গ্রন্থমুগ্ধ কথামালা একটি গ্রন্থালোচনামূলক বই। ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সময়ে প্রকাশিত বাংলার প্রথিতযশা কতেক সাহিত্যিকদের প্রকাশিত বই নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গ্রন্থালোচনা লিখেছিলেন গ্রন্থটির লেখক কবি মুকুল চৌধুরী। প্রায় শতাধিক গ্রন্থালোচনা থেকে বাছাইকৃত উনিশজন লেখকের ছাব্বিশটি গ্রন্থালোচনা দিয়ে সাজানো হয়েছে এই বইটি। প্রতিটি বই দীর্ঘ একটি সময় পাঠকের হৃদয়রাজ্যকে আলোকিত করেছে, কালের সাক্ষী হয়ে কথা বলেছে শিল্প ও মানবতার। বইয়ের শুরুতে বইপ্রকাশের নেপথ্যে লেখকের প্রিয়বন্ধু আহমদ আখতারের অনুপ্রেরণা-অবদান নিঃসঙ্কোচে বলেছেন লেখক। ‘প্রসঙ্গ—কথা’য় লেখক জানিয়েছেন, ‘এ গ্রন্থের প্রতিটি পৃষ্ঠায় মরহুম কবি আহমদ আখতারের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।’ ভিন্নধর্মী এই বইটি ধারণ করেছে আশি-নব্বই শতকের প্রকাশনাকে, সাহিত্যের রুচি-অভিরুচিকে। গ্রন্থমুগ্ধ কথামালায় বিলুপ্তপ্রায় কিছু গ্রন্থের প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট তথ্য রয়েছে, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি তথ্যকোষের অভাব পূরণ করবে৷
ভূমিকা পেরিয়ে বইয়ের সূচনা হয়েছে ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের কাব্যগ্রন্থ কাফেলা ও ইসলামী গানের বই মাহফিল দিয়ে৷ ২০০৪ সালে এই বইদুটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। নজরুল ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর দুটি বই বৈরিতার হাতে বন্দী ও বাংলা কাব্যে মুসলিম ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে স্থান পেয়েছে বেশ কয়েকটি খন্ডকবিতা। বৈরিতার হাতে বন্দী বইটি ১৯৯৬ এ প্রকাশিত, বাংলা কাব্যে মুসলিম ঐতিহ্য প্রকাশের মুখ দেখেছে ২০০৪ এ।
প্রখ্যাত লেখক, গবেষক ও নাট্যকার ড. আসকার ইবনে শাইখের মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা নিয়ে আলোচনা এসেছে বইয়ে। লেখক মূল্যায়ন করেছেন এভাবে, উল্লিখিত বইয়ে ‘অসত্যকে আঘাত করে প্রকৃত সত্যের উন্মোচন ঘটানো হয়েছে।’ এরপর আলোচনায় এসেছে আল মাহমুদের বিতর্কিত উপন্যাস পুরুষ সুন্দর। ১৯৯৪ সালে প্রকাশ হয় বইটি, যা বের হবার আগেই শুরু হয়েছিলো বিতর্ক। বই, বিতর্ক ও গল্পাংশ নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করেছেন মুকুল চৌধুরী।
পঞ্চাশ দশকের অন্যতম সচল কবি ওমর আলীর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ছবি প্রকাশিত হয় ১৯৯০ এ। ওমর আলীকে আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমি আজীবন তোমার কবিতার মুগ্ধ পাঠক। তুমি প্রকৃত কবি।’ সত্যিই ওমর আলী অমর কবি। তিনি আর বাংলার গ্রাম যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। তাঁর কবিতা ও শেষগ্রন্থটি নিয়ে পর্যালোচনা এসেছে বইয়ে।
ফররুখ আহমদকে নিয়ে লেখা শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ফররুখ আহমদ ব্যক্তি ও কবি বইকে নিয়ে লিখতে গিয়ে লেখক বলেন, ‘তিরিশোত্তর বাংলা কবিতায় যে কবিকন্ঠ স্বতন্ত্র উচ্চারণে বিশিষ্ট, তিনি ফররুখ আহমদ। রবীন্দ্র-নজরুল প্রবল প্রভাবিত বাংলা কাব্যে এতো বড় নাড়া বিপুল প্রতিভারই পরিচয়বাহী।’ ফররুখ আহমদ তার প্রতিভার মূল্যায়ন পাননি। অবহেলিত হতে হয়েছে, হতে হয়েছে কাব্যহিংসার শিকার। মরনোত্তরকালে কবি ফররুখ আহমদকে যথার্থ মূল্যায়নের স্বারকস্বরুপ উপর্যুক্ত বইটি লেখা হলো৷ ধীরগতিতে হলেও শুরু হলো ফররুখচর্চা।
আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ফররুখ আহমদের গল্প বইটি আরও চমকপ্রদ। কাব্যপ্রতিভূ ফররুখ আহমদ গল্পের আয়নায় কেমন ছিলেন? প্রতিটি গল্পই শুরুরজীবনে লেখা। ফররুখের গল্পবিচার করেছেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ। সামগ্রিক ভাবনাবিচার করেছেন কবি মুকুল চৌধুরী। ফররুখকে জানার তীব্র আগ্রহ তৈরী করতে এই কয়েকটি গ্রন্থালোচনা যথেষ্ট।
গ্রন্থমুগ্ধ কথামালায় এসেছে আফজাল চৌধুরীর ঐতিহ্য চিন্তা ও রসূল আর বিশ্বাসের দিওয়ান-এর কথা। নুরুল আলম রইসীর এখনই প্রয়োজন, সৈয়দ মোস্তফা কামালের বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী ও হবিগঞ্জের মুসলিম মানস নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।
এছাড়াও রূহুল আমীন খানের স্বর্ণ-ঈগল, কালাম আজাদের সম্পাদক সমীপে ও বয়েসী প্রপঞ্চ, সৈয়দ আব্দুল্লাহর মুসলিম মনীষা, সাজ্জাদ হোসাইন খানের স্বৈরাচারের ঐরাবত ও সোনালী শাহজাদা, শেখ তোফাজ্জল হোসেন সম্পাদিত বাংলা ভাষায় মুসলমানদের অবদান, ফিরোজ সরকারের ঝড়ের দাপট মাটির বিদ্রোহ, আতা সরকারের সুন্দর তুমি পবিত্রতম, হোসেন মাহমুদের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জাগরণের সূচনা ও সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, বুলবুল সরওয়ারের হিটলারের লাশ নিয়ে যথার্থ আলোচনা করেছেন লেখক মুকুল চৌধুরী।
উপরোল্লিখিত প্রতিটি বইয়ের প্রেক্ষাপট, বিষয় নিয়ে ভাবনা, লেখক পরিচিতিসহ বইপ্রকাশের আগে-পরের গল্পগুলো ওঠে এসেছে গ্রন্থালোচনায়। এই সপ্রতিভ লেখকরা দীর্ঘসময় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মসনদে আসীন। কবি মুকুল চৌধুরীর সাথে তাদের ব্যক্তিসম্পর্ক, প্রকাশনার সাথে সম্পৃক্ততা, অনুরোধ-আবদারের ফলস্বরুপ রচিত হয়েছে গ্রন্থালোচনাগুলো। লেখক তার দীর্ঘকালের লেখালিখি ও প্রকাশনাজীবনের নির্যাসকে রূপ দিয়েছেন গ্রন্থমুগ্ধ কথামালা বইয়ে। এতে এই প্রজন্ম কেবল দু’চারটে বইয়ের নাম নয়, গ্রন্থালোচনা লিখবার অবয়বও পেয়ে যাবে৷
গ্রন্থমুগ্ধ কথামালার সুনিপুণ প্রচ্ছদ প্রথমদফায় মুগ্ধ করবে পাঠককে। শেষদিকে আলোচিত প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদসহ পুরো পরিচিতি সংক্ষেপে আনা হয়েছে, যা বইটিকে পূর্ণাঙ্গতা দিয়েছে।