এক.
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তপ্ত পিচঢালা পথে আতঙ্কিত চেহারায় ছুটোছুটি করছে এক তরুণ। এখন ঠিক বেলা বারোটা। ভোরে একচোট বৃষ্টি হয়ে গেছে চৌদ্দগ্রামে, অথচ এ মুহূর্তে আকাশ যেন জ্বলন্ত উনুন। দরদর ঘাম ঝরছে মহাসড়কের দীর্ঘ জ্যামে বসে থাকা ত্রানকর্মীদের শরীর থেকে। ইতিমধ্যে কেউ কেউ গা থেকে খুলে নীচে রেখেছে লাইফ জ্যাকেট। ধুমপায়ীরা পিকআপ থেকে নেমে মুখে তুলে নিয়েছে সিগারেট। এমন অবসন্ন সময়ে ট্রাক ও পিকআপের দীর্ঘ সারির ফাঁকে ফাঁকে তরুণটি ব্যস্তসমস্ত হয়ে একে ওকে জিজ্ঞেস করছে—‘আমাকে নেওয়া যায় ভাই! আমি লস্করহাট যাব!’ কেউ ভিন্নদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তরুণটি আবার বলে ওঠে, ‘আমি আর্মির লোক! এই যে দেখেন আইডি!’ এতে কারও কারও মনে সামান্য করুণার উদ্রেক হয়। তবে নিজেদের যাত্রাকে আরও বিদঘুটে যন্ত্রণাময় করতে চায় না বলে তারা তাকে সশ্রদ্ধ জবাব দেয়—‘দেখেন স্যার! আমরা এক পিকআপে চব্বিশজন। গাদাগাদি করে সেই সায়েদাবাদ থেকে এটুকু আসছি। আপনাকে কোথায় নেবো? অন্য কোথাও দেখেন না প্লিজ।’
‘আমাকে স্যার বলার দরকার নেই। আমি শাফান। লস্করহাটে আমার বাড়ি। আমার মা-বোনদের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না আজ দুদিন হলো। তাদের ফোন বন্ধ। আমাকে আপনাদের সাথে নেওয়া যাবে না তাই না? আচ্ছা! অন্য কোথাও দেখি।’
শাফান এটুকু বলতে গিয়ে হাপিয়ে উঠে। তার ফর্সা চেহারাখানা লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। গতরাতে ঘুমায়নি সে। ঘুমাতে গেলেই মায়ের মুখ ভেসে ওঠে মনে। মায়ের শেষ কথাগুলো কানে বাজতে থাকে নিষ্ঠুরভাবে—‘পানি বাড়তাছে বাপ! তুই চইলা আয় পারলে।’ ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত বাসে, এরপর প্রখর রোদে অন্তত দশ কিলোমিটার হেঁটে-দৌঁড়ে শাফান এ পর্যন্ত এসেছে। ত্রানের ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যানগুলো ঢাকা থেকে অপর্যাপ্ত যাত্রী বহন করে এনেছে বলে শাফানকে উঠিয়ে নেয়নি কেউ। অথচ শাফানকে পৌঁছতে হবে লস্করহাটে। যেভাবেই হোক, পরিবারকে বাঁচাতে চায় সে। ফৌজি শাফান খুব করে চায় বুকের ভেতর সাহস ও আত্মবিশ্বাসটুকু ধরে রাখতে। ছোট কর্মজীবনে বহুবার বড় বড় পরিক্ষায় সে উতড়ে গেলেও বলতে দ্বিধা নেই, আজ সে সত্যিই কিছুটা ভেঙে পড়েছে। এ পরিক্ষায় গায়ের জোরে উতরে যাবার কোনো উপায় নেই বৈকি। এ মুহূর্তে লস্করহাটে যেতে হলে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো একটি পিকআপে অবশ্যই তাকে উঠে পড়তে হবে—এটাই চূড়ান্ত, এছাড়া কোনো বিষয় নিয়ে আপাতত সে ভাবতে পারছে না। শাফান সময় নষ্ট করতে চায় না, এক গাড়ি থেকে আরেক গাড়ির দিকে দ্রুত ছুটে চলে।
গত কয়েকদিনে ফেনীর অবস্থা দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। শোনা যাচ্ছে—ফেনীর সাথে লাগোয়া ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দেওয়া হয়েছে কোনো ঘোষণা ছাড়াই। তবে কি ভারতের পানিতে ডুবে মরছে মানুষ? সদ্য পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে আশ্রয়দানের কারণে দেশের মানুষ সুদীর্ঘকাল যে ভারতবিদ্বেষ মনের ভেতর পুষে রেখেছিল, তা উপচে বেরিয়েছে ইতিমধ্যে। এরই মাঝে বলাকওয়া ছাড়াই ডুম্বুর বাঁধ খুলে দেবার ঘটনা সারাদেশের মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। ভারতীয়রা সোস্যাল মিডিয়ায় রসিকতা করছে—‘ডুবে মর তোরা পানিতে! একেবারে চরম শিক্ষা হচ্ছে শালা বাঙালির বাচ্চা!’ আর এদেশের মানুষ পিঁপড়ের মতো ছুটে যাচ্ছে ফেনীর দিকে। হাজার হাজার ত্রাণের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় সকল উপাদান নিয়ে। মানুষের প্রাণ বাঁচাবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তাদের। তবুও ফৌজি শাফানকে তারা আশ্রয় দিতে চায় না। পরিস্থিতি বড্ড কঠিন হয়ে গেছে। শাফান বুঝতে পারে, এ মানুষগুলো তার মা-বোনের কথা শুনে বিগলিত না হলেও দোষ নেই; তারা তো মানুষ বাঁচাতেই ছুটে চলছে।
জ্যামটা কি ছুটল অবশেষে? হ্যাঁ, ওই তো ধীরগতিতে সামনের গাড়িগুলো এগোচ্ছে। শাফানের চোখদুটো দ্রুত উঠানামা করতে থাকে; কী হবে এবার? দৌঁড়ে যায় নিকটতম পিকআপটির দিকে।
‘আমার লস্করহাটে যেতে হবে। খুব আর্জেন্ট। মা-বোন পানিবন্দী। প্লিজ ভাই, একটু সুযোগ দেন।’
‘আরে আরে.. কী করছেন? বসবেন কোথায় ভাই? এইখানে জায়গা নাই তো..’—ভদ্রলোক বাধা দেবে কি দেবে না এ নিয়ে ইতস্তত করার ফাঁকেই শাফান উঠে পড়ে পিকআপে। এরইমধ্যে পিকআপটি জ্যাম থেকে ছাড়া পেয়ে শো শো গতিতে ছুটে চলতে শুরু করেছে। পিকআপে থাকা বাকি ত্রাণকর্মীরা ঈষৎ বিরক্তির মুখে শাফানের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা ঘুরিয়ে নেয়। শাফান সাইড ওয়ালে বসে জোরে শ্বাস নেয়। কে কী ভাবছে, তা দেখার সময় নেই তার। জীবনের কিছু মুহূর্তে এমন অন্যায় অনুপ্রবেশও বেশ পরিতৃপ্তি জোগায়।
‘আপনি আর্মির লোক?’ সেই ভদ্রলোক জানতে চায়।
‘হ্যাঁ। বুঝলেন কীভাবে?’
‘চুল দেখে। হা হা হা। আমি শওকত। মীরপুর থেকে ত্রাণ নিয়ে যাইতেছি। আমাদের ইলেক্ট্রিকের ব্যবসা। ফেনীর এই অবস্থার কথা শুনে আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। ভাই-ব্রাদারদের নিয়ে তৎক্ষণাৎ চাঁদা তুলে এগুলো কিনছি। ওই যে সামনের পিকআপে আমাদের নৌকা। অতিকষ্টে সদরঘাট থেকে নৌকা ম্যানেজ করছি। শালারা এত বাটপার, বন্যার কথা শুনে নৌকার ভাড়া দিছে বাড়াইয়া। তারপরও দর কষাকষি করে আনলাম। পার ডে দশ হাজার, তেল খরচ আমাদের। চিন্তা করছেন ব্যাপারটা?’ শওকত একনাগাড়ে বলে শেষ করে।
‘হুম। এই দেশের মানুষের রক্তে রক্তে অন্যায় মিশে গেছে।’ সংক্ষেপে কথায় সায় দেয় শাফান।
পিকআপে থাকা ত্রাণকর্মীরা ব্যবসায়ী। কেউ-বা ব্যবসায়ীর বন্ধু। কেজিবিশেক চিড়া, পর্যাপ্ত স্যালাইন, বিস্কিট, ঔষধ ইত্যাদি ঘিরে তারা পিকআপের চারিদিকে বসে আছে। ঠিক সামনের পিকআপটি পুরোদস্তুর দখল করে আছে একটি মস্ত নৌকা। সেখানে মানুষ বসবার স্থান নেই। ত্রাণকর্মীদের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকায় শাফান। দুয়েকজনকে দেখায় বড্ড ক্লান্ত, সারারাত ঘুমে বিঘ্ন ঘটায় চরম বিরক্ত। ক্লান্তি ও বিরক্তি ঝেড়ে কারও কারও মুখ অম্লান, জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে নিকট-অতীতের রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে। একজন তো রীতিমতো অ্যাকশন ক্যামেরা বের করে ঝেড়েমুছে ঠিকঠাক প্রস্তুত করে নিচ্ছে। তার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রায় সবাই।
‘ক্যামেরার ব্যাটারি আনছি দুইটা। ফুল চার্জড। অস্থির সব ভিউ নেওয়া লাগবে। এইটা কিন্তু একহিসাবে অ্যাডভাঞ্চার ট্যুর হইয়া গেল।’
সবাই ঈর্ষান্বিত হয়ে তার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকে। যেন তাদের আফসোস হচ্ছে এমন অ্যাকশন ক্যামেরা নিয়ে ট্যুরে না আসার। কেবল ঈর্ষা কিংবা আনন্দ নেই শাফানের। মা-বোনের খোঁজ নেই, দুদিন হলো ফোন বন্ধ—সিনিয়রকে না জানিয়ে ফেনীর পথে ছুটে আসা ফৌজি শাফানের জীবনে কোন অ্যাডভাঞ্চার অপেক্ষা করছে, তা কে জানে!
‘এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী কাজটা কী করতেছে বলেন তো ভাই! আপনি তো ভালো বলতে পারবেন। শুধু আকাশ দিয়ে হেলিকপ্টার উড়িয়ে পানি দেখাই কি তাদের কাজ? কোনো কাজের কাজ তো করতে পারতেছে না।’ এরইমধ্যে পিকআপের সবাই জেনে গেছে শাফানের পরিচয়, তাই একজন সামনের দিক থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় শাফানের দিকে।
‘দুর্গম এলাকাগুলোর ম্যাপ তৈরি হচ্ছে ভাই। আসলে ভেতরের অবস্থা অতটা ভালো না। পরিস্থিতি তো জানেনই।’ শাফানের উত্তর শুনে অসন্তুষ্টি নিয়ে অন্যদিকে তাকায় প্রশ্নকর্তা।
সবকিছু খোলাসা করা যাবে না। ভেতরের পরিস্থিতি জানে শাফান। ৫ই আগস্টের বহু আগেই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে সেনাবাহিনীর মাঝে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। অধিকাংশ স্বদেশপ্রেমী সৈনিক স্বৈরাচারের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণ করলেও কতিপয় উর্ধ্বতন জেনারেলদের ভয়ে তারা মুখ বুঁজে বন্দুক নিয়ে বেরিয়েছে রাস্তায়। তখন দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে সেনাবাহিনীর দিকে। মনেপ্রাণে তারা বিশ্বাস করে, কিছু করলে স্বদেশপ্রেমী এ সৈনিকদের পক্ষেই করা সম্ভব। কিন্তু কী করবে সেনাবাহিনী? তখনও ধোয়াশাপূর্ণ সবকিছু। কারফিউয়ের দিনগুলোতে শাফান আগারগাঁও এরিয়ায় ডিউটিরত অবস্থায় বারবার জনতার মুখে শুনেছে—‘এই মুহূর্তে দরকার, সেনাবাহিনী সরকার।’ কিন্তু সত্যিই কি পারবে সেনাবাহিনী? খোদ শাফানও ভাবেনি পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তবে অন্য সৈনিকদের মতো শাফানের বুকেও দেশপ্রেমের বারুদ জ্বলছিল। শাফান তার সিনিয়র ক্যাপ্টেন মুশফিকের কাছে বারবার ফিসফিসিয়ে বলেছে—‘স্যার! এভাবে কয়দিন? আমরাও কি জনতার বুকে গুলি চালাব? আবু সাঈদের মতো কারও বুকে?’ ক্যাপ্টেন চুপ করিয়ে দিয়েছে শাফানকে। বলেছে—‘এখনও সময় আসেনি। শীঘ্রই দেশে কিছু হতে যাচ্ছে। উপর থেকে ক্লু পাচ্ছি। তোমরা সতর্ক থাকো। মানুষ আমাদের ভালোবাসে। এর প্রতিদান আমাদের দিতে হবে। তবে এখন নয়; সময় আসবে।’
৩ আগস্ট রোজ শনিবার। সকালেই শাফান তার উর্ধ্বতন ক্যাপ্টেনের বরাতে সংবাদ পায়, দুপুর দেড়টায় হেলমেট হলে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান। পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বৈঠক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আঁচ করতে খুব বেগ পেতে হয় না শাফানকে। সকাল থেকেই সবার ভেতর চাপা উত্তেজনা। কেউ অগ্রীম দু-চার কথা বলতে গিয়েও থেমে থেকে যাচ্ছে। এমন অভ্যন্তরীণ দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই ঠিক একটায় হেলমেট হলের নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসে শাফান। বৈঠক শুরু হতে তখনও আধঘণ্টা বাকি; অথচ পুরো হলের সবাই নিশ্চুপ। সামান্য শব্দও নেই কোথাও। যথাসময়ে সেনাপ্রধান তার আসনে উপবিষ্ট হন। খুব মেপে মেপে বলা তার প্রতিটি বাক্য যেন চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের জানান দিচ্ছিল। জনগণ ও স্বৈরশাসকের মাঝে সেতুর মতো দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনী এবার কফিনের শেষ পেরেক ঠুকে দেবার দায়িত্বে—কিন্তু হয়েও যেন হচ্ছে না শেষ, এ নরকীয় যন্ত্রণার যাত্রা দীর্ঘায়িত হচ্ছে ক্রমেই, উপস্থিত তরুণ সেনাদের চোখের আগুন সেটিই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল সেনাপ্রধানকে।
আধঘণ্টা ঘোরাচ্ছন্ন বক্তব্যের মাঝে তিনি দুটি বিখ্যাত গানের কলি আবৃত্তি করলেন। অযাচিত ঝঞ্ঝাটের মুখে পড়ে মাটি ও মানুষের প্রিয় সেনাবাহিনী যখন জনতার ভালোবাসা হারাতে বসেছে, ওয়াকার তখন জানিয়েই দিলেন—‘আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে।’ প্রেম কি কখনও অসুন্দর হয়? তবে ওয়াকার কেন এ দেশ ও জাতির ঘোর সংকটকে প্রেমের সঙ্গে তুলনা করলেন? এ রহস্য শাফানের মতো তরুণ ফৌজির মনে রহস্য বেঁধে দেয়। আরও একটি রহস্যময় পঙ্ক্তি শোনা গেলো ওয়াকারের মুখে—‘আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেবো আকাশে।’ তবে কি এ কান্নার দায় শোধ করবার সময় এসেছে? কম তো কাঁদেনি মানুষ। শহিদ মুগ্ধের উচ্চারিত শব্দগুলো—‘পানি লাগবে পানি?’ কম কাঁদিয়েছে মানুষকে? আরও একবার শাফানের চোখের কোণে জল টলমল করে। বুকের ভেতর বারুদ জ্বলতে থাকে। ওয়াকারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে শাফান, মনে মনে বলতে থাকে, শুধু একবার নির্দেশ দিন—এ দেশের মানুষকে বাঁচাতে সেনাবাহিনী জীবন দিয়ে দেবে।
একটি মধ্যবিরতির পর ওয়াকার তরুণ সেনাদের মুখে রাজপথের অভিজ্ঞতা শুনতে চাইলেন। শাফানও শোনাতে চায়, কিন্তু সে জানে—শৈশবের সেই অভ্যাসটুকু তার রয়ে গেছে, আবেগাপ্লুত হলে তার কথা জড়িয়ে যায়, অসীম সাহসী সেনা হিসেবে প্লাটুনে খ্যাতি থাকলেও এ দুর্বলতা বরাবর চেপেই গেছে সে। হাত তুলেও আবার নামিয়ে রাখে। কী বলবে শাফান? চোখের সামনে নির্বিচারে বন্দুক চালিয়েছে একদল গুণ্ডা। না, ওরা আইনের মানুষ নয়। ওরা পুলিশের লোকও নয়। একটি গুলির হিসেব দেবার মতো কঠোর বিধিনিষেধ তো ওদের নেই। শাফান দেখেছে—সদ্য হাসিমুখে হাত উঁচিয়ে থাকা টগবগে তরুণ লুটিয়ে পড়ছে পথের ধারে। লাল রক্তে ভেসে গেছে নগরের কোনো স্কুল ইউনিফর্ম। এ দৃশ্যগুলো শাফান আর মনে করতে চায় না।
পিনপতন নিরবতা ভেদ করে একে একে তরুণ সেনারা যখন তাদের অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছিল, তখন আর নিজের সেই দুর্বলতাটুকু আড়াল করতে পারেনি শাফান। মাথা নিচু করে কেঁদেছে। ওয়াকারের চোখেও কি তখন অশ্রু জমেছিল? দেখতে ইচ্ছে হয়নি তার।
সেদিনের এ বৈঠক সমাপ্ত হয় কিছু কঠোর সিদ্ধান্তের জানান দিয়ে। এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায়—বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার পর আজ থেকে সেনাবাহিনী আন্দোলনকারী জনতার গায়ে গুলি ছুঁড়বে না। এতেই শাফানের মতো অনেক ফৌজির চোখে আনন্দের উচ্ছাস দেখতে পাওয়া যায়। অনেকেই হাত ঝাঁকিয়ে হ্যান্ডশেক করে সহযোদ্ধাদের সাথে। কিন্তু শাফান আরও গভীর কিছু বিষয়ে ভাবতে থাকে। তার মনে রহস্য জট পাকাতে থাকে, সেনাপ্রধান কি তবে স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার প্রথম ধাপে পা রাখলেন? এটা কি আদৌ সহজ তার পক্ষে?
দুই.
4ঠা আগস্ট রোজ রবিবার। শাফান বরাবরের মতোই আগারগাওয়ে ডিউটি পরিচালনার জন্য দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সকাল থেকে। গতকালের চেয়ে আজ পরিস্থিতি ঢের ভয়াবহ। মুহুর্মূহু ঘাত-প্রতিঘাতে প্রাণ হারানোর সংবাদ ভেসে আসছে। গতকালের বৈঠকে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে—তা পুরো গোপন রাখা হলেও বাতাসে বাতাসে জনতার কানে খবর পৌঁছে গেছে, সেনাবাহিনী জনতার পক্ষে। সেই থেকে পথচারীর চোখেমুখে ভিন্নমাত্রার আনন্দ দেখতে পায় শাফান। আবহমান কাল থেকে সেনাবাহিনীর প্রতি যে ভরসা মানুষের হৃদয়ে বিরাজমান ছিল, ক্ষণিক বিরতির পর সেটিই পুনরায় জেগে উঠেছে। চাপা ক্ষোভ নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে আসা অনেকেই সুযোগ পেলে স্যালুট জানাচ্ছে শাফানদের। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে নয়। সকাল থেকেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। খুব নিকট থেকে গুলির আওয়াজ কানে ভেসে আসছে। উপরের নির্দেশে পুলিশ বেপরোয়া আক্রমণ পরিচালনা করছে।
বিকেলনাগাদ সংবাদ এলো, প্রায় শ-খানেক বিপ্লবী জনতা প্রাণ হারিয়েছে। ওদিকে চাপা গুঞ্জন, সেনাবাহিনীর হাইকমাণ্ড থেকে যেকোনো ঘোষণা চলে আসতে পারে। সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন ক্যাপ্টেন মুশফিক। সন্ধ্যার আগে আগে ক্যাপ্টেনের ডাকে শাফান তড়িঘরি করে ছুটে যায় ক্যাপ্টেন মুশফিকের কাছে।
‘সকালে গণভবনে বৈঠক হয়েছে। ছয়টা থেকে কারফিউ। তোমার প্লাটুন নিয়ে শ্যামলী মোড় সামলাবে। বহিরাগত কেউই সন্দেহমুক্ত নয়। সবাইকে থামাবে। কুইক।’
‘স্যার, ছাত্ররা শহিদ মিনারে জমায়েত হচ্ছে। আমরা ওদের বাধা দেবো? পরিস্থিতি খুব খারাপ স্যার। অনেক মানুষ মারা গেছে পুলিশের হাতে।’
‘শাফান, পুলিশও মরেছে চৌদ্দজন। পুলিশ এখন নিয়ন্ত্রণে নেই। সরকার যা বলছে, ওরা তাই করছে। আমরা যে নির্দেশ পেয়েছি, সেটিই পালন করতে হবে। ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা ওদের শত্রু নই। তবে মনে রাখবে, অ্যাভরি সিঙ্গেল পারসন ইজ সাসপেক্ট। কাউকে বন্ধু মনে করবে না এ মুহূর্তে।’
‘ওকে স্যার।’
স্যালুট ঠুকে দ্রুত প্লাটুন নিয়ে শ্যামলী মোড়ে এসে দাঁড়ায় শাফান। গাবতলী থেকে তখন আর কোনো গাড়িই আসতে দেখা যায় না। খুব নিকটেই গণভবন। এসএসএফের বেশ কয়েকটি গাড়িকে ওদিকটায় যেতে দেখা গেলো। খুবসম্ভব সরকার আত্মরক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। শাফান বুঝতে পারে, খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে প্রেক্ষাপট। ছাত্র-জনতা মূল রাজপথ ছেড়ে অলিগলি ধরে শহিদ মিনারের দিকে ছুটে চলছে। এ দৃশ্য দেখে শাফানের হৃদয়ে উত্তেজনা বেড়েই চলে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়—‘তোমরা ছুটে চলো। আমরা পারিনি, তোমরা পারবে।’
সেদিন রাতে ঘোষণা এলো, মঙ্গলবারে ঘোষিত কর্মসূচি মার্চ ফর ঢাকা এগিয়ে আনা হয়েছে আগামীকাল সোমবারে। এ ঘোষণার পূর্বেই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীরা আন্দোলন ঠেকাতে কঠোর কর্মসূচি দেবার কথা জানিয়েছেন গণমাধ্যমে। রাত দশটায় ক্যাপ্টেন মুশফিক নিজেই গাড়ি নিয়ে ছুটে এলেন শ্যামলীতে। তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দৃশ্যমান।
‘শোনো শাফান, মার্চ ফর ঢাকা ঠেকাতে সরকার চাপ প্রয়োগ করছে। আমাদের সবাইকে সতর্ক হতে হবে। খুব শীঘ্রই হয়তো ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করবে মানুষ।’
‘আমরা তাদের আটকে দেবো স্যার?’ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে শাফান।
‘না। আমরা আটকাবো না। আমরা জনতার পক্ষে। পায়ের নীচে মাটি নেই সরকারের। শীঘ্রই কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা চাইবে যেকোনো মূল্যে শেষ আঘাত থেকে রক্ষা পেতে। আন্দোলনকারীদের সেইফলি যেতে দেবে।’
চমকে যায় শাফান। ক্যাপ্টেন মুশফিকের শেষ কথাগুলো তার ভেতরকার সুপ্ত অগ্নিশিখায় খড় ফেলে দেয় যেন। ‘ইয়েস স্যার’ বলে চিৎকার করে ওঠে সে। প্লাটুনের সব সেনাদের মাঝেই আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। এ নির্দেশ শুনবার জন্য কতকাল অপেক্ষমাণ ছিল তারা, কীভাবে তা বোঝানো যায়! কর্মজীবনের তাবৎ অভিযানের যুদ্ধাংদেহী তৎপরতার তুলনায় আজকের রাত শাফানের কাছে সবচে অ্যাডভাঞ্চারাস। জীবন দিয়ে দেবার শপথ নিয়ে হেলমেট ঠিকঠাক করে উঠে বসে সাদা সাঁজোয়া যানে।
সেদিন রাতে দলে দলে ছুটে আসা মানুষগুলোকে থামায়নি শাফানের দল। এমন স্ট্যাচু হয়ে থাকতে গত কদিনে যে অন্তর্দাহে জ্বলেছে হৃদয়, আজ তার ব্যতিক্রম। মৃত্যুর ভয় কাটিয়ে ওরা ছুটে আসছে, এ যেন নৈঃশব্দের মিছিল। ওরা জানে, কাল সকালেই জীবন-মৃত্যুর ফায়সালা। কাল যদি থেমে যায় জনতার স্রোত, হয়তো নিঃশব্দে ছেয়ে যাবে এ ব্যস্ত নগর। সবগুলো যোগাযোগমাধ্যম অচল, পুলিশের অতন্দ্র পাহাড়া, শত্রুপক্ষের হিংস্র উৎপাত, তবু কীভাবে যেন প্রাণে প্রাণে সংযোগ ওদের। ওরা স্রোতের মতো ধেয়ে আসছে নগরে। মৃত্যুর সাক্ষাত আলিঙ্গনে বিন্দুমাত্র ভীত নয় ওরা।
খুব সকালে থেমে থেমে ছুটে চলা মানুষের এ মিছিল ক্রমেই গাঢ় হয়ে আসে। শাফান চতুর্দিকে খবর রাখছে। সাভার বাসস্ট্যান্ড থেকে পুলিশের গুলি খেয়ে আসা আহত এক কিশোর তাকে বলে গেছে—‘স্যার, পুলিশ সবাইকে গুলি মারতেছে। আপনারা আমাদের বাঁচান।’ ছেলেটির কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছিল। তাকে ধরে রাখা সহযোদ্ধার হাত যেন মেহেদিরাঙা। শাফান ওদেরকে নিকটবর্তী হসপিটালের সড়ক দেখিয়ে দিলেও ওরা ভ্রুক্ষেপ না করে হেঁটে চলে সোজা—শাহবাগের দিকে।
শাফান আরও দেখতে পায়, এক রিকশাওয়ালা প্রবল গতিতে প্যাডেল চালিয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের দিকে এগোচ্ছে—যাত্রীর আসনে শুয়ে আছে রক্তমাখা এক মৃতদেহ।
চোখে আগুন জ্বলে উঠে শাফানের। কী হচ্ছে চারিদিকে? ওরা কি দেশের সবাইকে মেরেই ক্ষান্ত হবে? ক্যাপ্টেনের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে শাফান তার প্লাটুনকে জড়ো করে মুহূর্তেই। প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে বলতে থাকে—‘ওরা আমার ভাইদের মেরে ফেলছে। আমরা আর বসে থাকব না। ছড়িয়ে পড়ো। এখানে বসে বসে তামাশা দেখে লাভ নেই। কোনো পুলিশ বা গুন্ডাবাহিনী যদি জনতার দিকে বন্দুক তাক করে, তোমরাও তোমাদের বন্দুকের জোর দেখিয়ে ছাড়বে।’
আগারগাওয়ের সড়কে সচকিত হয়ে ছুটে চলে শাফানের দল। শাফান একা দাঁড়িয়ে থাকে এপিসির সামনে। পিঠে ঝুলে থাকা একে ফোরটি সেভেন আবারও হাতে তুলে নেয় সযত্নে। হাতের ইশারায় আতঙ্কিত মানুষগুলোকে শাহবাগের দিকে দ্রুত ছুটে যেতে ইঙ্গিত জানায়।
এরপর খুব শান্ত শহর। কোনো কারণে গাবতলী থেকে ছুটে আসা মানুষের সংখ্যা শূন্য। দূরে দেখা যায় নীল পোশাকের দলকে উন্মাদের মতো গুলি ছুঁড়তে। বুলেটের ভ্যাপসা গন্ধ বাতাসের টানে এসে লাগে শাফানের নাকে। লোডেড একে ফোরটি সেভেন নিয়ে ঝাপসা লক্ষ্যের দিকেই ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকবার গুলি চালায় শাফান। এরপর পুলিশের দলটি আশপাশে কোথাও সরে পড়ে। শাফান রাগেক্ষোভে গালিগালাজ করতে থাকে।
বেলা এগারোটা। থমথমে রাজপথ। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা প্লাটুনের সেনারা ফিরে এসেছে মোড়ে। সবাইকে সতর্কভাবে দাঁড় করিয়ে শাফান বারবার চেষ্টা করছে ওয়াকিটকিতে ক্যাপ্টেন মুশফিকের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে। সড়কে একটি মানুষও নেই। কোথাও কি মৃত্যুর সমাবেশ শুরু হয়েছে তবে—শাফান টের পায় না। কারও সাথে তার কোনো সংযোগ নেই। মন চাচ্ছে সবাইকে নিয়ে সামনের দিকে ছুটে যেতে। খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে—এ মুহূর্তে কী হচ্ছে ওদিকটায়! কিন্তু সর্বশেষ বার্তা হিসেবে কড়াস্বরে মুশফিক জানিয়েছিলেন, ‘যদি দেশে কেয়ামতও শুরু হয়ে যায়, তোমরা স্থান ত্যাগ করবে না।’
এরইমধ্যে কোত্থেকে যেন প্রবল চিৎকার ধ্বনি শোনা যায়। কীসের চিৎকার? কেউ গুলিবিদ্ধ হলো? খটখট শব্দে শাফানদের রাইফেল স্থাপিত হাতে হাতে। একটি চিৎকারের সাথে শুরু হয় আরও একটি, এরপর আরও একটি—এরইমধ্যে শাফানের ওয়াকিটকি শব্দ করে ওঠে। দ্রুত হাতের মুঠোয় তুলে নেয়। ভেসে আসে চেনা কণ্ঠ—‘ক্যাপ্টেন মুশফিক স্পিকিং! শেখ হাসিনা পালিয়েছে। কনগ্রাচুলেশন। সেলিব্রেট নাও আওয়ার ফ্রিডম।’
ভাঙা ভাঙা আওয়াজে ভেসে আসা বার্তাটুকু শুনেই শাফান লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। সাথে থাকা সৈন্যদের বুঝতে বাকি নেই, উল্লাস করে ওঠে তারা। থমথমে রাজপথের নিরবতা ভেদ করে প্রতিধ্বনিত হয় সেনাদের চিৎকার। ওদিকে চারিদিকে শুরু হয় আকাশ বিদীর্ণ করা চিৎকার। দূরের গাছে বসে থাকা একঝাক পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে যায় পশ্চিমাকাশে। শাফান তার একে ফোরটি সেভেন উঁচিয়ে আকাশের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে অবিরত। এ শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে আরও প্রকট হতে থাকে উচ্ছাসধ্বনি। এর ঠিক মিনিটকয়েক পর—খুব সচেতন ভীতসন্ত্রস্ত দুয়েকজন নেমে আসে বহুতল ভবন ছেড়ে রাস্তায়। শাফান আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারে না। হাত উচিয়ে তাদের ডেকে নেয়। তারাও বুঝে ফেলে—হ্যাঁ, বাতাসে বাতাসে যে খবর রটে গেছে, তা সত্য। দৌঁড়ে ছুটে আসে তারা শাফানের দিকে। শাফানও দৌঁড়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে নেয় অচেনা অজানা কোনো নাগরিককে। এক নারী তার পাঁচ বছরের সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় বেরোয় ঠিক এরই পরক্ষণে। কোত্থেকে এক রিকশাওয়ালা দ্রুতপদে প্যাডেল চেপে ছুটে আসে মোড়ে। নারীর কণ্ঠে তখন উচ্ছাস—‘মামা, চলেন শাহবাগে।’ ইতস্তত করতে থাকে রিকশাওয়ালা। নারীর চিৎকার—‘আরে কী ভাবতাছেন? ভয় পান? শেখ হাসিনা তো পালাইয়া গেছে!’ রিকশাওয়ালা ময়লা গামছা দিয়েই চোখ মুছে। এরপর কথা না বাড়িয়ে চিৎকার করতে করতে দুই যাত্রীকে নিয়ে ছুটে চলে শাহবাদের দিকে।
এরপর ক্রমাগত ঝড়ের মতো বেরোতে থাকে মানুষ। শাফান নিস্তার পায় না একমুহূর্ত। তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে এক কিশোর। প্লাটুনের সব সেনারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে আবেগাভূত মানুষের অভ্যর্থনা গ্রহণে। এরইমধ্যে কোত্থেকে যেন এক শিশু রজনিগন্ধার তোড়া নিয়ে বাড়িয়ে দেয় শাফানের দিকে। শাফান সবাইকে নিয়ে উদযাপন করতে থাকে। চোখ বেয়ে অবিরত ঝড়তে থাকে অকৃত্রিম আনন্দের অশ্রু।
‘শাফান! হ্যালো! মুশফিক স্পিকিং!’
ওয়াকিটকিতে অবিরত কথা বলে যাচ্ছেন ক্যাপ্টেন। কিন্তু ওদিকে যেন ভ্রুক্ষেপও নেই শাফানের। পরক্ষণে হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পেতেই দ্রুত কানে তুলে নেয়।
‘শাহবাগ থেকে জনতার স্রোত গণভবনের দিকে এগোচ্ছে। তাদের সেফটির দিকে নজর রেখো।’
‘ওকে স্যার।’
ওয়াকিটকি সরিয়ে রাখতেই শাফান লক্ষ্য করে—কালবোশেখি ঝড়ের মতো ধেয়ে আসছে মানুষ। শাফান হাত বাড়িয়ে দেয়। যেন ওরা সবাই একসাথে ঝাপিয়ে পড়বে তার বুকে।
তিন.
জ্যাম ছুটে গেছে। বাতাসের বেগে ছুটে চলেছে ত্রাণবাহী গাড়িগুলো। দীর্ঘ বিরক্তির জ্যাম ছুটে যাওয়ায় সবার চোখেমুখে স্বস্তি। বসে থাকা যাত্রীরা উঠে দাঁড়িয়েছে৷ মুখে বাঁশি ফুঁকে পথ সুগম করে দেবার আকাঙ্ক্ষা অনেকের। শাফানের মুখে জমে থাকা ক্লান্তির ঘাম বাতাসের ঝাপটায় শুকিয়ে গেছে৷ পথের ধারে সারিবদ্ধ কড়ই গাছের ফাঁক গলে রোদ এসে লাগছে গায়ে৷ গ্রামের বহু মানুষ ছুটে এসে দাঁড়িয়েছে পথের ধারে। ত্রাণকর্মীরা দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে—এ কৃতজ্ঞতায় তারা হাত নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছে৷
শাফানের মনে রাজ্যের চিন্তা, এ পিকআপের ত্রাণকর্মীরা যেতে চাচ্ছে ছাগলনাইয়ায়। সেখানে নাকি খুব বাজে পরিস্থিতি। কিন্তু লস্করহাটেও তো ভয়াবহতা, সেখানেও তো জীবন-মরণের যুদ্ধে নেমেছে শাফানের মা। হয়তো তার খালাত বোন রুমাও দিন কাটাচ্ছে কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে৷ রুমার মুখাবয়ব মনে পড়তেই শাফানের বুকটা কেঁপে ওঠে। এই তো কদিন পর এই মেয়েটি হতে পারত শাফানের জীবনসঙ্গিনী। এখন কেমন আছে রুমা—জানতে ইচ্ছে করে শাফানের৷ কিন্তু মায়ের ঝাপসা মুখচ্ছবির সামনে ম্লান হয়ে গেছে শাফানের বুকে লালিত প্রেমের মধুস্মৃতি৷
‘আচ্ছা শওকত ভাই, ছাগলনাইয়ায় না গিয়ে আপনারা কি লস্করহাট যাবেন প্লিজ? সিলোনিয়ার ওপাড়ে পানির মাত্রা খুব বেশি। মানুষ ঠিক কীভাবে জীবন কাটাচ্ছে কে জানে!’ শাফানের ইচ্ছে হয় না তার মা-বোনের কথা বলতে৷
‘ছাগলনাইয়ায় যাওয়াটা বেশি দরকার ভাই৷ আমার চাচাতো বোনের শশুরবাড়ির সবাই বাসার ছাদে বসবাস করতেছে৷ চাচাত বোন আফরোজা তার জামাই নিয়ে থাকে সুইজারল্যান্ডে। ওইখান থেকে ফোনে কেঁদেকেটে অস্থির৷ কী করব বলেন! পুরো ফেনীর মানুষই তো বিপদে আছে। আমরা তো নিজেদের আত্মীয়-স্বজনকে আগে বাঁচাবো—তাই না?’ শাফান মাথা নাড়ে৷ পিকআপের কেউ কেউ যে শাফানের প্রতি চরম বিরক্ত হচ্ছে, তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না তার। হয়তো ওরা মনে মনে বলছে, ‘শালা কোত্থেকে উদয় হয়ে ফেলেছে ঝামেলায়।’ হ্যাঁ শওকত সত্য বলেছে৷ এ ঘোর বিপদের কালে সবাই তো স্বজনকেই প্রাধান্য দেবে। শাফানের মা-বোন কোথায় কীভাবে মরে পড়ে রইলো, তাতে শওকতদের কী আসে যায়! শাফান বেদনার্ত মুখে হেসে ওঠে অজান্তেই। এক আকাশ দহন নিয়ে তীব্র হতাশার এ হাসি কেউই দেখতে পায় না। আরও মিনিটদশেক পর—যেদিকে চোখ যায়, দৃশ্যমান হয় কেবল অথৈ পানি। মাটিরাঙা ঘোলা পানিতে ডুবে আছে ক্ষেতখামার, গাছপালা, ঘরবাড়ি, খড়ের গাদা, ইটের ভাটা। ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ আছড়ে পড়ছে মহাসড়কে। ভাটার টানে পানি কিছুটা কমেছে—বোঝা যাচ্ছে ডুবন্ত বাড়িঘরের টিনের বেড়ায় মাটির চিহ্ন দেখে৷ মানুষগুলো কোথায় আছে? হয়তো ইশকুলঘরের দোতলায় জড়োসড়ো হয়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বশান্ত হয়ে রোগব্যধির সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে তারা বসে আছে—দূর থেকে ত্রাণবোঝাই কোনো নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে৷ আশ্রয়কেন্দ্রে কীভাবে কাটে মানুষের জীবন? ওখানে খেতে পায় তিনবেলা? আছে গোসল কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের সুবিধা? মায়ের কষ্ট হচ্ছে না? শাফানের লাল চোখে আবারও অশ্রু জমে। না, ভেঙে পড়লে চলবে না৷ এখনও বহুপথ বাকি।
সম্ভবত যেটুকু পথ গাড়িতে করে যাওয়া যায়, তার খুব নিকটে চলে এসেছে শাফানদের গাড়ি৷ দীর্ঘ একটি জ্যাম আবারও তৈরি হয়েছে। ত্রাণবোঝাই গাড়িগুলো সামনে গিয়ে থেমে পণ্য খালাস করে নৌকা নামিয়ে দিয়ে আবার ফিরে আসছে৷ এই তৎপরতা সঙ্গত কারণেই পরিচালিত হচ্ছে খুব ধীরগতিতে৷ কারণ, ওদিকটায় স্থান খুব সংকীর্ণ, আবার গাড়ির বহরও দীর্ঘ। শাফান একবার ভাবে, গাড়ি ছেড়ে নেমে পড়বে, বাকি শুকনো স্থানটুকু হেঁটেই পাড় হবে, কিন্তু আবার ভাবে—শেষমেশ এ মানুষগুলোর হাতেপায়ে ধরে হলেও যদি নৌকাটি লস্করহাটে নিয়ে যাওয়া যায়!
এ ক্ষীণ আশাটুকু বুকে বেঁধে পিকআপেই বসে থাকে শাফান। চারিদিকে ঠাণ্ডা শীতল বাতাস বইছে৷ বন্যার সর্বগ্রাসী পানি আরও নিকটে এখন। দেখা যায়—বাধভাঙা স্রোতে রাস্তার আস্তর খসে পড়েছে, কোথাও বেঁকে আছে বড় বড় গাছ—এই বোধহয় ভেঙে পড়বে ডালপালা সহ৷
ধীরগতিতে এগোতে এগোতে পিকআপটি প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শেষ গন্তব্যে পৌঁছায়। মহিপাল বাসস্ট্যান্ড থেকে তিন কিলোমিটার পর ফুরিয়ে গেছে শুকনো পথ, আর সামনে এগোবার জো নেই। মহাসড়ক গিলে খেয়েছে বন্যা। দেখে অনুমান করা যায় না, এ পথ দিয়েই বন্দরনগরী চট্টগ্রামের দিকে শো শো গতিতে গাড়ি ছুটে চলে।
পিকআপ থেকে নামানো হচ্ছে নৌকা। কাজটি সহজ নয়, আস্ত একটি ইঞ্জিনের নৌকা নামাতে ঢের ঝক্কিঝামেলা—ফলে এ কাজে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসছে অন্য দলের লোকেরাও৷ সবাই মিলে রীতিমতো হৈ-হুল্লোড় করে একেকটি নৌকা নামিয়ে অস্থায়ী নৌ-ঘাটে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপর মাঝি খুব দ্রুততার সাথে ইঞ্জিন বসিয়ে তেল ঢেলে গুছিয়ে নিচ্ছে সব। একমুহূর্ত দেরি করবার সুযোগ নেই; বহু নৌকাবাহী ট্রাক-পিকআপ দাঁড়িয়ে আছে সিরিয়ালে। তাই একেকটি নৌকার প্রস্তুতিপর্ব শেষ হতেই ত্রাণসামগ্রী ভর্তি করে দলবল নিয়ে ছুটে চলছে গন্তব্যে।
শাফান সবার সাথে এগিয়ে গিয়ে বহুকষ্টে তাদের বড় নৌকাটি পানিতে নামায়৷ এরপর সেই চাপা উত্তেজনা, সেই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা—নৌকাটি লস্করহাট নিয়ে যাবার শেষ প্রচেষ্টা।
ওই তো পিকআপে খাতির জমানো শওকত নৌকার পাটাতনে উঠে দাঁড়িয়েছে। সাথে আনা ত্রাণসামগ্রীও তোলা হয়েছে নৌকায়। শাফান কাছে গিয়ে দাঁড়ায় শওকতের। বলে,
‘শওকত ভাই, আপনার স্বজনরা বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের উদ্ধার করা উচিত, কিন্তু ভাই—আমার মা-বোনের কোনো খবরই আমি পাইনি৷ তারা কেমন আছে, কোথায় আছে কিছুই জানি না৷ প্লিজ ভাই, আপনার পায়ে পড়ি, নৌকাটি লস্করহাটে নিয়ে চলুন৷ এই তো ঘণ্টাখানেকের ব্যাপার।’
শওকত হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে শাফানের কথাটুকু শুনল কি শুনল না, এরইমধ্যে দলের কয়েকজন তেড়ে এলো শাফানের দিকে,
‘ওই মিয়া, কী সমস্যা আপনার? পাগল মনে হয় আমাদের? কুমিল্লা থেকে ঘাড়ে সওয়ার হইছেন, এখনও নামতে ইচ্ছা হয় না? আমাদের নৌকায় আপনি উঠবেন না।’
আরেকজন তাকে থামিয়ে বলতে শুরু করল,
‘আপ্নে না আর্মি? যান না আর্মিদের কাছে৷ হেলিকপ্টার দিয়া আপনার মা-বোনরে উদ্ধার কইরা আনবে৷ শুধু শুধু আমাদের কেন প্যারা দিচ্ছেন ভাই!’
শাফান আর কথা বলার সুযোগ পায় না৷ তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়েই স্টার্ট দেওয়া হয় নৌকার ইঞ্জিন৷ মুহূর্তেই কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ভটভট শব্দে দূরে সরে যেতে থাকে নৌকাটি৷ শাফান ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে৷ তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বুক ফেটে আসে কান্নায়। নৌকার যাত্রীরা প্রবল উল্লাসে মেতে উঠেছে৷ হই হই রই রই করে কোথায় যেন ওরা মানুষ বাঁচাতে যাচ্ছে। ফুল চার্জড অ্যাকশন ক্যামেরাধারী লোকটি ব্যাপক উৎসাহে ছবি নিচ্ছে দুর্যোগের। কী আনন্দ ওদের৷
চার.
‘আচ্ছা আপনার কী হয়েছে? বলবেন প্লিজ? কোনো সমস্যায় পড়েছেন?’
কাঁধে সামান্য স্পর্শ করে কথাগুলো বলা মানুষটির দিকে ঘুরে দাঁড়ায় শাফান। দেখে, খুব শান্তসৌম্য চেহারার এক হুজুর, গায়ে সাদা জুব্বা—যার অর্ধেকটা ভিজে গেছে পানিতে; মুখে অল্প দাঁড়ি, মাথায় লম্বা সাদা টুপি, প্রচণ্ড ক্লান্তি ও চিন্তা নিয়েও মুখে স্মিত হাসি, স্পষ্ট উচ্চারণে থেমে থেমে বলেন প্রতিটি শব্দ, নিপাট ভদ্রগোছের একজন মানুষ বলেই মনে হলো তাকে। শাফান তাকে একপলক দেখেই আবার দাঁড়িয়ে রইল আগের মতোই আনমনে। হুজুর লোকটি আবার বললেন,
‘কোনো বিপদে পড়েছেন? ওই নৌকার লোকেরা দেখলাম আপনার সাথে কী নিয়ে যেন কথা কাটাকাটি করছে!’
এবার শাফান কিছুটা সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল,
‘হ্যাঁ, ওদের সাথে যেতে চেয়েছিলাম। যাবো লস্করহাট, ওরা যাচ্ছে ছাগলনাইয়া। ওরা নিলো না আমাকে, কত করে বললাম।’
‘আমরা লস্করহাট যাচ্ছি। আপনি কীজন্য ওদিকটায় যেতে চাচ্ছেন?
কথাটুকু শুনেই শাফানের দেহে বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন। সে ভালোভাবে খেয়াল করেনি, ওই নৌকাটি অদৃশ্য হয়ে যাবার আগেই পেছনের পিকআপ থেকে আরও দুটি নৌকা নেমেছে—ত্রাণকর্মীরা খুবসম্ভব মাদরাসার ছাত্র হবে। ইতিমধ্যে একটি নৌকায় ত্রাণ বোঝাই করা হয়েছে। নিকটেই তার ইঞ্জিন মেরামত করছে মাঝি। আনমনে দাঁড়িয়ে থাকা গভীর চিন্তায় নিমগ্ন শাফান এতকিছু লক্ষই করেনি।
‘লস্করহাট কোথায় যাবেন ভাই? আমাকে নিন না ভাই প্লিজ! আমি লেফটেন্যান্ট শাফান। লস্করহাটে আমার বাড়ি। দুদিন আগে আমার মায়ের সাথে শেষ কথা হয়েছে। এরপর থেকে আর ফোনে পাচ্ছি না। আমি সিলোনিয়ার ওপাড়ে যাবো। এটুকু সহায়তা করুন ভাই।’
‘আমাদের দলে আছে প্রায় চল্লিশজন। নৌকা দুইটা। প্রথম নৌকায় ত্রাণসহ সর্বোচ্চ পাঁচজন বসতে পারবে। বাকিদের অর্ধেক পরের নৌকায় আসবে, বাকিরা এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে—আমাদের নামিয়ে দিয়ে নৌকা ফিরে আসা অবধি। এটা বড় বিষয় নয়, ব্যাপার হচ্ছে, আপনি যাবেন সিলোনিয়ার ওপাড়ে, আমরা যাবো রশিদিয়া মাদরাসায়। যতদূর শুনতে পাচ্ছি, রশিদিয়া পর্যন্ত যাওয়াটাও খুব টাফ। স্রোতের কবলে পড়ে এরমধ্যে বহু নৌকা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। কীভাবে কী করব বুঝতে পারছি না।’
শাফানের উচ্ছাস নেমে আসে কিছুটা। রশিদিয়া মাদরাসার পর নদী পেরিয়ে হাঁটাপথেই আরও প্রায় ঘন্টাখানেক লাগে শিবপুর যেতে। নৌকা ছাড়া এ পথটুকু যাবেই বা কীভাবে! তবু এ ঘোর বিপদের মুখে ওদিকটায় যাবার মতো একটা সূত্র পেয়ে হারাতে চায় না শাফান। জোরগলায় বলে,
‘সমস্যা নেই। আমাকে রশিদিয়া পর্যন্ত নিয়ে চলুন। বাকি পথ আমি যেভাবেই হোক চলে যাবো।’
‘কীভাবে যাবেন? নদী পার হওয়া তো অসম্ভব ব্যাপার। এ মুহূর্তে যে পরিমাণ স্রোত দেখছি, আমরা রশিদিয়ায় কীভাবে পৌঁছব, তা নিয়েই শঙ্কা জেগেছে। আবার, আমার দলে যারা আছে, তারা বিষয়টাকে কীভাবে নেয় কে জানে। সবাই তো এ মুহূর্তে আগেভাগে যেতে চাইছে গন্তব্যে। ওই দেখুন, প্রথম দফায় কারা যাবে এ নিয়ে রীতিমতো তর্ক বেঁধে গেছে।’
‘আপনি আমাকে নিয়ে চলুন। বাকি পথ আমি সাতড়ে চলে যাবো। আমি আর্মির লোক, ওইটুকু পথ সাতড়ানো মোটেও ব্যাপার নয় আমার জন্য। আপনি ম্যানেজ করুন ভাই প্লিজ।’
হুজুর অবাক হলেন শাফানের কথায়। এ মুহূর্তে স্রোতের ধাক্কায় হাটুপানিতেই দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না, আর ওদিকের যে পরিস্থিতি—তাতে সাতড়ে যাবার সাহস তো সাতারু চ্যাম্পিয়ানদের পক্ষেও করা সম্ভব নয়। তবু কথা না বাড়িয়ে তিনি বললেন,
‘আচ্ছা, আপনি নৌকায় গিয়ে বসুন। এখনই আমরা ছেড়ে দেবো।’
শাফান পাশে স্তূপাকৃত লাইফ জ্যাকেট থেকে একটি গায়ে পড়ে দ্রুতই নৌকায় গিয়ে ওঠে। নৌকার যাত্রী মাঝিসহ মোটে পাঁচজন। মাঝখানের পুরো জায়গাটা মালামাল আর ত্রাণসামগ্রীতে ভরা। শাফান এরই এককোণে বসে পড়ে। কিন্তু শাফানকে দেখেই যাত্রীদের একজন বলে ওঠে,
‘আপনি কে? এ নৌকায় উঠেছেন কেন?’
‘আপনাদের লিডারের…’
কথাটুকু শেষ না হতেই সে চিৎকার করে বলে উঠে, ‘নামুন, নামুন বলছি, কী আজব, সারারাত ধরে জার্নি করে এসে আমাদের ভাইয়েরা জায়গা পাচ্ছে না, আর কোত্থেকে বাইরের লোক এসে হাজির।’
এতক্ষণ যার সাথে কথা বলে অনুমতি নিয়ে শাফান নৌকায় উঠেছে, তিনি পাশে দাঁড়িয়েই উত্তেজিত ছেলেটিকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু রাগের মাথায় ছেলেটি তাকিয়েও দেখছিল না চারিদিকে। চরম ক্রুদ্ধকণ্ঠে সে বলেই যাচ্ছিল,
‘আপনি কে? দেখতে পাচ্ছেন না আমাদের ছেলেরা নৌকায় জায়গা পাচ্ছে না? আপনার কি বিবেক নেই? বুঝতে পারছেন না এখন আমাদের যাওয়া কতটা দরকার?’
‘ভাই, আমার যাওয়াটা আরও বেশি দরকার।’
‘তো আপনার যেদিকে ইচ্ছে যান। আমাদের নৌকায় কী? অদ্ভুত ব্যাপার। আরে নামছেন না কেন এখনও?’
এরমধ্যে তাদের নেতা যিনি, তিনি উত্তেজিত ছেলেটির মাথায় হাত রেখে বলছেন অবিরত,
‘রাইহান ভাই, উনাকে আমরা সাথে নিচ্ছি। আমি অনুমতি দিয়েছি যাবার। এই যে তাকিয়ে দেখুন, আমি বলেছি। শান্ত হোন।’
এবার ছেলেটি ভালো করে তাকিয়ে দেখে, তাদের দলের আমির তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করছেন। ছেলেটি ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি বুঝতে পেরেই চুপ হয়ে গেলো। আর একটি বাক্যও বেরোলো না তার মুখ থেকে। যাবতীয় উত্তাপ মিলিয়ে গেলো চোখমুখ থেকে। আর এরইমধ্যে শব্দ করে ইঞ্জিন চালু হলো, ধীরে ধীরে মহাসড়ক থেকে বা-দিকের খোলা ক্ষেতের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে চলল নৌকা।
ছেলেটির সাথে কথা বলতে গিয়ে শাফানের খুব রাগ হয়েছে। কিন্তু তার আত্মমর্যাদা সায় দেয়নি তার সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়াতে। উপরন্তু, যখন এরা তার বিপদের মুহূর্তে এত বড় উপকার করছে, তখন ভুল বোঝাবুঝির কারণে সৃষ্ট ঝামেলায় নিজেকে আর মেলে ধরেনি শাফান। এরইমধ্যে নৌকার গতি বেড়েছে। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে, সে তার কর্মকাণ্ডে অনুতপ্ত।
‘আমার নাম মাহফুজ। ঢাকায় শিক্ষকতা করি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক সংগঠনের সাথে আমার সম্পর্ক আছে। ঢাকা থেকে আমাদের আরও কয়েক ট্রাক ত্রাণ আসছে। আমরা যতদিন পানি না কমবে, এখানেই থাকব।’
যার অনুমোদনে মা-বোনকে বাঁচানোর পথে এগোবার সুযোগ মিলেছে, তার পরিচয় পেয়ে শাফানও নিজের পরিচয় দেয়,
‘শাফান। আমি সেনা কর্মকর্তা। পাঁচ বছর হয়েছে চাকুরির বয়স। লস্করহাটের শিবপুরে আমার বাড়ি। ঢাকাতেই থাকা হয়।’
‘আচ্ছা শাফান ভাই, আমি একটু কনফিউজড, আপনি সেনাসদস্য হয়েও কি আলাদা কোনো হেল্প পাননি? আই মিন, ফেনীতে সেনাবাহিনীর রেস্কিউ টিম কাজ করছে, ওদের কাছে গিয়ে আপনার পরিচয় জানালে কি এক্সট্রা সহায়তা পেতেন না?’
‘এ ব্যাপারটা কাউকে বোঝাতে পারি না ভাই। সবাই যখন শোনে আমি আর্মির লোক, তখনই বলে আপনি আর্মিদের কাছে গিয়ে হেল্প চাইলেই তো হয়। কিন্তু পরিস্থিতি কেবল আমিই জানি। এ মুহূর্তে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা খুব নাজেহাল। গোটা দেশের নানা জায়গায় বিশৃঙ্খলা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলো মাত্র। যারা সবেমাত্র ক্ষমতা থেকে লাঞ্ছিত হয়ে নেমেছে, তারা তো বসে নেই। গোলযোগ বাঁধানোর চেষ্টা করছে। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার আশঙ্কা আছে। থেকে থেকে বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। আমাদের দেশে সেনাবাহিনীর সংখ্যা খুব সীমিত। এ মুহূর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত আছে আমাদের সিংহভাগ সেনা। ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন জেলাশহরে আমাদের সেনারা টহল দিচ্ছে। এমন মুহূর্তে আচানক এই বন্যা। যে সেনাদের দেখছেন এখানে রেস্কিউ টিম হিসেবে কাজ করছে, বলতে পারেন এরা কেবল সেনাবাহিনীর মান-ইজ্জত বাঁচানোর একটা দায় সাড়ছে। আমি কোনোভাবেই তাদের কাছে গিয়ে কিংবা আমার সিনিয়রদের জানিয়ে হেল্প পাবো না। উল্টো আমার এ পরিস্থিতিকে অতটা গুরুতর মনে না করে তারা আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেবে। আমাদের জীবন খুব কঠিন মাহফুজ ভাই। আমি তো পারি না মায়ের এ বিপদে শান্ত হয়ে বসে থাকতে। আমার মায়ের হাঁপানি রোগ আছে। দিনভর ঔষধ খেতে হয়। বোনটার বিয়ে হয়নি; বয়সে ছোট। ও একা দেখভাল করে। বাবা তো চলে গেছে পরপারে বহু আগেই। আমি যদি এ বিপদে তার পাশে না দাঁড়াতে পারি, তাহলে বেঁচে থেকেই লাভ কী? কাউকে কিছু না জানিয়েই চলে এসেছি। আমি জানি, ঢাকা ফিরে গেলে এখন কঠিন পানিশম্যান্টের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু আমার কাছে মায়ের জীবন এতটা তুচ্ছ নয় যে, চাকরি বাঁচাতে দাঁতকামড়ে বসে থাকব।’
শাফানের কথাগুলো খুব মনোযোগে শোনেন মাহফুজ। শাফানের বুকে থাকা দুঃখ যেন ভাগাভাগি হয়ে যায় মাহফুজের বুকেও। তিনি ব্যথিত—তার চোখেমুখে তা স্পষ্ট প্রতিভাত হয়।
‘মা সবার আগে। আপনি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছে, আপনি নদীর ওপাড়ে যাবেন কীভাবে? এদিকে আমরা যে কন্ডিশনে আছি, আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দেবার মতো জো নেই। রশিদিয়ায় এ মালামাল রেখে আবার ফিরে এসে বাকি সদস্যদের নিয়ে যেতে হবে। কী যে করি আপনার জন্য। আচ্ছা চলুন, দেখি আল্লাহ ভরসা, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
‘আমি সাতরাতে পারব। কয়েক কিলোমিটার সাতরানো খুব কষ্ট হবে না।’
অসম্ভব একটি ব্যাপারেও শাফান সাহস হারায় না। যেতে তো হবেই—যে করেই হোক। নৌকা কখনও দ্রুত, কখনও থেমে থেমে চলছে। গাছগুলো সব ডুবে গেছে, ডালপালা আটকে দিচ্ছে চলার পথ। কখনও ঝোপঝাড়ে আটকে যাচ্ছে নৌকা। ভেসে আসা খড়কুটো, জঞ্জাল, কাঠের টুকরো আর অজস্র কচুরিপানার দল তো আছেই। নৌকার পাখায় ইতিমধ্যে বারকয়েক জঞ্জাল প্যাঁচিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। স্রোতের বিপরীতে চলতে গেলে ঘড়ঘড়ড় শব্দ করে কালো ধোয়া ছাড়ছে ইঞ্জিন। আবার স্রোতের দিকে চলতে গিয়ে নৌকার হাল ধরে গতিপথ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইতিমধ্যে নানা পথ ঘুরে নৌকাটি আবারও মহাসড়কের লেনে এসে পৌঁছে। লস্করহাট যেতে হলে লালপোল বাজারের এ পথটুকু পেরোতেই হবে। কিন্তু সামনের দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠে যাত্রীরা। মহাসড়কে যেন কতদিন ধরে আটকে থাকা বড় বড় কার্গো স্রোতের টানে নড়াচড়া করছে। সামান্য ঢল নেমে এলেই বুঝি গড়িয়ে পড়বে ওপাড়ে। নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টায় রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে গাড়িগুলো। আর—প্রবল গতিতে শাফানদের এদিক থেকে স্রোত বয়ে যাচ্ছে পথের অপরপাশে। আশপাশে আর একটি নৌকাও দেখা যায় না। কেবল কিছু আক্রান্ত মানুষ কিংবা ত্রাণকর্মী—আগত স্রোতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কোনো গাছের লতাপাতা কিংবা ডাল ধরে ভেসে আছে। সামান্য অসতর্কতায় তারা ভেসে যাবে—কতদূর, কোন ঠিকানায়, জানে না কেউ। এ স্রোত পেরিয়ে বাজারের দিকে যাওয়া কি সম্ভব? এ নিয়েই ভাবছিল শাফান-মাহফুজরা। ভাবনায় ছেদ পড়ল মাঝির কথা শুনে, ‘ওদিকে নৌকা নিয়া যাওয়া যাইব না।’
(প্রিয় পাঠক, উপন্যাসের এই অংশটুকু পড়ে যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, আশা করছি আমার ‘লস্করহাট’ নামে প্রকাশিতব্য বইটি সংগ্রহ করবেন।)