চৌরঙ্গি হোটেলের ছোট কাঠের টেবিলে এসে বসল মুস্তফা। ডানদিকে চেপে বসে টেবিলে কনুই রেখে দুই হাতের তালুর ভেতর মুখ ঢুকিয়ে সামনের দিকে তাকালে ব্যস্ত মানুষের অসংলগ্ন পারাপার, চিরচেনা রিকশার গিট্টু, বাকরখানির দোকান, ক্রিং ক্রিং পিইইপ পিপ—এইসব ছাড়া আর কিছু নেই। রোদ পড়েছে আকাশ থেকে। মুস্তফার চোখে ধরা পড়তেছে রোদের ভেতর উড়াউড়ি করা লক্ষ-কোটি ধূলিকণা। সামনে থাকা গুড়ামাছের বর্তন আর গোল্লা বানিয়ে রাখা আলুভর্তাগুলো গোগ্রাসে গিলতেছে সেইসব ধুলাবালি। মুস্তফা পয়সা দিয়ে ধুলা খাবে না। ঠান্ডা পানির গ্লাস রেখে যাওয়া ওয়েটারকে সে ভেতরের তাকে রাখা মুরগির গোশত অর্ডার করল। দুইপিস আশি টাকা, ভাত পনেরো টাকা, সবমিলিয়ে পচানব্বই—এর কমে এখন একবেলা ভাত খাওয়া যায় না। মুস্তফা সকালে কিছু খায়নি। এখনও পেটে খিদা নাই। কিন্তু মনের খিদা দূর করা অত্যাবশ্যক। ভাতের প্লেট সামনে এলো একফাল্টা লেবুসমেত। সেই লেবু কচলিয়ে রস বের করা যায় না; শ্যামবাজার থেকে সবচে খারাপ লেবুগুলো এরা কমদামে কিনে আনে। এরপর যখন হলদে বাটিতে দুই পিস মাংস মশলায় মাখামাখি হয়ে হাজির হলো, মুস্তফা একপিস উঠিয়ে ভাতে রেখেছে কেবল—তখনই সামনের চেয়ারে এসে বসল এক বৃদ্ধ।
‘অই কী আছে রে!’
‘গুড়ামাছ, আলুভর্তা, রুইমাছ, তেলাপিয়া ভাজা, ঝাটকা ইলিশ, মুরগি, ডিম, খাসির মাথা দিয়া মুগডাইল, সবজি।’
‘খাসির মাথা দে।’
আলতাফ মিয়া গত তিনদিন এই খাসির মাথা দিয়ে দুপুরের আহার সম্পন্ন করেছে। জিনিসটা মন্দ না খেতে, আবার দামও নাগালের ভেতর। সামনে যে ছেলেটা মুরগির মাংস ভাতের মধ্যে মাখাইতেছে—আলতাফ মিয়ার বলতে ইচ্ছে হয় তাকে—‘মিয়া, কী ঘোড়ার ডিম খাইতাছো!’ কিন্তু কী দরকার মানুষের রুচিবোধ নিয়ে আলগা চিন্তা করার। নিজের পেরেশানি নিয়ে ভাবতে গেলেই তো দিন ফুরাইয়া যায়। আলতাফ মিয়া যে লোকটার কাছ থেকে হাজারদশেক টাকা নিয়ে ইন্ডিয়ার ভিসা এনে দিতে ব্যর্থ হইছে—সেই লোক এক সপ্তাহের আল্টিমেটাম শুনিয়ে গেছে। ইন্ডিয়ার ভিসা দালাল দিয়ে ম্যানেজ করা যায় না, এটা আলতাফ মিয়া জানলেও ওই লোক জানত না। সপ্তাহের আজ তৃতীয় দিন। কোত্থেকে কীভাবে দশ হাজার টাকা ম্যানেজ করা যাবে, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে খাসির মাথার গোশতহীন এক হাড্ডিতে চোষণ দেয় আলতাফ।
মুস্তফার মুখে মুরগির গোশত লাগে মরা ঘাসের মতো। জোর করে পেটে ঢোকাতে হচ্ছে মশলাযুক্ত এই অখাদ্য। আর সামনের বুড়োকে দেখে লোভ জাগছে খাসির মাথার প্রতি। এই মুহূর্তে পকেটে অপর্যাপ্ত পয়সাকড়ি থাকলে ওয়েটারের মুখে মুরগির টুকরো ছুঁড়ে ফেলে একপ্লেট খাসির মাথা নেওয়া যাইত। কে জানে, খাসির মাথাও কি মুখে রুচবে মুস্তফার! বউ ফোন করে জানিয়েছে সকালে—মা কোনোক্রমেই পুত্রবধুর পেটে সন্তান রাখতে চান না। মুস্তফার বউয়ের এমন ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশনে বাচ্চা নিয়ে ভাববার সময় নাই, নষ্ট করে ফেলতে হবে। নাহয় বাচ্চা ত্রুটি নিয়ে জন্মাবে। মায়ের কথার উপর কথা বলতে পারে না মুস্তফা। আবার নামধাম ঠিক করে রাখা অনাগত সন্তানের কথা মনে পড়লে কান্না পায়। এমন নিস্পাপ একটি প্রাণের হন্তক হইতে চায় না মুস্তফা।
‘ভাই, একটু চাইপা বসলে ভালো হয়।’ লম্বাচওড়া লোকটির দিকে তাকিয়ে পাশে চেপে বসল মুস্তফা। আলতাফ মিয়া মনে মনে বলল, ‘ভালো অইছে।’
‘কী আছে ভাই! আলু ভর্তা হবে?’
‘হবো। বহেন দিতেয়াছি।’ ওয়েটার ধুলোমাখা আলুভর্তার গোল্লা তুলে নিতে ছোট হাফপ্লেট নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ত্রিশোর্ধ শাহিন জুঁতসই করে বসতে পারেনি দেহের লম্বা গড়নের কারণে। এই সমস্যায় তাকে পড়তে হয় যাত্রাবাড়ী থেকে বাহাদুর শাহ পরিবহনে চড়ে অফিসে যাবার কালেও। তখন মনে হয় পা-দুটো খুলে জানালা দিয়ে ফেলে দিতে। তবে এরচে বড় সমস্যা মাথায় লাটিমের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ স্ত্রী জান্নাত আরা বেগম তাকে ছেড়ে অন্যত্র সংসার জমাবার হুমকি দিয়েছে। এ হুমকি নতুন নয়। মাত্র বাইশ বছর বয়সে যখন শাহিন বিয়ে করে, জান্নাত তখন ষোড়শী বালিকা। বছরখানেক কেটে গেছে নবদাম্পত্যের ছন্দে-তালে খুনসুটি আর অপ্রাসঙ্গিক বিবাদে। এরপর যখন দুজনের মাথায় সংসারে নতুন সদস্য যোগ করবার স্বপ্ন, বংশের বাতি জ্বালাবার তাগাদা যখন উধ্বপুরুষদের, ঠিক তখন শাহিন আবির্ভূত হলো ‘কাপুরুষ’ হিসেবে।
‘ওই মিয়া! ডাইলে আঙ্গুল চুবাইছেন কেন? বুদ্ধিসুদ্ধি নাই মাথায়?’ ওয়েটারকে ধরে পিষে ফেলতে ইচ্ছে করে মুস্তফার। শালার ব্যাটা কোথায় না কোথায় হাতাহাতি করে তার ঠিক নাই।
মুস্তফার আকস্মিক রক্তিম চেহারা দেখে ভড়কে যায় ওয়েটার শরিফ। মাত্র তিনদিন হয়েছে চৌরঙ্গির চাকুরির। এরইমধ্যে পাঁচবার কাস্টমারের ঝাড়ি খেয়ে মালিকের কুদৃষ্টি কুড়িয়েছে সে। বরিশালের নিজ গ্রাম থেকে মালিক আকবর আলি বিদেশ যাত্রায় দালালের হাতে প্রতারিত যে ছেলেটিকে ‘কোনো কাজে লাগানোর’ ইচ্ছায় ঢাকা এনেছে, ছেলেটি বোধহয় এরইমধ্যে তাকে বিরক্ত করে ফেলেছে। গোল সাদা টুপি পরা আকবর আলি ক্যাশ থেকে উঠে এসে মুস্তফার কাঁধে হাত রেখে বলে,
‘হেয় নতুন আইছে। রাগ কইরেন না বস।’—‘শরিফ! তোমারে না কইছি বুইজ্জাশুইনা কাম করতে! যা আরেকটা ডাইল নিয়ায়।’ শরিফ মাথা নীচু করে ফিরে যায় পেছনে।
‘দেখছেন কত বড় বদমাইশ? আর এই শালাগো তোয়াজ কইরা চলে মালিকরা।’ মুস্তফার কথা শুনে আলুভর্তায় ভাত মাখাতে মাখাতে মাথা নাড়ে শাহিন। ওয়েটারের চেয়ে নিজেকেই মনে হয় সবচে অকর্মা শালা। যেই শালায় একটা বাচ্চা জন্ম দিতে পারে না, তাকে জান্নাত কীভাবে কোন দুঃখে এতকাল সহ্য করেছে—তা সেই জানে। না, যৌনসমস্যা যে শাহিনের নেই, তা ডাক্তার আগেভাগেই জানিয়েছে। জান্নাতও জানে ব্যাপারটা। যদিও শশুরালয়ে চাউর হয়ে গেছে—জামাইয়ের গোপন সমস্যা আছে বলেই সে বাবা হতে পারছে না। এই অজুহাত পুঁজি করে জান্নাতকে সক্ষম পুরুষের কাছে পুনঃপাত্রস্থ করবার ভাবনাটাও কতিপয় বংশীয় মুরব্বির মাথায় ঘা দিয়েছে।
‘মুরব্বি? ফোন বাজে পকেটে।’ সদ্য হাতমুখ ধুয়ে গা ঘেঁষে বসা দাঁড়ি-গোফহীন বালকের কথায় লোকমা মুখে পুরতে গিয়েও থেমে গেল আলতাফ মিয়া। ফোনটা কে দিয়েছে সে জানে। কোর্টকাচারিতে নানাবিধ দালালি করার ফাঁকে কিছু আলাভোলা বিদেশ যাত্রীর সাথে কানেকশন করেই আলতাফ মিয়ার জীবন চলে। সবসময় শুধু প্রতারণা করে বেড়ায়—ব্যাপারটা এমন না। স্ত্রী জামিলা বেগম আইসিউতে শয্যাশায়ী, জন্ডিসে হলুদ হয়ে গেছে দেহ, চোখদুটোর দিকে তাকালে মনে হয় তাতে পুঁজ জমে গেছে—ওই হতাশায় ছুটোছুটির সময়ে আলতাফ ফোন পেয়েছিল কবির ভাইয়ের।
‘এক ছেলে ভারত যাইতে চায়, ভিসার দালাল খুঁজতাছে।’
‘ভিসা!’
‘হ ব্যাটা। ধরাইয়া দেই তোরে? খাইয়া ভুজুংভাজুং বুঝাইয়া ছাইড়া দে।’
ছেলেটির কাছে গুণে গুণে দশ হাজার টাকা চেয়েছিল আলতাফ। টাকাটা দরকার ছিল স্ত্রীর চিকিৎসা পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু টাকা খরচের দুদিন পর স্ত্রী পরবর্তী জীবনে পাড়ি জমায়। ব্লকলিস্টে ফেলে দিলে আলতাফকে খুঁজে পাবার কোনো জো নেই। কিন্তু তাকে ধোকা দেবার ইচ্ছে হয়নি আলতাফের। পাসপোর্ট এখনও পকেটে, কোনোভাবে টাকাটা ম্যানেজ হলেই সব ফিরিয়ে দেবে সে।
মুরব্বি ফোনটা ধরছে না, অবিরত বেজেই চলছে—এ দেখে আহনাফ বেশ উত্তেজিত। ছোট বিষয়েই তার মাঝে প্রবল রহস্য তৈরি হয়। এই যেমন এখন মনে হচ্ছে, লোকটি কারও সাথে বেঈমানি করেছে। বুড়ো খুব দ্রুত শেষ খাবারটুকু গলায় ঢুকিয়ে হাত ধুতে যাচ্ছে। হোটেল থেকে বেরিয়েই ফোনটা রিসিভ করবে হয়তো। আহনাফ মাত্র খাওয়া শুরু করেছে—নাহয় ইচ্ছে করছে বাইরে গিয়ে তার ফোনালাপ শোনার।
‘ভাই! বের হবো।’
আঙুল চাটতে থাকা ছেলেটির খাবার শেষ। শাহিন চেয়ার ছেড়ে সরে দাঁড়াবার পর মুস্তফা হাত ধুতে গেলো। আবারও ভর্তাভাতের সাথে ডালের মিশ্রণে হাত ডুবিয়ে মূলত সেই চিন্তায় ডুবে গেল শাহিন। আচ্ছা—এই যে এত মানুষ, সবারই সংসার আছে, বাচ্চাকাচ্চা আছে, বোধহয় যে ছেলেটি হাত ধুতে গেল তারও আছে। আল্লাহ কোন অজানা কারণে আমাকে পথরুদ্ধ করে রেখেছেন তিনিই জানেন। বাচ্চা তিনি দেবেন না এতে আফসোস নেই। কিন্তু ‘বাচ্চা হয় না’ বলে সমাজ ও পরিবারের যে অবর্ণনীয় মানসিক নিপীড়ন আমি সহ্য করছি, তা থেকে কি মুক্তি দেওয়া যায় না মাবুদ?
শুধু বাচ্চাটা মেরে ফেলতে পারলেই সব ঝামেলা শেষ—মুস্তফা জানে। কিন্তু আল্লাখোদার ভয়ে মুস্তফার ভেতরটা কেঁপে উঠে এ কথা ভাবতে গেলেই। আচ্ছা—কারও সন্তান যদি নিশ্চিত ত্রুটি নিয়ে জন্মাবার আশঙ্কাও থাকে, বাবা-মা তাকে মেরে ফেলতে পারে? স্ত্রীর স্ফিত গর্ভে হাত রাখলেই অনুভূত হয় জীবিত একটা প্রাণ প্রবল আনন্দে ছুটোছুটি করছে। জীবনের যত সুখ-আহ্লাদ, ভাগ্যের যত ভালো-মন্দ, সব তো লেখা থাকে আসমানে। এই যে না চাইতেই কীভাবে কোত্থেকে একটা প্রাণের সঞ্চার ঘটে গেলো অপ্রস্তুত মায়ের ভেতর, এর যাত্রা কি চাইলেই রুখে দেওয়া যায়?
‘হ্যাঁ, আমি আপনার সাথে প্রতারণা করছি। এজন্য মাফ চাই। আমাকে আর দুইটা দিন সময় দেন। আমি টাকাটা দিয়া দিবো।’
‘শোনেন, আমার টাকা লাগবে না। আমি পরকালে আপনার থেকে হিসাব বুইঝা নিমু। খোদার কাছেই আপনার ব্যাপারে আমি নালিশ দিলাম। আল্লাহ যেন আপনারে শাস্তি দেয়।’ এটুকু শোনার পর কলটা কেটে গেল। আলতাফ মিয়া উপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘আর কোন শাস্তিডা বাকি আছে মাবুদ?’
ইয়েসস, প্রেডিকশন মিলে গেছে। লোকটা ফ্রড। এতক্ষণ পরে এসেও যে শেষটা ধরতে পারা গেছে, এতেই আনন্দিত আহনাফের মুখ। কী রহস্যময় এ পৃথিবী!