মহাকালের মধু বইটির নাম। কবি, সুফি শেখ সাদীর জীবন ও কবিতা নিয়ে রচিত। লিখেছেন আরেক কবি, সুফি মুসা আল হাফিজ। বুঝাই যাচ্ছে, অন্যরকম এক আসর বসবে!
আসর বসেছে বটে, বইয়ে। শুরুতেই বলা হচ্ছে, পড়ো এই প্রেমলিপি! প্রেমের উচ্ছাস ঢেউ খেলে আছড়ে পড়ে কাগজের পাতায়। সাদীকে বলতে হলে, সাদীকে ভাবতে হলে এরচে শৈল্পিক শব্দের আবাহন আর কি হতে পারে? লেখক বলছেন, ‘তিনি গাইলেন রাতের গীতি, প্রতিটি শব্দ হয়ে উঠল প্রাতের উচ্ছ্বাস।’ একেকটি বাক্য হাজারটি অর্থ নিয়ে পাঠককে সিক্ত করবে প্রেমলিপির সুমিষ্ট সুধায়। যে মহাকবিকে নিয়ে গাঁথা হয়েছে মহাকালের মধু নামের মালা, তার কাব্যিক, শৈল্পিক এক আলোচনা—শিরোনাম ‘পড়ো এই প্রেমলিপি।’
দুঃখের উপকূলে দাঁড়িয়ে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে নিরাশার ঝড়ের মোকাবেলা করা প্রেমিকের প্রেম ও অনুভূতি, আত্মা ও উপলব্ধি, শিল্প ও প্রকৃতি নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাবে ‘প্রজ্ঞার কন্ঠস্বর’ শোনা যায়। প্রজ্ঞাবান—সেই মহাকবি সাদী। সাদীর কন্ঠে ভেসে আসে জীবন, ভেসে আসে ম্যুরালিটি। প্রেমিক যখন চিন্তিত মনে জিজ্ঞেস করে, আনন্দ আমাদের কী দেয়? সাদীর উত্তর, ‘শুদ্ধ আনন্দ তোমাকে দেয় সেই প্রাচুর্য, যা ধারণ করার মতো বড়ো নয় এই পৃথিবী৷’ প্রজ্ঞার কণ্ঠস্বর প্রেমিককে শেখায় আনন্দ, আনন্দের পরিশুদ্ধতা ও পরিশুদ্ধ আনন্দের পরম সুখ।
যে ভাষায় সাদী গেয়েছেন জীবনের গান, পথ দেখিয়েছেন পথহারাদের, শাসন করেছেন রাষ্ট্রপ্রভুদের, সেই ভাষা ও তার মূলের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন লেখক। ‘ফার্সি কবিতা ও গীতিকাব্যের নদী’তে ফারসি ভাষার প্রবর্তনা ও ফারসি কবিদের ধারাবাহিকতায় লেখক এনেছেন হানজালা বাদগাযসি, ফিরোজ মাশরিকিকে। এসেছে গজনির মালিকুশ শুআরা কবি উনসুরি, ফররুখি আর মহাকবি ফেরদৌসি। আরও এসেছে হাকিম সানাঈ, ফরিদুদ্দিন আত্তার, আমির মুয়িজ্জি, হাকিম নেজামি, নাসির খসরু আর সালজুকের কবি ওমর খৈয়াম। এদের গানের সুর বাতাস ভুলেনি, তখনই ভুবনজুড়ে নেমে এসেছে আঁধার। তাতারিরা ধ্বংস করেছে ইরান৷ ধ্বংস হয়েছে সাহিত্য আর সংস্কৃতি৷ বিবর্ণ হয়েছে সভ্যতা। সভ্যতার আঁধারে মশাল হাতে উপস্থিত হলেন জালালুদ্দিন রুমি, ফখরুদ্দিন ইরাকি, শাইখ মুসলেহ উদ্দীন সাদী। রুমির প্রেম, ইরাকির আধ্যাত্মিকতা, সাদীর কর্ম ও মহত্ত্বের পথনির্দেশে ফারসি কবিতার নদীতে পুনরায় ঢেউ খেললো। বসন্ত এলো মানবহৃদয়ে। একজন শেখ সাদীর জীবন, পর্যটন, দৃষ্টিপাত—সব কবিতার রুপে জীবনবোধ আর ধর্মের বাণী হয়ে ছড়িয়ে পড়লো দিগবিদিক।
লেখক তিনটি ধাপ পেরিয়ে এসেছেন বসন্তে। সাদীর জন্ম ও বাল্যকাল দিয়ে সেজেছে কয়েকটি পাতা৷ সিরাজের বুলবুলি, বাগিচা আর রূপের পসরার মাঝে সাদীর বেড়ে উঠা। খন্ড খন্ড কয়েকটি গল্পে সাদী নিজে শুনিয়েছেন তার জীবন ও শিক্ষা। বাবার হাত ছেড়ে বাল্যকালেই তিনি বুঝেছেন, বিচ্ছিন্নতা কখনও সফল হতে দেয় না। বাবা তাকে বুঝিয়েছেন, গীবত মানুষকে ধ্বংস করে। কখনও নেজামিয়ার দরসগাহ, কখনও কাওয়ালী মাহফিলে যেতে ইবনুল জাওযির নিষেধাজ্ঞা—সাদী যেন শিখেছেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত থেকে৷
যে সাদী হরেক রঙের কাব্য লিখেছেন, সে হরেক প্রজাতির সমাজ ও মানুষকে দেখতে চষে বেড়িয়েছেন পৃথিবী। লেখক সেই গল্পগুলো এনেছেন ‘ধরণীর পথে পথে’ শিরোনামে। বিচিত্র ভুবনের নানা স্থানে সাদী থেমেছেন, দেখেছেন ও শিখেছেন। কখনও কুফায় পা-বিহীন ভিক্ষুককে দেখে নিজের জুতাবিহীন পা-কে সান্ত্বনা দিয়েছেন, কখনও আলেকজান্দ্রিয়ায় ক্ষুধায় কাতর হয়েও মজুতদারের সাহায্য উপেক্ষা করেছেন৷ ভারতের সোমনাথে সাদী এসেছিলেন। এ নিয়ে লেখক আলাদা অধ্যায় লিখেছেন৷ পুরো পৃথিবী চষে সাদী প্রত্যাবর্তন করেছেন সিরাজে। আচ্ছন্ন হয়েছেন নিবিড় একাকীত্বের জগতে।
সাদী ছিলেন আধ্যাত্মিক পুরুষ। যার কবিতা কেবল বাক্যের মিশ্রণ নয়, তিনি কবিতায় শোনাতেন সমাধান৷ সমাধান শুনতে ভীড় জমত তার কুটিরে। বাদশাহ কী ফকির! সবার হাজিরা সাদীর দরবারে। বাগদাদের শাসক থেকে হালাকু খানের রক্তধারী আবাকা খান! সবাই মুগ্ধ এই দরবেশে। সবাই কম্পিত এই দরবেশের তর্জনীতে। লেখক লিখেছেন, ‘সময় এটাই চাইছিল সাদীর কাছে। তিনি সময়ের প্রয়োজন পুরণ করলেন দক্ষ হাতে। ইতিহাস দেখল এক কবিসম্রাটকে, যার তর্জনী উঁচু হলে মাথা নত করে নৃশংস তাতার।’
সাদী মানুষকে আহ্বান করেন সত্যের দিকে। সতর্ক করেন জগৎ সম্পর্কে। স্বাধীনতা শেখান পরাধীনকে। মানুষ শুনতে থাকে ‘অস্তিত্বের বার্তা’। সাদী ভ্রুণের সাথে বিচরণশীল মানুষের আলাপ করিয়ে দেন,
: মায়ের পেটে তোমার নিবাস ক্ষণস্থায়ী।
: এই নিবাসে ছিলাম, আছি, এরচে বেশি ভাবনা কীসের?
: তোমার লাগি অপেক্ষমাণ বিশাল জগৎ।
: এই জগতের বিশালতায় মুগ্ধ আমি।
: রঙধনু আর সবুজ বাগান, সমুদ্র আর পাখির কূজন, হাজার রকম রূপের বাহার সেই জগতে।
: বানিয়ে গল্প বলা!
: অচিরেই দেখবে তুমি সকল কিছু।
: এ যদি থাকেই তবে, দেখব না কেন?
: দেখতে হলে যেতে হবে সূর্যালোকে। অন্ধকারে অন্ধ মানুষ দেখবেটা কী?
বিরতিহীন অনুবাদকাব্যে পাঠক মুগ্ধ হবে। সিক্ত হবে। অনুতপ্ত হবে। খুঁজতে থাকবে অস্তিত্বের বার্তা। সাদী অন্তিমকালের আগে আবারও মুগ্ধ করেছেন মানুষকে। সৃষ্টি করেছেন ‘মহাকালের মধু’। পৃথিবীর সব বাগানকে তুচ্ছ করে তিনি সৃষ্টি করেছেন গুলিস্তাঁ ও বুস্তা। যে বাগানের ফুল কখনও শুকিয়ে যায় না, সুঘ্রাণ হারায় না। যে বাগানের ফুল সিরাজ ছেড়ে দূর বহুদূরে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মুখে মুখে। প্রেমিকের বুকে বুকে।
সাদী শোনায় তিক্তসত্য, ‘কী মুশকিল! যাদের হৃদয়ে করুণা আছে তাদের হাতে অর্থ নেই। অর্থে যাদের উদর ভরা তাদের দানের হৃদয় নেই৷’
সাদী শোনায় অন্ধভক্তির গল্প ‘রাজা যদি দিনকে রাত বলে বসেন, তার পারিষদ বলবে হ্যাঁ, এই তো চাঁদ, এই তো তারকারাজি দেখা যাচ্ছে।’
সাদী শোনায় বন্ধুত্বের বিশ্লেষণ, ‘বন্ধুর শেকলে বন্দি থাকা শত্রুর ফুলশয্যার বিশ্রামের চেয়ে উত্তম।’
সাদী শোনায় নবীপ্রেমের ঐতিহাসিক রুবাঈ, ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি।’
সাদীকে তুলনা করে স্যার গোর ওয়েলসলিস বললেন, প্রাচ্যের শেক্সপিয়র। বর্ণাঢ্য জীবন ও রচনা দিয়ে সাদী অমর রয়েছে মানুষের হৃদয়ে। তার কাব্য মাহফিলে বেজে ওঠে পৃথিবীর কোণে কোণে। তার পঙক্তি থেকে রচিত হয় গল্প। তার চিন্তা থেকে তৈরি হয় শিক্ষা।
শেখ সাদীর জীবন ও কবিতাকে শৈল্পিকভাবে বহন করেছে মহাকালের মধু বইটি। বইয়ের শুরু থেকে শেষ—গদ্যশৈলী ও অনুবাদকাব্যের মুগ্ধতা পাঠককে তৃপ্তি দিবে সাদীপাঠের। ছন্দবদ্ধ হয়ে কবিতা এসেছে প্রতিটি অধ্যায়জুড়ে। ফারসির অপুর্ব সেই ধাঁচ মেখে গেছে বাংলায়। শেখ সাদীর জীবনকে লিখতে হলে যে আধ্যাত্মিকতা, কাব্যপ্রতিভা ও শৈল্পিক মননের প্রয়োজন—তা কবি, গবেষক মুসা আল হাফিজের রয়েছে যথার্থ। পাতায় পাতায় প্রকাশ ঘটেছে শিল্পের। একমলাটে পাঠক খুঁজে পাবে সাদীর জীবন ও প্রচুর কবিতা। বইয়ের শেষদিকে একাধারে সাদীর ৮৮টি অনুবাদকাব্য রচিত হয়েছে। এর বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরও বহু কবিতা, পঙক্তি। সাদীর কবিতায় প্রেমিকের দগ্ধ হৃদয় করতো চিৎকার। অপলক তাকিয়ে থাকতো সুলুকসন্ধানী। মহাকালের মধু পাঠককে সেই ঘোর, সেই আমেজে প্রবেশ করাবে। বাংলায় বসে পাঠক সিরাজের বাগিচায় গুণগুণ করে আহরণ করবে মহাকালের মধু।