পরম সাঁতার বইটির নাম। পরমে এই সাঁতার আমাদের শুরুতেই পুলকিত করে। ধ্যানী, প্রেমী ও দ্রোহী এক প্লাবন বয়ে গেছে বইটিতে।
কবি বিচরণ করেন হৃদয়ের গভীর প্রদেশে। বিচিত্র ফুল, সবুজ পল্লবের সাথে তার আত্মীয়তা। কবি জলের ইবনে বতুতা। তারকা জানে—কবি মজনু-মাতাল। আকাশ জানে, কবি প্রশান্ত আগুন। ফেরেশতা জানে, কবি অক্লান্ত পথিক। দৃশ্যমান পৃথিবী ছেড়ে দূর বহুদূরে কবির বিচরণ আর খ্যাতি পরিচিতি। আবিস্কারের পথ ধরে উঠে আসে কবিতা। সৃষ্টির সাঁতারে—কবি ও আমরা সাঁতারের ঢেউ।
‘পরম সাঁতার’ কবিতার নামেই বইয়ের নামকরণ হয়েছে। এই কবিতায় কবি জানিয়েছেন—সৃষ্টিজগত জুড়ে তার অবগাহন। ভাবের তরঙ্গে হিল্লোলিত তিনি। ৬৪ কবিতার পসরা পরম সাঁতারে। প্রতিটি কবিতার আত্মায় রয়েছে জীবন, দেহে রয়েছে বহুমাত্রার সমাহার। প্রতিটি কবিতা একটি গল্প ও ইতিহাস, চলমান জীবন কিংবা আগুনে গোলাপে মেশামেশি।
একটি কবিতায় জীবনকে বলা হলো ‘ক্ষীণতোয়া দুঃখিত জলধারা’৷ এরপর—
রাত্রির পথিক আমি বিষণ্ন নদীকে বলি
কী তোমার অসুখ?
নদী বলে আমি তো হে চলমান তোমারই জীবন।
নিজের অসুখটাকে নিজেও জানো না?
দেহ ও আত্মাকে আলাদা করে উচ্চবিলাসী আর পৃথিবীর ধাঁধায় উন্মত্ত আত্মাকে কবি বলেন, এই ‘ধুকে ধুকে বহমান নদী, যার বুক ভরা বালু জুড়ে কালো সংবাদ’—এ তোমারই জীবন। জীবনকে না জেনে নিজেকে না চিনে হাঁটছো অবিরত।
‘তোমার প্রতি’ কবিতায় ঘটেছে প্রেমের সমাবেশ। কবি বললেন,
তোমার আঁচলের মেঘে জ্বলজ্বল করছে দশটি অঙ্গুলির শুভ্রশিখা
তোমার দৃষ্টিতে আছে পৃথিবীর সেরা মৌচাক
ভ্রুলতার গোপন তরবারি তাকে পাহারা দিচ্ছে!
প্রেমের উন্মেষ ফুরোতেই এলো কবির করুণকণ্ঠ,
পরাজিত হয়ো না নারী!
তুমি যদি হেরে যাও, পৃথিবীটা হয়ে যাবে আইয়ুবের বিলাপ
ফুলের বাগান হবে নিথর শোকসভা
ঘাস হয়ে যাবে হলুদ
পাখিরা মাতম ছাড়া সব গান ভুলে যাবে!
কবিতার অভীষ্ট আহ্বান এসেছে প্রেমের পর। যেন হাসির ভেতর আর্তনাদ! যেন ফুলের ভেতর আত্মচিৎকার। কবি শক্তকন্ঠে উচ্চারণ করে,
দ্যাখো, শুয়োরের বাচ্চারা তোমার সীমান্তরেখায় জড়ো হচ্ছে…
তোমার পরাজয় ছাড়া কিছুতেই তারা তৃপ্ত নয়
তোমার ঐশ্বর্যকে আগলে রাখা অমীয় পতাকার দিকে
ওদিক থেকে ধেয়ে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর
সামলাও বিজয়িনী, সামলাও!
উদাত্ত কন্ঠে কবি বলেন দুঃসময়ের জারি। প্রেমকে চড়ামূল্যে বিক্রির আমলে কবি বলেন,
বধির সাপের মতো দিবসের ঘরে নেমে এসেছে দুর্যোগ
ফসল তোলার স্বপ্নকে ঘিরে ধেই ধেই করে নাচছে বিনাশী প্লাবন
উঠানে প্রত্যাশার পায়চারি আর নেই, সেখানে অগ্নিবৃষ্টি নিয়ে ধেয়ে আসছে কাপালিক ড্রোন,
তখনও লিখবো প্রেমের কবিতা?
জীবনের অপচয় ও অবক্ষয়ে কবি নারাজ। তার দৃষ্টি বিদ্যালয় আর শিক্ষার্থীদের দিকেও। যারা বিদ্যালয় নয়—নিদ্রালয়ে কন্ঠস্থ করছে প্রাণহীন প্রেমহীন কা-কা কা-কা। শিক্ষা নিয়ে যারা সওদা করতে বসেছে, তাদের বাজার ক্রেতাশূন্য। ‘কাকগীতি’ নামের এই কবিতায় লক্ষ্য করলে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্গতি, ছাত্রদের রোবটসূলভ পড়াশোনা আর শিক্ষা থেকে শিক্ষা হারিয়ে যাবার গল্প দেখা যায়।
কবি তাকিয়েছেন ফিলিস্তিনে। মাহমুদ দারবিশকে স্বরণ করে জায়নবাদীদের বলেছেন ‘মহাকালের ড্রাকুলারা’। সিরিয়ার শিশু আয়লান কুর্দিকে নিয়ে শব্দের ঝংকারে কেঁদেছেন। গেয়েছেন ‘জয়যাত্রার গান’,
চড়চড়ে বারুদে প্রস্তুত হচ্ছে বিশ্বায়নের খেত
রক্ত আর তেল দিয়ে সিক্ত বীজতলা
খুলির ‘উত্তম সার’ ছিটানো হচ্ছে খুবই আহ্লাদে
এখানেই চাষ হবে প্রগতির চারা আর
ভোগের স্বাধীনতা! আহা স্বাধীনতা!
কবি বিদ্রোহ আর আত্মচিৎকারের মাঝে আকুতি করেছেন প্রভুর নিবেদনে। খোদাপ্রেমের সিক্তকন্ঠে বলেছেন,
হত্যা করো যেভাবেই চাও
শুধু আমার চিৎকারকে করো শুদ্ধ
শুধু আমার রোদনকে করো প্রেম।
কষ্ট আর ক্লান্তিকে গোলাপ ভেবে টেনে নিয়েছেন। নেয়ামতের ব্যাখ্যা করেছেন ‘যে দান তোমার’ কবিতায়৷ ‘মদকাব্যে’ পৃথিবীর জীবনকে তুচ্ছ করে আখেরাতকে মুখ্য করেছেন৷ দিদারে ইলাহির তীব্র বাসনায় কবি বলেছেন,
তোমার পেয়ালায় মদ পান করবো বলে
পৃথিবীর মদ্যকে মেনেছি হারাম!
পরম সাঁতার নামে মলাটবদ্ধ কবিতাকুঞ্জে প্রেম, হৃদয়, মনুষ্যত্ব, সভ্যতা, শিক্ষা, খোদাপ্রেমসহ বিচিত্র সব অধ্যায়কে টেনে কবি মুসা আল হাফিজ কবিতার আসর বসিয়েছেন। মর্ম উদ্ধারে প্রাণ যায়, শব্দের গাঁথুনিতে প্রেম জাগে৷ একটি কবিতা শোনায় হাজার গল্প। চোখ বা মুখ দিয়ে নয়, কবিতা পড়তে হবে হৃদয় দিয়ে। কবিতাপ্রীতি বা কবিতাভক্তিতে আমার দুর্বলতা রয়েছে। কবিতার ভাষা আমাকে মুগ্ধ করে; মর্মোদঘাটন করে না। পরম সাঁতারের কবিতাগুলো বারবার পড়ে অল্প অল্প নির্যাস বের করলাম। মুসা আল হাফিজের কবিতার একপ্রান্তে দার্শনিকতা, একপ্রান্তে গভীর সুফিতত্ত্ব। বাক্যের ভেতরে রয়েছে বহু গুহা। জ্ঞানীদের জন্য কবিতার ভাবে রয়েছে সমুদ্র। বোদ্ধাদের জন্য হাজার পাতার পাণ্ডুলিপি।