সূচীপত্র

গদ্য

আমার উস্তাদ মাওলানা ফোরকান ফয়জী

24 December, 2025
দুই হাজার এগারো সালের এক বিষণ্ণ শুক্রবারে আমি পা রাখি চট্টগ্রামে। আমার শহর টাঙ্গাইল থেকে সে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরে। আমি তখন সবে দশপেরোনো এক কিশোর। নতুন একটি জায়গায় এসেছি বলে উত্তেজনায় কাঁপছি। বাংলাদেশে দেওবন্দি সিলসিলার যত দরসগাহ রয়েছে, আমাদের মাদরাসা ‘মেখল’ ছিল সবচে ভিন্ন। খোদ হাটহাজারী—মেখলকে বলা হয় যার শাখা, মেখলের স্বকীয়তার প্রতাপ ঝড়ে পড়ত তার সামনেও। স্বকীয়তায় প্রোজ্জ্বল মেখলের শ্যাওলাধরা অস্পষ্ট কেতাবতে ‘মেখল হামিউসসুন্নাহ মাদরাসা’ লেখা গুরুগম্ভীর শাহী গেইট পেরিয়ে সেদিন এক নবভুবনে প্রবেশ করলাম, রিমিঝিমি তিলাওয়াতে আবিষ্ট এক জামাত আমাকে নিরবে জানাল আহলান সাহলান। কিছুটা মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত আলিশান মসজিদে জুমা পড়লাম। কৈশোরমনে তখন রাজ্যের উন্মাদনা। নতুন জায়গাটি করোটিতে গেঁথে রাখতে দ্রুত তাকাচ্ছি। দেখছি, চারিদিকে সফেদ পাগড়িওয়ালা। কেশমুণ্ডিত ছেলেগুলোর কেউ খালিপায়ে ছুটছে পুকুরপাড়ে, কারও ময়লা জুব্বার মাঝে ঝলক দিচ্ছে পবিত্রতা। কোলাহল নেই, আছে মৃদু গুঞ্জন। চারিদিক বড় বড় ভবনে ঘেরা, সারি সারি নারিকেল গাছে তৈরি প্রকৃতির আঁধারে ধ্বনিত সে গুঞ্জন আমার হৃদয়পাড়াকে মাতাল করল। আমি পাগলের মতো ভালোবেসে ফেললাম মেখলকে। তৃপ্তির ঝড় বয়ে গেল ভেতরটায়, যেন মহাকালের এক নুরানি কাফেলার শেষ কাতারে যুক্ত হলাম।
মেখলে নতুন ছাত্রদের জন্য সবচে ঝামেলার ব্যাপার ছিলো সারাবছরে থাকার জন্য হোস্টেলের রুম নির্ধারণ করা, মেখলের ভাষায় সিট গ্রহণ করা। আমার মামা আরিফুল ইসলাম (আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন)-এর সুবাদে উর্দুখানার বছর সিট নিয়ে ভাবতে হলো না। তিনি ব্যবস্থা করলেন, আরও দুবছর তিনি এই কাজটি করবেন। সিট নেওয়ার জন্য ছাত্ররা হুমড়ি খেয়ে পড়ত। কারও পছন্দ ছিল মাদরাসা ভবনের নীচতলার রুমগুলো, কেউ তাকিয়ে থাকত মুজাফফর মঞ্জিলের দিকে, কারো চাওয়া ছিলো উস্তাদের খাদেমদের জন্য নির্ধারিত পাশের রুমটি। বছরের শুরুতে একটি দিন বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে, নানা ফাঁকফোকড় খুঁজে, উস্তাদের সাথে আগেভাগে দেখাসাক্ষাত করে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিয়ে সিট নিতে সক্ষম হলে সারাটি বছর নিশ্চিন্তে থাকা যায়। তাই মেখলে সেই দিনটি রোজ হাশরের মতো। মেখলের এই উত্তেজনার দিনে যিনি সিটপ্রদানের ইয়া মোটা খাতাটি বগলদাবা করে ধীরপায়ে মসজিদের মিম্বারপানে এগিয়ে আসতেন, তিনিই আল্লামা ফোরকান ফয়জী। যে ছাত্রটি মেখলে ভর্তি হয়েছে, সে যেখানেই পড়ুক, যেখানেই থাকুক, এই লোকটির সম্মুখীন হতেই হবে। খাটো দেহাবয়বে কাঁচাপাকা দাঁড়িতে ফোরকান সাহেবকে লাগত গাম্ভীর্যহীন ঋজুপ্রকৃতির। রাগ নেই ভেতরটায়, কেউ সালাম দিলে ঠোটের একদিক বাঁকা করে সামান্য হাসেন। এই হাসিতে ছাত্ররা মুগ্ধ হয়, তার ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়ে যায়। আমিও পরিচিত হলাম। খুঁজতে থাকলাম—এই ব্যক্তির কী বৈশিষ্ট্য রয়েছে!
ফোরকান সাহেব উর্দুখানায় কোন ক্লাস নিতেন না। আমি নতুন নতুন হুজুরদের আগমনপানে তাকিয়ে রইলাম। তিনি এলেন না। সে বছর কিছুদিন ফারসিখানার দরস হলো মাদরাসার মধ্যখানের মাঠে, বাদামগাছতলায়। মাঝারি সাইজের কাঠবাদাম গাছটি ছিলো ঠিক মাঠের মধ্যখানে। ছাত্ররা মাটিতে চট বিছিয়ে ক্লাস করত। পুরো মাদরাসায় কেবল ফারসিখানায় মাইক ছিল না। ছাত্রও বোধহয় দুইশোর কম ছিল। আমরা উর্দুখানার ছাত্ররা মাদরাসা ভবনের দোতলা থেকে উঁকি দিয়ে দেখতাম, ফারসিখানার ছেলেরা সবুজ গাছের তলে রোদেবাতাসে দুলেদুলে পড়ছে ‘হামদে বেহদ মর খুদায়ে পাকে রা, আঁকেহ ঈমাঁ দাদে মুশতে খাকে রা’। কী সুর! কী ছন্দ! যিনি পড়াচ্ছেন তিনি যেন একটি তরঙ্গ ছুড়ে দিচ্ছেন, পরক্ষণে সে তরঙ্গ বহুমাত্রায় ঢেউ খেলে আকাশে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। দুইশো ছাত্র একসাথে ফরিদ উদ্দিন আত্তারের পান্দেনামা পড়ছে, আর আমরা বছরের প্রথম দরসে বসে আফসোস করছি, কবে ফারসিখানায় উঠব? উর্দুখানার ছাব্বিশটি কিতাবের প্রতিটি পাতা উল্টিয়ে দেখতাম, কোন শের আছে কী না! উর্দুর আঁকাবাকা অক্ষরগুলো আমাদের হতাশ করত। আমরা আবার ফিরে তাকাতাম গাছতলার সেই দোলায়িত মজমার দিকে। দেখতাম, যিনি পান্দেনামা পড়াচ্ছেন, যিনি এই মহাতরঙ্গের সুত্রধর, তিনি সেই ফোরকান সাহেব।
পরের বছর আমরা স্বপ্নের ফারসিখানায়। বছরের শুরুতে সব ছাত্ররা মিলে চাঁদা তুলে সাউন্ডবক্স কিনে ফেললাম। আমাদের জন্য নির্ধারিত ছিল মসজিদের নীচতলার বারান্দা। সেখানে গোল করে বসে আমরা মাসদার ফয়ূজ, চেহেল সবক, ফারসি কি পহেলি, তাইসিরুল মুবতাদি পড়তাম। আর পড়তাম, মহাকবি সাদীর কারিমা, আত্তারের পান্দেনামা। ফোরকান সাহেব হুজুর প্রথম দরসে সেই মধুমাখা তরঙ্গ ছুড়ে দিলেন, আমরা লুফে নিলাম। আনন্দে পরিতৃপ্ত হলাম, ভেতরে অদৃশ্য সঙ্কোচন-প্রসারণে নড়ে উঠলাম। এরপর কেবলই মধু আর মধু! তৃঞ্চার্ত কিশোরগুলো ডুবে গেলো আহরণে। হুজুরের কণ্ঠ ছিল ভরাট। সামান্য ভাঙা। সে ভরাট ভাঙা গলায় ছন্দে ছন্দে যখন পান্দেনামা পড়াতেন, আর আমরা তিনশো কিশোর সমস্বরে তা পুনরাবৃত্তি করতাম, পুরো মসজিদ দুলে উঠত। হুজুরের অভ্যাস ছিল, পুরো বছরে নির্ধারিত কিছু ছেলেকে অবশ্যই পড়া ধরবেন। ক্লাসে এসে সর্বপ্রথম তাদের নাম ধরে ডাকবেন। পড়াতে ভুল হলে বেতের সাহায্যে ‘উত্তম মাধ্যম দিতেন’, তবে তাতে কেবল শব্দ হতো, ব্যাথা নয়। ক্লাসে মজার গল্প শোনাতেন, তাতে থাকত অসংখ্য নসিহা, এসব গুণে মুগ্ধ ছাত্ররা হুজুরের জন্য পাগল ছিল।
পরের বছর মিজান। প্রতিবছরই আমরা নতুন কিতাবের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। প্রতিটি কিতাবের প্রতি আলাদা টান তৈরি হতো। মিজানে আমরা পেলাম সাদীর অমরগ্রন্থ গুলিস্তা ও বুস্তা। এ দুটি কিতাবকে দুইভাগে মিজান-নাহবেমীরে পড়ানো হতো। পালাক্রমে দুই জামাতে এ কিতাবদুটি পড়াতেন মুফতি মুহাম্মদ আলী সাহেব ও ফোরকান সাহেব। আমরা গুলিস্তা পড়লাম হুজুরের কাছে। নাহবেমীরে পড়লাম বুস্তা। সেই ভরাট গলায় গুলিস্তার হরেক ছন্দের কবিতাগুলো অবাধ্য বায়োলিনের মতো বেজে উঠল। সাদীর মর্মী গল্পগুলো হুজুর এমনভাবে শোনাতেন, যেন খোদ সাদী এসে বসেছেন মাদরাসা ভবনের তিনতলার এ মজমায়। গুলিস্তার গল্পে যুক্ত হতো হুজুরের ট্রেডমার্ক কিছু কিচ্ছা। যা তিনি প্রতিবছরই নতুন ছাত্রদের শুনিয়ে থাকেন। এ ধারা বহুবছর ধরে চলছে। আমাদের কাছে হুজুরের একটি পুরোনো গল্প—যা বহুবার শুনেছি—তা-ও নতুন মনে হতো প্রতিবার। নাহবেমীরে বুস্তা পড়ার পর হুজুরের সাথে আমাদের বিচ্ছেদ ঘটল। কারণ, তিনি মেখলে চেহেল সবক আর এই তিনটি কিতাবই পড়ান। এই তিনটি শেরের কিতাব বহুবছর ধরে তার মুখে অবিরত পঠিত হচ্ছিল। এরপর দরসে হুজুরকে না পেলেও মাদরাসার বিভিন্ন দায়িত্বের সুবাদে হুজুরের সাথে সাক্ষাত হতে থাকল। খুব বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলাম না আমি। তবে বহুবছর মেখলে থাকার সুবাদে তিনি দেখলেই চিনতেন, মুচকি হাসতেন, ডেকে কথা বলতেন। খুবই সাদাসিধে হুজুর বাড়ি থেকে একা হেটে আসতেন মাদরাসায়, গোসলের সময় পুকুরে সাধারণ মানুষের মতো ডুব দিতেন, তার ব্যক্তিত্ব কখনো ব্যক্ত করেনি—তিনি মুজাদ্দিদে জামান মুফতি আজম ফয়জুল্লাহ রহিমাহুল্লাহর নাতি।
মেখল মাদরাসায় দরসি ও ইনতেজামি জিম্মাদারিতে মুফতি আজম রহিমাহুল্লাহর তিন নাতি ছিলেন অনন্য উঁচুতে। নোমান ফয়জী রহ. ইহতিমামের দায়িত্বে ছিলেন, দরসে পড়াতেন মিজানুস সরফ, উসুলুশ শাশী, হিদায়া; উসমান ফয়জী হাফিজাহুল্লাহ পড়াতেন নাহবেমীর, কুদুরী, মুখতাসারুল মাআনী। সবচে ছোটভাইটি ছিলেন ফোরকান সাহেব। আমরা দেখেছি, নোমান ফয়জী রহিমাহুল্লাহ ছোটভাইটিকে অত্যাধিক মুহাব্বাত করতেন। মাদরাসার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো সস্নেহ সঁপে দিতেন তার অভিজ্ঞ হাতে।
আমরা স্বপ্নের মেখল ছেড়ে একদিন চলে এলাম। স্মৃতির পাতায় কোথায় যেন পরিত্যক্ত পড়ে রইলো গুলিস্তা বুস্তার দরসগুলো। একদিন শুনলাম, সেরেতাজ আল্লামা নোমান ফয়জী নেই। তিনি চলে গেছেন ওপারে। পাগলের মতো ছুটে গেলাম মেখলে। কত শত মানুষ! ফোরকান নামের ছোটভাইটি তখন ভয়াবহ বিধ্বস্ত মন নিয়ে সব মানুষের মাঝে প্রিয় ভাইকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ফোরকান সাহেব হুজুরের শরীরে নানা রোগব্যধি তো ছিল, তবে আমরা কখনও বুঝতে পারতাম না। পিঠে শক্ত কাঠের তৈরি একটি বস্তুতে হেলান দিয়ে তিনি হিসেবের খাতা খুলতেন। মুখের প্রফুল্ল হাসিতে বোঝা যেত না, ভেতরে কী চলছে! একদিন শুনলাম, হুজুর প্রচণ্ড অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। এর আগেও তো অসুস্থ হয়েছেন, ফিরে এসেছেন। এবারও তেমনই হবে। কিন্তু হলো না। হুজুর আর ফিরলেন না। মেখলের আকাশ থেকে পরপর দুটি তারা খসে পড়ল। অন্ধকার আকাশ হাহাকার করছে সামান্য আলো নিয়ে। হারিয়ে গেলো সাদীর ভাষ্যকার, গুলিস্তা বুস্তার পাতায় পাতায় চষে বেড়ানো পাখিটি। হারিয়ে গেলো আত্তারের প্রেমিক, পান্দেনামার গূঢ়তত্ত্ব আবিস্কারে একটি জীবন কাটিয়ে দেওয়া মানুষটি। এক নতুন জীবনের সূচনালগ্নে যখন নানামাত্রিক আনন্দে ভাসছিলাম, কানে এলো মর্মান্তিক এই সংবাদটি। ভেঙে পড়েছি ভেতরে, বাহিরে প্রকাশ পায়নি তার ছাঁপ। বারবার চারিদিকে ভেসে আসছে বারো বছর আগের সেই সুর! সেই তরঙ্গ! আবার কখনও আমার কৈশোরের প্রেম—মেখল নামের ছায়াঘেরা গ্রামটিতে যদি ছুটে যাই, ফোরকান ফয়জী নামের মানুষটিকে দেখব না, দেখব তাঁর নামফলক আঁটা একটি কবর। কীভাবে দাঁড়াব সে কবরের পানে?
হে প্রিয় সাদীর ভাষ্যকার! হে আমার শৈশবের স্বপ্নপুরুষ! হে মেখলের মধ্যাকাশের তারা! আপনার কবরটি আল্লাহ গুলিস্তার মতো হরেক রঙের ফুলে ভরে দিক, বুস্তাঁর মতো শত শত গোলাপের সুবাসে ভরে উঠুক আটপৌড়ে মাটির ঘরটি। আপনার মুখে উচ্চারিত হওয়া প্রতিটি হরফের বিনিময়ে সহস্র নেকি ঝড়ে পড়ুক। আপনার এই ছোট্ট শাগরিদটি সামান্য দোয়া ছাড়া আর কী করতে পারে!

শেয়ার করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

গদ্য

তাহিরপুর

সহকর্মী আবুল খায়ের পিয়াসের দাদির পিতৃলয় তাহিরপুরে। এখন ওই গ্রামে তার একমাত্র চাচা বসবাস করেন।…

17 January, 2026
আরও পড়ুন