আমাদের হেফজখানার ঘরটি ছিল নদীর ধারে। জানালায় দাঁড়ালেই লৌহজং নদী দেখা যেত। সরু নদী, স্রোত নেই, পানি কালচে বর্ণের; কচুরিপানায় ঢেকে থাকে নদীর বুক। নদীর দিকে তাকালে নাকি মানুষের মন ভালো হয়ে যায়, আর আমরা জানালায় দাঁড়ালেই মন খারাপ হয়ে যেত।
আমি বড্ড একা থাকতে পছন্দ করতাম। বন্ধু-বান্ধব ছিল না—তা বলা যাবে না। তবে বিকেলবেলায় ওদের সাথে হাডুডু কিংবা গোল্লাছুট খেলার চেয়ে আমার বরং নদী দেখতে ভালো লাগত। আমি মন খারাপের জগতে ডুবে থাকতেই পছন্দ করতাম।
বিকেলে যখন জানালায় দাঁড়াতাম, নদীর ওপাড়ে হিন্দু ছেলেমেয়েদের ঝাপাঝাপি দেখা যেত। আমি ভাবতাম, এই নোংরা পানিতে ওরা কীভাবে গোসল করছে! ওদের কি ঘেন্না করে না?
ওপারের একটি বাড়ি নিয়ে সবার ভেতর কানাকানি ফিসফিস হতো, ওই বাড়িতে নাকি মদ বানায়। আমি খুব আগ্রহভরে ওই বাড়ির দিকেও তাকিয়ে থাকতাম। আরও খানিক দূরে নদীঘেঁষা একটি পুরোনো একতলা ভবনের নীচে শিয়াল বাসা বানিয়েছিল। আমি নীরবে শিয়ালের গতিবিধি বুঝতে চাইতাম।
একদিন নদীর দিকে তাকিয়ে দেখি, একটি মরা গরু ভেসে যাচ্ছে। তার উপর বসে আছে অনেকগুলো কাক। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি, মৃত গরুটির উপর ওরা বসে আছে কেন? আমার সঙ্গীরা বিষয়টি বুঝিয়ে দিল। ওরা বলল, ‘গরুর গোশত খাওয়ার জন্য বসে আছে।’ কী অদ্ভূত ব্যাপার না? গরুটি ভেসে যাবে, আর কাকেরা অল্প অল্প গোশত ঠুকরে খাবে।
আরেকবার ঘটেছে ভয়ানক ঘটনা। বন্যায় তলিয়ে গেছে নদী। পানি এসে ঠেকেছে আমাদের হেফজখানার ঘরের সাথে। একদিন দেখি, ঘরের পাশে যে কামরাঙা গাছ, তার ডালের সাথে একটা সাপ প্যাঁচিয়ে আছে। দেখে তো আমার গা ছমছম করে উঠল। ছেলেপেলেরা দৌঁড়ে ছুটে গেলো মুহতামিম সাহেবের কাছে। পরেরদিন বাজার থেকে নিয়ে আসা হলো চার বোতল বিষ। ঘরের চারকোণে রেখে দেওয়া হলো বোতল চারটি। হুজুর আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘দেখো, এই বিষের কাছেও যদি তোমরা যাও, সোজা নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাবে।’
আমাদের মাদরাসায় শৌচাগার—মানে বাথরুম ছিল খানিকটা দূরে। ওখানটায় ছিল নিরব নিস্তব্ধ পরিবেশ। দিনের বেলায়ও যেতে ভয় করত। বাথরুমের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল শতবর্ষী তিনটি কাঠবাদাম গাছ। এর একটি গাছ ছিল সবচেয়ে বড়। গাছটি কত বড় হবে জানো? অন্তত দশতলা ভবনের সমান। এত বড় গাছ আমাদের পুরো জেলায় আর একটিও ছিল না।
গাছের নীচে, অর্থাৎ বাথরুমের পেছনের দিকটায় যাওয়া আমাদের জন্য নিষেধ ছিল। ওখানে শুকনো পাতা পড়তে পড়তে স্তূপ জমে গিয়েছিল। কেউ হাটতে গেলে খচখচ শব্দ হতো। গাছের সবচেয়ে নীচু ডালটিও যদি তুমি ধরতে চাও, তোমাকে মই বেয়ে উঠতে হবে। আমাদের ছাত্রদের মধ্যে একটি কথা প্রসিদ্ধ ছিল, ওই গাছের ভেতরে নাকি ইয়া বড় এক সাপ থাকে। ওই সাপের খাবার হচ্ছে কাঁচের জিনিসপত্র। বছরে একবার নাকি গাছ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। আমি তো সবসময় ভয়ে থাকতাম, কবে যেন সেই ভয়ানক দিনটি চলে আসে।
যে গল্প বলার জন্য এত আয়োজন করে তোমাদের নিয়ে বসেছি, এবার সেটি বলা যাক।
শুয়াইব নামের এক ছেলে একবার গোটা মাদরাসায় ঘটিয়ে ফেলল চাঞ্চল্যকর ঘটনা। একরাতে হিসু করতে গিয়ে ও যেন কী দেখেছে, ভয়ে চিৎকার করে গোটা মাদরাসা জাগিয়ে তুলেছে। মধ্যরাতে ঘুমের চোখে খুব একটা বুঝতে পারিনি, ঘটেছে কী। সকালে উঠে শুনলাম, ও নাকি রাতের বেলায় কাঠবাদাম গাছের নীচে ভূত দেখেছে।
শুয়াইবের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর। ও শুয়ে আছে। চারিদিকে ছাত্ররা ভীড় করে শুনছে সেই ভীতিকর কাহিনী। ঘটনা সত্য—এতে কোনো সন্দেহ নেই। ঘটনা মিথ্যে হলে তো শুয়াইবের শরীরে জ্বর হতো না।
হুজুরও খানিকটা চিন্তিত। ছাত্রদের মধ্যে চাউর হয়ে গেছে, কাঠবাদাম গাছের নীচে ভূত দেখা গেছে। দিনের বেলায়ও কেউ ঘর থেকে বেরোবার সাহস করল না। হুজুর তিনজন করে দল বানিয়ে দিলেন। ইসতেনজা করতে হলে তিনজনকে একসাথে যেতে হবে। তিনজন কেন? কারণ, একজন ভেতরে ঢুকলে আরেকজন একা ভয় পেয়ে যেতে পারে।
আমরা তখন প্রচণ্ড ভয় ও উৎকণ্ঠা নিয়ে শুয়াইবের কাছে ঘটনা শুনতে চাই। শুয়াইব ভয় ভয় চোখে বলতে থাকে—ভূতটি ছিল কাফনের মতো ধবধবে সাদা কাপড় পরিহিত। মুখটা নিকষ কালো। দাঁতগুলো ইয়া বড় বড়। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, ভূতের এক হাত ছিল অর্ধেক কাটা, ওই অংশটুকুতে ব্যান্ডেজ লাগানো ছিল। ব্যান্ডেজ থেকে রক্ত বেয়ে বেয়ে পড়ছিল।
আমরা এ বৃত্তান্ত শুনে তো ভয়ে কুপোকাত। এমনকি হুজুরও বোধহয় কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন। বুঝলাম কী করে? কারণ মাগরিবের পর হুজুর ইসতেনজা করতে যাবার সময় একজনকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন।
গোটা হেফজখানায় তখন আলোচনার শীর্ষে—কাঠবাদাম গাছের ভূত। সবার মাঝে ভূতের একটা নামও ছড়িয়ে পড়ল, হাতকাটা ব্যান্ডেজ। ভূতের সবচেয়ে ভয়ানক এবং প্রধান বৈশিষ্ট্য যেহেতু তার কর্তিত রক্তাক্ত হাত, তাই এ নাম দেওয়া হয়েছে।
ছেলেরা মজা করে একে অন্যকে ভয়ও দেখাতে শুরু করল, ‘এই, সাবধান, হাতকাটা ব্যান্ডেজ ধরবে কিন্তু।’
সেদিন রাতে আমরা ঘুমাতে গিয়ে চোখ বুঁজতে পারলাম না। সবার মাঝে আতঙ্ক। জানালার দিকে তাকালেই ভয়ে বুক কেঁপে উঠে। সবসময় যে হলুদ বাতি জ্বলে থাকে, তার দিকেও ভয়ে তাকানো যাচ্ছে না। কুরআন শরিফ যে বিশাল তাকে রাখা হতো, সেখানে অনেকগুলো ছেঁড়া কুরআন শরিফ ছিল। ওগুলো অনেক পুরোনো। ব্যাবহারের অযোগ্য। ছেলেরা সেই ছেঁড়া কুরআন শরিফ থেকে সুরা জিনের পৃষ্ঠা খুলে এনে বালিশের নীচে রেখে দিলো। শুনতে হাস্যকর লাগছে তোমাদের? কিন্তু ওই ভয়ের সময়ে আমাদের হাসি পায়নি। আমরা ভেবেছি, কুরআনের বরকতে হাতকাটা ব্যান্ডেজ আমাদের কাছে আসতে ভয় পাবে।
আরও মজার ব্যাপার হলো, কয়েকজন ছেলে বোতল জোগার করে কাঁথার নীচে লুকিয়ে রাখল। রাতের বেলায় যদি প্রচণ্ড হিসু পায়, ওরা নাকি এই বোতলে সেরে নেবে।
এসব কর্মকাণ্ড দেখে হুজুর রেগে উঠলেন। লাঠি নিয়ে তেড়ে এসে সবাইকে শুইয়ে দিলেন। সেদিন আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালবেলায় মারুফ নামের এক ছেলে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হলো। মারুফ ছিল বয়সে আমাদের চেয়ে কিছুটা বড়। ওর জ্বর দেখে আমরা ভয়ে আতঙ্কে চুপসে গেলাম। ফজরের পর হুজুর মারুফের কাছে জানতে চাইলেন—কী হয়েছে ওর। মারুফ যা শোনালো, তাতে হুজুরের চেহারায় স্পষ্ট হয়ে উঠল প্রচণ্ড ভীতি।
রাতে কে নাকি ঘরের দরজায় কড়া নেড়েছে। ঠক ঠক ঠক ঠকক্। মারুফের ঘুম পাতলা। সে সজাগ পেয়ে অতকিছু না ভেবে দরজা খুলেছে। যে-ই কাঠের দরজাটি সামান্য ফাঁকা হয়েছে, অমনি সে দেখতে পেয়েছে—সামনে ইয়া বড় বড় দাঁত বের করে হাসছে সেই হাতকাটা ব্যান্ডেজ। এরপর ধড়াক করে দরজা বন্ধ করেই সে বিছানায় পড়ে গেছে। এরপর আর কিছুই মনে নেই ওর।
এ ঘটনা শুনে যারা বয়সে অনেক ছোট, ওদের কেউ কেউ বাড়িতে চলে যাবার জন্য হুজুরের কাছে ছুটির আবদার করল। দুপুরনাগাদ আবিদ নামের এক ছেলের বাবা চলে এলো ওকে নেবার জন্য। বড় ছাত্রদের অনেকেই হুজুরকে বলল তাবিজের ব্যবস্থা করতে। আর আমি—রহস্যের জটলা পেরোবার অভ্যাস তো ছিলোই, ভয়-আতঙ্ক নিয়েই এককোণে চুপসে বসে রইলাম।
সেদিন বিকেলে হেফজখানায় এলেন বাহরুল কাকা। উনি মাদরাসার বোর্ডিং দেখাশোনা করেন, আর মসজিদে আজান দেন। সব ছাত্ররা উনাকে পছন্দ করে গল্প বলা মানুষ হিসেবে। নানান মজার গল্প জানেন উনি। তো—বিকেলবেলায় ঘরে এসেই সবাইকে ডেকে কাছে বসালেন।
এমনিতেই সবার ভেতর ভূতের ভয়, আর বাহারুল কাকা শোনাতে শুরু করলেন অতি-বিভৎস এক গল্প।
এই মাদরাসা তখনও হয়ে ওঠেনি। এখানটায় ছিল কাশবন। শিয়ালদের অভয়ারণ্য। বিশাল মাঠ পেরিয়ে নদীর এই ধারে কেউ দিনের বেলায়ও আসত না। আর ওই বিশাল কাঠবাদাম গাছ, তখনও ছিল এমনই।
একরাতের ঘটনা। বাহারুল কাকা মসজিদ থেকে এশার নামাজ পড়ে বেরিয়েছেন মাত্র। হঠাৎ দেখতে পেলেন, কাঠবাদাম গাছের নীচে একটি ছোট্ট টর্চলাইট জ্বলছে। উনি এগিয়ে গেলেন সেদিকটায়। দেখতে চাইলেন, এ জনশূন্য স্থানে হঠাৎ লাইট এলো কোত্থেকে।
কাছাকাছি গিয়ে দেখলেন, এক মহিলার লাশ ঝুলছে কাঠবাদাম গাছের নীচের ডালে—ফাঁসির দড়িতে। গাছের সাথে লাগিয়ে রাখা একটি মই। আর নীচে জ্বলছে ছোট্ট একটি টর্চলাইট। মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগও পড়ে আছে শুকনো পাতার ওপর।
এই গল্প শুনে সবার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। একজন বলল, ‘আমি একদিন ওই গাছের নীচে একগাছি চুল পড়ে থাকতে দেখেছি।’ বাহারুল কাকা তার সাথে সায় দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, ওই মহিলাকে যখন পুলিশ নামাতে গিয়েছিল, তখন তার মাথার চুল ছিঁড়ে পড়েছিল।’
আরেকজন বলল, ‘আমি একটা ছেঁড়া ভ্যানিটি ব্যাগ দেখেছিলাম।’ বাহারুল কাকা তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়েও বোঝালেন তার ঘটনার সত্যতা।
সন্ধ্যার পর নিয়মমাফিক আমার দাদা এলেন আমার জন্য এক বোতল দুধ নিয়ে। প্রতিদিনই আসেন তিনি। গোটা মাদরাসায় আমার দাদা হাজি সাহেব নামে পরিচিত। দাদা এলেই হুজুর আমাকে ইশারায় ছুটি দিয়ে দেন। ক্লাসের পড়া থামিয়ে আমি বারান্দায় গেলাম। আমার চেহারায় ভয়ের ছাপ দেখে তিনি বললেন,
‘কী হয়েছে?’
‘মাদরাসায় ভূত আছে। হাতকাটা ব্যান্ডেজ। আমি বাসায় যাব।’
‘আরে কীসের ভূত! ধুর!’
‘না সত্যি ভূত আছে। দুইজন ছাত্র দেখেছে। রাতে কেউ ভয়ে বাথরুমে যায় না।’
‘আচ্ছা তুমি থাকো। আমি কাল দেখছি কী করা যায়।’
পরেরদিন দাদা এলেন বিকেলে। তার সঙ্গে দুজন কাঠমিস্তিরি। দাদা তাদেরকে হেফজখানার কোণায় নিয়ে দেখিয়ে দিলেন কিছু একটা। এরপর হাসিমুখে হুজুরদের সাথেও কী যেন বললেন। মিস্তিরি কাজ শুরু করল। আমি তখনও কিছু বুঝে উঠতে পারিনি কিন্তু। আমার ভাবনাজুড়ে শুধু হাতকাটা ব্যান্ডেজ; আর দাদার প্রতি প্রচণ্ড অভিমান, এত করে বোঝানোর পরও উনি আমাকে বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন না।
সন্ধ্যার পর বড় হুজুর এলেন, মানে মুহতামিম সাহেব। সবাইকে কাছে ডেকে বসিয়ে বললেন,
‘শোনো, আমি ভালোমতো বলে দিচ্ছি, এখানে ভূত বলতে কিছু নেই। ভূতের আবিস্কারক তোমরা। মন থেকে ভয় ঝেড়ে ফেলো। আর যদি ভূত থেকেই থাকে, আমি আজ মাদরাসার চারিদিকে এমন তাবিজ পুঁতে দিয়েছি, ওই হাতকাটা ব্যান্ডেজ আর আসতেই সাহস পাবে না।
তোমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাবে। ভূত ভূত বলে অনেক পড়াশোনা নষ্ট করেছো। কাল থেকে যেন এমনটা না হয়।’
ছাত্ররা তবু নিশ্চিন্ত হলো না। ফিসফিস চলতে থাকলো কানে কানে। মুহতামিম সাহেব বললেন, ‘কী হয়েছে? এখনও ফিসফিসানি বন্ধ হলো না?’
একজন বড় ছাত্র বলল, ‘হুজুর, বিকেলে বাহারুল কাকা একটা ঘটনা শুনিয়ে গেছে…’ এটুকু শুনতেই মুহতামিম সাহেব বললেন, ‘বাহারুল মিয়া তোমাদের ভয় দেখিয়েছে। ওই ঘটনা মিথ্যা। আর শুয়াইব, মারুফ যা দেখেছে—তাও আমার বিশ্বাস হয় না। আমি এই মাদরাসায় বহু বছর ধরে আছি। ভূতপ্রেত থাকলে তোমাদের আগে আমি দেখতাম।’
সবার মাঝে এবার স্থিরতা ফিরে এলো। হাসি ফুটে উঠল ছোট ছোট মুখে। মুহতামিম সাহেব সবাইকে উৎফুল্ল দেখে হেসে বললেন, ‘তোমাদের এই গুজব রটানোতে অবশ্য একটা উপকার হয়েছে। হাজি সাহেব নিজ খরচে হেফজখানার সাথে এটাস্ট বাথরুম বানিয়ে দিচ্ছেন। তার নাতির সুবাদে তোমরাও এর উপকার ভোগ করবে।’