখানে, খড়ের একখানা ঘর তুলিয়া পড়ি, লিখি, চুরুট ফুঁকি, দিন কাটাইয়া দেই—
পত্রের মাঝে অর্জুন নামের এক কাজের ছেলের চরিত্র বেশ অদ্ভুত সুন্দর। জীবনানন্দ বলেই বোধহয় সামান্য চাকরকেও অনিন্দ্য উপস্থাপনায় ব্যক্ত করতে পেরেছেন। বাড়িতে স্ত্রী নেই, মা চলে গেছেন কাশীতে, সঙ্গে নিয়ে গেছেন বিধবা বোন চারুকে। ঘরে শুধু বাবা আছেন, দিনের মধ্যে যার নানা রকম তত্ত্ব-তলবের দরকার। এসব দরকারি কাজ সারবার জন্য আছে চাকর অর্জুন। জীবনানন্দের ভাষায়—
সে অবিশ্যি অর্জুনও নয়, শিখণ্ডীও নয়—মাঝামাঝি একটা কিছু। এক-এক সময় খুঁটিনাটি খানিকটা কাজ বেশ মন দিয়া গুছাইয়া করে; কিন্তু তার পরেই আসে তার অবসাদের সময়, পালাইয়া গিয়া ছাতিম তলায় চাকরদের দলে মিশিয়া তাস খেলিয়া দিন উজাড় করিয়া দেয় সে, কিংবা মনসাতলায় নিরিবিলি অশ্বত্থ গাছের নীচে ঘুমাইয়া-ঘুমাইয়া চৈত্রের দিনটা সাঙ্গ করে।
কিন্তু জীবনানন্দ তাকে কিছু বলতে চান না। জবাবদিহি চান না। কারণ—
বেচারার মা নাই, কেহ নাই; পৃথিবীর মাটির জন্য টান রহিয়াছে; পৃথিবীর পথে-পথে ঘুরিতে ভালবাসে সে। ঘুরুক। আমার যদি কোনো সন্তান থাকিত তা হলে এই রকম ঘুরিতে দেখিলেই ভাল লাগিত আমার—
পত্রের আরও একটি চরিত্রের দেখা মেলে—হিমাংশুর মা। স্ত্রী-মা-বিধবা বোন—তিন নারীর অনুপস্থিতিতে রান্নাবান্নার দেখভালের দায়িত্ব যার কাঁধে। কিন্তু তার রান্না কি খাওয়া যায়? মশলাহীন জলের মতো তরকারি ঝোলের দিকে তাকিয়ে তাই পত্রপ্রেরকের মনে হয় মায়ের কথা, চারুর কথা আর স্ত্রীর কথা। পুরুষের জীবনে পরিচিত নারীদের রান্নার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিনিয়ত স্ত্রী কিংবা মায়ের হাতের রান্না পুরুষরা অনুভব করে। বিয়ের আগে বোধহয় সব পুরুষের প্রিয় রাঁধুনী থাকেন মা। কিন্তু বিয়ের পর এ জায়গায় স্ত্রী চলে আসেন অনিবার্যভাবেই। মা তখন সন্তানকে আদর করে খাওয়াবার সেই দায়িত্ব আর অনুভব করেন কি না—জীবনানন্দ সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন এভাবে—
মার হাতের মোলায়েম রান্না খাওয়ার চিরদিনের অভ্যাস; বিবাহের আগের দিন পর্যন্তও মা কাছে বসিয়া বাতাস দিয়া সাধিয়া-সাধিয়া খাওয়াইতেন। তার পর ভাবিলেন, তুমি আসিয়াছ, তাই সরিয়া পড়িলেন।
বাক্যদুটোর দিকে তাকালে আমরা আমাদের জীবনকেই দেখতে পাই। নিঃসঙ্গ পত্রপ্রেরক তার জীবনকে অন্তর্মুখী করবার প্রয়াস পায়। জীবনকে সে স্থির ও শান্ত করতে চায়। বোধহয় নিঃসঙ্গতার কারণেই তা সম্ভব হয়ে ওঠে। জীবনকে ভিন্নচোখে দেখা ও অনুভব করার যে চশমা জীবনানন্দের রয়েছে, তা আমাদের চির আকাঙ্ক্ষার এক বস্তু।
গল্পের পুরোটা জুড়ে আর কোনো চরিত্রের দেখা মেলে না। বাকিটা কেবল পত্রপ্রেরকের চোখে জগতের বিচিত্র দৃশ্যপট, জীবনের চেনা সুর ও ছন্দের নিপুণ বিশ্লেষণ আর প্রেম ও গভীর জীবনবোধের অকপট বর্ণনা। জীবনানন্দ তার সবগুলো গল্পেই বোধহয় নিজেকে বিশ্লেষণ করেছেন।
১১ই জানুয়ারি ২০২৬, রাত ১০.১৮