সূচীপত্র

বইকথন

হৃদয়াস্ত্র : করো হৃদয়ের অস্ত্রোপচার

23 December, 2025

হৃদয়াস্ত্র আবার কেমন অস্ত্র? অন্য সবার মত আমারও এই প্রশ্ন। জীবন ও জগতে দার্শনিক অবলোকনের মাধ্যমে তৈরী হলো এই অস্ত্র। লেখক ও দার্শনিক মুসা আল হাফিজ এই অস্ত্রটি বানালেন বুদ্ধির সৃজন, ভাষার বিনিময়, যুক্তির যাচাই, বিবেকের বিচার দিয়ে। হৃদয়ের উপকরণে তৈরী অস্ত্রটি কেন বানালেন তিনি? কী এর প্রয়োজনীয়তা? আধুনিক মরণাস্ত্রের ঝনঝনানি শোনাচ্ছে যখন পৃথিবী, নিশ্বাসের মত ন্যায়ের পেটেমুখে ঢুকছে যখন শাসকের শোষণাস্ত্র—কী গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয় তখন গুরুগম্ভীর আটপৌরে হৃদয়াস্ত্র?

হাজির হয় সত্য নিয়ে—বিচিত্র শব্দজালে বন্দী হয়ে অসহায়ের মত নতিস্বীকার করতে হবে যার সামনে। সত্যের হুংকারে কখনও খুলেছে সংকটাচ্ছন্ন জাতির হাকিকত। কখনও জানিয়েছে রাজনীতির মরীচিকাচ্ছন্ন নেতার মিথ্যার গতি! আঘাত করেছে বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধির কাঠামোতে, বুঝিয়ে দিচ্ছে একুশ শতকে এসে আমাদের চিন্তাদারিদ্রের পরিসংখ্যান।

হৃদয়াস্ত্রে আছে অনিবার্য সত্য। এই সত্য হাজির করেছে পুরো ভঙ্গুর জীবনব্যবস্থা, মিথ্যার ধাঁধায় আচ্ছন্ন রাজনীতি, স্বৈরাচারীদের নৈতিকতা, গভীর উপলব্ধি, আত্মপরিচয়ের সংকট, জ্ঞানের পরিসীমা, তারুণ্যের অবক্ষয়, ভিন্ন আবেশে জীবনপাঠ। এককথায় আপনার মনের দুনিয়ায় অস্ত্রোপচারের লক্ষ্যে একজন গভীর জীবনবিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞের অপারেশনপ্রক্রিয়া প্রস্তুত—যা হবে হৃদয়াস্ত্র দিয়ে।

হৃদয়াস্ত্রে সাতটি অধ্যায় রয়েছে। শুরুর অধ্যায়টি ‘জিজ্ঞাসার জালে’ নামে সূচিত। এর আগেই ‘মুসা আল হাফিজের দর্শনচূর্ণ ট্রিলজি’ শিরোনামে বিশ্লেষক মনোয়ার শামসী সাখাওয়াতের চমৎকার একটি প্রবেশিকা লেখক, বই ও বইয়ের ধরণকে সুস্পষ্ট করেছে।

‘জিজ্ঞাসার জালে’ লেখক প্রশ্ন করেছেন ও জবাব দিয়েছেন অবিচলভাবে। এই প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পাঠক কখনও কোরআনের সাথে মহাবিশ্ব ও আবহমান মানুষের যোগসাজশ জানতে পারে, কখনও মানুষের সাথে মাছের কথোপকথনে বুঝতে পারে—অনিয়ন্ত্রিত মুখ মাছের বিপদ ডেকে আনা লেজের তুলনায় অধিক বিপজ্জনক। ঐক্য ও মতানৈক্যের অদ্ভুত ব্যখ্যায় উঠে আসবে মুসলমানদের বাস্তবতা, নবীন কবির প্রশ্নে লেখক তার কাব্যসত্তাকে জাগানোর রসদ বলে দেন, শিল্পের আত্মায় কী থাকে, সেটা দেখান।

‘জীবনের আলো-কালো’ অধ্যায়ে যাপিত জীবনের দিকে দার্শনিক দৃষ্টি রেখে ছোট ছোট উপশিরোনামে অবধারিত সমাধান দিয়েছেন। লেখকের দৃষ্টিপাতই যেন একটি প্রতিবাদন, লেখকের সত্যপাঠই যেন অসত্যের জন্য বজ্রপাত। সংক্ষিপ্ত বাক্যে তিনি দেখান জালেমের নিয়তি, তার সাফল্যের অর্থ তার দম্ভের বেলুন ফুলে যাওয়া, যা অধিক ফুলে গেলে ফেটে যাওয়া অবধারিত।

‘বিন্দুর হিল্লোল’ অধ্যায়ে তাঁর অস্ত্র ক্ষুদ্র—তবে বৃহৎ শক্তি নিয়ে আঘাত হানে বিবেকের দরজায়। এই আঘাতকে আততায়ী আক্রমণ বলাই ভালো। যা ‘না যায় বলা, না যায় সওয়া’। সরকাররা শুনবে, ‘যে সরকারের কোনো প্রোডাক্ট নেই, সাধারণ মানুষকে সে নিজের প্রোডাক্ট মনে করে’। রাজনীতিবিমুখতাকে বলা হবে, ‘এই যে বলছেন, আমরা রাজনীতি করি না, এতেও কাজ করছে রাজনীতি’। সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র বুঝিয়ে লেখক বলবেন, ‘আমেরিকার শাসকদের সমস্যা আমাদের মারা, না মারা নিয়ে নয়, তাদের সমস্যা হলো, আমাদের মারার পদ্ধতি নিয়ে!

‘পদাবলী’ অধ্যায়ে রয়েছে কবি মুসা আল হাফিজের ১৪টি কবিতা। যার প্রতিটির ভিন্ন ভিন্ন রিভিউ হতে পারে। ‘আধুনিক ইশ্বর’ নামের কবিতায় আধুনিকতার কান মলে দিয়ে লেখক শোনান, ‘নারীকে মুক্তি দেবে বলে নারীত্ব থেকে তাকে আলাদা করছো। সে হতে পারছে ভালো রেসলার, জুতোর বিজ্ঞাপনের ভালো মডেল, কিন্তু হতে পারছে না ভালো মা!’ আল মাহমুদকে নিয়ে লেখা লেখকের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর অন্যতম দুটি’ কবিতা স্থান পেয়েছে এ অধ্যায়ে। ‘আল মাহমুদের চোখ!’ কবিতায় লেখক আল মাহমুদের চোখের জ্যোতিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন—’যা দৃশ্যের ভেতর-বাহিরকে দেখেই থামে না, শিকার করে নেয় ইতিহাসের নদীতে সময়ের জলপানের শব্দও!’

‘একদা সমুদ্রতীরে’ কবিতায় নাস্তিক স্পেনিশ, আস্তিক গ্রিক, জাতীয়তাবাদী জার্মান, প্রকৃতিপূজারি ফরাসি, জায়োনিস্ট, ক্রুসেডার ও নারীবাদীদের মাঝদরিয়ায় ডুবন্ত জাহাজে বসে বাঁচার আশায় করা চিৎকার তুলে ধরেন। জীবন বাঁচানোর আশায় তাদের ডাক আর সিজদায় পড়ে থাকা লেখকের ডাকে ভেদাভেদ ঘটে বিশ্বাসের বহুবিচিত্রার।

সেজদার কার্যকারণ তিনি উপস্থাপন করেন সেজদাকাব্যে; বলেন—আমার সেজদাই শেষ অস্তিত্বদর্শন!

‘অনুভবের রক্তপাত’ অধ্যায়ে অনুভূতির ছন্দ প্রকাশ পেয়েছে হৃদয়াস্ত্র হয়ে। অসুস্থ রাজনীতির এক দুর্দান্ত ব্যখ্যা লেখক দিলেন এভাবে, ‘পাপ পাপকে বলল, পাপ করো না। মন্ত্রী এমপিকে বলল, মিথ্যা বলো না!

‘যাপনের রোদজল’ এ লেখক তাঁর যাপিত জীবন থেকে টুকরো টুকরো কয়েকটি গল্প বলেছেন, কয়েকটি বলেছেন অনুভব থেকে। সবগুলো শেখায় ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণ। শিল্পবোধ দিয়ে শুরু হলো অধ্যায়টি। প্রথম গল্পেই লেখক শিল্পের সওদাগর শেক্সপীয়র, এলিয়ট, গালিব, ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলদের আসরে ইসলামকে আনলেন শিল্পবোধশক্তির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে৷ বৃক্ষের জীবনী লিখতে গিয়ে পল্লব, সবুজ পাতা, ফুলদের সাথে প্রতিবাদের মুখে পড়ে পোকামাকড়দের আনতে বাধ্য হলেন লেখক। বুঝিয়ে গেলেন, বৃক্ষ না চাইলেও তাকে আঘাত করা পোকামাকড়ের কথা আসছে জীবনীতে।

এছাড়া তরুণ কবি বই করতে চায়, কী ছিলো তাকে দেওয়া পরামর্শ? বুয়েটছাত্র অবিশ্বাসী, কী ছিলো বিশ্বাসের প্রত্যুত্তর! লেখক কেন লজ্জিত জাবির ইবনে হাইয়ান, ইবনে সীনা, আলকিন্দিদের প্রশ্নে! আরো নানা দিক, নানাকিছু!

‘অন্তরালের তন্তু’তে এসেছে গভীর অর্থবহ কিছু গল্প, যা হাজির হয় শব্দের আড়ালে থাকা ভিন্ন আরেকটি গল্প নিয়ে। কথাশিল্পী শওকত ওসমানের গল্পে এসেছে কলকাতা-বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের সম্পর্কের হাল, হুমায়ূন আহমেদ অনিবার্য ছিলেন কেন? এসেছে সেকথাও। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, বাংলা বিভাজন ও তারুণ্যের জন্য জাগরণীবাক্য—এ অধ্যায়ের বৈশিষ্ট্য।

‘ইতিবৃত্ত উবাচ’ অধ্যায়ে ইতিহাস থেকে কয়েকটি গল্প—সাফল্যের সুত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মকালের গল্প, আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে যুক্তিবাদীদের ভুলের শক্ত সমালোচনাসহ অধ্যায় ও বই সমাপ্ত হয়েছে গাযালীর সাথে দীর্ঘ সংলাপে। এ সংলাপে ছিলেন ইবনে তাইমিয়া, ফখরুদ্দীন রাযীসহ অনেকেই। বিষয়বস্তু হলো, তাদাব্বুরে কুরআন!

হৃদয়াস্ত্র নিয়ে যখন ভাবি—তখন বইটিকে মনে হয় একটি তীরহারা সমুদ্র। যাতে সাঁতরে উত্তীর্ণ হতে পারা যায় না খুব সহজে। বইটির প্রতিলাইনে নিহিত আছে আরেকটি বই। মাত্র দুইশো টাকায় এতকিছু পেয়ে যাওয়া পাঠকের কাছে ‘মেঘ না চাইতে বৃষ্টি’ পেয়ে যাওয়ার মতন।

শেয়ার করুন

guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট