এমভি ইমাম হাসান। বেশ বড়সড়ো তিনতলা লঞ্চের ছাদে যাত্রীদের বসতে দেওয়া হবে না বলে স্টিলের তৈরি মোড়ার মতো বস্তুটি নেই। অথচ চাঁদপুরে এসেছিলাম যে লঞ্চটিতে, তাতে এই জিনিসটা ছিল। মানুষকে মুগ্ধ করতে দুর্দান্ত কিছু করে ফেলার তো প্রয়োজন নেই, ক্ষেত্রবিশেষ ছোট একটি ‘স্টিলের মোড়া’ যথেষ্ট হয়ে ওঠে। লঞ্চে মানবজৌলুস নেই। চুপচাপ দ্বিতীয়তলার লম্বা ব্রেঞ্চে বসে সামনে ঢালা বিছানায় সন্তান বুকে নিয়ে এক মাকে ঘুমোতে দেখছি। কিছু মানুষ অনায়াসে পরিবেশকে আপন করে নিতে পারে।
লঞ্চ ছাড়তেই দোতলার খোলা ডেকের মাঝ বরাবর বসলেন এক লাল দাঁড়িওয়ালা চাচা। গামছা বিছিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া দেখে প্রথমবার ভেবেই বসেছিলাম; ব্যাটা এই হৈ হুল্লোড়ে, বিড়ির গন্ধে ভাত খাবে ক্যামনে! ভাত তো খেল না, কলব্রিজ খেলতে তাসের কার্ড বানাতে থাকল চাচা; বেশ পাকা হাতে। অপরিচিত আরও তিনজন খুব কম সময়ে জুটেও গেল। চাচার মুখ উৎফুল্ল। আমরা যারা ব্রেঞ্চে বসে পুরোটা পথ নদী ও তার ঢেউ দেখতে দেখতে সদরঘাট যাব, চাচা তাদের দিকে একবার তাকিয়ে বোঝালেন—‘সময়কে কাজে লাগাইতে হয় ক্যামনে দেখ তোরা!’
চাঁদপুর শব্দটা একজীবন মাথায় প্রতিবেশীর বাড়ির আঙিনার মতোই স্পষ্ট ঘোরপাক খেত। কখনও দেখিনি এই জনপদ, কখনও হাটিনি এই জেলাশহরে, কখনও ইলিশভাজা খেয়েও দেখিনি; তবুও। হৃদয়ের আকুলতাকে প্রশ্রয় দিতে গিয়েই ভরদুপুরে বাসায় না বলে রিক্সায় সদরঘাট অতঃপর ছোটখাটো এক লঞ্চে চাঁদপুর। হুটহাট ভ্রমণে তো আনন্দ আছেই, তবুও চাঁদপুর কেন মূখ্য! ব্যাপারটা কি নজরুল মাঝির জন্য? নজরুল মাঝির বাড়ি চাঁদপুর বলেছিল। যদিও চাঁদপুরের কোন জেলেপল্লীতে তার কুড়েঘরটি—তা বলেনি। পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে সন্ধ্যার মেঘনায় প্রেমে পড়ব বলে ভাবছি। নজরুল মাঝিও তো মেঘনার প্রেমিক ছিল! এই নদীতেই তার ইলিশের নৌকা ছুটে বেড়াত দিগবিদিক। দু-বছর আগে এই নজরুল মাঝির সাথে দেখা হলো; চাঁদপুরে নয়, সেই টেকনাফে।
এক বিষণ্ণ বিকেলে আকাশমুখে তাকিয়ে নাফ নদীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছি। মানুষের কোলাহল, পানির কলকল মিলে যেন যুদ্ধশিবিরের ব্যস্ততা। অদ্ভুত বিমর্ষ সৌন্দর্য নিয়ে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছে দূরের পর্বতগুলো। জীবন হাতে কেউ আসছে নৌকায় চেপে। কেউ অন্যের জীবন বাঁচাতে স্বল্পমূল্যের সওদা করে কৃতজ্ঞতার বোঝা ভারি করছে। আমি কেবল দর্শক। দর্শনে তৃপ্তি; দর্শনে মুক্তি। জীবনবিপন্ন মানুষেরা দর্শকদের চেয়ে ঢের পছন্দ করে স্বার্থান্বেষী ধর্ষকদের। এসব সমীরণ গায়ে মেখে দেশের শেষ ইটটির উপর দাঁড়িয়ে হাসিমাখা মুখে পরিচয় হলো নজরুল মাঝির সাথে। মাঝি কেবল নৌকা নয়, সাগড় নদীতে বয়ে বেড়ায় অর্থ; স্বপ্ন আর স্বার্থ। সেই অর্থে সুখ নেই, সেই স্বপ্নে আনন্দ নেই, সেই স্বার্থে তৃপ্তি নেই। কথা বলতে বলতে আবিস্কার করা গেল, মানবসত্তার কোনো ক্ষুদ্র অংশে নজরুল মাঝি আর আমার একাত্মতা রয়েছে। আমি হাসলে সে তার অংশ হতে চায়, আমি বললে সে শুনতে চায়; সে বললে আমি মুগ্ধ হই। টেকনাফে কোনো বিশেষ ‘চালান’ উঠাতে এসে অচেনা এক তরুণের সাথে এক জনমের বিশ্বাস নিয়ে বোশেখের ঝড়ো বাতাসের গতিতে বলে চলল নজরুল মাঝি।
চাচার হাত কেবল পাকা নয়—তাসের মাঠে ইঁচড়ে পাকা। বাকি তিনজন হা করে দেখছে আর খাতায় মাইনাসের পসরা সাজাচ্ছে। একটা বেনসন চাচার হাতের পাশে জ্বলছে। উৎসাহী কিছু তরুণ দর্শকের শূন্যতা বুঝতে দিচ্ছে না। চাচার ট্রাম্পকার্ড কাউকে গিলে খেলে তরুণরা উচ্ছসিত হয়; হাততালি দেয়। এই হাততালি পেতে হলেও চাচাকে অহেতুক কারণ দর্শিয়ে সপ্তাহে দুদিন বাড়ি ছেড়ে সদরঘাট আসতে হয়।
‘বুঝলেন মিয়াভাই! কত টেকা যে হাতাইছি! কিন্তু কপাল তো ফাটা!’
‘টাকার সাথে কপালের সম্পর্ক কী নজরুল ভাই!’
‘আছে। দুনিয়ার সব জিনিসই কপালের লগে পিরিত করে।’
নজরুল মাঝি চাঁদপুরের সন্তান। গ্রামের নাম বলেনি। বউয়ের নাম করিমন। নজরুল মাঝির গল্পের প্রতি লাইনে একবার করে করিমন আছে। করিমন যেবার সন্তানসম্ভবা, নজরুল মাঝি তখন জীবনঝুঁকি নিয়ে যশোরে শার্শার গোগা সীমান্তে ইলিশবোঝাই পেটিগুলো ওপারে ঢোকাবার উপায় খুঁজছে। দশ-দশটি বছর চোরা কারবারি করে নজরুল মাঝির হাত ইঁচড়ে পাকা হয়েছে। তবুও নজরুল ছোটবেলায় দাদির মুখে শুনেছে—চোরের দশদিন, গেরস্তের একদিন। দাদি যদি কবর থেকে জানতে পারে নজরুল বড় হয়ে চোর হয়েছে? উদ্ভট চিন্তার সাথে আত্মকম্পন নজরুলের অভিজ্ঞতাকে ধুয়েমুছে ফেলে দেয়। করিমন এবার আসতে দিতে চায়নি; নজরুলের ডানহাত তার পেটের উঁচু দিকটায় চেপে ধরে হেঁচকি মেরে কেঁদেছে। নজরুল এই আবেগকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বেড়িয়ে এসেছে। ইলিশের চাহিদা পশ্চিমবঙ্গে তুঙ্গে। এই চালান ঢোকাতে পারলে মহাজন পাবে পাঁচলাখ টাকা, নজরুল মাঝি পাবে পঞ্চাশ হাজার। ‘লাখে দশ’ হিসাব ভালো লাগে না নজরুলের। মহাজনের সেই পাঁচলাখ তার জিহ্বায় জল এনে দেয়। সরকারের হম্বিতম্বিরা ধরলে ধরবে নজরুলদের, মহাজনরা কেবল অন্ধকার লঞ্চের কোণার কেবিনে বসে মুহুর্মুহু কল করবে, সিগারেট ফুঁকবে। সরকার বাহিনীর প্রতিও ক্ষোভ নেই নজরুলের; সরকার ইলিশ রপ্তানীতে নিষেধাজ্ঞা এনেছে বলে নজরুলের ব্যবসা। কিন্তু এবার একটু ঝাকি বেশিই লাগবে বলে মনে হচ্ছে। সীমান্তে দাঁড়িয়ে আরও একবার করিমন আর তার স্ফিত গর্ভের কথা মনে হলো। নজরুল ঘরে ফিরলেই হাতে ঝকঝক করবে অনিবার্য পঞ্চাশ হাজার টাকার বান্ডেল।
লঞ্চ ধীরে চলছে। চাচা তার প্রথম ম্যাচ শেষ করেছে। সবসময়ের মতো এবারও চাচার জয়। এই লঞ্চের ডেকে বসে চাচার পরাজয় খুব কমই হয়েছে। তরুণদের দলটিতে প্রবীণ, আধো-প্রবীণরাও যোগ হলো। চারজনের একজন দুশো টাকার নোটটি ফেলতে বেশ কাঁচুমাচু করল। সদ্য কামাই করা টাকা বজ্জাত চাচার পকেটে চলে যাবে! হইচই করেও লাভ হয়নি। চাচার সাপোর্টার অনেক। টাকা না দিলে লঞ্চ ছেড়ে সদরঘাটে পা ফেলতে পারবে না বলে হুমকিও দিল এক পুঁচকে সিগারেটবিক্রেতা। চাচা খুশিমনে পিছুফিরে একবার দেখলেন সোনার ছেলেকে। বাধ্য হয়ে দুশো টাকা লাল গামছায় ফেলে গজগজ করতে করতে ডেক ছেড়ে ছাঁদে উঠে লোকটি রাতের মেঘনার দিকে তাকিয়ে রইল। ঢাকা বহুদূর। আরেক গেম হয়ে যাবে। খেলুড়ে মহাপণ্ডিতের হার দেখে চাচার সাথে বসতে রাজি হলো না কেউ। একজন দরকার। লঞ্চে এত জুয়াড়ি—একজন পাব না? চাচার নিরব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলো। গলায় গামছা ঝুলিয়ে ময়লা লুঙ্গি সোজা করে বসে পড়ল এক তরুণ। কামলা শ্রেণির ছেলে। চাচার বাজেট বেড়ে গেছে। ‘এইবার খেলা হইবো পাঁচশোতে’। যে জিতবে সে সবার পকেট ঝেড়ে পাঁচশো করে টাকা নেবে। নতুন নিয়মে জড়োসড়ো হয়ে বসল খিলাড়িরা। বাকিরা চরম উৎসাহে তাকিয়ে।
‘তারপর কী হলো নজরুল ভাই? ইলিশ গেলো ওপারে?’
নজরুল মাঝি মাথা নীচু করে ডানবাম করলেন। বিজিবির একটি দল এসে ইলিশগুলো উদ্ধার করে পাশের এতিমখানায় দান করে দেয়। পাঁচ লক্ষ টাকার ইলিশ চোখের সামনে শেষ। নজরুল মাঝিকে গ্রেফতার করে বিজিবি। এরপর পুরো একবছর জেল খেটে যখন বাড়ি ফিরে, তখন করিমনের কোলে হাসছে কামরুল। করিমন খুশিতে আধঘন্টা কাঁদল, কামরুলও না বুঝে কাঁদল। ‘আপনে বাঁইচ্যা আছেন? এই দেহেন এইডা আপনের পোলা! নাম রাখছি কামরুল। আপনের নামের সাথে মিলাইয়া—নজরুল-কামরুল।’
ছেলের কপালে চুমু খেতে গিয়ে নজরুল ভাবল, একজন চোর চুমু খাচ্ছে নিস্পাপ শিশুকে। কেঁপে উঠল ঠোট। আর চোরা কারবারে জড়ায়নি নজরুল। এক জীবন যাদের বোঝা টেনে অবশেষে জেলের ভাত খেয়ে এসেছে, টেকনাফের আলো অন্ধকারে পূর্বের হিসাবনিকাশ মিলাতে বহু মহাজনের ঘরে, লঞ্চে ঘুরঘুর করে নজরুল। সবাই কুকুরের মতো তাড়িয়ে দেয়। তাড়া খেয়ে খেয়ে নজরুল জীবনের খাতা থেকে অবৈধ উপাদানগুলোর ছায়া মুছে ফেলছে। আমি যখন নজরুল মাঝির হাত ধরে লিংক রোড ধরে হাটছি, তখন এক আকাশ মুগ্ধতা ঝেড়ে নজরুল মাঝি বললো, ‘শেষ! আর দৌঁড়ামু না। এইবার কাম শুরু করমু। ব্যবসা ধরমু মাছের।’
সদরঘাটের টার্মিনাল জ্বলছে। লঞ্চের গতি কমে গেছে। আরও অস্বাভাবিক খবর হলো, চাচা হেরে গেছে—ওই কামলা ছেলেটি জিতে গেছে। পুরো লঞ্চজুড়ে হইচই চাচাকে নিয়ে। চাচা মাথায় হাত ঠেকিয়ে বসে আছে। এখনও বেনসনের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিভুনিভু জ্বলছে।