সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আমি কী যেন ভাবতে ভাবতে হেটে চলছি প্যারিদাস রোড দিয়ে। সামনে শিংটোলা মোড়, এরপর হেমেন্দ্রদাস রোডে আমার বাসা। আজ মাসের তেরো তারিখ। বাসা ভাড়া দেইনি। এ বলে কি আমার সংকোচ বোধ হচ্ছে? হতে পারে। একজন রিকশা থেকে সালাম দিয়েছে। আমি দেখেছি, তবুও উত্তর দিইনি। স্বাভাবিক সময়ে এমনটা হওয়া প্রায় অসম্ভব। সন্ধ্যায় ঘরেফেরা মানুষগুলোর ভিড়ে আমি হেলেদুলে হাটছি। কোথাও সিএনজি আটকে গেছে রিকশার প্যাঁচে, ক্রিং ক্রিং বেল বাজছে শত শত রিকশা থেকে, এসব মাথায় খোঁচা দেয় বড্ড। আমি সেই ভিড়ের ফাঁক গলে এপার ওপার হয়ে এগিয়ে চলছি। খানিকদূর হেটে পকেটে হাত দিলাম। এ আমার শৈশবের অভ্যাস। পকেটে কি টাকা আছে? কী যেন খেতে ইচ্ছে করছে, ঠিক করতে পারছি না। সামনে ঝালমুড়ি। ঝালমুড়ি খাওয়া যায়। আকাশে মেঘ করেছে। মেঘলা দিনে মুড়ি বেশ মানানসই খাদ্য।
মানিব্যাগে ত্রিশ টাকা আছে। এর মধ্য থেকে দশ টাকার মুড়ি খাবো ভাবলাম। মুড়িওয়ালা চাচা আমেজে আছেন। বেঁচাকেনা ভালো। কয়েকজনের পর আমার সিরিয়াল। চাচা যখন লাল মগের ভেতর বোম্বে মরিচকুঁচি, পেয়াজকুঁচি, ঘুগনি আর তেলমশলার ওপর মুড়ি রেখে সরু চামচটি দিয়ে নাড়ছেন, যেন তার ভেতর উন্মত্ততা পেয়ে বসল। নানা রসনার সাথে মুড়ি যেমন মগের ভেতর ঘুরছে, তিনিও ঘুরছেন, কে জানে তার আত্মাও হয়তো ঘুরছে। প্রবল উৎফুল্লতা মানুষকে এমন উন্মত্ত করে তোলে। দশ টাকা দিলাম। চাচা তার পকেট থেকে পাঁচ-দশ-বিশ টাকার ইয়া মোটা বান্ডেলের সাথে আমার লাল নোট মিলিয়ে রাখলেন। টাকাগুলো দেখে বোধহয় লোভ হলো। কত হবে ওখানে? অন্তত হাজারতিনেক হবে তো? আমার বাসাভাড়ার সমান। লোভ করে কী লাভ? চোর তো নই যে হ্যাঁচকা টান মেরে দিবো দৌড়। মুড়িহাতে অদ্ভুত সব কথা বলতে বলতে বাসার দিকে এগিয়ে গেলাম। পথে হেটে হেটে কথা বলার অভ্যাসের বয়সও প্রায় পাঁচ বছর হলো। বাসায় কেউ নেই। একাকি থাকতে বেশ ভালো লাগে। সবচে আনন্দের বিষয় হলো, অতীব কষ্টের মুহূর্তে এমন নিরব পরিবেশে শব্দ করে কাঁদা যায়। শব্দ করে কাঁদার মতো পরিবেশ পাওয়া কি কম আনন্দের কথা? যাহোক, আজ কাঁদার ইচ্ছে নেই। খালিগায়ে লিখতে বসবো।
১৩. ০৫. ২৩
সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিট