সূচীপত্র

ছোটগল্প

অন্ধধর্ম

27 December, 2025

পার্নিস পর্বত এই সময়টাতে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। এত কাছে প্রকাণ্ড এই পর্বতশৃঙ্গ! অথচ বেভিন তার সত্তরপুরোনো চোখে মিনিটখানেক অপলক তাকিয়েও পাহাড়চুড়ার লম্বা ক্রুশফলক দেখতে পেল না। অন্ধকারচ্ছন্ন তার জীবনে ক্রুশটুকু দেখেই যা তৃপ্তি! পাহাড় আর শহরের চারিদিকে অস্থিরতা। পাদরিরা মাসে দু-তিনবার এসে পুরোনো সেই কিচ্ছা শোনাবে ঘটা করে। বেভিন জন্ম থেকে এই গল্প শুনছে। কেন যেন তার মন রাজ্যের সহস্র পথ ছেড়ে জমে থাকে পার্নিসের সমতলের এই ছোট্ট গ্রাম কিংবা উপশহরে। এটা ছিল তার বাবার ভিটা। বেভিনের স্বামী রাজবন্দী হয়ে মরেছে আরও বছরবিশেক আগে। সে গল্প এখন ভুলেই গেছে বেভিন। সবচেয়ে পীড়া দেয় ছেলেদের বিচ্ছেদ। তিনটি ছেলে ছিল তার। এখনও বোধহয় আছে। অথচ এই কাঠের জীর্ণ ঘরে নানা পোকামাকরের সাথে খসখসে দেহ নিয়ে একা থাকে বেভিন। দশবছর হলো—মায়ের খোঁজে কেউ আসেনি। কোথায় হারিয়ে গেল ছেলেগুলো! আজ এই সাতসকালে গোছগাছের পেছনে ভালো কারণ আছে। ছোট ছেলে সেন্ট পোম্যানের খবর এসেছে। গ্রামের এক বৃদ্ধ তার খোঁজ দিয়ে গেছে। বৃদ্ধকে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়নি বেভিনের। দশবছর পর নিজের ছেলেকে দেখবে—আনন্দের খবরটি এনে দিয়েছে সেই বৃদ্ধ। তাকে অন্তত যিশুর নামে দোয়া করে দেওয়া উচিত ছিল নয় কী!

পোম্যান এথেন্সেই থাকে। অথচ মায়ের খোঁজ নেয়নি। তাতে মায়ের কোনো আফসোস নেই। হয়তো ভুলে গেছে পার্নিসের সমতলে একটি গ্রাম আছে। দশবছর আগে পোম্যান ছিল কিশোর। এখন নিশ্চয়ই যুবক হয়েছে। বেভিন ছোট্ট একটি ব্যাগ নিল সাথে। ছেলেকে চমকে দেবে বাবার রেখে যাওয়া কম্পাসটি গিফট করে। ছোট থাকতে সে কাঠের আলমারি টপকে উপরে ঝুলিয়ে রাখা কম্পাসটি পেতে বেশ কয়েকবার আহত হয়েছে। মা ব্যাগে কম্পাসটি পুরে নিল। আরও নিল একটি মাফলার। শীত যা পড়েছে! বেভিন একমুহূর্তের জন্যও ভাবেনি—ছেলের এতটা অভাব নেই যে এথেন্সের ভয়াবহ শীতে মাফলার ছাড়া ঘুরে বেড়াবে। বেভিন ঘন্টাখানেক হাটার পর শহরতলির সেই ঠিকানায় পৌঁছল। কাঠের পুরোনো দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে এথেন্সের পুরোনো রীতি অনুযায়ী মালিকের নাম লেখা ফলক ঝুলছে। সেখানে মিউটিয়াস লেখাটুকু বোঝা যাচ্ছে। বাকি অংশ মুছে গেছে। এখানেই পোম্যানের থাকার কথা বলেছে সেই আটপৌরে বৃদ্ধ। প্রকম্পিত হাতে বেশ কয়েকবার আওয়াজ করল বেভিন।

পাশে একটি কাচের জানালা দিয়ে একজন মাথা বের করে বলল,

‘কে বলছেন?’

‘তু.. তুমি পোম্যান? সেন্ট.. পোম্যান!’

‘বলুন। আমিই পোম্যান।’

‘আমাকে চিনতে পেরেছ?’

‘না তো! আপনি কে?’

‘আমি.. বেভিন। তোমার মা।’

‘ওহ! আচ্ছা। এখানে কেন এসেছেন?’

পোম্যানের কথা শুনে আবারও সেই দশ বছর আগের আবছা স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল বেভিনের হৃদয়পটে। দশটি বছরে ছেলের কোনো পরিবর্তন নেই। বাকি দুই ছেলে কোথায়, জানা নেই বেভিনের। এমন এক শীতের দিনে পোম্যান বাড়ি ছেড়েছিল। চারিদিকে তখন সাদা ফুল ফুটেছে। ঝাকে ঝাকে মৌমাছি পার্নিসের সেই বিখ্যাত ফুল থেকে মধু খেতে আসে। দখিনমুখী জানালায় বসে এই দৃশ্য দেখা যেত। সব সুখ জমে যেত পাহাড়ের এই পল্লীতে। কেবল সন্তান হারানোর ব্যাথা সেই সুখগুলোকে তাড়িয়ে দিত।

ঈসা আলাইহিস সালামের পৃথিবী ছেড়ে প্রস্থানের পর তার অনুসারীদের একটি অংশ তৎকালীন গ্রীস ও রোমে এসে রাজশক্তির চোখ ফাঁকি দিয়ে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারণায় আত্মনিয়োগ করে। তাদের মাঝে একটি দল বেশ আয়োজন করে খ্রিষ্টধর্মে নিজেদের বানানো রীতিনীতি সংযোজন করতে থাকে। ফলে ধর্ম ধীরে ধীরে তার মৌলিকত্ব হারিয়ে বসেছে। ইহুদিদের দৌরাত্ম্য চলছে। গ্রীসে চলছে দার্শনিকদের যুগ। যিশু অনুসারীরা বিভক্ত হয়েছে। লুকিয়ে লুকিয়ে ধর্মকে বেগবান করতে তারা বিভিন্ন উপায়ে দরিদ্রদের প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছে। এর একটি দল বৈরাগ্যবাদ ছড়িয়ে দিয়েছে চারিদিকে। তারা বলছে, ‘সংসার পরিত্যাগ করো। বাহ্যিক সবকিছু ছেড়ে জঙ্গলে চলে যাও। আসমানি রাজ্যে প্রবেশ করো। এতেই মুক্তি।’ এতে কাজ হয়। সহজ কিছু যুক্তিতে দরিদ্ররা বিশ্বাসী হয়। গ্রাম-শহর ছেড়ে দূরের উপত্যকায় ঢুকে পড়ে। বৈরাগী সন্নাসীদের দল ভারি হয়। পাদরিরা তখন মানুষকে যেভাবে হোক, বৈরাগী বানিয়ে ছাড়ছে।

বৈরাগ্যবাদ খুব সহজেই বেভিনের পরিবারে এসে জেঁকে বসে। সর্বপ্রথম বড় ছেলে সেন্ট মিচেল চলে যায় জঙ্গলে। যাবার সময় চোখে একফোটা অশ্রু নেই, বুকে অদম্য সাহস। স্বর্গের পথে যাচ্ছে। কয়েকদিন পর সেন্ট এথেনসিয়াস গেল। ভাইয়ের উদ্দেশ্যে নয়—সে পশ্চিমের পথ ধরে অজানা গন্তব্যে হাটল। এর মাসখানেক পর সেন্ট পোম্যান মায়ের আঁচল ছেড়ে বিদায় নিল। ছোট ছেলেকে বেশি ভালোবাসত বেভিন। বাবার আদর পায়নি এই ছেলে। সবাই যখন বৈরাগী হলো, বেভিনের ঘরে তখন বেঁচে থাকার সরঞ্জাম নেই। ভেড়া ছিল দশটা। তার মধ্যে ছয়টা নেকড়ে খেয়েছে। বয়স তখনও বাড়েনি বেভিনের। পঞ্চাশের ঘরে বসেও কষ্ট-ক্লেশকে সঙ্গী করে তার জীবনচাকা চলতে থাকল। কাঁদতে গিয়ে পাদরিদের উপদেশগুলো মনে হয়, তখন আর কাঁদতে পারে না বেভিন। ছেলেগুলো তো স্বর্গের পথে গেছে। ধর্ম তার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে। এর মূল্য পেয়ে যাবে পরকালে।

কিন্তু এই নীতির প্রতি কোনোদিন ভক্তি জাগেনি বেভিনের। হোক এ ধর্ম-অবমাননা। ছেলেদের হারিয়ে খুব সুখে নেই বেভিন। ভিক্ষুকের মতো হাত পাততে হয় মানুষের দুয়ারে। এথেন্সের বড় বড় বাজারগুলোতে ছেলেরা দোকান খুলে বসলে বেভিনের দোতলা কাঠের বাড়ি হতো। তার নামফলক ঝুলত সদরগেটে। এথেন্সের দার্শনিকরা বলে—ধর্ম বলতে কিছু নেই। সব মিথ্যে। তাহলে এত কষ্টের আয়োজন কাকে ঘিরে! বেভিনের সত্তরপেরোনো মস্তিস্ক বারবার উত্তর খোঁজে। ধর্ম কী এমন অমানুষিকতা শেখায়? বেভিন তার বাবার কাছে ধর্ম শিখেছে। তখন এই বৈরাগ্যবাদের অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে একটি ধর্ম মাত্র কয়েকটি যুগ পেরিয়ে এমন আমূল পরিবর্তিত হলো? ছেলেদের বিচ্ছেদে ধীরে ধীরে ধর্মের প্রতি অনাস্থা তৈরি হয় বেভিনের। এমন দিনগুলোতে পোম্যানের খবর নিয়ে হাজির হয় এক বৃদ্ধ।

‘আশ্চর্য! আপনি কাঁদছেন কেন?’

‘তোমাদের কি একটুও মনে পড়ে না মাকে? বুকের দুধ কি আমি খাওয়াইনি?’

‘মা! আপনি যান তো। এই বাড়িটা আমার না। আমি উত্তরের সাগর তীরে থাকি। আপনি ধর্মের বিষয়ে এখনও কাঁচা। বলি কী! আপনিও জঙ্গলে চলে যান। মাত্র কয়েকটি দিনই তো বেঁচে থাকবেন।’

বেভিন নিঃশব্দে চলে এলো। তার চোখ শুকিয়ে গেল। ধর্ম নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। এবার সন্তানদের নিয়েও আগ্রহ ফুরোল। হয়তো চলে যাবার সময় হয়েছে এই অন্ধনগরী ছেড়ে। বুকটা ফেটে যাচ্ছে। ঘরে ফেরার আগে একজনের সাথে সাক্ষাত করতে হবে। মিস্টার জেরোম। শতবর্ষী পাদরি। এই শহরের একমাত্র পাদরি—যিনি বৈরাগী নন। এই লোকটি এখনও বেঁচে আছে পুরোনো পৃথিবীর স্মৃতিগুলো নিয়ে।

‘বেভিন! কতকাল পরে! বেঁচে আছ তাই তো জানি না।’

‘বেঁচে থেকেও মরে গেছি। আমার তিন ছেলে বৈরাগী। বনবাঁদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। আমাকে ছোট ছেলে বলছে, আমিও যেন জঙ্গলে চলে যাই।’

‘ওরা ধ্বংস করে দিলো ধর্মটাকে। সব ওদের তৈরি। এসব ছিল না। ধর্ম যুগে যুগে তার চরিত্র পাল্টায় না।’

‘আপনি বিধর্মী হয়ে গেছেন দার্শনিকদের মতো?’

‘না বেভিন। নতুন একটি ধর্মের অপেক্ষায় আছি। আমি মরে যাব। তোমাদেরও সৌভাগ্য হবে কী না তা দেখার!’

‘সেই নিরক্ষর নবী! যে মানুষের কাছে শিক্ষা না পেয়েও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী?’

‘হ্যাঁ! সেই..’

বেভিন দুঃখগুলো ভুলে গেলো। সত্যিই তাহলে আবার নবী আসার সময় হয়েছে! এই মিথ্যেবাদীদের পতন হবে! ধর্ম মানুষের ছেলে কেড়ে নেবে না!

বেভিন হয়তো বেঁচে থাকবে না ততকাল। পৃথিবীজুড়ে একটি বজ্রনিনাদ কাঁপিয়ে দেবে সব পরাশক্তির মহল। সব রাজপ্রাসাদ কম্পিত হবে মুহাম্মাদের কণ্ঠে। যুগ যুগ ধরে গাছ-পাতা, পৌরাণিক গল্প, অদৃশ্য দেবতাদের মাঝে অস্তিত্বের সকল সমাধান খুঁজতে থাকা দার্শনিকদের চোখে আঙুল দিয়ে এক মহাপুরুষ তাওহিদের বাণী শোনাবে। আর আল্লাহ তাআলা সেই পুরোনো ধর্মযাজকদের কথা বলবেন পবিত্র কুরআনে—‘আর বৈরাগ্যবাদ—যা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তারা নিজেরা প্রবর্তন করেছিল, আমি তাদের উপর এই বিধান প্রদান করিনি।’

 

শেয়ার করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

ছোটগল্প

পরাভব

এমভি ইমাম হাসান। বেশ বড়সড়ো তিনতলা লঞ্চের ছাদে যাত্রীদের বসতে দেওয়া হবে না বলে স্টিলের…

27 December, 2025
আরও পড়ুন